- বি। দে । শ
- মার্চ ২৭, ২০২৬
হরমুজ সংকটেও তেল রফতানিতে বাড়লো ইরানের আয়
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির ফলে ইরান সম্ভবত শত শত মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আয় করেছে তেল রফতানি করে । কারণ, হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে সক্ষম একমাত্র বড় রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে তারাই বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে । এই যুদ্ধে আমেরিকা চেয়েছিল ইরানের তেলের ভান্ডার লুঠ করে তাতে দখলদারি চালাতে, সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে ইরান প্রতিদিন ১৩৯ মিলিয়ন ডলার আয় করছে তেল থেকে ।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দামের পরিবর্তনের ফলে ইরান দুইভাবে লাভবান হচ্ছে । তাদের প্রধান ক্রুড তেল গ্রেড এখন গ্রাহকদের কাছে (মূলত চিনে) ব্রেন্টের তুলনায় প্রায় ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ডিসকাউন্টে বিক্রি হচ্ছে । অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের দামও বোমাবর্ষণ শুরু হওয়ার পর প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের উপরে উঠে গেছে ।
এই মাসে ইরানের তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের মতোই প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে । খার্গ দ্বীপ টার্মিনাল থেকে তেলবাহী জাহাজগুলো এখনও লোড হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে—বরং সাম্প্রতিক সময়ে এই কার্যক্রম আরও বেড়েছে ।
এটি অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে কার্যত তেল পরিবহনে অবরোধ সৃষ্টি হয়েছে ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রতিদিন বিমান হামলা চালালেও, ইরান তাদের আর্থিক লাইফলাইন বজায় রাখতে সক্ষম হওয়ায় সেই প্রচেষ্টা অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে । এমনকি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সমুদ্রে থাকা ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় ইরানের আরও লাভ হতে পারে ।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রিচার্ড নেফিউ বলেন, “মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইরানকে তেল বিক্রি করতে উৎসাহ দিচ্ছে । আমার মনে হয়েছিল, ইরানের তেল বিক্রি বন্ধ করাই তাদের অগ্রাধিকার হবে ।”
ট্যাঙ্কারট্র্যাকার্স ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ইরান প্রতিদিন প্রায় ১৩৯ মিলিয়ন ডলার আয় করছে তাদের প্রধান ‘ইরানিয়ান লাইট’ তেল বিক্রি থেকে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১১৫ মিলিয়ন ডলার ।
ইরানের তেলের দাম এখন ব্রেন্টের তুলনায় মাত্র ২.১০ ডলার কম, যা প্রায় এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যবধান। যুদ্ধের আগে এই পার্থক্য ছিল ১০ ডলারেরও বেশি ।
এই উচ্চমূল্য ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন । পাশাপাশি প্রতিশোধমূলক হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রও পুনরায় সংগ্রহ করতে হবে ।
ইরাক ও কুয়েতের মতো দেশগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হলেও, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব বিকল্প রুট খুঁজতে ব্যস্ত—অন্যদিকে ইরান নির্বিঘ্নে তেল রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে ।
মার্চ ১ থেকে ২৩ পর্যন্ত ইরান প্রতিদিন গড়ে ১৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, যা যুদ্ধের আগের পর্যায়ের কাছাকাছি । এমনকি ফেব্রুয়ারিতে তাদের রপ্তানি ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ ছিল ।
ইরানের প্রধান রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে তেল অবকাঠামো এখনও অক্ষত রয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র সেখানে শুধুমাত্র সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে । স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, সেখানে নিয়মিত বড় তেলবাহী জাহাজ অবস্থান করছে এবং কার্যক্রম বাড়ছে ।
ইরান জাস্ক টার্মিনাল থেকেও তেল পাঠিয়েছে, যা হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত । যদিও এই টার্মিনাল থেকে সাধারণত খুব কম রফতানি হয় । এছাড়া, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ইরান সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ট্রানজিট ফি আদায় করছে ।
অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের তেল আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । বিভিন্ন তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে । কাতারের রাস লাফান এলএনজি কেন্দ্রেও বড় ধরনের ধ্বংস হয়েছে, যা উৎপাদন দীর্ঘদিনের জন্য ব্যাহত করবে ।
ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকলেও, গত সপ্তাহে সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলা হয়েছে, যার জবাবে ইরানও পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে ।
সপ্তাহান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেন । তবে পরে তিনি “ইতিবাচক আলোচনা”র কথা উল্লেখ করে সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন । ইরান এই ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে, যা যুদ্ধ শেষ করার ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা দিয়েছে ।
❤ Support Us








