- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ১৩, ২০২৫
বঙ্গ রাজনীতিতে অনন্য নজির ! দলত্যাগ বিরোধী আইনে মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজ করল হাইকোর্ট, অধ্যক্ষের সিদ্ধান্তও বাতিল
বাংলার রাজনীতিতে স্মরণাতীত কালে এমন ঘটনা বিরল। বর্তমান রাজনীতিতে যেখানে দলবদল করা নেতা-মন্ত্রীদের জীবনে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন সময়ে দলত্যাগ বিরোধী আইনের প্রয়োগ করল কলকাতা হাইকোর্ট। বিজেপি-তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজ করে দিল উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুকুল প্রসঙ্গে নেওয়া পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তও বাতিল করা হয়েছে। ফলে কৃষ্ণনগর উত্তর আসন বর্তমানে শূন্য। তবে এ আসনে নতুন করে উপনির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ, বছর ঘুরলেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি থেকে জিতে বিধায়ক হন মুকুল রায়। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই তিনি তৃণমূলে যোগ দেন। বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা না দেওয়ায় খাতায়কলমে তিনি তখনো বিজেপির বিধায়ক হিসেবেই ছিলেন। বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের যুক্তি ছিল, মুকুল আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও বিজেপির সদস্য। তাই তাঁর বিধায়ক পদ খারিজ করার প্রশ্নই ওঠে না। এমন অবস্থাতেও তিনি পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি) চেয়ারম্যান পদে বসেছিলেন, যা সাধারণত বিরোধী দলের বিধায়কের জন্য সংরক্ষিত। তবে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মুকুলের বিরুদ্ধে দলত্যাগবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করেন। প্রথমে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে হয়েছিল, কিন্তু শীর্ষ আদালত নির্দেশ দেন এটি কলকাতা হাই কোর্টে করা হোক। এরপর শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি বিজেপির অম্বিকা রায়ও পৃথকভাবে মুকুলের পিএসি চেয়ারম্যান পদ নিয়ে মামলা দায়ের করেন।
মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজের মামলার শুনানি করেন বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশিদির বেঞ্চ। বৃহস্পতিবার আদালত রায় ঘোষণা করেছে। হাইকোর্টের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, দলত্যাগবিরোধী আইন অনুযায়ী মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে অধ্যক্ষের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তও বাতিল করা হয়েছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী আদালতের রায়কে ‘সংবিধানের জয়’ বলে অভিহিত করেছেন। শুভেন্দু বলেন, ‘দেরি হলেও সত্যের জয় হল। পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের রায় প্রথম, সম্ভবত গোটা দেশের ইতিহাসেও প্রথম। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষা করেছে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘যে কোনো দলত্যাগ হলে বিধায়কের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া উচিত। আমরা সেই সংবিধান রক্ষার লড়াই করব।’ তৃণমূলের পক্ষ থেকে মন্তব্য এসেছে, আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করা যায় না। দলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘মুকুলদা দীর্ঘদিন অসুস্থ। তার সুস্থতা কামনা করি। তবে শুভেন্দুর রাজনৈতিক দ্বিচারিতা এবার প্রকাশ পেয়েছে। তিনি নিজে একসময় দল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছিলেন। নিজের পরিবারের প্রেক্ষাপটে তিনি দলত্যাগবিরোধী আইনের কথা মনে রাখতে পারেননি।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নজিরবিহীন এ রায় ঘোষনায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষত, বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে সম্পর্ক আরও টানাপোড়েনপূর্ণ হতে পারে।
উল্লেখ্য, দলত্যাগ বিরোধী আইন হলো এমন একটি বিধান, যার মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্য বা বিধায়ক দল বদল করলে বা নির্বাচিত হয়াকালীন দলীয় সিদ্ধান্ত (যেমন ভোট, অথবা অনুপস্থিতি) লঙ্ঘন করলে তাঁকে সংসদ বা বিধানসভা থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ রয়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়— যদি কোনো সদস্য স্বেচ্ছায় তার নির্বাচিত দলের সদস্যপদ ত্যাগ করে, অথবা যদি সদস্য দলীয় হুঁশিয়ারি ভেঙে ভোট দেয় বা অনুপস্থিত থাকে, কিংবা স্বাধীন সদস্য যদি দলভুক্ত হয় এবং মনোনীত সদস্য দলভুক্ত হয় ৬ মাস পর, তাও এই আইন দ্বারা কার্যকর হতে পারে। তবে, আইনের প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে বিধান — বিশেষ করে সংসদের স্পিকার বা বিধানসভা সভাপতির মাধ্যমে। ১৯৬০-এর দশক থেকে ভারতের রাজনীতিতে ‘দলবদল’ বা সংসদ সদস্যদের একদল থেকে অন্যদলে যাওয়া ব্যাপকভাবে ঘটতে থাকে। বিশেষ করে ১৯৬৭ সালের নির্বাচনের পর বহু বিধায়ক দল বদল করেন এবং এমন এক পরিস্থিতি গড়ে ওঠে যাকে জনপ্রিয়ভাবে বলা হয় ‘আয়া রাম গয়া রাম।’ উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬৭ সালে গয়া লাল নামের একজন হরিয়ানার বিধায়ক মাত্র এক দিনে তিনবার দলবদল করে বড়ো ধরনের রাজনৈতিক হইচই সৃষ্ট করেছিলেন। এই ধাঁচের দলবদল ও রাজনৈতিক অস্থিরতা রোধ করতে উদ্যোগ নেয়া হয়। দীর্ঘ আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এক উচ্চপর্যায়ের কমিটিই গঠন করা হয়, প্রস্তাব জমা পড়ে। অবশেষে আইনগত রূপ পায়। ১৯৮৫ সালের ৩০ জানুয়ারি এবং ৩১ জানুয়ারি সংসদে আইন গ্রহণ হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর আইন কার্যকর হয় ১৮ মার্চ ১৯৮৫ থেকে। এই আইন ভারতের সংবিধানের ৫২তম সংশোধনী আইন হিসেবে ১০তম সূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে ২০০৩ সালে আইন এক সংশোধন করা হয়। দলভিত্তিক ‘স্প্লিট’ বা ‘মার্জার’ সংক্রান্ত ধারা কঠোর করা হয়।
এই আইন কার্যকর হওয়ার পর প্রথম বড় প্রয়োগের ঘটনায় নজির – মিজোরাম থেকে লোকসভার সদস্য লালদুহোমা, ১৯৮৮ সালে। যা নিয়ে প্রবল হইচই হয়েছিল রাজনীতির আঙিনায়। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিধানসভা ও সংসদীয় সদস্যদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ ঘটেছে। ২০২৪ সালে হিমাচল প্রদেশ বিধানসভায় স্পিকার কুলদীপ সিং পাথানিয়া ৬ জন কংগ্রেস বিধায়ককে দলবদলের (দলীয় হুইপ ভঙ্গ) কারণে অবিলম্বে সদস্যপদ কেড়ে নেন। ২০২০ সালে মণিপুর বিধানসভায় থৌনাওজাম শ্যামকুমার সিং নামে এক বিধায়ক দণ্ডিত হন। তিনি প্রথমে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, পরে ভারতীয় জনতা পার্টি‑এ যোগ দেন এবং আইন অনুসারে তাকে সদস্যপদ থেকে সরানো হয়। কর্ণাটকেও এমন দৃষ্টান্ত মেলে। তবে ভারতীয় রাজনীতিতে এমন ঘটনা বারবার ঘটলেও, বঙ্গ রাজনীতিতে এ ঘটনা বিরল। সাম্প্রতিক সময়ে, একমাত্র সাবিত্রী মিত্রের কথা বলা যায়। ১৯৯১ সাল থেকে আড়াইডাঙ্গা বিধানসভা কেন্দ্র (মালদা জেলা) থেকে কংগ্রেসের বিধায়ক ছিলেন। এরপর ২০১১ সালে দিকে তিনি তৃণমূলে যোগ দেন। সে কারণে তিনি দলবিরোধী আইন অনুসারে বিধায়ক পদ হারান। ‘স্বেচ্ছায় নিজের দল ত্যাগ’ করার যুক্তিতে তৎকালীন স্পিকার হাসিম আবদুল হালিম তাঁর সদস্যপদ বাতিল করেন। অবশ্য এরপর তিনি ২০১১ সালেই মণিকচক বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে বিধায়ক হিসাবে নির্বাচিত হন।
❤ Support Us







