- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৫
এত অপদার্থ, অসভ্য রাজনৈতিক দল দেখিনি”, বিজেপিকে আক্রমণ মমতার
ভিনরাজ্যে বাংলাভাষী শ্রমিকদের হেনস্তা ও বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় রাজ্য বিধানসভায় শুরু হয়েছে বিশেষ আলোচনা। আর এরই মাঝে হট্টগোলে, স্লোগানে, মার্শাল ডাকা, সাসপেনশন, ধাক্কাধাক্কিতে কার্যত রণক্ষেত্র হয়ে উঠল কক্ষ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণের মাঝেই উত্তাল হয়ে উঠল অধিবেশন। ‘বাংলা ভাষার অপমান করলে মানুষ ক্ষমা করবে না’—বক্তব্যের শুরুতেই স্লোগানে ফেটে পড়ে তৃণমূল। পাল্টা বিজেপির অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রীর আগে কেন তাঁদের কথা বলতে দেওয়া হল না? ওয়েল অব দ্য হাউসে নেমে টেবিল চাপড়াতে শুরু করেন বিজেপি বিধায়করা। স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার অনুরোধ করলেও শান্ত হননি তাঁরা। বাধ্য হয়ে একে একে সাসপেন্ড করা হয় বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী, শঙ্কর ঘোষ, মিহির গোস্বামী, অশোক দিন্দা ও বঙ্কিম ঘোষকে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগেই নেওয়া হয় সিদ্ধান্ত।
সেখানেই শেষ নয়। কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে রাজি হননি শঙ্কর ঘোষ। বরং তিনি নিজের আসনের পাশেই শুয়ে পড়েন। শুরু হয় নাটকীয় টানাটানি। পরিস্থিতি সামাল দিতে হস্তক্ষেপ করেন মার্শালরা। শেষ পর্যন্ত শঙ্কর ঘোষকে চ্যাংদোলা করে কক্ষের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। ধস্তাধস্তিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। বিধানসভায় প্রবেশ করে অ্যাম্বুলেন্স। পরে তাঁকে জে এন রায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই তুলকালাম অবস্থাতেও ভাষণের মধ্যে থামেননি মুখ্যমন্ত্রী। একের পর এক তির্যক মন্তব্যে বিঁধেছেন বিরোধী দলকে। তাঁর কণ্ঠে বারবার উঠে এসেছে, বিজেপি বাংলা জানে না, বাংলার ইতিহাস জানে না। চক্রান্তের রাজনীতির মধ্য দিয়েই এ রাজ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইছে। বললেন, যারা আজ বাংলার ভাষাকে অপমান করছে, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তাদের অস্তিত্বই ছিল না। বলেন, বাংলা ভাগ করতে যারা ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল, আজ তারাই ভাষার অধিকার নিয়ে কথা বলে! মুখ্যমন্ত্রী একপর্যায়ে বলেন, ‘বিজেপি বিধায়করা বিধানসভার অপমান করছেন। ধিক্কার জানাই। এত অপদার্থ, অসভ্য রাজনৈতিক দল দেখিনি।’ এরপর কেন্দ্র সরকারকে বিঁধে বলেন ‘আর নেই দরকার নরেন্দ্র মোদির সরকার। মানুষ আপনাদের গদিচ্যুত করবে। তৃণমূল সুপ্রিমোর মুখে এ কথা শুনেই ক্ষোভে ফেটে পোড়ে গেরুয়া শিবির। উচ্চস্বরে স্লোগান দিতে শুরু করেন বিজেপি বিধায়করা। তৃণমূল-বিজেপির স্লোগান যুদ্ধের মাঝেই ওয়েলে নেমে আসেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘এরা বাংলা বিরোধী। বাংলা ভাষার অপমান করেছে, সে নিয়ে বিধানসভায় কথা বললে এঁরা কথা বলতে দিচ্ছে না। এঁরা চায় না, মানুষ এগুলো জানুক।’
অন্যদিকে, সাসপেন্ড হওয়া বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, তাঁদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। সাসপেনশন নিয়ম মেনে হয়নি। তিনি বলেন, আজ ৬৫ জন বিজেপি বিধায়কই প্রত্যেকেউ ‘শুভেন্দু’ হয়ে উঠবেন। অন্যদিকে, শাসক শিবিরের পাল্টা অভিযোগ, বিজেপিই আসলে বাংলা বিরোধী। বাংলা ভাষার আড়ালে বিভাজনের রাজনীতি করছে তারা। নাটকীয় এ পর্বের সূচনা হয়েছিল কৃষিমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। ধর্মতলায় ভাষা দিবসের তৃণমূলের মঞ্চ খুলে দেওয়ার জন্য সেনার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। প্রসঙ্গ টানেন পাকিস্তান সেনার। সে সময় প্রবল বিরোধিতা করেন শুভেন্দু অধিকারী।’ যার জেরে সাসপেন্ড হতে হয় তাঁকে।
বিধানসভার বাইরেও প্রতিবাদের আঁচ। সভা চলাকালীন এ দিন গেটের বাইরে হাতে দেখা গেল চাকরিহারা শিক্ষক নেতা সুমন বিশ্বাসকে, জাতীয় পতাকা হাতে, চোখে বিসর্জনের যন্ত্রণা। পাশে আরও চাকরি হারানো প্রার্থীরা। দাবি একটাই—বিশেষ বিল এনে দ্রুত যোগ্যদের ফিরিয়ে আনা হোক। প্রশ্ন তুলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী যদি দাগিদের রক্ষা করতে চান, তবে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা কোথায় দাঁড়াবে? আজই মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, যাঁরা শিক্ষক হতে পারবেন না, তাঁদের গ্রুপ ‘সি’-তে সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি আইনি পরামর্শ নিয়ে দেখা হচ্ছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এর অর্থই হল দাগিদেরই বাঁচানোর চেষ্টা।
সব মিলিয়ে ভাষার মর্যাদা নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনার মধ্যেই বিধানসভার ইতিহাসে আরো একটি উত্তপ্ত, কলঙ্কিত অধ্যায়ের সাক্ষী রইল রাজ্য। স্লোগান ছুঁড়ে ছুঁড়ে যেমন বলা হল—‘চাকরি চোর গদি ছোড়’, পাল্টা উঠল—‘মোদি চোর, গোদি চোর’। শাসক ও বিরোধী, কেউই যেন পিছিয়ে থাকল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও এদিন একাধিকবার শাসকদলের বিধায়কদের শাসন করে বলেন, ‘আমাদের কেউ ওয়েলে থাকবে না। থাকলে আমি স্পিকারকে বলব সাসপেন্ড করতে। শৃঙ্খলাবদ্ধ হও।’ এক পর্যায়ে নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ুন কবীর, নির্মল ঘোষদের উদ্দেশেও কড়া ভাষায় সতর্ক করেন তিনি। একদিকে বিজেপিকে মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, জনতা ধাক্কা দিয়ে আপনাদের শূন্য করে দেবে। পাল্টা শুভেন্দুর দাবি, বাংলা এখন বোঝে কারা শত্রু, কারা বন্ধু। বিশেষ অধিবেশনে, ভাষা নিয়ে তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গভীর আলোচনা করার কথা ছিল, অথচ রাজনীতির গরম হাওয়ায় তা আর হয়ে উঠল না। বিধানসভার স্পিকারের কথাতেই হয়তো ছবিটা স্পষ্ট—‘এটা তামাশার জায়গা নয়।’ অথচ শেষ পর্যন্ত যেন তামাশার রূপেই বিধানসভার এদিনের পাতা লেখা রইল।
❤ Support Us








