- এই মুহূর্তে দে । শ
- ডিসেম্বর ২০, ২০২৫
ট্রলারডুবিতে আতঙ্ক উপকূলে ! নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণের দাবি তুলে কাকদ্বীপে জেলেদের বিক্ষোভ
ভারত-বাংলাদেশ জলসীমান্তে মাছ ধরাকে ঘিরে উত্তেজনা ফের চরমে। কাকদ্বীপ উপকূলে শনিবার সকাল থেকে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা। অভিযোগ, বাংলাদেশের নৌবাহিনীর নির্যাতন ও ধাক্কার জেরেই ভারতীয় ট্রলার এফবি পারমিতা-১১ ডুবে যায়। ওই ঘটনায় ২ জন মৎস্যজীবীর মৃত্যুদেহ উদ্ধার হয়েছে হয়েছে, নিখোঁজ ৩। ঘটনার পর থেকেই উপকূলবর্তী এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। অভিযোগ, সমুদ্রে মাছ ধরার সময় বাংলাদেশের নৌসেনার জাহাজ হামলা চালায় ভারতীয় ট্রলারটির। মৎস্যজীবীদের দাবি, পড়শি দেশের নৌ-সেনা ইচ্ছাকৃত ভাবে পিছন দিক থেকে ধাক্কা দেয়। তার পরেই ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে ডুবে যায়। ঘটনার সময় ট্রলারে থাকা একাধিক মৎস্যজীবী জলে পড়ে যান।
শনিবার কাকদ্বীপ মৎস্যবন্দর চত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখান শতাধিক মৎস্যজীবী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যেরা। তাঁদের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরেই বাংলাদেশের দিক থেকে হামলা ও হুমকির ঘটনা বাড়ছে। কিন্তু বার বার অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা মিলছে না। নিহতদের সহকর্মী জেলে হরি দাস বলেন, ‘আমরা নিজেদের নৌকার মালিক হয়েও আজ নিরাপত্তাহীন। ভারতীয় জলসীমান্তেই মাছ ধরতে গিয়ে এ অবস্থা। বাংলাদেশি নৌকা এসে আমাদের ট্রলারকে পিছন থেকে ধাক্কা দেয়। আমাদের ২ ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে, অনেকে আহত হয়েছেন। নৌকাটাই ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ তাঁর দাবি, ‘আর কত দিন আমরা এ ভাবে প্রাণ হাতে নিয়ে মাছ ধরব? কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ চাই।‘ বিক্ষোভকারীদের দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক স্তরে কড়া পদক্ষেপ করা হোক। পাশাপাশি, নিহত, নিখোঁজ ৫ জনের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং নিখোঁজদের দ্রুত খোঁজে বিশেষ তল্লাশি অভিযানের দাবিও তোলা হয়েছে।
এ বিষয়ে, প্রশাসনের এক কর্তা জানান, বিষয়টি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে জানানো হয়েছে। উপকূলরক্ষী বাহিনী ও নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চলছে। মৎস্যজীবীদের আন্তর্জাতিক জলসীমার অন্তত ১০ কিলোমিটার ভিতরে মাছ ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মৎস্যজীবী সংগঠনের তরফে। কাকদ্বীপ ফিশারম্যান ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বিজন মাইতি জানান, ‘পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জলসীমার অন্তত ১০ কিলোমিটার ভিতরে মাছ ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে বিপদের আশঙ্কা কিছুটা হলেও কমব।’ ট্রলার মালিকদেরও বলা হয়েছে, কোথায় জাল ফেলা হচ্ছে, সে বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে। তবে জেলেদের একাংশের বক্তব্য, শুধু আশ্বাসে কাজ হবে না, সীমান্তে কার্যকর নিরাপত্তাই এখন তাঁদের একমাত্র দাবি। নিরাপত্তার দাবিতে মৎস্যজীবীরা বিভিন্ন এলাকায় মিছিল ও পথসভার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গত সোমবার বাংলাদেশের উপকূলরক্ষী বাহিনীর একটি জাহাজের ধাক্কায় নামখানার ট্রলার পারমিতা-১০ ডুবে যায় বলে অভিযোগ। ওই ট্রলারে থাকা ১৬ জন মৎস্যজীবীর মধ্যে ১১ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নিখোঁজ ছিলেন ৫ জন। পরে ২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়। এ ঘটনার পর থেকেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে সমুদ্রপাড়ের মৎস্যজীবী মহল্লায়। প্রাণের ঝুঁকি নিতে না চেয়ে বহু ট্রলার মাঝ সমুদ্র থেকেই ফিরে আসতে শুরু করেছেন। ইতিমধ্যেই কয়েকটি ট্রলার উপকূলে নোঙর করেছে। বাংলাদেশ উপকূলরক্ষী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন কাকদ্বীপ ও নামখানার মৎস্যজীবীদের একাংশ। স্থানীয় মৎস্যজীবী শ্যামল দাস বলেন, ‘আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। এখন আন্তর্জাতিক জলসীমার কাছাকাছি গেলেই ভয় করছে। ভবিষ্যতে আবার এমন কিছু হলে প্রাণে বাঁচব কি না, সন্দেহ।’ তিনি জানান, আতঙ্কের কারণেই ট্রলার ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের নৌ-সেনা মৎস্যজীবীদের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ দফতর (আইএসপিআর)-এর প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামিউদদৌলা চৌধুরী এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, পারমিতা-১০ দুর্ঘটনাগ্রস্ত হওয়ার সময় বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর কোনো টহলদার জাহাজ ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ছিল না। তাঁদের বক্তব্য, ওই সময় বাংলাদেশের নৌ-সেনার জাহাজটি ১২ মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থান করছিল। আইএসপিআরের বিবৃতিতে আরও জানানো হয়েছে, ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে ভারতীয় কোস্ট গার্ডের মেরিটাইম রেসকিউ কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (এমআরসিসি) থেকে ঢাকাকে ই-মেল করে জানানো হয় যে, একটি ভারতীয় ট্রলার বঙ্গোপসাগরের ভারতীয় জলসীমায় ডুবে গিয়েছে। সে অনুরোধের ভিত্তিতেই মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশের জলসীমায় অনুসন্ধান চালানো হয় বলে দাবি নৌ-সেনার। যদিও উদ্ধার পাওয়া কয়েক জন মৎস্যজীবীর অভিযোগ করে আসছেন, রাতের অন্ধকারে আলো নিভিয়ে বাংলাদেশ নৌ-সেনার একটি জাহাজ ভারতীয় জলসীমায় ঢুকে পড়েছিল এবং তার ধাক্কাতেই ট্রলারটি ডুবে যায়।
সুন্দরবন জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার দিন বাংলাদেশ নৌ-সেনার একটি জাহাজ ভারতীয় জলসীমায় ঢুকে পড়ায় ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী তাদের তাড়া করে। পরে জাহাজটি সীমানা ছেড়ে চলে যায়। সুন্দরবন পুলিশ জেলার সুপার কোটেশ্বর রাও বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। উদ্ধার হওয়া মৎস্যজীবীদের ফ্রেজারগঞ্জ কোস্টাল থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’অন্যদিকে, ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীর হাতে আটক ৩৫ জন বাংলাদেশি মৎস্যজীবীকে বৃহস্পতিবার কাকদ্বীপ মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁদের ১৪ দিনের জেল হেপাজতের নির্দেশ দেন। সীমান্তে এ টানাপোড়েনের আবহে সমুদ্রপাড়ের মানুষজনের একটাই প্রশ্ন, কবে মিলবে স্থায়ী সমাধান, অমূল্য জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা?
❤ Support Us







