- স | হ | জ | পা | ঠ
- মার্চ ২৭, ২০২৬
জাপানের উপকূলে মঙ্গোল আক্রমণের বিস্মৃত ইতিহাস। ৭৪৫ বছর পর সমুদ্রগর্ভ থেকে উঠে এল কুবলাই খাঁয়ের যুদ্ধজাহাজ
সাত শতকেরও বেশি সময় পর জাপানের সমুদ্রতল থেকে উঠে এল ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়। কুবলাই খাঁ-র নেতৃত্বে জাপান আক্রমণের সময়ের মঙ্গোল নৌবহরের একটি যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করলেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। ১২৮১ সালের ব্যর্থ ‘কোআন যুদ্ধ’-এর সঙ্গে যুক্ত এই জাহাজটি নিয়ে নতুন করে আলোচনায় আন্তর্জাতিক ইতিহাস গবেষক মহল।
জাপানের নাগাসাকি প্রিফেকচারের তাকাশিমা দ্বীপের কাছে ইমারি উপসাগরের গভীরে পাওয়া গিয়েছে জাহাজের অংশবিশেষ। প্রত্নতত্ত্ববিদদের দাবি, এটি ওই অভিযানের অংশ হিসেবে পাঠানো মঙ্গোল নৌবহরের তৃতীয় জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। এর আগেও ২০১১ এবং ২০১৪ সালে ওই অঞ্চল থেকেই আরও দুটি জাহাজের সন্ধান মিলেছিল। উদ্ধার হওয়া জাহাজে পাওয়া গিয়েছে একাধিক চমকপ্রদ প্রত্নবস্তু—খাপে রাখা একটি ছোট তরবারি, বান্ডিল করা তীর, এমনকি খোদাই করা ধাতব চপস্টিকও। বহু শতাব্দী ধরে সমুদ্রের তলায় চাপা পড়ে থাকা এই সামগ্রীগুলি আশ্চর্যভাবে প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
ইতিহাস বলছে, ১২৮১ সালে কুবলাই খাঁ প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার সৈন্যকে নিয়ে ৪৪০০টি জাহাজের বিশাল নৌবহর পাঠিয়েছিলেন জাপান দখলের উদ্দেশ্যে। নৌবহরটি ভাগ করা হয়েছিল দুই ভাগে— দক্ষিণ চিনের জিয়াংনান বাহিনী এবং কোরীয় উপদ্বীপ থেকে আসা পূর্বাঞ্চলীয় বাহিনী। পরিকল্পনা ছিল, ইকি দ্বীপের কাছে মিলিত হয়ে যৌথ আক্রমণ চালানো। কিন্তু সময়মতো দুই বাহিনীর সমন্বয় হয়নি। সে ফাঁকেই প্রকৃতি যেন ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাকাশিমার উপকূলে ভয়াবহ টাইফুন আছড়ে পড়ে, যা পরবর্তীকালে জাপানি ইতিহাসে ‘কামিকাজে’ বা ‘দৈব বাতাস’ নামে পরিচিত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল নৌবহরের বড়ো অংশই ধ্বংস হয়ে যায়। বহু জাহাজ সমুদ্রে তলিয়ে যায়, আর যেগুলি কোনোভাবে তীরে পৌঁছেছিল, সেগুলিও জাপানি বাহিনীর আক্রমণে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
নতুনভাবে শনাক্ত হওয়া এই জাহাজটি প্রথম নজরে আসে ২০২৩ সালে, অ্যাকুস্টিক সিবেড স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে। প্রায় ৬৫ ফুট গভীর জলের নিচে, পলির স্তরের তলায় চাপা অবস্থায় ছিল সেটি। আশপাশেই আগে উদ্ধার হওয়া আরও একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। খননকার্যে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। রেডিওকার্বন পরীক্ষায় জানা গেছে, জাহাজ নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠ কাটা হয়েছিল প্রায় ১২৫৩ সালের দিকে—অর্থাৎ অভিযানের প্রায় তিন দশক আগেই তৈরি হয়েছিল জাহাজটি। বিশ্লেষণে ধারণা, এটি দক্ষিণ চিনের ঝেজিয়াং প্রদেশে নির্মিত। উদ্ধার হওয়া সিরামিক সামগ্রী মিলেছে জিয়াংসু অঞ্চলের উৎপাদনের সঙ্গে, যা জিয়াংনান বাহিনীর উপস্থিতিকে আরও নিশ্চিত করে।
জাহাজের ভেতর থেকে শুধু অস্ত্র নয়, মিলেছে নিত্যব্যবহারের বহু সামগ্রীও। মাছের কাঁটা, চামড়া, কাঠের টুকরো, ল্যাকার আবরণ—সব মিলিয়ে এক সময়ের নাবিক ও সৈনিকদের দৈনন্দিন জীবনের স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, এ আবিষ্কার শুধু একটি যুদ্ধজাহাজের সন্ধান নয়, বরং তৎকালীন পূর্ব এশিয়ার নৌ-ইতিহাস, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এখন পর্যন্ত ওই বিশাল ৪৪০০ জাহাজের বহর থেকে মাত্র তিনটি জাহাজের হদিস মিলেছে। ফলে ইমারি উপসাগরের গভীরে এখনও লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাসের বহু অজানা অধ্যায়—যা হয়তো আগামী দিনে আরও বিস্ময় উপহার দেবে গবেষকদের।
❤ Support Us








