Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ১০, ২০২৫

বরাকের বাঙালি এবং অসম বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে মন্তব্যে বিতর্ক, বাংলার অধ্যাপকের বিরুদ্ধে শিলচর থানায় অভিযোগ দায়ের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বরাকের বাঙালি এবং অসম বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে মন্তব্যে বিতর্ক, বাংলার অধ্যাপকের বিরুদ্ধে শিলচর থানায় অভিযোগ দায়ের

১৯ মে অসমের আপামর বাঙালির জন্য স্মৃতি আর বর্তমানের মিলনধারার যৌথভাষের দিন। ভাষাশহীদদের প্রতি আবেগঘন শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, কান্না আর ভাষা রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকারের শপথ নিয়ে বুকের রক্ত ছেঁচে এ দিনে এক হয়ে যায় বাঙালির চেতনা, মনন, ইতিহাসের অবিমিশ্র স্রোত। বিশ্বের বুকে মাত্র কয়েকটি ভাষিক জাতি আছে, যারা ভাষা রক্ষার লড়াইয়ে দ্বিধাহীন পদক্ষেপে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, দীর্ঘ সংগ্রামে ছিনিয়ে এনেছে অধিকার। প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আর ১৯ মে দিনটি এলেই অশ্রুশিক্ত হয়ে ওঠে বাঙালির মন, হাত মুঠো হয় গর্ব আর অহংকারে, চোখ উঠে যায় আত্মমর্যাদার অসীম আসমানে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে নানামুনির নানা মত, তবু এ কথা অস্বীকার করা যায় না, ভাষা আগ্রাসনের তীব্র ছোবল খেয়েও, রাষ্ট্রযন্ত্রের আঘাতে বীর সন্তানদের রক্তে মাটি ভিজে গেলেও, আবার নিজের স্বমর্যাদায় দাঁড়িয়েছে প্রাণের ভাষা– আ মরি বাংলাভাষা।

ভাষা দিবসের দিনে অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে, বাংলা সাহিত্যসভার সম্পাদক, অধ্যাপক প্রশান্ত চক্রবর্তী অসমিয়া ভাষায় সংস্কৃতি ও শিক্ষার প্রসারে বাঙালিদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি অসম বিশ্ববিদ্যালয় ‘অসম চুক্তির ফসল’ এবং বরাকের বাঙালিদের ‘মেরুদন্ডহীন’ বলে উল্লেখ করেন। মুহুর্তেই বরাক উপত্যকায় বাঙালি জনমানসে ছড়িয়ে পড়ে এ কথা, তৈরি হয় প্রবল ক্ষোভ। অধ্যাপকের এহেন কথা বরাক উপত্যকার ইতিহাসের বিকৃতি বলেই অনেকের মত। এছাড়াও, তিনি বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব খাটো করে দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। শিলচরের বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তাঁর এ ধরনের একাধিক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে।

ক্রমেই অশান্তি ঘনীভূত হচ্ছিল। ‘অনুচিত’ বক্তব্যের জন্য তাঁকে বরাকবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, দাবি জানিয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠন বরাক ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট ও বাঙালি নবর্নিমাণ সেনা। কিন্তু ঘটনার প্রায় একমাস কেটে গেলেও প্রশান্তবাবুর তরফে কোনো উচ্চবাচ্য দেখা যায় নি, এমনকি চুপ অসম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। দায়সারা জবাব দিয়েছে বাংলা সাহিত্যসভা সংগঠন। ফলে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে বিদ্রোহের আকারে। প্রতিবাদী দুই সংগঠন যৌথভাবে শিলচর সদর থানায় অধ্যাপক চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। তাদের অভিযোগ, প্রশান্ত চক্রবর্তী শুধু ইতিহাস বিকৃতি করেছেন তা নয়, বরাকের বাঙালিদের সম্মানকেও আঘাত করেছেন। বিডিএফ-এর মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জয়দীপ ভট্টাচার্য বলেন, তাঁরা অধ্যাপকের কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার প্রত্যাশা করছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি কোনো দুঃখপ্রকাশ না করায় তাঁদের এই আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। জয়দীপ জানান, এর আগেও বিডিএফ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় একই ধরনের মন্তব্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল।

বিডিএফ-এর অন্য আহ্বায়ক হৃষীকেশ দে জানান, বাংলা সাহিত্যসভার কাছাড় জেলা কমিটি অধ্যাপকের বক্তব্যকে তাঁর ব্যক্তিগত মত বলে এড়িয়ে গেছে, যা যথেষ্ট নয়। তিনি দাবি করেন, বাংলা সাহিত্যসভা যেন সুস্পষ্টভাবে জানায় যে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বরাকবাসীর রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ফল, আসাম চুক্তির নয়। একইসাথে, তিনি সাহিত্যসভার পক্ষ থেকে অধ্যাপকের বক্তব্যের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানান। বিএনএস-এর পক্ষ থেকে সুমন দে ও দুলাল ভৌমিক জানান, তাঁরাও এর আগেও প্রশান্তবাবুকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কিন্তু তাতে কাজ হয় নি। তাই বিডিএফ-এর সাথে একত্রে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। প্রশাসনের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছেন তাঁরা।

বাঙালির শিল্প, সাহিত্য তথা বৌদ্ধিক ধারায়, আত্মসমালোচনা করবার ইতিহাস বহু পুরনো। একটি সমাজের এগিয়ে যাবার পথে, নির্মাণের পথে আত্মসমালোচনার ভূমিকা অপূরণীয়। সেই কবে রাজা রামমোহন রায়, কালীপ্রসন্ন সিংহ, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগর বাঙালির চেতনা বিকাশে আত্মসমালোচনার পথ বেছে নিয়েছিলেন। রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘সাত কোটি বাঙালিরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি’। তবে ইতিহাসের প্রতিটা উদাহরণেই দেখা যায়, বঙ্গবাসীর কূপমণ্ডূকতা, কুসংস্কার, সীমিত চিন্তাভাবনার জাল ছিঁড়ে নতুন অরুণোদয়ের ভাষ্যে আলোকিত, প্রজ্বলিত সমাজ দেখবার স্বপ্ন আর দৃঢ় অঙ্গীকারে কাজ করেছিলে মহাপুরুষের তীক্ষ্ণ ‘কুঠার’। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যাপারখানি এমন হলে খুশি হওয়া যেত, কিন্তু তা হয়নি। কটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত অধ্যাপক প্রশান্ত চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে ভালবাসেন। অসমীয়া জাতীয়তাবাদের রমরমা সময়ে, সে দিকেই ঝুঁকে থাকেন। বাঙালির জাগ্রত মিনার যে বিশ্ববিদ্যালয়, যে দিন আসলে চেতনার দিন, যে ভাষা প্রাণের, মা-য়ের, সে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করতে সঙ্কোচবোধ করেন না, ক্ষমা চান না, অনুতপ্ত হন না। এ বোধহয়, এ সময়েরই বিরোধাভাস। গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষায় গবেষণা, ক্ষেত্র মূলত ঠাকুর সাহিত্য, অসম-বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আর ইতিহাস, দীর্ঘ অধ্যাপক জীবনের পরেও, ভাষা আর সংস্কৃতি নিয়ে এরকম মন্তব্য কী কেবলই প্রচারে থাকবার চেষ্টা, না কি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ ! উত্তর জানা নেই, অধ্যাপক প্রশান্ত চক্রবর্তীর সাথে যোগাযোগ করা গেলে হয়তো অন্য কোনো ভাষ্য, অন্য কোনো যুক্তি পাওয়া যেতে পারত, তবে তা সম্ভব হয়নি।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!