- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ৮, ২০২৫
‘ভোট লুটের প্রমাণ’ তথ্য পেশ রাহুল গান্ধির ! বিজেপির দাবি ‘সব মিথ্য কথা’, হলফনামায় প্রমাণ চাইল নির্বাচন কমিশন
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকে তাঁর দাবি, কর্নাটকের মহাদেবপুরা বিধানসভা কেন্দ্রে অন্তত ১ লক্ষ ভোট বেআইনিভাবে পড়েছে। রাহুলের দাবি, এই ‘ভোট চুরি’ বিজেপির পক্ষে নির্বাচনী ফল ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং এই গোটা ‘অপারেশন’-এর পিছনে নির্বাচন কমিশনের মদত রয়েছে। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতা ধরে রাখতে ২৫টি আসনে ভোট জালিয়াতি যথেষ্ট ছিল, আর তেমন কারচুপির ছক কষেই বিজেপি ক্ষমতায় ফিরেছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসি রাহুল গান্ধিকে লিখিত ঘোষণার মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণ করার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যথায়, তিনি যেন তাঁর ‘বানোয়াট প্রমাণ’ প্রত্যাহার করেন। বিজেপিও এ অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলেছে।
এদিন, রাহুল গান্ধি জানান, কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা অনুযায়ী কর্নাটকে তারা অন্তত ১৬টি আসনে জয় পাওয়ার সম্ভাবনা দেখেছিল। কিন্তু চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফলে কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৯টি আসন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর পরাজয়ের একটি ছিল বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল, যেখানে কংগ্রেস প্রার্থী মনসুর আলি খান প্রাথমিক গণনায় এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত ফলাফলে বিজেপি প্রার্থী পি সি মোহন জয়ী হন ৩২,৭০৭ ভোটে। এই কেন্দ্রের মধ্যেই মহাদেবপুরা বিধানসভা অঞ্চলটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস। রাহুল বলেন, যেখানে কংগ্রেস পেয়েছে ১,১৫,৫৮৬ ভোট, সেখানে বিজেপি পেয়েছে ২,২৯,৬৩২ ভোট, অর্থাৎ ব্যবধান প্রায় এক লক্ষেরও বেশি। তাঁর বক্তব্য, শুধু এই একটি বিধানসভা কেন্দ্র বাদ দিলে বাকি ৬টি বিধানসভা অংশেই কংগ্রেস এগিয়ে ছিল। প্রশ্ন তুলেছেন তিনি, ‘‘এত ভোট গেল কোথা থেকে ? এই কেন্দ্রে কীভাবে বিজেপি এতটা এগিয়ে থাকল ?’’ তাঁর অভিযোগ, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। বিপুল ‘ভোট চুরি’ কীভাবে ঘটেছে, তারও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন রাহুল। তিনি বলেছেন, তাঁদের দলের অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, একাধিক ব্যক্তি একাধিকবার ভোট দিয়েছেন। অনেকের নাম রয়েছে একাধিক রাজ্যের ভোটার তালিকায়। বহু ক্ষেত্রে একটাই ঠিকানায় কয়েকশো ভোটারের নাম যুক্ত। কিছু ঠিকানাই অস্তিত্বহীন, কোথাও আবার ঠিকানার জায়গায় লেখা আছে শুধু ‘০’। এমনও বহু ভোটার পাওয়া গিয়েছে, যাঁদের ভোটার কার্ডে দেওয়া ছবি এতটাই ছোট বা অস্পষ্ট যে কাউকে চেনা দায়। আবার ‘ফর্ম ৬’, যা মূলত নতুন ভোটারদের তালিকায় যুক্ত হওয়ার জন্য ব্যবহার হয়, তা ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যায় ভুয়ো ভোটার তালিকায় ঢুকে পড়েছে বলে তাঁর দাবি। একটি উদাহরণ দিয়ে বিরোধী দলনেতা বলেন, গুরকিরাত সিং ডাং নামে এক ভোটারের নাম ৪টি আলাদা আলাদা বুথের তালিকায় রয়েছে, সন্দেহজনক ব্যক্তির ৪টি আলাদা এপিক নম্বরও রয়েছে। আবার আদিত্য শ্রীবাস্তব নামে অন্য এক ভোটার একইসঙ্গে বারাণসী, মুম্বই ও বেঙ্গালুরু— ৩টি শহরে ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত।
বৃহস্পতিবার, রাহুল গান্ধি বলেছেন, ‘মহারাষ্ট্রে লোকসভা নির্বাচনে ভালো ফলের পর বিধানসভা ভোটে হঠাৎ বিপর্যয় প্রমাণ করে কিছু একটা ঠিক ছিল না। সন্দেহ বাড়ছিল।’ ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে মহারাষ্ট্রে ‘ইন্ডিয়া’ জোট ৪৮টির মধ্যে ৩০টি আসনে জিতলেও, ৫ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে ৫০ আসনও পায়নি তারা। তাঁর অভিযোগ, ‘বিজেপি কখনো গণবিরোধের, বিরুদ্ধ ভোটের শিকার হয় না! দেখা গেছে, আগে জনমত সমীক্ষা একরকম ছিল, কিন্তু ফল অন্যরকম এসেছে। হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, সব জায়গাতেই এই প্রবণতা দেখা গেছে। এ এক সাজানো খেলা। ‘লাড়লি বেহনা’, ‘পুলওয়ামা’, ‘সিঁদুর অভিযান’, সবমিলিয়ে লাগাতার একেকটা গল্প তৈরি করা হয়েছে।’ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটের সময়সূচি ‘পরিকল্পিতভাবে সাজানো’ হয়েছে বলেও অভিযোগ কংগ্রেস নেতার। ‘মহারাষ্ট্রে ৫ মাসে যত ভোটার যোগ হয়েছে, গত ৫ বছরে তত যোগ হয়নি। লোকসভায় আমরা জিতি, বিধানসভায় হেরে যাই। এক কোটি নতুন ভোটার ভোট দেয়। বিকেল সাড়ে ৫টার সময় ইসি বলে টানা ভোট হচ্ছে। অথচ আমাদের বুথ এজেন্টরা বলছে, এমন কিছু হয়নি।’ দাবি রাহুলের। বিরোধী দলনেতার মারাত্মক অভিযোগের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বিজেপি নেতারাও। বর্ষীয়ান নেতা রবি শঙ্কর প্রসাদ বলেন, ‘এটা রাহুলের পুরনো অভ্যাস। অভিযোগ করবেন, মামলা খেয়ে যাবেন, তারপর ক্ষমা চাইবেন।’ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর কটাক্ষ, ‘গতকাল সুপ্রিম কোর্টকে নিশানা করলেন, আজ নির্বাচন কমিশনকে। যেখানে মানায় না, সেখানেই দোষারোপ। প্রতিষ্ঠানগুলিকে আক্রমণ করাই কংগ্রেসের রাজনীতি।’ তবে সবথেকে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি বলেন, ‘রাহুল গান্ধী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ওঁর পরিবার এক সময় দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিল। এখন ফের সেই অতীত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। গণতন্ত্র ও সংবিধানকে আঘাত করতে গোটা কংগ্রেস দল ঝাঁপিয়ে পড়েছে।’
যদিও, এতসব আক্রমণের পরও রাহুল গান্ধি বা কংগ্রেস নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। দৃঢ়কণ্ঠে রাহুল গান্ধি বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি যে অবস্থান নিয়েছেন, তা থেকে পিছু হটবেন না। তাঁর বক্তব্য, তিনি একজন সংসদ সদস্য এবং দেশের জনগণের সামনে যা বলছেন, সেটাই তাঁর শপথ। তিনি আরও বলেন, যদি তাঁরা আবার ক্ষমতায় আসেন, তবে এই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, গণতন্ত্র ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রকারী অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ‘ভোটলুট’-এর প্রতিবাদে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেকে সঙ্গে নিয়ে রাহুল গান্ধি বেঙ্গালুরুতে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছেন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়াকে ‘প্রতিষ্ঠানিক চুরি’ আখ্যা দিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি শুক্রবার এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন প্রকাশ্যেই বিজেপির সঙ্গে মিলে এই চুরি চালাচ্ছে, যার উদ্দেশ্য গরিব মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া। এই ভিডিওটি রাহুল গান্ধি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, বিহারে এসআইআর চালু করা হয়েছে কারণ কমিশন বুঝে গেছে যে আমরা তাদের চুরি ধরেছি। তাঁর অভিযোগ, ইলেকশন কমিশন এবং বিজেপি একসঙ্গে মিলে নির্বাচনের ফলাফল চুরি করছে। একদিন আগেই তিনি এক সাংবাদিক সম্মেলনে ‘ভোট চুরি’র মডেল নিয়ে অভিযোগ তোলেন।
রাহুল গান্ধি যে পদ্ধতিতে ভোট চুরির অভিযোগ করেন, সেগুলো হলো:
ডুপ্লিকেট ভোটার – ১১,৯৬৫ জন
উদাহরণস্বরূপ, গুরকিরত সিং দাং চারটি ভিন্ন বুথে ভোটার তালিকায় নাম আছে।
ভুয়া বা অবৈধ ঠিকানা – ৪০,০০৯ জন
উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়, অনেকের ঠিকানায় লেখা ‘হাউস নম্বর ০’।
বাল্ক বা একক ঠিকানার ভোটার – ১০,৪৫২ জন
যেমন ‘হাউস নম্বর ৩৫’ এ ৮০ জন ভোটার নিবন্ধিত।
ভুল ছবি সহ ভোটার – ৪,১৩২ জননতুন ভোটারদের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম ৬-এর অপব্যবহার – ৩৩,৬৯২ জন
উদাহরণস্বরূপ, শাকুন রানি নামে ৭০ বছরের এক মহিলার নাম দুইবার তুলনামূলকভাবে অল্প ব্যবধানে তালিকাভুক্ত হয়েছে।
রাহুল গান্ধী বলেন, “ভারতে নির্বাচন কমিশিন এবং বিজেপি একসঙ্গে মিলে নির্বাচন চুরি করছে – প্রমাণ সাদা কাগজে কালো অক্ষরে সামনে রয়েছে।”
#VoteChori हमारे लोकतंत्र पर Atom Bomb है। pic.twitter.com/jcLvhLPqM6
— Rahul Gandhi (@RahulGandhi) August 7, 2025
‘তথ্যপ্রমাণ’ সামনে এনে রাহুল বলেন, ‘এটা নিছক অনিয়ম নয়, এটা সংবিধানের বিরুদ্ধে একটি বড়ো রকমের অপরাধ। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে মিলে এই কাজ করেছে বিজেপি। আমি যেহেতু সংসদ সদস্য, দেশের জনগণের সামনে যা বলছি সেটাই আমার শপথ। কমিশন এখনো পর্যন্ত একবারও বলেনি, যে তথ্য আমরা দিয়েছি, তা মিথ্যা।’ লোকসভার বিরোধী দলনেতার বিস্ফোরক দাবি সামনে আসতেই, তৎপর হয়েছে নির্বাচন কমিশন। কর্নাটকের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক রাহুলকে একটি চিঠি পাঠিয়ে স্পষ্ট জানান, তাঁকে আইনি বিধি অনুসারে লিখিতভাবে শপথ করে অভিযোগ পেশ করতে হবে। চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্বাচন আইন অনুযায়ী তিনি ‘রুল ২০ (৩) বি’ ধারায় যে কোনো ভোটারের নাম নিয়ে আপত্তি জানাতেই পারেন, তবে তার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও শপথপত্র জমা দিতে হবে।
❤ Support Us





