Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • নভেম্বর ২১, ২০২৫

‘লাল কার্ড’ থেকে আধার, পরিচয়পত্রের দীর্ঘ যাত্রায় নাগরিকত্বের প্রশ্ন তিমিরেই। কীভাবে হবে সমাধান, প্রশ্ন তুলেছিলেন আডবাণী

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘লাল কার্ড’ থেকে আধার, পরিচয়পত্রের দীর্ঘ যাত্রায় নাগরিকত্বের প্রশ্ন তিমিরেই। কীভাবে হবে সমাধান, প্রশ্ন তুলেছিলেন আডবাণী

২০০৮ সালের কথা। মিশ্রো দেবী, তাঁর বয়স তখন ৬৯, ছিলেন ভারতের প্রথম নাগরিক যাকে তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ‘স্মার্ট কার্ড’ দিয়েছিল। সে কার্ডটিই ছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম বহুমুখী জাতীয় পরিচয়পত্র। ভেতরে ছিল নাগরিকের ১০ আঙ্গুলের ছাপ, ছবি আর রেটিনার স্ক্যান। পাশাপাশি নাম, জন্ম তারিখ, পিতামাতার নাম, জন্মস্থান ও ১০ বছরের বৈধতা, সবই লিপিবদ্ধ ছিল। মিশ্রো দেবী আর তাঁদের গ্রামের কয়েকশো বাসিন্দা ছিলেন সেই প্রথম কয়েক লক্ষ মানুষের মধ্যে যারা এই কার্ড পেয়েছিলেন। সরকার বলেছিল, এই কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকরা পানীয় জল, বিভিন্ন সেবার সুবিধা পেতে পারবেন। কিন্তু মিশ্রোর কথায়, তিনি কখনো এটি ব্যবহার করেননি। শুধু সংরক্ষণ করেছেন যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে তিনিই প্রথম এই কার্ড পেয়েছেন

কংগ্রেস জমানায় এই ‘স্মার্ট কার্ড’-এর আংশিক প্রকল্প ৩১ মার্চ ২০০৯-এ শেষ হয়। সে সময়ে ১২.৮৮ লাখ কার্ড ইস্যু হয়েছিল। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে, আধার কার্ড আসার পর এই প্রায়োগিক প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছিল অবৈধ নাগরিকরাও ওই কার্ড পাচ্ছেন বলে। তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপির তরফে দেশে এনপিআর করার প্রস্তাব আসে। যা নিয়ে বিপাকে পড়েন মনমোহন সিংয়ের সরকার। সরকারি সূত্রে জানা যায়, ‘স্মার্ট কার্ডের সমস্ত বায়োমেট্রিক তথ্য পরবর্তীতে ইউআইডিএআই’-এর সঙ্গে ভাগ করা হয়, যাতে সমস্যার পুনরাবৃত্তি না হয়।’ নাগরিকত্ব এবং প্রমাণের দলিল নিয়ে বিতর্ক আবার উঠে আসে বিহারে ‘এসআইআর’ চালু হবার সময়। তালিকায় নাম থাকায়, অনেক ভোটারের নাম বাদ পড়ে। শুরুতে আধার কার্ড তালিকায় যোগ্য ছিল না। পরে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তা অনুমোদিত হয়।

নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫ অনুযায়ী জন্ম, উত্তরাধিকার, নিবন্ধন, নাগরিকীকরণ বা ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জন করা যায়। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো সরকারই স্পষ্ট করে কখনো বলেনি, কোন দলিল নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য বৈধ। মোদি সরকার বলেছে, এনপিআর-এর তথ্য হালনাগাদের প্রাথমিক কাজ ২০২৫ সালে হয়েছে, তবে নাগরিকত্ব নির্ধারণের কাজ এনআরসি-এর সময়েই হবে। ২০০১ সালে প্রথম ‘স্মার্ট কার্ড’ বা ‘এমএনআইসি’ ধারণার সূচনা হয়েছিল তখনকার হোমমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানীর মাধ্যমেই। তাঁর পরামর্শ ছিল, নাগরিক ও অ-নাগরিকদের আলাদা কার্ড দেওয়া হোক। ২০০১ সালে, যখন কার্গিল যুদ্ধ পর্যালোচনা কমিটি দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরেছিল। কমিটি বিশেষভাবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ইন্টেলিজেন্স এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করেছিল। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, সীমান্তবর্তী জেলা থেকে নাগরিক এবং অ-নাগরিকদের নিবন্ধন শুরু করা উচিত। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে দেশের ২০টি জেলা, ১২টি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়। পরবর্তীতে এই কার্ড নিয়ে জটিলতা ও নাগরিকত্ব সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে, সে নিয়ে লোকসভায় প্রশ্ন তুলেছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা আডবানী। যদিও সে প্রশ্নের উত্তর কোনো দলের কাছে তখনো ছিল না, আজও নেই।

২০০৩ সালের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ‘সীমান্ত এলাকা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে পুরো দেশে নাগরিকদের জন্য এই কার্ড ইস্যু করা হোক।’ ১৮ বছরের বেশি বয়সী সকল সাধারণ বাসিন্দাকে রেসিডেন্ট আইডেন্টিটি (স্মার্ট) কার্ড ইস্যু করার প্রস্তাব অনুমোদিত করে এক্সপেনডিচার ফাইন্যান্স কমিটি। ৩১ জানুয়ারি ২০১৩-এ ক্যাবিনেট বিষয়টি বিবেচনা করে এবং মন্ত্রীদলের কাছে বিবেচনার জন্য পাঠায়। কিন্তু সেখানে কোনো সিদ্ধান্ত না হুওয়ায় বিষয়টি আটকে যায়। এরপর চালু হয় এনপিআর। নাগরিকত্বের স্বীকৃতির জন্য গ্রামসভা ও ওয়ার্ড কমিটি‘র মাধ্যমে ‘সোশ্যাল ভেটিং’ প্রক্রিয়া চালু করে কংগ্রেস। সরকারের তরফে তখন বলা হয়েছিল, স্থানীয় এলাকায় তালিকা প্রকাশ করা হবে এবং গ্রামের মানুষদের অভিযোগ বা দাবির জন্য সুযোগ দেওয়া হবে। অভিযোগ ও দাবিগুলো পর্যালোচনা করবেন পাটওয়ারী বা তালাতি, উপজেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে তহসিলদার এবং জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে কলেক্টর/জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা রেজিস্ট্রারদের নিজস্ব উদ্যোগে অভিযোগ তুলতে কোনো বাঁধা নেই। পাশাপাশি সংবেদনশীল এলাকায় রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সরকার অতিরিক্ত যাচাই ব্যবস্থা নিতে পারবে। প্রয়োজনে স্থানীয় পুলিশ স্টেশন বা গ্রামের চৌকিদারদের যাচাই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। তৎকালীন মনমোহন সিং সরকার এও ঘোষণা করে যে, ‘স্মার্ট কার্ড’ নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। কার্ডটি নাগরিকত্বের অধিকার প্রদান করে না। প্রতিটি ব্যক্তির নাগরিকত্ব আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হবে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেনস প্রস্তুতির সময়, যা এনপিআর এর পরবর্তী সময়ে গোটা দেশে নিবিড়ভাবে করা হবে। যা আর বাস্তবায়িত করতে পারেনি কংগ্রেস সরকার।

কংগ্রেসের ‘স্মার্ট কার্ড’-এর লক্ষ্য ছিল প্রতিটি নাগরিককে একক জাতীয় পরিচয় নম্বর দেওয়া। নিবন্ধনের সময় ব্যক্তিগত বায়োমেট্রিক তথ্য যেমন ছবি এবং আঙুলের ছাপ নেওয়া হতো। পাশাপাশি আবেদনকারীদের পরিবারের ইতিহাস, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিবাহিত অবস্থা এবং স্থায়ী ঠিকানা বিস্তারিতভাবে সংগ্রহ করা হতো। তবে প্রক্রিয়াটি ছিল ব্যয়বহুল এবং জটিল। গ্রামীণ এলাকায় এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য প্রমাণপত্র সংগ্রহ করা কঠিন ছিল। এমনকি বহু দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী অভিবাসীরাও বৈধ পরিচয়পত্রের অভাবে এই কার্ড পাননি। রাজনৈতিক পালাবদলের পর, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ নতুন করে নাগরিকত্ব, অনুপ্রবেশ ও অবৈধ নাগরিক এবং সেসবের সমাধানে সিএএ-এনপিআর-এর কথা জোরদারভাবে বলতে শুরু করে। আসে ‘আধার কার্ড’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেসময় দাবি করেছিলেন, ‘এই কার্ডটিই হবে দেশের নাগরিকদের একক পরিচয় পত্র। এটি দিয়েই আগামীতে সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এটি জাল করা-ও যে যাবেনা সে গ্যারান্টিও দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।’ যদিও আধারকে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা হবে কি না, তা নিয়ে কখনো মুখ খোলেননি প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেউই। এনআরসি বা সাম্প্রতিক ‘এসআইআর’-এর প্রক্ষাপটে দেখা গেছে আধার কোনোভাবেই নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। অর্থাৎ কংগ্রেসের ‘স্মার্ট কার্ড’ থেকে বিজেপির ‘আধার কার্ড’ দশকের দীর্ঘ যাত্রার পরেও, দেশের কয়েককোটি প্রান্তিক, দরিদ্র, ছিন্নমূল, মূলনিবাসী মানুষের নাগরিকত্ব আজও অন্ধকার তিমিরেই। কেউই জানেন না কোন কার্ডটি দেখালে প্রমাণিত হয় যে, তিনি এ দেশের নাগরিক।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!