- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ১১, ২০২৫
দাঁড়াও, পথিক-বর… মাইকেল কবির খিদিরপুরের বাড়ির হেরিটেজ তকমা আইনি প্রশ্ন চিহ্নের মুখে
দাঁড়াও পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে—গভীর উচ্চারণে পথিককে দাঁড় করিয়ে চেতনা আর মনন আর ঐতিহ্যের পাঠ দিয়েছিলেন যিনি, তিনিই আজ সময়ের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নীরব, নিরুপায়। কলকাতার খিদিরপুরে তাঁর স্মৃতিমাখা বাড়িটি আজ আর অতীতের ছায়ায় শৌর্যবান নয়, বরং ভগ্নদশায় ক্লান্ত এক কাঠামো। মাইকেল মধুসূদন দত্ত—বাংলা সাহিত্যের মধুকবি, ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা। তাঁর ছোঁয়ামাখা বাড়ি হারাতে চলেছে হেরিটেজের সম্মান !
কলকাতা পুরসভার হেরিটেজ তালিকায় ‘গ্রেড ১বি’ তকমাপ্রাপ্ত ২০বি, কার্ল মার্কস সরণীর এই ঠিকানার ভাগ্য আজ আদালতের হাতে। এ বাড়ি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, কিন্তু এবার বিতর্কের গায়ে চাপছে আইনের চাদর। আদালত বলছে, কবি এখানে থাকতেন তার পাকা প্রমাণ চাই। লোককথা, ইতিহাসবিদের মত কিংবা সাহিত্যমনস্ক জনতার আবেগ—এসব নয়, চায় দলিল, ডিড, বা মিউটেশন কাগজ। এ যেন ইতিহাসের অরণ্যে বসে আধুনিক আইনি সংজ্ঞার খেলা। পুরসভা বহু পত্রপত্রিকা, লেখালিখি, সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করলেও আদালতের ভাষায় তা যথেষ্ট নয়। খিদিরপুর ব্রিজ থেকে ফ্যান্সি মার্কেটের দিকে এগোলে যে বাড়িটি চোখে পড়ে, যে বাড়িতে একসময় নাকি ছাপাখানা ছিল, যে বাড়িতে রাজনারায়ণ দত্ত তাঁর পরিবার নিয়ে উঠেছিলেন, যে বাড়ি থেকে মধুসূদন তাঁর সাহিত্যজীবনের যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেই বাড়ির অস্তিত্ব আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
১৮৩০-এর দশকে মা জাহ্নবী দেবী যখন পুত্র মধুসূদনকে নিয়ে সাগরদাঁড়ি থেকে কলকাতায় এলেন, এই বাড়িই ছিল তাঁদের ঠিকানা। এখান থেকেই স্কুল, এখান থেকেই কলেজ। এখানেই কবির বাল্যবন্ধু রঙ্গলালের কাছে মাত্র সাত হাজার টাকায় বিক্রি হয় বাড়িটি। তাঁর জীবনের বহু গোপন নাটকীয়তার সাক্ষী এই বাড়ি। মামলার লড়াই, আত্মীয়দের সঙ্গে বিতণ্ডা, বিলেতে যাওয়ার প্রস্তুতি—সব কিছুতেই এই বাড়ির দেওয়ালে লেগে রয়েছে বাংলা সাতিত্যের চিরায়ত সাহিত্যের গন্ধ। ঐতিহাসিক গুরুত্ব কি কেবল দলিলে ধরা পড়ে ? ঐতিহ্যের বাহার কি কেবল জমির রেজিস্ট্রিতে লেখা থাকে ? এই প্রশ্নই আজ তুলে দিচ্ছে বহু সাহিত্যপ্রেমী নাগরিক। তাঁদের মতে, এই বাড়িটি ধ্বংস হলে হারাবে একটি যুগের ছায়া। যে স্থাপত্য একসময় মুঘল ও ইউরোপীয় ঘরানার সম্মিলনে গড়ে উঠেছিল, যার কাঠামোয় ছিল উঁচু ছাদ, চওড়া জানলা, চুন-সুড়কির প্রলেপ—তার স্থানে উঠবে এক নির্ভেজাল কংক্রিটের বহুতল।
বর্তমান মালিক সালাউদ্দিন এই বাড়ির হেরিটেজ তকমা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। আদালত হেরিটেজ তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে। পুরসভার হেরিটেজ বিভাগ হতাশ। মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দার জানিয়েছেন, ‘আমরা চাই বাড়িটি হেরিটেজ হিসেবে থাক। কিন্তু আদালতের বাইরে গিয়ে তো কিছু করা যায় না।’ নানা প্রচেষ্টা, কমিশনের বিজ্ঞাপন, সংবাদমাধ্যমের আহ্বান—কিছুতেই হাতে আসেনি প্রত্যাশিত প্রমাণ। অথচ জানা যায়, বিশিষ্ট শিল্পী শুভাপ্রসন্নের নেতৃত্বে কমিশন একসময় প্রস্তাব দিয়েছিল, অন্তত ভবিষ্যতের নির্মাণ যেন মধুসূদনের নামে হয়, বাড়ির সামনে থাকুক একটি মূর্তি, একটি ফলক।
প্রশ্ন ওঠে, মূর্তি কি ইতিহাস সংরক্ষণ করে ? ফলক কি যথার্থ উত্তরাধিকার ? আমাদের স্মৃতিচিহ্নগুলো কি শুধুই তাত্ত্বিক ? একদিন যদি ওই দেয়াল ভেঙে যায়, তখন কি কেউ মনে রাখবে—এইখানে এক কবি ছিলেন, যিনি বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ এনেছিলেন, যিনি জন্ম দিয়েছিলেন মেঘনাদবধ কাব্য–এর মতো মহাকাব্যের ? সময়ের ভাষায় বললে, আদালত চায় প্রমাণ, আর সাহিত্যপ্রেমীরা চায় স্মৃতি। একদল দেখে দলিল, অন্যদল দেখে অন্তর্দৃষ্টি। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি—বিস্মৃত, জীর্ণ, অথচ গৌরবময়। মহানগরের স্মৃতিবিমুখ মানুষ, যারা নিজের ইতিহাসের গায়ে প্রোমোটারের প্ল্যাস্টার চড়িয়ে দিতে ব্যস্ত, মাইকেল কবির বাড়ি রক্ষা করার দায় ততখানি দেখা যায় না। অথচ উচিৎ ছিল যতটা সম্ভব, যতটা যত্নে পারা যায় আগলে রাখা। কারণ ইতিহাস যখন মুছে যায়, তখন কেবল স্মৃতিই নয়, মুছে যায় জাতিসত্তার রক্তমাংস।
❤ Support Us







