- বি। দে । শ
- ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৫
চিনের প্রাচীরের ইতিহাসে বদল ? নয়া অনুসন্ধান প্রত্নতাত্ত্বিকদের
পাথর ও মাটি থরে থরে সাজানো। পৃথিবীর দীর্ঘতম মহাপ্রাচীর, স্থাপত্যের দুনিয়ার এক আশ্চর্য। ইউনেস্কো-এর ‘বিশ্বঐতিহ্য’ তালিকায় থাকা এই প্রাচীরের উচ্চতা প্রায় ৫ থেকে ৮ মিটার এবং দৈর্ঘ্য ২১,১৫৬.১৮ কিলোমিটার, চওড়ায় প্রায় ৯.৭৫ মিটার বা ৩২ ফুট। শুরু হয়েছে চিনের সাংহাই পাস এবং শেষ হয়েছে লোপনুর নামক স্থানে। কথিত আছে সুবিশাল চওরা প্রাচীরে একসাথে ১২ জোড়া ঘোড়া পাশাপাশি চলতে পারতো। আগে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে খ্রিস্ট্রিয় ১৬শ শতক পর্যন্ত চিনের উত্তর সীমান্ত রক্ষা করবার জন্য পাঁচিল নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এ সময় প্রায় একইরকম অনেকগুলো প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল, তবে খ্রিস্টপূর্বাব্দ ২২০ থেকে ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে চিনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াঙের অধীনে নির্মিত প্রাচীরটিই সবচেয়ে বিখ্যাত। এটি বর্তমান প্রাচীরের একেবারে উত্তরে অংশে অবস্থিত এবং এর খুব সামান্যই অবশিষ্ট আছে। বর্তমান প্রাচীরটি মিং রাজবংশের শাসনামলে নির্মিত হয়। এই ইতিহাস বদলে যেতে চলেছে ? পূর্ববর্তী ধারণা ভেঙে দিয়ে নতুন গবেষণায় উল্লেখ, চিনের মহাপ্রাচীরের বয়স এত দিন ধরে অনুমান করা ইতিহাসের থেকেও ৩০০ বছর বেশি পুরনো। আশ্চর্য এই স্থাপত্য কোনো এক রাজার একক নির্মাণ নয়, বরং একাধিক রাজবংশের দীর্ঘ সময়ের সম্মিলিত প্রয়াস। ইতিহাস হতে জানা যায়, সে সময় মাঞ্চুরিয়া আর মঙ্গোলিয়ার যাযাবর দস্যুরা চিনের বিভিন্ন অংশে আক্রমন করতো। দস্যুদের হাত থেকে চীনকে রক্ষা করার জন্য সুবিশাল এ প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল।
চিনের প্রত্নতাত্ত্বিকরা আবিষ্কার করেছেন যে, মহাপ্রাচীরের কিছু অংশ আগের ধারণার চেয়ে প্রায় ৩০০ বছর পুরোনো হতে পারে। শানডং প্রদেশের চাংকিং এলাকায় খননকার্যের ফলে জানা গেছে যে এই বিখ্যাত কাঠামোর কিছু অংশ পশ্চিম ঝাউ রাজবংশের শেষভাগ [১০৪৬-৭৭১ খ্রিস্টপূর্ব] এবং বসন্ত ও শরৎকালের [৭৭০-৪৭৬ খ্রিস্টপূর্ব] শুরুর দিকের। এই আবিষ্কার আগের ধারণা, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী দিকে শুরু হয়েছিল এবং পরে তৃতীয় শতাব্দী খ্রিষ্টপূর্বে ‘কিন’ রাজবংশের অধীনে একত্রিত করা হয়েছিল। চাইনিজ সোসাইটি অফ কালচারাল রিলিকস-এর লিউ ঝেং বলেছেন, ‘সর্বশেষ গবেষণা নির্দেশ করে যে, আবিষ্কৃত নতুন অংশটি চিনের সবচেয়ে প্রাচীন মহাপ্রাচীর। উল্লেখযোগ্য এই আবিষ্কারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে, সুবিশাল প্রাচীর একবারে নির্মিত হয়নি, বরং বিভিন্ন রাজবংশের মাধ্যমে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি বিকশিত হয়েছে।’
২০২৪ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত চিনের ওয়াংলি গ্রামে ১১০০ বর্গ কিমি এলাক্লা জুড়ে খননকার্য চালিয়েছিলেন প্রত্নতত্ত্ব বিষেশজ্ঞের বিশেষ একটি দল। প্রাথমিক জরিপ ও তদন্তের পর, গবেষণায় উঠে আসে নতুন আবিষ্কার করা অংশই কিউই রাজ্যের ‘গ্রেট ওয়াল’-এর নির্মাণের শুরুয়াৎ। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই কাজে বহুমাত্রিক আবিষ্কার পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্মের পাশাপাশি, উদ্ভিদ সিলিকা এবং পশুর হাড়ের মতো নমুনা সংগ্রহ করেছেন। তাঁরা অপটিক্যালি স্টিমুলেটেড লুমিনিসেন্স ও কার্বন-১৪ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে, আবিষ্কৃত অংশগুলির সময়কাল নির্ধারণ করেছেন। খননকার্যে রাস্তা, বাড়ির ভিত্তি, পরিখা, ছাইভস্মের গর্ত আর প্রাচীরের অংশ উন্মোচিত হয়েছে, যা প্রাচীন চিনের ইতিহাসের উন্নত প্রকৌশল ব্যবস্থার সাক্ষ্য বহন করে। কিছু অংশ পরিত্যক্ত হয়েছিল এবং পরে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল।মূলত চিনের উত্তর সীমান্তকে যাযাবর গোষ্ঠী থেকে রক্ষা করার জন্য নির্মিত এই প্রাচীর বাণিজ্য ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করেছিল। যুদ্ধরত রাজ্যকালের [৪৭৫-২২১ খ্রিস্টপূর্ব] সময়ে বিশেষভাবে সংরক্ষিত এই অংশ এবং সময়ের সাথে সাথে প্রাচীরের বিকাশ সম্পর্কে, এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রত্নতত্ত্ব আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নয়া দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
শানডং প্রাদেশিক ‘ইনস্টিটিউট অফ কালচারাল রিলিক্স অ্যান্ড আর্কিওলজি’-এর প্রত্নদলের প্রধান ঝাং সু গবেষনাপত্রে ব্যাখ্যা করেছেন, খননকার্যের ফলে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের স্থাপত্য নির্মাণের উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষকদলটি মাটির নিচে চাপা পড়া, স্থাপত্য, রাস্তা, ঢাল, আবাসিক ভিত্তি, পরিখা এবং ছাইয়ের গর্ত, পাশাপাশি প্রাচীরের উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ের চিহ্নবহনকারী দেয়ালগুলি আবিষ্কার করেছে। ঝাং এর মতে, দেয়াল দুটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত করা যেতে পারে। প্রথমদিকের দেয়ালগুলি, যা সম্ভবত বসন্ত এবং শরতের সময়কালের, প্রায় ১০ মিটার প্রশস্ত এবং ঝৌ রাজবংশের (১০৪৬ বিসি-২৫৬বিসি) প্রথম দিকে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তী প্রাচীর বিভাগগুলি প্রাথমিকভাবে ‘যুদ্ধরত রাজ্যে’-এর সময়কালের (৪৭৫বিসি-২২১বিসি) অন্তর্গত। দেয়ালের তৃতীয় ধাপটি সর্বোত্তম সংরক্ষিত, সবচেয়ে উন্নত নির্মাণ কৌশল এবং সবচেয়ে বড় আকারের, যার প্রস্থ ৩০ মিটারের বেশি। এই বিভাগটি সম্ভবত কিউই রাজ্যের শীর্ষ সময়ে নির্মিত হয়েছিল।
লিউ ঝেং আরো বলেছেন, ‘এই প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারটি মহান প্রাচীরের নির্মাণের তারিখকে পশ্চিম ‘ঝো’ যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। চিনের প্রাচীনতম পরিচিতি ‘গ্রেট ওয়াল’ সম্পর্কিত প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রে নতুন আবিষ্কার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এটি চিনের মহান উন্নয়ন বা গবেষণার জগতে নয়া মাইলফলক।’ দেয়াল ছাড়াও, উত্তর অঞ্চলের খনন এলাকায় শুরুর দিকের দেয়ালের নীচে অবস্থিত ‘ঝো’ রাজবংশের দুটি বাসস্থানের খোঁজ মিলেছে। বৃত্তাকার কোণ সহ বর্গাকার ভিত্তি বিশিষ্ট এই আবাসগুলি সেই সময়ের আধা-ভূগর্ভস্থ বাড়ির বৈশিষ্ট্য। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, প্রাচীর নির্মাণের আগে, এই অঞ্চলটি সম্ভবত একটি ছোট বসতির অংশ ছিল।’-ঝাং উল্লেখ করেছেন। এর আগে লিউ-এর নেতৃত্বে প্রত্নতাত্ত্বিক দল চিনের প্রাচীন বসতি, পিংগিন শহর আবিষ্কার করেছিল। যা আরেক ঐতিহাসিক ঘটনা। ওই শহর ‘গ্রেট ওয়াল’ থেকে প্রায় ১.৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।
কুইয়ে প্রদেশে নতুন আবিস্কৃত চিনের মহাপ্রাচীরের-এর বিন্যাস, অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো কিউই রাজ্যের উন্নত সামরিক পরিকল্পনা আর বহিঃশত্রু আক্রমণ ঠেকাতে কৌশলগত উন্নত ব্যবস্থার ঐতিহাসিক প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলো। পিংগিনের সাথে এর সংযোগ এও ইঙ্গিত দেয়, প্রাচীরটি শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নয় বরং মূল পরিবহন নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
❤ Support Us








