- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ৪, ২০২৫
‘ধ্বংসের মুখে’ হিমালয় ! পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘সবুজ বোনাস’-এর প্রস্তাব, অর্থ কমিশনকে চিঠি শতাধিক প্রাক্তন আমলার
হিমালয় কোলের রাজ্যগুলো ধীরে ধীরে ‘ধ্বংসের পথে এগিয়ে’ যাচ্ছে, এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের প্রাক্তন সরকারি কর্মকর্তারা। দেশের নানান দফতরে দায়িত্বে থাকা প্রায় ১০০ জন প্রাক্তন আইএএস ও আইপিএস কর্মকর্তার সংগঠন, ‘কনস্টিটিউশনাল কন্ডাক্ট গ্রুপ’, ১৬তম অর্থ কমিশনের চেয়ারপার্সন অরবিন্দ পনগারিয়াকে একটি চিঠি লিখেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, কাশ্মীর ও সিকিমের প্রাকৃতিক সম্পদ শুধু স্থানীয় নয়, বরং সমগ্র দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য, কিন্তু এ রাজ্যগুলোতে এ সংক্রান্ত কোনো পরিকাঠামো বা কেন্দ্র সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পায়নি।
চিঠিতে হিমালয়ের কোলে অবস্থিত রাজ্যগুলোর ক্ষতির পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হিমাচল প্রদেশ প্রায় ১৮,০০০ কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, আর উত্তরাখণ্ডের ক্ষতি চলতি বছরে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা। বিপুল এই ক্ষতির পেছনে রয়েছে ধরালী ক্লাউডবার্স্ট, দেরাদুন ও উত্তারকাশী বন্যা, লাহুল-স্পিতি অঞ্চলের ভূমিধস এবং চাম্বার বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। শুধু তা-ই নয়, হিমাচলের বনসম্পদের আর্থিক মূল্যও অত্যন্ত বৃহৎ; ভারতীয় ইনস্টিটিউট অফ ফরেস্ট ম্যানেজমেন্টের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হিমাচলের বনভূমির মোট মূল্য প্রায় ৯.৯ লক্ষ কোটি টাকা। প্রাক্তন কর্মকর্তারা ভয়াবহ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় তহবিল বণ্টনের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, বন ও পরিবেশ সেবার জন্য বর্তমানে যে পরিকাঠামো ও বিপর্যয় মোকাবিলার পদ্ধতি রয়েছে, তা প্রয়োজনের মাত্র ১০ শতাংশ। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণভাবে অপর্যাপ্ত। তাঁরা দাবি করেছেন, এই কাঠামো কমপক্ষে ২০ শতাংশ হওয়া উচিত, যাতে রাজ্যগুলো আরও বেশি সবুজ আচ্ছাদন বাড়াতে উৎসাহিত হয়।
চিঠিতে হিমাচল মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাবিত ‘সবুজ তহবিল’ বা ‘সবুজ বোনাস’-কেও গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুখু ইতিমধ্যেই ৫০,০০০ কোটি টাকার একটি তহবিল প্রস্তাব করেছেন, যা হিমালয়ীয় রাজ্যগুলিকে তাদের পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগের জন্য সাহায্য করবে। প্রাক্তন আমলারা কমিশনকে অনুরোধ করেছেন যে, এই প্রস্তাবকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। চিঠিতে আরো তুলে ধরা হয়েছে যে, হিমালয়ীয় রাজ্যগুলো এই মুহূর্তে চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। একদিকে তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন, অন্যদিকে তাদের রাজস্বের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাকৃতিক সম্পদ অতিমাত্রায় ব্যবহার করতে বাধ্য। বনভূমি হ্রাস, হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্প, পর্যটন এবং অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে রাজ্যগুলোর আয় বাড়লেও পরিবেশের জন্য এমন ব্যবস্থাপনার প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক সহায়তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু রাজ্যগুলোকেও তাদের ‘পরিবেশগত দায়বদ্ধতা’ মানতে হবে। দক্ষিণ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভারস অ্যান্ড পিপল-এর সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাকুর বলেছেন, এই তহবিল দিয়ে শুধুই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, নতুন অবকাঠামো নির্মাণে নয় বা ক্ষতিপূরণ নয়। বরং রাজ্যগুলোকে তাদের সম্পদ রক্ষার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। ভবিষ্যৎমুখী এই চিঠির স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন পরিবেশ সচিব মীনা গুপ্ত, প্রাক্তন ওএসডি কাশ্মীর এ.এস. দুলাত, প্রাক্তন চিফ ইকোনমিক অ্যাডভাইজার নিতীন দেশাই এবং প্রাক্তন যুগ্ম সচিব অরুণা বাগচি। তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, শুধু রাজ্যগুলোর ক্ষতির হিসাব নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ সুরক্ষার দিকটিকেও কেন্দ্রীয় তহবিলের নীতি নির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁরা বলছেন, হিমালয়ীয় রাজ্যগুলো বর্তমানে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকারই নয়, বরং দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যের রক্ষাকর্তা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলে তা প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব ও সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। আর তা না হলে, শুধু ক্ষতির হিসাব করে রাজ্যগুলোর অস্তিত্ব ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
❤ Support Us







