- প্রচ্ছদ রচনা
- মার্চ ১৪, ২০২৬
ভোটের দামামা বাজিয়ে আজ ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রীর মেগাসভা। শহর জুড়ে কড়া নিরাপত্তা, পথে পথে কর্মী সমাগম
বিধানসভা নির্বাচনের আগে শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভা ঘিরে আশা, আকাঙ্খা আর রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক— দুই কর্মসূচিতেই যোগ দিতে এ দিন শহরে আসছেন তিনি। দুপুর ১টা ২০ মিনিট নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দরে নামার কথা প্রধানমন্ত্রীর। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছে গাড়িতে ব্রিগেডে যাবেন তিনি। সভা শেষে বিকেলের মধ্যেই তাঁর অসমে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
ব্রিগেড ময়দানেই প্রথমে সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সে মঞ্চ থেকে প্রায় ১৮,৮৬০ কোটি টাকার একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের শিলান্যাস ও উদ্বোধন করার কথা তাঁর। সেখানে আমন্ত্রিত রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, যদিও তিনি এতে যোগ দেবেন কি না, সে বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয় নি নবান্ন। প্রশাসনিক অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরই পাশের পৃথক মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক জনসভায় বক্তব্য রাখবেন মোদি। রাজ্যে বিধানসভা ভোটের আগে ব্রিগেডের এই সভাকে বিজেপির তরফে এক বড় শক্তিপ্রদর্শন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সভা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে একাধিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ব্রিগেডে মোদির সভায় ভিড় কতটা হয়— তা যেমন কৌতূহলের বিষয়, তেমনই নজর থাকবে তাঁর বক্তৃতার রাজনৈতিক সুরের দিকেও। বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল সরকারকে কীভাবে আক্রমণ করেন প্রধানমন্ত্রী, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। সম্প্রতি রায়দিঘির সভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে ৩টি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে তেমন কোনো নতুন প্রতিশ্রুতি উঠে আসে কি না, সেটাও দেখার অপেক্ষা।
তবে সভার আগেই নজর কেড়েছে ব্রিগেডের মঞ্চসজ্জা। মঞ্চের নকশায় বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা চিহ্ন তুলে ধরা হয়েছে। পটভূমিতে রাখা হয়েছে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের প্রতিরূপ। পাশাপাশি বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা শিল্প, পটচিত্র, বাউল ও কীর্তনের মতো বাংলার লোকসংস্কৃতির নানা উপাদানও মঞ্চের দু–প্রান্তে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিজেপির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা ‘বাংলা-বিরোধী’ অভিযোগের জবাব দিতেই ‘বাঙালিয়ানা’কে সামনে আনা হয়েছে। ঘটনাচক্রে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ৭ মার্চ এই ব্রিগেডেই শেষবার জনসভা করেছিলেন মোদি। ৫ বছর পর আবার সেই ময়দানেই সভা। দিনটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসেও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ নন্দীগ্রাম-এ জমি আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সে স্মৃতিও এ দিন নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে রাজনৈতিক মহলে।
এদিকে সভাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা ইতিমধ্যেই কলকাতামুখী হয়েছেন। শিয়ালদহ ও হাওড়া স্টেশনে সকাল থেকেই ভিড় বাড়তে দেখা গিয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা কর্মীদের জন্য দুই স্টেশনেই অস্থায়ী শিবির করে প্রাতরাশের ব্যবস্থাও করেছে দল। সেখান থেকেই মিছিল করে ব্রিগেডের দিকে রওনা দিচ্ছেন বহু কর্মী-সমর্থক। ব্রিগেড ময়দানে প্রায় ৬৪ হাজার চেয়ার পাতা হয়েছে বলে বিজেপি সূত্রে খবর। মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে বসানো হয়েছে ৩৫টি বড় স্ক্রিনও। যাতে দূরে বসে থাকা মানুষও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য স্পষ্টভাবে দেখতে ও শুনতে পারেন। দলের দাবি, সভায় উপস্থিতির সংখ্যা এ ব্যবস্থাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।তবে সভার আগেই কিছুটা উত্তেজনার পরিস্থিতিও তৈরি হয়। নিরাপত্তার কারণে সভাস্থলে ব্যাগ নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ। ফলে প্রবেশপথে অনেক কর্মী-সমর্থককে আটকে দেওয়া হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ব্যাগ রাখার জন্য আলাদা কাউন্টার রয়েছে। সেখানে ব্যাগ জমা রেখে সভাস্থলে প্রবেশ করা যাবে। কিন্তু এই ব্যবস্থায় আস্থা দেখাতে চাননি অনেক কর্মী। তাঁদের দাবি, আগে থেকে এই নিষেধাজ্ঞার কথা জানানো হয়নি। ফলে অনেকেই ব্যাগ নিয়েই সভাস্থলে চলে এসেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে কলকাতা পুলিশ। প্রায় ৩ হাজার পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে ব্রিগেড ও সংলগ্ন এলাকায়। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন রাজ্য পুলিশের এডিজি (কোস্টাল) হরিকিশোর কুসুমাকার। বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ করে পুরো এলাকাজুড়ে নজরদারি চালানো হবে। মঞ্চ ও আশপাশে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। ‘নো-ফ্লাই জ়োন’ ঘোষণা করা হয়েছে ময়দান এলাকা। সভাকে কেন্দ্র করে শহরে ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও করেছে পুলিশ। শনিবার ভোর ৪টে থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কলকাতায় ভারী যান চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে জরুরি পরিষেবা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী গাড়ি এই বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবে। এসপ্ল্যানেড র্যাম্প, কে পি রোড, হসপিটাল রোড, লাভার্স লেন, কুইনসওয়ে-সহ একাধিক রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর সভাকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজাও তুঙ্গে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় মোদির সভার সমর্থনে পোস্টার দিয়েছে বিজেপি। পাল্টা হিসেবে ‘গো ব্যাক মোদি’ এবং ‘বয়কট বিজেপি’ লেখা হোর্ডিংও দেখা গিয়েছে একাধিক এলাকায়। বিজেপি নেতাদের দাবি, এ প্রচার আসলে শাসক দলের রাজনৈতিক অস্বস্তির বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে তৃণমূলের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় বকেয়া অর্থের প্রশ্ন তুলে মানুষের সামনে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরতেই এই প্রচার। সব মিলিয়ে, ভোটের আগে কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে শনিবারের এ সভা রাজনৈতিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন নজর, ব্রিগেডের মাঠে কতটা জনসমাগম হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কী রাজনৈতিক বার্তা উঠে আসে।
❤ Support Us






