Advertisement
  • এই মুহূর্তে বৈষয়িক
  • আগস্ট ১২, ২০২৫

আমেরিকার শুল্কবৃদ্ধিতে জোর ধাক্কা, সৌরাষ্ট্রে কর্মহীন ১ লক্ষ হিরে শ্রমিক

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
আমেরিকার শুল্কবৃদ্ধিতে জোর ধাক্কা, সৌরাষ্ট্রে কর্মহীন ১ লক্ষ হিরে শ্রমিক

ভারত থেকে রফতানি হওয়া হিরে এবং রত্ন-গহনার উপর আমেরিকার লাগামছাড়া শুল্কবৃদ্ধির জেরে গুজরাটের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে দেখা দিয়েছে গভীর কর্মসংকট। এপ্রিল মাসে শুরু হয়েছিল দশ শতাংশ বেসিক শুল্ক দিয়ে, যা কয়েক দিনের ব্যবধানে বেড়ে দাঁড়ায় পঁচিশ শতাংশে। এখন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় সেই শুল্ক আরো বেড়ে আগস্ট মাসের ২৭ তারিখ থেকে হতে চলেছে ৫০ শতাংশ। তার আগেই মার্কিন শুল্ক-আঘাতে সৌরাষ্ট্রের ভবনগর, আমরেলি ও জুনাগড় জেলার ছোট ছোট হিরে শিল্প কেন্দ্রগুলি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই জেলাগুলির শতাধিক ক্ষুদ্র শিল্প ইউনিটে কর্মরত প্রায় ১ লক্ষ হিরে কাটাই ও পালিশের শ্রমিক ইতিমধ্যেই কাজ হারিয়েছেন।

গুজরাট ডায়মন্ড ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ভবেশ ট্যাঙ্ক জানিয়েছেন, পরিস্থিতির এত দ্রুত অবনতি হয়েছে যে, শ্রমিকদের কিছু না জানিয়েই একের পর এক ইউনিট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এপ্রিল থেকে ব্যবসা পড়তির দিকে থাকলেও গত ১০ দিনে তা আরো তীব্র হয়েছে। যাঁরা মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা উপার্জন করতেন, তাঁদের অনেকেই এখন কর্মহীন হয়ে বাড়িতে বসে রয়েছেন। জানা যাচ্ছে, যে সমস্ত ছোট ইউনিটগুলি বড়ো সংস্থার কাছ থেকে চুক্তির ভিত্তিতে কাঁচা হিরে কাটাই ও পালিশের কাজ পেত, তাদের উপরেই পড়েছে এই ধসের সবচেয়ে ভয়ানক চাপ। কারণ আমেরিকান ক্রেতারা একের পর এক অর্ডার স্থগিত করে দিচ্ছেন কিংবা বাতিল করছেন। এমনকি যেসব চালান প্রস্তুত ছিল, সেগুলিও আটকে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন কার্যত বন্ধ।

২০২৪ সালের হিসেব অনুযায়ী, আমেরিকা তার মোট হিরে আমদানির প্রায় ৮ ভাগের ৬ ভাগ পরিমাণ এবং প্রায় অর্ধেক মূল্য ভারত থেকেই সংগ্রহ করত। রত্ন ও গহনা রফতানি উন্নয়ন পর্ষদের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ৩ মাসে কাটা ও পালিশ করা হিরের রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ। সে অনুপাতে টাকার অঙ্কে কমেছে প্রায় এক পঞ্চমাংশ। বর্তমানে এই সংকটে পড়ে কিছু শ্রমিক ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত কৃত্রিম হিরে শিল্পে কাজ খুঁজছেন ঠিকই, তবে সেই পথও খুব একটা নিরাপদ নয়। কারণ আমেরিকাই কৃত্রিম হিরের সবচেয়ে বড়ো বাজার, এবং এই খাতে শুল্কবৃদ্ধির প্রভাব পড়লে নতুন করে বিপদের মুখে পড়বেন অনেকেই। রত্ন ও গহনা রফতানি উন্নয়ন পর্ষদের গুজরাট শাখার চেয়ারম্যান জয়ন্তীভাই সাভালিয়া স্পষ্টই বলেছেন, যদি কৃত্রিম হিরেও ৫০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়, তাহলে গোটা শিল্প বিপর্যস্ত হবে।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বড়ো বড়ো রফতানিকারক সংস্থাগুলি প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছে না। কারণ তারা আশঙ্কা করছে, জনমতের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে ভিতরে ভিতরে অনেক সংস্থাই স্বীকার করছে, যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে হয় উৎপাদন কমাতে হবে, নয়তো অস্থায়ীভাবে শ্রমিক ছাঁটাই করতে হবে। ইতিমধ্যেই আমেরিকান ক্রেতারা অন্য বিকল্প খুঁজছেন, ভারতের বদলে ভিয়েতনাম কিংবা থাইল্যান্ডে হিরে পাঠিয়ে সেখানে গহনা তৈরি করার কথা ভাবছেন অনেকেই। কারণ ওই সব দেশে আমেরিকার শুল্ক অনেক কম। রফতানিকারকদের সংগঠন সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে, যাতে শুল্কের এই ফারাক কমানো যায়। সেই সঙ্গে তাঁরা আরও চাচ্ছেন রফতানির উপর বেশি প্রণোদনা, সুদের ছাড় এবং দ্রুত মালের উপর দেওয়া পণ্যমূল্য সংযোজন করের (জিএসটি) ফেরতের সুবিধা।

যদিও এ পর্যন্ত গুজরাটের সুরত শহরে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব ততটা দেখা যায়নি, তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি আমেরিকা থেকে অর্ডার একেবারে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সুরতের মতো বড় শিল্পকেন্দ্রেও ব্যাপক ছাঁটাই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ সুরত শহরেই প্রায় আট লক্ষ মানুষ হিরে শিল্পে যুক্ত। এ মুহূর্তে পরিস্থিতি কেবল সৌরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে রাজস্থানের মতো অন্যান্য রাজ্যেও। জয়পুর, যেটি মূলত রঙিন রত্ন ও হিরে বসানো গহনার জন্য বিখ্যাত, সেখানেও আমেরিকান অর্ডার স্থগিত হয়েছে। নতুন বাজার খোঁজা শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্বীকৃতি, সংযোগ এবং রফতানি পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সময় লাগবে। ফলে ততদিন এই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, বৈশ্বিক বাজারে ভারত এখনো বিশ্বের বৃহত্তম হিরে কাটাই ও পালিশ কেন্দ্র। ১০ হিরের মধ্যে ৯টিই ভারতে প্রক্রিয়াকরণ হয়। এই শিল্প, শুধু রফতানির নিরিখেই নয়, দেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহের সঙ্গে জড়িত। ফলে আমেরিকার শুল্কহামলায় গোটা দেশের বিশাল শ্রমনির্ভর শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!