- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ৩০, ২০২৫
অস্পৃশ্যতা-বিরোধী’ আইন কাগজেই বন্দি ! আদালতে ঝুলে ৯৭% মামলা। কেন্দ্রের রিপোর্টে উদ্বেগজনক তথ্য
ভারতে অস্পৃশ্যতা দণ্ডনীয় অপরাধ। সংবিধানে স্পষ্ট ভাষায় তা লেখা আছে। তবু বাস্তবের ছবি আশঙ্কাজনক। কেন্দ্র সরকারের সদ্যপ্রকাশিত রিপোর্টে উঠে এসেছে এমনই আশঙ্কা আর উদ্বেগে ভরা তথ্য। দেশে ‘অস্পৃশ্যতা’-সংক্রান্ত মামলার ৯৭ শতাংশেরও বেশি শুনানির অভাবে ঝুলে রয়েছে আদালতে, আর যেসব মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, সেখানে প্রায় সব ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা বেকসুর খালাস! ২০২২ সালে নিষ্পত্তি হওয়া ৩১টি মামলার মধ্যে মাত্র ১ টিতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে একজন।
নথিভুক্ত মামলার সংখ্যাতেও বড়োসড়ো পতন। ১৯৫৫ সালের সিভিল রাইটস সুরক্ষা আইন বা ‘পিসিআর অ্যাক্ট’ অনুযায়ী ২০২২ সালে সারা দেশে নথিভুক্ত হয়েছে মাত্র ১৩টি মামলা। তার আগের বছর সংখ্যাটি ছিল ২৪, ২০২০ সালে ২৫। ২০২২ সালের ১৩টি মামলার মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীর ও কর্ণাটক থেকে ৫টি করে, মহারাষ্ট্র থেকে ২টি, এবং হিমাচল প্রদেশ থেকে ১টি। এর বাইরেও কোনো রাজ্য থেকে মামলা নেই। অথচ জাতপাতের ভিত্তিতে বৈষম্যের অভিযোগ আজও দেশের নানাপ্রান্ত থেকে হামেশায় শুনতে পাওয়া যায়।
এই আইনের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্র যে বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করে, তাতে বেশ কয়েকটি রাজ্য ‘শূন্য’ তথ্য জমা দিয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও লক্ষদ্বীপ জানিয়েছে, তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনও তথ্য নেই। মনিপুর তো একবার নয়, একাধিকবার চাইলেও কোনো তথ্য পাঠায়নি। রিপোর্ট বলছে, ২০২২ সালের শেষে মোট ১,২৪২টি মামলা আদালতে বিচারাধীন ছিল। সেই বছরই নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৩১টি মামলা। তার মধ্যে মাত্র একটিতে অভিযুক্তকে দোষি সাব্যস্ত করে শাস্তি দিয়েছে আদালত। বাকি ৩০টি মামলাতে অভিযুক্তরা বেকসুর খালাস হয়েছে। এমনকি ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৩৭টি নিষ্পত্তি হওয়া মামলার প্রতিটিতেই বিচারকের রায়— অভিযুক্ত নির্দোষ! ছবিটা শুধু আতঙ্কের নয়, আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি সমাজের নিপীড়িত, অত্যাচারিত দলিত মানুষের আস্থা ভাঙার সামিল।
আদালতে যখন এমন অবস্থা, অন্য দিকে, তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধ প্রতিরোধ আইন (১৯৮৯)-এর আওতায় মামলা উত্তরোত্তর বেড়েছে। শুধুমাত্র ২০২২ সালে এ ধরনের ৬২,৫০১টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু এখানেও একই সমস্যা— ৯৪ শতাংশ মামলা বিচারাধীন। পুলিশের ফাইলে ধুলো চাপা পড়ে রয়েছে ১৭ হাজারের বেশি মামলা। আর দেশের নানা প্রান্তে আদালতের টেবিলে জমা রয়েছে ২.৩৩ লক্ষের বেশি মামলা। রিপোর্টে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল, দেশের কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ২০২২ সালে একটি এলাকাকেও ‘অস্পৃশ্যতা-প্রবণ’ বলে ঘোষণা করেনি। অথচ একের পর এক ঘটনা প্রমাণ দিচ্ছে, অস্পৃশ্যতা নয়া ভারতে নিছক অতীত নয়। গত মার্চেই পশ্চিমবঙ্গের গিধগ্রামে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ পুলিশি নিরাপত্তায় প্রবেশ করেন একটি শিবমন্দিরে, সেটি এত দিন পর্যন্ত তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। তার আগের বছর, তামিলনাড়ুর একটি গ্রামে ভেঙে ফেলা হয় ৩০ মিটার লম্বা এক ‘অস্পৃশ্যতা প্রাচীর’। সেটি তৈরি করা হয়েছিল যাতে নিম্নবর্গীয় জনজাতির শ্মশান উচ্চবর্ণের চোখে না পড়ে। সম্প্রতি, রাজস্থানে দলিতদের কবরস্থান ব্যবহার নিয়েও বাধা দেয় এক উচ্চবর্ণ গোষ্ঠী।
সংশোধিত সিভিল রাইটস সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, প্রতিবছর এই আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে কেন্দ্রকে রাজ্যগুলিকে রিপোর্ট জমা দিতে হয়। তাতে শুধু মামলা রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যাই নয়, বিশেষ আদালতের সংখ্যা, চার্জশিট দেওয়ার হার, পুলিশের পদক্ষেপ, এমনকি আন্তঃবর্ণ বিবাহে আর্থিক অনুদানের তথ্যও থাকার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ রাজ্য সেই দায়িত্বই পালন করেনি। যাঁরা এই আইনের আওতায় ন্যায়বিচার পেতে পারেন, সেসকল সম্প্রদায়ের মানুষরা সমাজে সবচেয়ে প্রান্তিক। আইনগত লড়াইয়ের খরচ, প্রভাবশালীদের হুমকি, পুলিশ ও প্রশাসনের অবহেলা— সব মিলিয়ে তাঁদের উপরেই পড়ে ন্যায়ের বোঝা। অথচ এই ভার বহনের মতো শক্তি তাঁদের হাতে থাকে না। অনেকক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের ভিতর থেকেও প্রতিরোধ আসে। ফলে, মামলা দায়ের হওয়াটাই হয় একপ্রকার অসম সাহসিকতার পরিচয়। বিচার পাওয়া তো বহু দূরের কথা। আন্তঃবর্ণ বিবাহে ২.৫ লক্ষ টাকার অনুদানের বিষয়েও বহু রাজ্য চুপ। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালে ২১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এই অনুদান দিয়েছে ১৮,৯৩৬টি দম্পতিকে। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও তামিলনাড়ু এ বিষয়ে এগিয়ে রয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ডের মতো বড়ো রাজ্যগুলির থেকে কোনরকম তথ্যই পাওয়া যায়নি।
এ ছবি শুধু আইন প্রয়োগের নয়, বরং এটি এক বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তার ব্যর্থতার দিকেই আঙুল তোলে। যেখানে দলিতদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, ভাষা, সংস্কৃতি, এবং মর্যাদার প্রশ্নে রাষ্ট্র এখনো কার্যত উদাসীন। এমন পরিস্থিতিতে বহু ভাষাভাষী এবং নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলির সাংস্কৃতিক অস্তিত্বও প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। ভারতবর্ষ নিজেকে যখন বহুত্ববাদের ধারক হিসেবে তুলে ধরতে চায়, তখন প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলিকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হবে। শুধু সংবিধান লেখা নয়, তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যেই ভারতের প্রকৃত গণতন্ত্রের চেহারা ধরা পড়বে। আজ যখন সংবিধানের নাম করে রাজনীতি হয়, যখন জাতপাত মুছে ফেলার নামে নানা প্রচার চলে, তখন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রের রিপোর্ট জোর গলায় বলে দেয়, সংবিধানের প্রতিশ্রুতি এখনো দেশের বিশাল সংখ্যক নাগরিকের কাছে অধরা। পিসিআর অ্যাক্ট অনুযায়ী প্রতিটি রাজ্যকে বিশেষ আদালত গঠন, পুলিশি ব্যবস্থা জোরদার করা, আর সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগ করার সদিচ্ছা, সামাজিক চেতনা এবং প্রশাসনিক উদ্যোগ ম্রিয়মাণ। যদি পরিস্থিতি এরকম চলতে থাকে, তবে স্বাধীনতার এত বছর পরেও, সংবিধানিক কঠোরতা সত্ত্বেও অস্পৃশ্যতা শুধু অতীতের শব্দ হিসেবে নয়, বর্তমানের নির্মম সত্য হিসেবে চলতে থাকবে।
❤ Support Us







