- এই মুহূর্তে দে । শ
- মার্চ ১৩, ২০২৬
আতঙ্কে বাড়ছে গ্যাস বুকিং, জোগান অপরিবর্তিত। এসওপি জারির পর রাজ্যজুড়ে গুদামে হানা এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের
রাজ্যে রান্নার গ্যাসের সম্ভাব্য সঙ্কট মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার আদর্শ কার্যপদ্ধতি (এসওপি) জারি করেছে নবান্ন। একই সঙ্গে খোলা হয়েছে কন্ট্রোলরুম। সেই নির্দেশ জারির পর শুক্রবার থেকেই প্রশাসনিক তৎপরতা চোখে পড়ছে। শহর থেকে জেলা—বিভিন্ন গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতর ও গুদামে অভিযান শুরু করেছে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ। কোথায় কত সিলিন্ডার মজুত রয়েছে, জোগান কতটা, গ্রাহকেরা কীভাবে গ্যাস বুক করছেন—এসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি কোথাও কালোবাজারি হচ্ছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে কলকাতার লর্ডস মোড়ে একটি গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে হানা দেন এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের আধিকারিকেরা। সেখানে গ্যাসের মজুত, সরবরাহ এবং বুকিংয়ের রেজিস্টার খতিয়ে দেখা হয়। শহরের পাশাপাশি জেলাতেও একই ছবি। উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের বাদুতে একটি গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার গুদামে অভিযান চালায় পুলিশ। বারাসত পুলিশ জেলার এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ সেখানে গ্যাসের মজুত ও জোগান নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। অভিযোগ উঠেছে, ওই গুদামে প্রচুর সিলিন্ডার মজুত থাকলেও স্থানীয় মানুষ গ্যাস পাচ্ছেন না। প্রাথমিক তদন্তে জোগানে কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে বলে জানা গিয়েছে। যদিও ডিলারদের দাবি, কোনও গরমিল নেই—প্রতিদিন নিয়ম মেনেই হিসাব মেলানো হয়।
জলপাইগুড়ির একটি গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে নোটিস টাঙিয়ে জানানো হয়েছে, ৯ মার্চের পরে যাঁরা গ্যাস বুক করেছেন, তাঁদের আপাতত সিলিন্ডার দেওয়া সম্ভব নয়। পরবর্তী সরবরাহ এলে তবেই গ্যাস দেওয়া হবে। অন্যদিকে হুগলিতে গ্যাসের জোগান পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে মহকুমাশাসকের নেতৃত্বে বিশেষ শাখার পুলিশ নিয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। চুঁচুড়া, ব্যান্ডেল ও ডানলপ এলাকার কয়েকটি গুদামে তদারকি চলছে। গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলির দাবি, আতঙ্কের জেরে হঠাৎ করেই বুকিংয়ের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু গ্যাসের জোগান আগের মতোই রয়েছে। ফলে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। যোধপুর পার্ক এলাকার এক গ্যাস সরবরাহকারী শঙ্কর প্রসাদ নস্কর জানান, আগে তাঁদের দফতরে দিনে ৪০০–৫০০টি বুকিং হত। এখন তা হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ আগে যেমন ৫২৫টি সিলিন্ডার নিয়ে একটি ট্রাক আসত, এখনও সেই একই পরিমাণ সিলিন্ডারই আসছে। ফলে বাড়তি বুকিং সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। দিনে মাত্র একটি করে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে বলেও তিনি জানান। আতঙ্কে অনেক গ্রাহক সরাসরি দফতরে এসে খোঁজখবর নিচ্ছেন।
গ্রাহকদেরও ভোগান্তি বাড়ছে। রুবি এলাকার বাসিন্দা অশোককুমার মাহাতো জানান, তাঁর এক মাস আট দিন হয়ে গিয়েছে, ঘরে মাত্র একটি সিলিন্ডার আছে এবং সেটিও প্রায় শেষ। অথচ নতুন করে বুক করতে পারছেন না। আর এক বাসিন্দা জানান, তিনি ৮ মার্চ ফোন করে গ্যাস বুক করেছিলেন। কিন্তু কোনও মেসেজ পাননি। কাউন্টারে গেলে তাঁকে জানানো হয়, সার্ভার ডাউন রয়েছে। তাঁর বাড়িতে অসুস্থ রোগী থাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। পোদ্দার নগর হাই স্কুলের আবাসিক হস্টেলের জন্য গ্যাসের খোঁজে দফতরে এসেছিলেন সুশান্ত কুমার বাগ। তিনি জানান, তাঁদের হস্টেলে প্রায় ৫০ জন ছাত্র রয়েছে। মাসে পাঁচ-ছ’টি বাণিজ্যিক সিলিন্ডার লাগে। কিন্তু এ মাসে এখনও বুকিং করা যায়নি। গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করতে হচ্ছে। একই সমস্যা লেক গার্ডেন্সের বাসিন্দা সৌমেন হালদারেরও। গ্যাস বুক করতে এসে তিনিও শুনেছেন সার্ভার ডাউন থাকার কথা।
অন্যদিকে সরবরাহকারী রোহিত চন্দ্র বলেন, গ্রাহকদের সমস্যার পাশাপাশি ডিলারদেরও বিপাকে পড়তে হচ্ছে। ৫২৫টি সিলিন্ডারের ট্রাক দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ নতুন সরবরাহ তৎক্ষণাৎ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে শহরের বড়ো হাসপাতালগুলিতে আপাতত গ্যাসের কোনও সঙ্কট নেই। এসএসকেএম, মেডিক্যাল কলেজ, এনআরএস এবং আরজি কর হাসপাতালের রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকা সংস্থার ম্যানেজার তরুণ দে জানিয়েছেন, সাধারণত একটি হাসপাতালে মাসে ১৫ থেকে ২০ বার সিলিন্ডার নেওয়া হয় এবং বর্তমানে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত রয়েছে। গ্যাস সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনের মৎস্যজীবীদের জীবনেও। সিলিন্ডার না থাকায় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে ট্রলার নিয়ে যেতে পারছেন না অনেকেই। বিষ্ণুপুরের একটি গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা ইতিমধ্যেই সিলিন্ডারশূন্য হয়ে পড়েছে। বসিরহাটে গত তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে মা ক্যান্টিন। স্কুলের মিড-ডে মিল রান্না করতে কাঠের উনুন ব্যবহার করতে হচ্ছে। এমনকি কিছু মন্দিরেও ভোগ রান্নায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।
গ্যাসের কালোবাজারি রুখতে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং রাজ্য সরকারগুলিকে তৎপর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জারি করা এসওপি অনুযায়ী মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একটি পর্যবেক্ষক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি রাজ্যে সিএনজি, ডিজেল, পেট্রল ও কেরোসিনের মজুত পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখবে। ইন্ডিয়ান অয়েল, এইচপিসিএল এবং বিপিসিএল-এর মতো সংস্থাগুলিকে জরুরি পরিষেবায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শহর ও গ্রামের বাড়ি, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, অঙ্গনওয়াড়ি, স্কুল-কলেজ, সরকারি হস্টেল এবং বিভিন্ন হোমে যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী এলপিজি পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব গ্রাহক একটি মাত্র সিলিন্ডার ব্যবহার করেন, সরবরাহের ক্ষেত্রে তাঁদের অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষকেও গ্যাস সংযতভাবে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।এদিকে কেন্দ্রের দাবি, বুকিংয়ের আড়াই দিনের মধ্যেই গ্যাস বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ইস্যুতে শুক্রবার সকালে সংসদের বাইরে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদেরা।
❤ Support Us







