- বি। দে । শ
- জানুয়ারি ১, ২০২৫
বার্লিনে আক্রান্ত দাউদ হায়দার। সঙ্কটজনক অবস্থা, নির্বাসিত কবিকে নিয়ে নিঃশব্দ ঢাকার শাসক
ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে, সম্ভবত ১২ ডিসেম্বর, বার্লিনে তাঁর বসত বাড়ির নিকটস্থ এলাকায়, প্রকাশ্য রাস্তায়, একদল দুর্বৃত্ত হামলা চালায় সুপরিচিত কবি দাউদ হায়দারের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন দাউদ। পরে পুলিশ ছুটে আসে এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে। বিভিন্ন বন্ধুসূত্রে জানা গেছে, ভাঙা পাঁজর, প্রায় অকেজো হাত পা নিয়ে দাউদ লড়ছেন, নিঃসঙ্গের মতো । নাকে নল লাগিয়ে খাওয়াতে হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার তাঁর খবর নিয়েছে কি না, জার্মানিও বা কেন খবরটি চাপা দিতে চাইছে, এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। দাউদের বন্ধু আর বিশ্বজোড়া মননশীল পাঠকদের অনেকেই ক্ষুব্ধ, উদ্বিগ্ন।
বাংলাদেশের প্রথম সারির সংবাদপত্রে বীভৎস এ হামলার সংবাদ বের হয়নি, সারি সারি অনলাইন ডিজিটালও অদ্ভূত নীরব।
দাউদ বাংলাভাষার অন্যতম জনপ্রিয়, শক্তিমান কবি। বয়স ৭২, জন্ম ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, পাবনায়, সুশিক্ষিত, সাহিত্যময় পরিবারে। ১৯৭৩ সালে, লন্ডনের পয়েট্রি সোসাইটি বছরের সেরা কবির মর্যাদা দেয় তাঁকে। দুর্ভাগ্যজনক সত্য ‘বিদ্রোহ ছোঁয়া’ কবিতা লেখার ‘অভিযোগে’ তখনকার সরকার ওই ১৯৭৩ সালেই তরুণ কবিকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়ে দেয়। দাউদের বিরুদ্ধে শোরগোল ওঠে, ধর্মের সমালোচনা করেছেন তিনি? প্রশ্ন তুলেছেন অপৌরুষেয় তত্ত্ব নিয়ে। দাউদ তখন ঢাকার ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক, বয়স কম। যুক্তির চেয়ে আবেগের জোর বেশি তাঁর চিন্তায়। ফরাসি নব্য রোমান্টিকদের মতো দ্বিধাহীন উচ্চারণে ঘোষণা করছিলেন ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’। আগুনে ঘৃতাহুতি, ক্ষেপে গেল সমাজের একাংশ। তাঁর ওপর হামলা চালাল অসহিষ্ণুতার উপাসকরা, পাবনায় তাঁর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটল। দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন দাউদের একজন নিকটাত্মীয়।
তখনকার প্রশাসন চাপে পড়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে, দেশবিদেশে তরুণ কবিকে নিয়ে হৈ চৈ শুরু হলে, শাসক তার বাধ্যতা মেনে মুক্তি দিয়ে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়, কলকাতায়। তরুণ কবিকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। পাশে দাঁড়ালেন আবু সয়ীদ আইয়ুব, গৌরী আইয়ুব, অম্লান দত্ত, গৌরকিশোর ঘোষ, সন্তোষকুমার ঘোষ, হামদিবের এর মতো মুক্তবুদ্ধিচর্চার প্রবক্তারা। দাউদ বেকার, বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ নেই, মাঝে মধ্যে দাদা জিয়া হায়দার (নাট্যকার, কবি) ও অন্যান্য স্বজন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ছুটে আসতেন এই অতুল্য সাংস্কৃতিক শহরে। দাউদের স্থানীয় অভিভাবক অন্নদাশঙ্করের অতিথি সবাই; দাউদ ঘুরে বেড়ান দুঃসাহস আর তরুণোচিত চাঞ্চল্য নিয়ে। অন্নদাশঙ্করের বিশেষ আগ্রহে ভর্তি হলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে। এখানকার লেখাপড়া শেষেও দেশে ফেরা হলো না, ‘নির্বাসিত কবির’ মুকুট নিয়ে চলে গেলেন বার্লিনে। একুশের সন্তান দ্রুত মিশে গেলেন ওখানকার বৌদ্ধিক সমাজের স্রোতে। প্রকাশের প্রধান মাধ্যম বাংলা, চাকরিসূত্রে জার্মান ভাষা।
কলকাতার প্রতি দাউদের টান দুর্নিবার, প্রায়ই তাঁকে যৌবনের শহরে আসতে হয়, নিয়মিত লেখালিখি আজকাল পত্রিকায়। করনাকালে, পরেও তাঁর কলম নিস্তেজ হয় নি। এরকম একজন কবিকে, প্রেম আর সজাগ ভাবাবেগের দূতকে ব্রাত্য করে রেখেছে ঢাকা, কখনো দেশে ফেরানোর চেষ্টা করে নি। তাঁর উপর সাম্প্রতিক হামলার পরেও মুখে কুলুপ বাংলাদেশের শাসকের, কবিদের এবং লেখকদের। এ আরেক প্রগাঢ়, দুর্বোধ্য বিস্ময়।
❤ Support Us








