- দে । শ
- জুন ৯, ২০২৬
কোচিং সেন্টারের বাইরে গুলি বিতর্কে জনপ্রিয় শিক্ষককে রক্ষাকবচ পাটনা আদালতের
পাটনার কোচিং সেন্টারে গুলি চালানোর বহুচর্চিত ঘটনায় আপাতত আইনি স্বস্তি পেলেন জনপ্রিয় শিক্ষক তথা ইউটিউবার ফয়জল খান, যিনি ‘খান স্যর’ নামেই দেশ জুড়ে পরিচিত। তাঁর কোচিং প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভাঙচুর ও পরবর্তী গুলিচালনার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় মঙ্গলবার তাঁকে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ দিয়েছে পটনা জেলা আদালত। আদালতের নির্দেশ, তদন্ত চলবে, প্রয়োজনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদও করা যাবে, কিন্তু পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ বা গ্রেফতারি করা যাবে না।
মঙ্গলবার, পাটনা জেলা বিচারকের আদালতে খান স্যরের আগাম জামিনের আবেদনের শুনানি হয়। শুনানিতেই আদালত জানিয়ে দেয়, তদন্তকারী সংস্থাকে সব রকম সহযোগিতা করতে হবে তাঁকে। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ যে কোনো সময় তাঁকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। তবে তাঁকে গ্রেফতার করা বা অন্য কোনো জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উপর আপাতত নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে। আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, শুনানির সময় তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিকদের ‘কেস ডায়েরি’, সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণ ও তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত নথি পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। খানের আবেদন মঞ্জুর হলেও এ মামলার আর এক গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত, প্রতিদ্বন্দ্বী কোচিং প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার রোশন আনন্দের আগাম জামিনের আবেদনের উপর রায়দান আপাতত স্থগিত রেখেছে আদালত।
মামলার সূত্রপাত গত ২ জুন। অভিযোগ, ওই দিন সন্ধ্যার পর ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল পাটনার মুসল্লাপুর হাট এলাকায় অবস্থিত ‘খান গ্লোবাল স্টাডিজ’ বা কেজিএস-এর সামনে জড়ো হয়। কোচিং সেন্টারের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়, প্রাঙ্গণে ভাঙচুর চালানো হয়, ইট-পাথর ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। আচমকা ওই হামলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাটি পাটনার অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। ঘটনার পরদিনই নতুন মোড় আসে। সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে খান স্যরের কোচিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জন নিরাপত্তারক্ষীকে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছুড়তে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়। ভিডিও সামনে আসার পর তদন্তে নামে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় কোচিং সেন্টারের দুই নিরাপত্তারক্ষীকে। বর্তমানে তাঁরা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন।
পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত দুই রক্ষীর কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা অস্ত্রগুলি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওই নিরাপত্তারক্ষীরা গুলি চালানোর কথা স্বীকার করেছেন। সে ঘটনার ভিত্তিতেই কদমকুঁয়া থানায় এফআইআর দায়ের হয় এবং তদন্তের পরিধি ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। প্রথম থেকেই খান স্যরের অভিযোগ, তাঁর কোচিং সেন্টারে হামলার পিছনে রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী কোচিং ব্যবসায়ী রোশন আনন্দ ও তাঁর অনুগামীরা। হামলাটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই দাবি করেন তিনি। সে অভিযোগের ভিত্তিতে রোশন আনন্দ-সহ আরও কয়েক জনকে গ্রেফতারও করে পুলিশ।
তবে ঘটনার অন্যদিকও সামনে এসেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের অভিযোগ, পুরো ঘটনাটি সাজানো ঘটনা হতে পারে। তাঁদের দাবি, ভাইরাল হওয়া গুলিচালনার ভিডিওই সে সন্দেহকে আরও উসকে দিয়েছে। যদিও সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন খান স্যর। তাঁর বক্তব্য, হামলার শিকার হয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান এবং তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনাটি যে শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ নয়, বরং দীর্ঘ দিনের পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল, সেই ইঙ্গিতও মিলছে স্থানীয় সূত্রে। পাটনার কিসান কোল্ড স্টোরেজ এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই বিহারের অন্যতম বড়ো কোচিং হাব হিসেবে পরিচিত। মুসল্লাপুরের এই এলাকায় ২০১৮-১৯ সাল থেকে ২০টিরও বেশি কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। সরকারি চাকরির প্রস্তুতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কোচিংয়ের জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী সেখানে ভিড় করেন।
ওই এলাকাতেই পাশাপাশি রয়েছে খান স্যর ও রোশন আনন্দের কোচিং প্রতিষ্ঠান। কোভিড অতিমারির সময় বহু কোচিং সেন্টার বন্ধ হয়ে গেলেও এই দুই শিক্ষকের প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তা এবং ব্যবসা বরং আরও বৃদ্ধি পায়। অনলাইন শিক্ষার বাজারেও দু–জনেই নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, দু–পক্ষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়। গত তিন–চার বছর ধরেই দুই শিবিরের মধ্যে টানাপড়েন, ছাত্র টানার প্রতিযোগিতা সহ নানা ইস্যুতে বিরোধ চলছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাটি দীর্ঘ দিনের দ্বন্দ্বকেই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন, ২ জুনের হামলা, পরবর্তী গুলিচালনার ঘটনাগুলি কি একই সূত্রে গাঁথা, না কি এর পিছনে আরও গভীর কোনো পরিকল্পনা কাজ করেছে? সেসব উত্তর খুঁজতেই কেস ডায়েরি, ফরেনসিক রিপোর্ট, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে আদালতের অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ খান স্যরকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও আইনি লড়াই যে এখনো অনেক দূর গড়াবে, তা স্পষ্ট। আগামী শুনানিতে আদালত কী অবস্থান নেয় এবং তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর পাটনার কোচিং জগৎ থেকে শুরু করে দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর।
❤ Support Us






