- এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- নভেম্বর ২৬, ২০২৫
গোয়ার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে দ্রোহের সুর ! ইরান-ইরাকের নির্মাতাদের কণ্ঠে সেন্সরশিপ, সমাজবাস্তবতা আর মানুষের লড়াই
গোয়ার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রোৎসব ‘আইএফএফআই’-এর মঞ্চে বুধবার অদ্ভুত এক সেতুবন্ধনের ছবি দেখা গেল। ইরান ও ইরাক, দুই দেশের দুই ভিন্ন ইতিহাস, ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, ভিন্ন চলচ্চিত্রভাষা। তবুও, রাজনৈতিক চাপের নিচে পিষ্ট সাধারণ মানুষের দুঃখ, বেদনা, সাহস আর অদম্য টিকে থাকার লড়াই, এক সূত্রে বেঁধে দিল দুই দেশের নির্মাতাদের। গোয়ার প্রগাঢ় আলো-হাওয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁরা তুলে ধরলেন নিজেদের ছবি এবং সেই ছবির পেছনের না-বলা কাহিনি, শাসকের লালচক্ষু আর শীতল আগ্রাসনের কথা।
এই আলাপচারিতার কেন্দ্রে ছিল ইরানের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আমার মেয়ের চুল (রাহা)’ এবং ইরাকের ‘রাষ্ট্রপতির কেক’। দুটি ছবিই নিজ নিজ ভাবে নির্দেশ করছে সমাজ কতটা বদলে গেছে, কতটা বদলাতে বাধ্য হয়েছে, আবার কোথায় কোথায় চেপে রাখা হয়েছে সত্য। ইরানি নির্মাতা সৈয়দ হেসাম ফারাহমান জু বললেন, তাঁর ছবির ভিতর দানা বাঁধা গল্পটি আসলে তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের নারীদের যে নীরব সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অদেখা লড়াই, আমি সেটাই দেখাতে চেয়েছি। রাহা তার পড়াশোনার জন্য ল্যাপটপ কিনতে চুল বিক্রি করে, এই দৃশ্যটি প্রতীকী, ইরানের অসংখ্য নারী প্রতিদিনই এমন কিছুর সঙ্গেই লড়ছেন, যা বাইরের দুনিয়া দেখতে পায় না।’ ছবির প্রযোজক সাঈদ খানিনামাঘি জানান, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার অভিঘাত ইরানের সমাজকে ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে দিচ্ছে। ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমশ দরিদ্রতার দিকে পিছলে যাচ্ছে…’ বললেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘আমাদের ছবিতে দেখা যায়, একটি পরিবারের আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ে কেবল একটি ল্যাপটপের কারণে। বাস্তবে এরকম অসংখ্য পরিবারই প্রতিদিন নিজেদের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।’
হেসাম আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন, দারিদ্র্যকে কেবল ধূসর ফ্রেমে দেখানোর প্রবণতা তাঁর পছন্দ নয়। তিনি বলেন, ‘দরিদ্রতা মানেই অন্ধকার নয়। যারা সংগ্রাম করেন, তাদের জীবনেও রঙ আছে। হাসির রঙ, উৎসবের রঙ, পারিবারিক সুখের রঙ। আমি চেয়েছি ক্যামেরার ফ্রেমে জীবনের সেই রঙিন বাস্তবতা ফুটে উঠুক।’ তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ভবিষ্যতেও তিনি এমন সামাজিক বাস্তবতার গল্প বাণিজ্যিক ছবির কাঠামোর মধ্যেই বলতে চান। অন্যদিকে, প্রযোজক খনিনামাঘি খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেন যে, ইরানি চলচ্চিত্রশিল্প এখনো কঠোর সেন্সরশিপের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তাঁর দাবি, ‘অনেক সময় নির্মাতার গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য কেটে নেওয়া হয়। ফলে দর্শক অসম্পূর্ণ গল্প দেখেন।’
ইরাকের নির্মাতা আলেকজান্দ্রু–রাডুর বক্তব্য ছিল পুরোপুরি ভিন্ন অথচ ইরানের পরিচালকের সঙ্গে এক বিচিত্র মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি জানান, তাঁদের ছবি ‘রাষ্ট্রপতির কেক’ তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ অপ্রশিক্ষিত, সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে বাছাই করা লোকদের অভিনয়ে। আর এই পদ্ধতিই ছবিটিকে তীব্র বাস্তবতা দিয়েছে। রাডু স্মরণ করালেন ১৯৯০-এর নিষ্ঠুর দশক —স্বৈরশাসক ও নিষেধাজ্ঞার কষ্টে দমবন্ধ হওয়া ইরাক। তাঁর কথায়, ‘যখন রাষ্ট্রের উপরে নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়, শাসকের কিছুই হয় না। ভোগে সাধারণ মানুষ।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, এক স্বৈরশাসকের জন্মদিনে জনগণকে জোর করে উদযাপনে নামানোর বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় তৈরি হয়েছে ছবিটি। লামিয়া নামের এক কিশোরীর ওপর স্বৈরশাসকের জন্য কেক বানানোর অদ্ভুত দায়িত্ব চাপানো হয়। পরিচালক এই গল্পটিকে দেখতে চেয়েছেন এক ধরনের রূপকথা হিসেবে— যেখানে লামিয়া ইরাকের প্রতীক। তার সঙ্গে যা ঘটে, দেশের সঙ্গেও ঠিক তাই ঘটে। রাডু বলেন, ‘ইরাকের চলচ্চিত্রশিল্প এখনো শৈশব পর্যায়ে। ইরানের মতো সুদীর্ঘ ঐতিহ্য নেই। ‘রাষ্ট্রপতির কেক’ ইরাকের প্রথম আর্ট–হাউস ধাঁচের ছবি।’
আলোচনার শেষে দুই দেশের দুই চলচ্চিত্রের মধ্যকার সমান্তরাল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিষেধাজ্ঞার চাপে নুয়ে পড়া মানুষ, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে মানসম্মান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা, এবং জীবনের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে প্রতিদিনের লড়াই, এই সত্যগুলোই যেন তেহরান থেকে বাগদাদ পর্যন্ত এক অদৃশ্য সেতু নির্মাণ করল, যার ইট-পাথর হলো গল্প বলার শক্তি। গোয়ার সাগর হাওয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে যেন ভেসে আসছিল একটিই বার্তা— যে দেশেই হোক, মানুষ তার গল্প বলতে চায়, তার দুঃখ জানাতে চায়, আর শিল্পই পারে সেই চাপা থাকা সত্যকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে। আর এর সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো সিনেমা। গোয়ার চলচিত্রউৎসব আগামীতেও মানুষের কণ্ঠ এভাবেই তুলে ধরতে সাহায্য করবে বলে জানালেন ‘আইএফএফআই’-এর কর্মকর্তারা।
❤ Support Us







