Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ৭, ২০২৬

ঝিলমের ভাঙনে ধসের আশঙ্কা, বিপন্ন কাশ্মীরের দু-হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধস্থল

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ঝিলমের ভাঙনে ধসের আশঙ্কা, বিপন্ন কাশ্মীরের দু-হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধস্থল

দীর্ঘ ইতিহাস স্রোতের সাক্ষী হয়ে প্রায় দু-হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে কাশ্মীরের প্রাচীন বৌদ্ধ প্রত্নস্থল। এবার সে অস্তিত্বের সঙ্কটে। একদিকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মাটি খুঁড়ে খুঁজছেন কাশ্মীরের প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সূত্র, অন্যদিকে সেই ঐতিহ্যের নীচের মাটিই ক্রমশ সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঝিলম নদী। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ২০৫০ সালের মধ্যে জেহানপোরা বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক কমপ্লেক্সের আশপাশের ১০,১২২ বর্গমিটার জমি নদীভাঙনে হারিয়ে যেতে পারে। শুধু জমিই নয়, নদীর তীরের কাছে থাকা মূল স্তূপটিও আগামী তিন দশকের মধ্যে ধসে পড়ার ‘প্রবল ঝুঁকি’-তে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

উত্তর কাশ্মীরের জেহানপোরা গ্রামে ঝিলমের ডান তীরে অবস্থিত সুপ্রাচীন প্রত্নস্থলটি বারামুলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, সরলরেখায় বিন্যস্ত তিনটি স্তূপ-সহ এই কমপ্লেক্স কাশ্মীরের প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রত্নস্থলটির সঙ্গে কাশ্মীর, গান্ধার ও মধ্য এশিয়াকে যুক্ত করা প্রাচীন ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক পথের যোগও রয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা। কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার অব সেন্ট্রাল এশিয়ান স্টাডিজ’-এর গবেষক বিলাল হাসান, মহম্মদ আজমল শাহ এবং মুমতাজ এ ইয়াতু এই নিয়ে বিস্তারিত সমীক্ষা করেছেন। ‘অ্যানশিয়েন্ট এশিয়া’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁদের গবেষণার শিরোনাম, ‘অ্যাসেসিং দ্য ইমপ্যাক্ট অব সয়েল ইরোশন অন দ্য জেহানপোরা বুদ্ধিস্ট আর্কিয়োলজিক্যাল সাইট ইন বারামুলা: আ রিমোট সেন্সিং অ্যান্ড জিআইএস অ্যানালিসিস’। ১৯৭৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৪৬ বছরের উপগ্রহচিত্র ও গুগল আর্থের উচ্চ-রেজ়োলিউশনের ছবি বিশ্লেষণ করে তাঁরা নদীতীরের পরিবর্তনের হিসাব করেছেন।

গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক ছবি। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে জেহানপোরার নদীতীরে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮১৮.১৫ বর্গমিটার জমি ক্ষয় হয়েছিল। ওই সময়সীমায় মোট ক্ষয়ের পরিমাণ ছিল ১০,৬০০ বর্গমিটারেরও বেশি। কিন্তু পরের দশকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ১৯৮৯ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ৩,৬১৬.০৯ বর্গমিটার জমি নদীর ভাঙনে হারাতে থাকে। ১১ বছরে মোট ক্ষয়ের পরিমাণ পৌঁছয় প্রায় ৩৯,৭৭৭ বর্গমিটারে। গবেষকদের মতে, এই সময় নদীতীরের অস্বাভাবিক ক্ষয়ের পিছনে শুধু প্রাকৃতিক নদীপ্রবাহ দায়ী নয়। স্বাভাবিক পরিবেশের উপর মানুষের ক্রমাগত হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষত নদীর খাত থেকে বালি, পাথর-সহ বিভিন্ন সামগ্রী তোলার কাজ এবং পরিকাঠামো নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে যায়। নদীর মধ্যে তৈরি হওয়া খননগর্ত জলের প্রবাহের গতিবিদ্যায় পরিবর্তন আনে। ধীরে ধীরে নদীর গভীরতম প্রবাহের পথও প্রত্নস্থলের দিকে সরে আসে। ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে নদীতীর।

নদীতীরবর্তী স্বাভাবিক উদ্ভিদ সরিয়ে ফেলার বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গাছপালার শিকড় মাটিকে যে ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে, তা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নদীর স্রোতের ধাক্কায় মাটি সহজেই সরে যেতে শুরু করে। ফলে জেহানপোরা প্রত্নস্থলের নিচের জমি ক্রমশ ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। তবে ২০০০ সালের পর ক্ষয়ের হার কিছুটা কমেছে। ২০০০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ৩৬১.৫০ বর্গমিটার জমি ক্ষয় হয়েছে বলে গবেষণায় দেখা গিয়েছে। গবেষকদের অনুমান, নদী থেকে খননকার্য কমে যাওয়া এবং কিছু এলাকায় স্বাভাবিক উদ্ভিদের পুনর্জন্ম এই হার কমার অন্যতম কারণ।

কিন্তু তাতে বিপদ কাটেনি। বরং নদীতীরের এত দিনের ক্ষয় ইতিমধ্যেই প্রত্নস্থলের জন্য ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি করেছে। গবেষণায় ‘প্লেস এ’ নামে চিহ্নিত একটি এলাকাকে ভাঙনের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরগুলি ইতিমধ্যেই উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। নদীর বাঁক পরিবর্তন, সরাসরি নদীতীর কেটে যাওয়া এবং মাধ্যাকর্ষণজনিত ধস — তিন দিক থেকেই ওই অংশ বিপন্ন। বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, নদীর খুব কাছেই রয়েছে প্রত্নস্থলের মূল স্তূপ। গবেষকদের পূর্বাভাস, বর্তমান ক্ষয়ের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২২ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে আরও প্রায় ১০,১২২ বর্গমিটার জমি হারাতে পারে জেহানপোরা। সেই সঙ্গে মূল স্মৃতিস্তম্ভটিরও ধসে পড়ার আশঙ্কা বাড়বে। তবে গবেষকেরা এও স্পষ্ট করেছেন, ২০৫০ সালের এই হিসাব কোনো  নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। অতীতের ক্ষয়ের হারের উপর ভিত্তি করে একটি সরলরৈখিক অনুমান করা হয়েছে। ভবিষ্যতে জেলমে বড় বন্যা হলে, নদীর জলপ্রবাহের চরিত্র বদলালে কিংবা জলবায়ু ও অববাহিকার জলবিদ্যাগত পরিস্থিতিতে বড়ো কোনো পরিবর্তন এলে ক্ষয়ের গতি আরও বেড়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিপদ আরও দ্রুত ঘনিয়ে আসতে পারে।

প্রত্নস্থলটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে কাশ্মীরের প্রাচীন ইতিহাসে। জেহানপোরা কমপ্লেক্সে সরলরেখায় থাকা তিনটি স্তূপ ছাড়াও অ্যাপসিডাল প্রার্থনাগৃহ, ভিক্ষুদের আবাসন বা বিহার এবং পাথরের ভিত্তি কাঠামোর সন্ধান মিলেছে। গবেষকদের ধারণা, প্রাচীন কাশ্মীরের ধর্মীয় এবং বাণিজ্যিক পরিসরে এই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কাশ্মীর থেকে গান্ধার হয়ে মধ্য এশিয়ার দিকে যে সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের পথ তৈরি হয়েছিল, তারই একটি অংশ ছিল এই ভূখণ্ড। সপ্তম শতকে কাশ্মীর সফর করেছিলেন চিনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও পর্যটক হিউয়েন সাং। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে কাশ্মীরের বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলির উল্লেখ রয়েছে। বারামুলা-উশকুর অঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্বের সঙ্গে সেই বিবরণের যোগ রয়েছে বলেও গবেষকেরা জানিয়েছেন। জেহানপোরা নতুন করে আলোচনায় আসে ২০২৫ সালে। ফ্রান্সের একটি জাদুঘরের আর্কাইভে সংরক্ষিত বহু পুরনো, ঝাপসা একটি ছবিতে দেখা তিনটি স্তূপের সঙ্গে জেহানপোরার বর্তমান ভূদৃশ্যের মিল খুঁজে পান গবেষকেরা। সে ছবিই কাশ্মীরের বিস্মৃতপ্রায় বৌদ্ধ অতীতের দিকে নতুন করে নজর ফেরায়। প্রায় ১০ একর এলাকা জুড়ে থাকা প্রত্নস্থলটির গুরুত্ব তখন জাতীয় স্তরেও সামনে আসে।

গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘মন কি বাত’-এ জেহানপোরার স্তূপ আবিষ্কারের প্রসঙ্গ তোলেন। জম্মু-কাশ্মীরের জন্য ঘটনাটিকে ‘গর্বের মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। কাশ্মীর যে শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ নয়, বহু শতাব্দী ধরে শিক্ষা, আধ্যাত্মিকতা এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল — জেহানপোরার আবিষ্কার তারই প্রমাণ বলে মন্তব্য করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এখন অবশ্য প্রত্নতাত্ত্বিকদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় বছরের মতো জেহানপোরায় খননকার্য চলছে। এক দিকে মাটির নীচে চাপা পড়ে থাকা বৌদ্ধ অতীতের খোঁজ, অন্য দিকে মাটির উপর দিয়েই এগিয়ে আসছে ঝিলমের ভাঙন। গবেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা সম্ভব, সেগুলোর কোনো কোনোটি নদীর গর্ভে চলে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে গবেষকেরা নদীতীর রক্ষায় একাধিক পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন। ‘রিটেনিং ওয়াল’, ‘গ্যাবিয়ন কাঠামো’র মতো প্রকৌশলগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি গভীরমূলবিশিষ্ট স্থানীয় গাছপালা লাগিয়ে নদীতীরকে শক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু কংক্রিটের কাঠামো নয়, প্রকৃতিনির্ভর সংরক্ষণ পদ্ধতিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তাঁরা। এ গবেষণার ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রত্নস্থলের উপর নদীভাঙনের প্রভাব পরিমাপ করতে উপগ্রহচিত্র ও ভূস্থানিক তথ্যের ব্যবহার। গবেষকদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু জেহানপোরা নয়, নদীর তীরে থাকা অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানের উপরেও আগাম বিপদের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব।

ভারতের অন্য প্রান্তেও নদীভাঙনে ঐতিহাসিক স্থাপত্য এবং প্রত্নস্থল বিপন্ন হওয়ার নজির রয়েছে। গঙ্গার গতিপথের পরিবর্তনে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন বসতি এবং মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে অসমে গ্রাম ও সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যের বড় অংশ হারিয়েছে। গুজরাতের খাম্ভাত উপসাগরের কাছে নদী ও সমুদ্রের ক্ষয়প্রক্রিয়ার প্রভাব পড়েছে হরপ্পা যুগের উপকূলীয় প্রত্নস্থলেও। জেহানপোরার ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি শুধু প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপ বা কয়েক একর জমি রক্ষার নয়। প্রশ্ন কাশ্মীরের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে কতটা নিরাপদে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়া যাবে। গবেষকদের বার্তা স্পষ্ট, আর শুধু নদীর গতিপথের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় নেই। প্রত্নস্থলটিকে বাঁচাতে এখনই সক্রিয় সংরক্ষণ শুরু করা প্রয়োজন। না হলে ইতিহাসের যে অধ্যায়টি নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছে, ঝিলমের স্রোতেই হয়তো তার শেষ কয়েকটি পাতা হারিয়ে যেতে পারে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!