- প্রচ্ছদ রচনা স | হ | জ | পা | ঠ
- জানুয়ারি ২১, ২০২৬
ডুবে যাচ্ছে দেশের বিস্তৃত নদী অববাহিকা ! বিপন্ন গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, গোদাবরি
ভারতের প্রধান নদী অববাহিকা অঞ্চলগুলোর জন্য সাম্প্রতিক এক গবেষণা বয়ে এনেছে ভয়াবহ সতর্কবার্তা। ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত ‘বিশ্বব্যাপী নদী অববাহিকার নিম্নগমন’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের গঙ্গা -ব্রহ্মপুত্র, ব্রাহ্মণী, মহানদী, গোদাবরি, কাবেরি এবং কাবানি অববাহিকা অঞ্চলগুলো দ্রুতগতিতে ডুবে যাচ্ছে।
গবেষণায় স্পষ্ট, স্থানীয় সমুদ্রের স্তর বৃদ্ধির চেয়ে ভূ-অবনমন বা ভূমি নিম্নগমন অনেক বেশি দ্রুত গতিতে হয়ে চলেছে। অর্থাৎ এই অববাহিকা এলাকাগুলি সমুদ্রের তুলনায় অনেক দ্রুত নিচে নামছে, যা এখানকার মানুষ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য বড়ো ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই এলাকাগুলি দেশের মোট অংশের মাত্র এক শতাংশ হলেও, এখানে বসবাস করে বিশ্বের ৪ থেকে ৬ শতাংশ মানুষ। এ অঞ্চলে রয়েছে ১০টি বৃহৎ শহর, কৃষি জমি, মৎস্যচাষ, নদী ও সড়ক যোগাযোগ এবং বিস্তীর্ণ বাস্তুতন্ত্র। তাই শুধুমাত্র পরিবেশগত কারণে নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে এই ডুবে যাওয়া ব্যাপক সমস্যার আকার নিচ্ছে।
কেন এভাবে দ্রুত হারে জমি নিচে নামছে, তা বোঝার জন্য গবেষকরা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নদী অববাহিকা অঞ্চলের পৃষ্ঠের উচ্চতা পরিবর্তন পরিমাপ করেছেন। দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ জল অতিরিক্তভাবে উত্তোলন, নদীর পলি সরবরাহের পরিবর্তন এবং শহুরে সম্প্রসারণ, এই ৩টি প্রধান কারণ ভূমি নিম্নগমনের জন্য দায়ী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন ভূগর্ভস্থ জল খুব দ্রুত তোলা হয়, তখন মাটির নিচে থাকা পলি সংকুচিত হয়ে যায়। সাধারণত এটি ধীরে ধীরে ঘটে, কিন্তু মানুষের অতিরিক্ত চাহিদা এবং দ্রুত নগরায়নের কারণে এ প্রক্রিয়া অনেক দ্রুতগতিতে হচ্ছে। শহরের বৃদ্ধি আরো বেশি ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের প্রয়োজন সৃষ্টি করে, ফলে ভূমি নিম্নগমন ত্বরান্বিত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের বিশটি নদী অববাহিকার মধ্যে বেশিরভাগই বছরে গড়ে ৩ মিলিমিটারের বেশি ডুবে যাচ্ছে। বিশেষভাবে ব্রাহ্মণী ও মহানদীর অববাহিকা বছরে ৫ মিলিমিটারের বেশি হারে নিচে নামছে। এই ভূমি-অবনমন যদি সমুদ্রস্তর বৃদ্ধির সঙ্গে মিলিত হয়, তাহলে বন্যা, লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশ এবং ভূমিক্ষয় ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। বিশ্বের বড়ো বড়ো উপকূলীয় শহর যেমন ঢাকা, কলকাতা, ব্যাঙ্কক, সাংহাই, জাকার্তা— সবই এমন অববাহিকায় অবস্থিত, যেখানে ভূমি নিম্নগমন এবং সমুদ্রস্তর বৃদ্ধি একসঙ্গে হয়ে চলছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, কেবল বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা হিসেবে এটিকে দেখলে হবে না, বরং আঞ্চলিক ও সামাজিক-প্রযুক্তিগত সমস্যার দৃষ্টিকোণ থেকেও পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। গবেষকরা বলেছেন, ডেল্টা অঞ্চলে ভূমি নিম্নগমন কমানো এবং আপেক্ষিক সমুদ্রস্তর বৃদ্ধির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া, এই দুই কার্যই একসঙ্গে চালাতে হবে।
নয়া এই গবেষণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, নদী অববাহিকা শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নয়, মানুষের ক্রিয়াকলাপের কারণে বিপন্ন। দ্রুত নগরায়ন, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন এবং নদীর প্রাকৃতিক গতিপথে বাঁধ নির্মাণ— এসব মিলিতভাবে ধীরে ধীরে না হয়, বরং অনেক দ্রুত ডেল্টিকে নিম্নগমনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ব্রাহ্মণী এবং মহানদীর মতো দ্রুত ডুবে যাওয়া অববাহিকা শুধুমাত্র স্থানীয় কৃষক বা শহরবাসীর জন্য নয়, গোটা দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার জন্য এক গুরুতর সংকেত বহন করছে।
❤ Support Us








