Advertisement
  • এই মুহূর্তে বৈষয়িক
  • অক্টোবর ১৫, ২০২৫

বড়ো পুঁজিকে রক্ষা করতে এমএসএমই-কে শেষ করবার ছক? কেন্দ্রের ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল অর্ডার’-এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পপতিদের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বড়ো পুঁজিকে রক্ষা করতে এমএসএমই-কে শেষ করবার ছক? কেন্দ্রের ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল অর্ডার’-এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পপতিদের

ট্রাম্পের শুল্ক চাপের মুখে ভারত সরকার দেশীয় পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে চালু করেছে ‘গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ আদেশ’ বা কোয়ালিটি কন্ট্রোল অর্ডার। কিন্তু ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্রতম ও মধ্যম শিল্প উদ্যোগ (এমএসএমই) শিবির থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। তারা দাবি করছেন, এ আদেশ গুণগত মানের উন্নয়ন করায় সহায়ক না হয়ে এক প্রকার বাণিজ্য সংরক্ষণবাদী কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ছোটো এবং মধ্যম শিল্পের জন্য অহেতুক দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে।

‘সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রগ্রেস’ নামক অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা আয়োজিত ‘ভারতের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ আদেশ: বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় বিষয়গুলি উঠে এসেছে। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর নিয়মাবলী আরোপের ফলে, এই আদেশনামা এখন শিল্পোদ্যোক্তাদের ওপর একটি অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও আর্থিক বোঝা। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে কোয়ালিটি কন্ট্রোল অর্ডারের লক্ষ্য দেশের পণ্যের গুণগত মান উন্নত করা হলেও, বাস্তবে তা বড়ো ও শক্তিশালী শিল্প গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন শিল্প উদ্যোদক্তরা। প্রখ্যাত স্টেইনলেস স্টিল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভারধান গ্রুপের পরিচালক সৌনক রুংটা বলেন, ‘এখন কিউসিও পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধির বদলে এক ধরণের সংরক্ষণবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যা কেবল কয়েকটি বৃহৎ শিল্পপতিকে রক্ষা করছে।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা প্রতি পণ্যের জন্য ১০ হাজার ডলারের একটি ব্যাংক জামানত দাবী করে। ছোটো কোনো শিল্প উদ্যোগ যদি বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার ব্যবসা করে এবং ৩০ ধরনের পণ্য তৈরি করে, তাহলে তাকে ৩০ লক্ষ ডলার জামানত রাখতে হবে, যা তার পক্ষে অসম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘সব পণ্যের জন্য একই নিয়ম আরোপ করা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়, কারণ সব শিল্পের পরিস্থিতি একরকম হয় না।’

নীতি আয়োগের উচ্চ পদস্থ উপদেষ্টা সঞ্জিত সিং জানান, ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল অর্ডার অনুসরণ করতে গিয়ে এমএসএমই কোম্পানি গুলোকে সার্টিফিকেশন ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে। এর ফলে বাজার প্রতিযোগিতা বাড়ার বদলে কেবলমাত্র বড়ো শিল্প গোষ্ঠীগুলোর শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ ব্যবসায়িক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘অ্যাকাডেমি অফ বিজনেস স্টাডিজ’-এর পরিচালক অর্থনীতিবিদ অরুণ গোয়েল বলেছেন, ‘ভোক্তা সুরক্ষা এবং গুণগত মান নিশ্চিতকরণের অজুহাত দেখিয়ে এ আইন আসলে বাজারে একচেটিয়া সৃষ্টি করছে। কিছু শিল্পপতিকে অতিরিক্ত সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।’

উল্লেখ্য, নীতিনির্ধারক সংস্থাগুলোর কাছে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এমএসএমই সংস্থাগুলো বলছে, কোয়ালিটি কন্ট্রোল আদেশের কারণে মধ্যবর্তী পণ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং স্বীকৃতিপ্রদান প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলাকে বিপর্যস্ত করছে। সিএসইপি-এর গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কেন্দ্রের এ আদেশ কার্যকর হওয়ার বছরেই পণ্যের আমদানি প্রায় ১৬ শতাংশ কমে গিয়েছে এবং পরবর্তী বছরে তা আরও ১৭.৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে আমদানি ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

অরুণ গোয়েলের মত, ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল আদেশ শুধু শেষ পর্যায়ের ভোক্তা পণ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত, কাঁচামাল বা মধ্যবর্তী পণ্যে নয়। কারণ এ ধরণের পণ্য গুলো দেশের উৎপাদনের মূল চালিকা শক্তি।’ ভারধান গ্রুপের সৌনক রুংটা বলেন, ‘বিআইএস থেকে অনুমোদন পাওয়া বর্তমানে অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। বিদেশি কারখানায় গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য প্রায় ৭ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগীদের জন্য মারাত্মক সংকট তৈরি করছে।’ আশঙ্কার কথা, এর ফলে ভারত ফের একবার পুরনো ‘লাইসেন্স রাজ’ বা সরকারি নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত জটিল ব্যবস্থার দিকে ফিরছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করাটা অবশ্যই জরুরি, তবে তা যেন ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা নষ্ট না করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের উপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপায় এবং আমদানি-রোধের নামে বাণিজ্যে অযাচিত বাধা সৃষ্টি না করে— এটাই হতে হবে সরকারের মূল লক্ষ্য। এমতাবস্থায় কোয়ালিটি কন্ট্রোল আদেশের ব্যাপক সংস্কার ও যথাযথ সমন্বয়ের প্রয়োজন বলে দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!