Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • আগস্ট ১২, ২০২৬

মণিপুরে ফের হিংসা, নাগা গ্রামে হামলা, আগুনে পুড়ল বাড়ি ও গির্জা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মণিপুরে ফের হিংসা, নাগা গ্রামে হামলা, আগুনে পুড়ল বাড়ি ও গির্জা

ফের অশান্ত মণিপুর। এ বার কাংপোকপি জেলার একটি নাগা গ্রামে ঢুকে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা গুলি চালানোর পর একাধিক বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ। মঙ্গলবার রাতে টোকপা লিয়াংমাই গ্রামে ওই হামলার ঘটনায় অন্তত ৯টি বাড়ি ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনিক আধিকারিকেরা। যদিও লিয়াংমাই নাগা কাউন্সিল’-এর দাবিআগুনে প্রায় ১০টি বাড়ির পাশাপাশি একটি গির্জাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে এলাকায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছেমঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ তুমনৌপোকপি থাংগাল গ্রামের কাছে টোকপা লিয়াংমাই গ্রামে হামলা চালায় সশস্ত্র এক দল। প্রথমে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালানো হয়। তার পরেই গ্রামের একাধিক বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। আক্রান্ত বাড়িগুলির বেশির ভাগই কাঁচা কাঠামোর হওয়ায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে ছুটে এসে আগুন নেভানোর কাজে হাত লাগান।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছেকতগুলি বাড়ি সম্পূর্ণ ভাবে পুড়ে গিয়েছেতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে লিয়াংমাই নাগা কাউন্সিল’-এর দাবিহামলায় প্রায় ১০টি বাড়ি এবং একটি গির্জা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পিছনে অন্য সম্প্রদায়ের সশস্ত্র ব্যক্তিরা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে তারা। যদিও সে অভিযোগ স্বাধীন ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে লিয়াংমাই নাগা কাউন্সিল। সংগঠনের বক্তব্যনিরীহ সাধারণ মানুষের বাড়িঘর এবং উপাসনাস্থলকে পরিকল্পিত ভাবে নিশানা করা হয়েছে। এ ধরনের হামলা অত্যন্ত গুরুতর ও নিন্দনীয় বলেই মন্তব্য করেছে তারা।

আরও একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নাগা সংগঠনটি। তাদের দাবিযে জায়গায় হামলা হয়েছেসেটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর রেড জ়োন’ হিসাবে চিহ্নিত। অথচ আক্রান্ত এলাকার মাত্র কয়েক মিটার দূরেই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যেরা মোতায়েন ছিলেন। তা হলে তাঁদের উপস্থিতি সত্ত্বেও কী ভাবে হামলাকারীরা গ্রামে ঢুকে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলেনসে প্রশ্ন তুলেছে কাউন্সিল। নিরাপত্তাকর্মীদের ভূমিকা এবং তাঁদের দায়িত্ব পালনে কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি নাতা তদন্ত করে দেখারও দাবি জানিয়েছে তারা। হামলাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেফতার এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে এলএনসি। একই সঙ্গে নিরপেক্ষস্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্তের দাবি করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য ত্রাণপুনর্বাসন এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থার কথাও বলেছে সংগঠনটি।

সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে নতুন করে অশান্তি ছড়িয়েছে মণিপুরে। নাগা  কুকি-জ়ো সংগঠনগুলির মধ্যে টানাপড়েন ফের তীব্র হয়েছে।  সোমবার সেনাপতি জেলায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। কৈলেনজাং গ্রামে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েক জন সশস্ত্র ব্যক্তি অন্তত টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ। আগুন লাগানোর পর অভিযুক্তেরা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। তাঁদের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। পরে অসম রাইফেলসের একটি দল ওই গ্রামে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কৈলেনজাং গ্রামটি এক সময় কুকি পরিবারগুলির বসতি ছিল। ১৯৯২ সালের নাগা-কুকি সংঘর্ষের সময় বহু পরিবার সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ সময় গ্রামটি কার্যত জনশূন্য ছিল। পরে কয়েকটি পরিবার ফিরে এলেও চলতি বছরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর পর ফের তাঁদের সরে যেতে হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

 জন নাগাকে অপহরণ করে হত্যা করার অভিযোগে ১৭ মে থেকে নাগা অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে অনির্দিষ্টকালের আন্তঃজেলা অর্থনৈতিক অবরোধ চালু করেছে ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল। তাদের অভিযোগওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কুকি গোষ্ঠীর সদস্যেরা জড়িত। এর পাল্টা ২৬ জুলাই মধ্যরাত থেকে পাল্টা অবরোধ শুরু করে কুকি নাগরিক সংগঠনগুলির ওয়ার্কিং কমিটি। ফলে রাজ্যের বিভিন্ন অংশে সাধারণ মানুষের যাতায়াত  পণ্য পরিবহণও ব্যাপক ভাবে ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সোমবার তাফৌ গ্রামে মণিপুর সরকার এবং ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল’-এর প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রথম দফার বৈঠক হয়। জাতীয় সড়কে অবরোধ তুলে নেওয়া, যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে। যদিও ওই বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সমাধানসূত্র মেলেনিশান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে নাগা কাউন্সিল। এর আগে ৮ জুলাই কাংপোকপি সফরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ইয়ুমনাম খেমচাঁদ এবং উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপগেন জাতীয় সড়ক খুলে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। সব সম্প্রদায়ের মানুষের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার কথাও জানিয়েছিল রাজ্য সরকার।

২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে মেইতেই  কুকি-জ়ো সম্প্রদায়ের সংঘর্ষ দিয়ে যে হিংসার সূত্রপাততার রেশ এখনো কাটেনি। দীর্ঘ এই অশান্তিতে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রদায়ভিত্তিক বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন, নিহত, আহত হয়েছেন বহু। থমকে রয়েছে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জনজীবন। বাধাগ্রস্ত হয়েছে স্বাভাবিক যাতায়াত ও পণ্য পরিবহণ। এখনো পর্যন্ত অন্তত ২৬০ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার খবর রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কাংপোকপির নাগা গ্রামে নতুন করে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে— আলোচনার মাধ্যমে যখন পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চলছেতখন ফের কেন আগুন জ্বলল মণিপুরেহামলার নেপথ্যে কারাসে উত্তর এখনো অধরা। প্রশাসনের তদন্তেই আপাতত তাকিয়ে আক্রান্ত এলাকার মানুষ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!