Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ১১, ২০২৫

‘আপাতত রাজ্যের কোনো বাড়িতে বসছে না স্মার্ট মিটার’ — বিধানসভায় ঘোষণা বিদ্যুৎমন্ত্রীর। কেন্দ্রের নির্দেশ নস্যাৎ করে জারি বিজ্ঞপ্তি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘আপাতত রাজ্যের কোনো বাড়িতে বসছে না স্মার্ট মিটার’ — বিধানসভায় ঘোষণা বিদ্যুৎমন্ত্রীর। কেন্দ্রের নির্দেশ নস্যাৎ করে জারি বিজ্ঞপ্তি

রাজ্যের গৃহস্থ বাড়িতে আপাতত আর বসানো হচ্ছে না স্মার্ট মিটার। সোমবার বিজ্ঞপ্তি, বুধবার বিধানসভায় ঘোষণার মাধ্যমে রাজ্য চূড়ান্ত করল — কেন্দ্রীয় প্রকল্প হলেও, তৃণমূল সরকার আপাতত স্মার্ট মিটার প্রকল্পে সায় দিচ্ছে না। আগেই বিদ্যুৎ দফতরের তরফে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। বুধবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে সে কথাতেই সিলমোহর দিয়েছেন রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্র সরকারের চাপিয়ে দেওয়ায় নীতি অনুযায়ী কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলক ভাবে স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছিল। কিন্তু বহু জায়গা থেকে অভিযোগ আসায় মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে রাজ্য সরকার এই প্রকল্প বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ স্মার্ট মিটার বসানোর পর বিদ্যুৎ বিল ‘অস্বাভাবিক’ হারে বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ জানিয়ে রাজ্যের নানা প্রান্তে শুরু হয়েছে প্রবল ক্ষোভ-বিক্ষোভ। সেই আবহেই বড় সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের। বিধানসভায় বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের চাপিয়ে দেওয়া প্রকল্পের বিরুদ্ধে আমরা মুখ খুলেছি। কারো উপর জোর করে স্মার্ট মিটার চাপিয়ে দেওয়া হবে না।’

রাজ্য পরিষ্কার করে দিয়েছে, সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বাদে আপাতত কোনো গৃহস্থ বাড়িতে নতুন স্মার্ট মিটার বসবে না। ইতিমধ্যেই যেসব বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছে, সেগুলিকেও ধরা হবে সাধারণ পোস্টপেড মিটার হিসেবেই। শুধু সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিতেই স্মার্ট মিটার প্রকল্প আপাতত চালু থাকবে। স্মার্ট মিটার বসানোর পর থেকেই একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ— বিদ্যুৎ বিল এক ধাক্কায় তিন থেকে চার গুণ বেড়ে যাচ্ছে। হুগলির ব্যান্ডেল এলাকার এক গ্রাহক জানান, এক মাসে তাঁর বিদ্যুৎ বিল এসেছে ১২ হাজার টাকা ! তার পর থেকেই প্রবল বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পথে নামে তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেসের মতো বিজেপি বিরোধী দলগুলি। সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটু-সহ একাধিক বিদ্যুৎ কর্মী সংগঠনের অভিযোগ, প্রিপেড স্মার্ট মিটার বসিয়ে রাজ্যে বিদ্যুৎ পরিষেবার বেসরকারিকরণ ঘটানোর চেষ্টা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, এই প্রিপেড ব্যবস্থা কার্যত সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলবে। রাতের বেলায় যদি রিচার্জ শেষ হয়ে যায়, তাহলে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে— যার প্রভাব সরাসরি পড়বে কৃষি এবং ঘরোয়া জীবনে। এদিকে বিদ্যুৎ দফতরের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির শেষ লাইন— ‘সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া গৃহস্থ বাড়িতে স্মার্ট মিটার স্থগিত’— তুলে ধরে সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ করেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। লাল কালি দিয়ে দাগিয়ে লিখেছেন, ‘বোঝো ঠ্যালা!’

২০২১ সালে স্মার্ট মিটার প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছিল মোদি সরকার। লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে গোটা দেশে ২২ কোটি মিটার প্রতিস্থাপন। সেই অনুযায়ী অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয়েছিল পরীক্ষামূলক প্রয়োগ। রাজ্যের অভিযোগ, সরকারি দফতর, টাওয়ার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছাড়াও কয়েকটি জেলার কিছু বাড়িতে যেখানেই স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছে সেখান থেকেই আসছে অভিযোগের পাহাড়। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টর অবশ্য স্মার্ট মিটারকে ‘টেকনোলজিক্যালি উন্নত এবং নিরাপদ’ বলে দাবি করেছেন। তিনি জানান, ‘বিদ্যুৎ চুরির রাস্তাগুলি রুদ্ধ হবে। বিল বেশি আসার কথা নয়। তবু কারো আপত্তি থাকলে সাধারণ মিটারেই ফিরে যেতে পারেন। জোর করে কারো উপর এটি চাপিয়ে দেওয়া হবে না। ‘ ‘ন্যাশনাল স্মার্ট গ্রিড মিশন’-এর তথ্য বলছে, গোটা দেশে ২২ কোটি স্মার্ট মিটার বসানোর লক্ষ্য নেওয়া হলেও এখনও পর্যন্ত বসানো গিয়েছে মাত্র ৩ কোটি ১৪ লক্ষ। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেও গতি বেশ মন্থর— যেমন গুজরাতে মাত্র ৯.৫৯%, উত্তরপ্রদেশে ১১.২%। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী খট্টরের নিজের রাজ্য হরিয়ানায় অবশ্য প্রায় ৮৫% স্মার্ট মিটার বসেছে। পশ্চিমবঙ্গে এখনো পর্যন্ত বসানো হয়েছে মাত্র ২.৩%। স্মার্ট মিটার ইস্যুতে রাজ্যের ভূমিকা ঘিরে প্রশ্ন তুলছে কেন্দ্র। জানা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় প্রকল্পে অংশ না নিলে অন্যান্য প্রকল্পের আর্থিক সুবিধা আটকে দেওয়ার হুমকিও মিলছে পরোক্ষভাবে।

এই মুহূর্তে স্মার্ট মিটার স্থগিত হলেও, প্রযুক্তিগত দিক থেকে এর উপকারিতার কথা স্বীকার করছে উভয় পক্ষই। যদিও বাস্তব প্রয়োগে বিপত্তি ঘটায় রাজ্য পিছিয়ে এসেছে। বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত অবকাঠামো এবং স্বচ্ছ বিলিং ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে স্মার্ট মিটার চালু করলে সাধারণ মানুষের ওপরই চাপ পড়বে। রাজ্যের বিদ্যুৎ দফতরের এক আধিকারিক বলেন, ‘আমরা চাই না, প্রযুক্তির নামে সাধারণ মানুষের উপর বাড়তি বোঝা চাপুক। বিল নিয়ে অভিযোগ এলে সেগুলোর নিষ্পত্তিই এখন অগ্রাধিকার।’ এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— স্মার্ট মিটারের ভবিষ্যৎ কী? রাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট, তবে পাল্টা চাপ দিতে পারে কেন্দ্র।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!