Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • ডিসেম্বর ১২, ২০২৫

উত্তরপ্রদেশ-গুজরাত-ঝাড়খণ্ডে ইডির তল্লাশি অভিযান, হাজার কোটি টাকার কাফ সিরাপ র‌্যাকেটের সূত্র, মূল হোতা পলাতক

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
উত্তরপ্রদেশ-গুজরাত-ঝাড়খণ্ডে ইডির তল্লাশি অভিযান, হাজার কোটি টাকার কাফ সিরাপ র‌্যাকেটের সূত্র, মূল হোতা পলাতক

দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল বাজারে বহু দিন ধরেই অবৈধ কোডিন–ভিত্তিক কফ সিরাপ চক্র সক্রিয় থাকার আশঙ্কা ছিল তদন্তকারী সংস্থার। কিন্তু তার প্রকৃত বিস্তার যে এতখানি গভীরে, বহুরাজ্যে এর জাল ছড়িয়ে আছে তার ভয়াবহতা পুরোপুরি উপলব্ধী করা যায় নি। এবার তা স্পষ্ট হয়ে উঠল বুধবারের অভূতপূর্ব অভিযানে। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত এবং ঝাড়খণ্ড জুড়ে একযোগে তল্লাশিতে উঠে এসেছে কোডিন সিরাপ পাচারের এক বিশাল নেটওয়ার্ক,তদন্তকারীদের অনুমান অনুযায়ী, এই চক্রের আর্থিক আয় ১,০০০ কোটিরও বেশি। ইডির তদন্তকারীরা বলছেন, এই র‌্যাকেটের পরতে পরতে রয়েছে জাল নথি, মিথ্যা বিল, গোপন স্টক, বেনামি সংস্থা এবং নগদ লেনদেনের ঘোর জটিল কাঠামো; যার রাশ রয়েছে একাধিক চক্রের হাতে।

বিভিন্ন জেলার পুলিশ, এসটিএফ এবং খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের হাতে গত এক বছরে জমা পড়েছিল মোট ২৪টি আলাদা আলাদা এফআইআর। লখনৌ, চন্দৌলি, বারাণসী, গাজিয়াবাদ, সোনভদ্র, সুলতানপুর, কানপুর নগর, জৌনপুর, বাহরাইচ, ভদোহি এবং গাজীপুর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সে মামলাগুলিতেই মিলেছিল অস্বাভাবিক পরিমাণ কফ সিরাপ, ভুয়ো জিএসটি ইনভয়েস, পরিবর্তিত স্টক রেজিস্টার। তদন্তে উঠে এসেছে এমন সব সংস্থার অস্তিত্ব, যেগুলি কাগজে-কলমে ছিল, কিন্তু বাস্তবে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই সমস্ত নথি একত্র করে ইডি সম্প্রতি একটি বড়োসড়ো ইসিআইআর নথিভুক্ত করে। ওই নথির ভিত্তিতেই বুধবার ভোর থেকে শুরু হয় বহু-রাজ্যে একযোগে অভিযান। এদিন, তল্লাশি শুরু হয় কারখানা, গুদাম এবং গোটা র‌্যাকেটের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহভাজনদের বাড়িতে। কোথাও পাওয়া যায় মাটির তলায় লুকিয়ে রাখা সিরাপের কার্টন, কোথাও আবার উদ্ধার হয় ব্যাগভর্তি জিএসটি বিল, যেগুলির প্রতিটিই ফটোকপি করা একটি পুরনো টেমপ্লেটের উপর ভিত্তি করে তৈরি। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, যে কয়েকটি স্টক রেজিস্টার উদ্ধার হয়েছে, সেখানে লক্ষ লক্ষ কফ সিরাপের বোতল উৎপাদনের নথি থাকলেও কোনো পরিবহন তথ্য নেই। বড়ো সংস্থার নাম ব্যবহার করে তৈরি হয়েছিল ভুয়ো পরিবহনকারীরও তালিকা। সেগুলি ধরে ধরে খতিয়ে দেখে ইডি বুঝতে পারে যে, সরবরাহের বেশিরভাগ অংশই কোনো সরকারি নথিতে ছিল না— সবই চলত নগদে, গোপন ট্রাকে করে, মাঝরাতে রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে।

তদন্তকারীরা অনুমান করছেন, এ ব্যবসা চালাতে চক্রটি ব্যবহার করত বহুস্তরীয় মানি–লন্ডারিংয়ের ব্যবস্থা— ছায়া কোম্পানি, বেনামি মালিকানা ও অঘোষিত নগদ লেনদেনে সাজানো এক বিস্তৃত ছায়া–অর্থনীতি। প্রচুর পরিমাণ সিরাপ নিয়মিত দেশে বিভিন্ন গোপন বাজারে পৌঁছে দেওয়া হতো, আবার তার একটি অংশ সীমান্ত পেরিয়েও চোরাচালান করা হতো। প্রত্যেক ধাপেই ছিল আলাদা আলাদা মধ্যস্থতাকারী— পরিবহনকারী, গুদামজাত করার লোক, নগদ সংগ্রাহক এবং আর্থিক দালাল, যারা পরস্পরকে চিনতও না, কিন্তু একই র‌্যাকেটের সূত্রে তাঁরা বাঁধা। গোটা চক্রের ’মাস্টারমাইন্ড’ শুভম জয়সওয়ালকে ইডি গত ৮ ডিসেম্বর লখনৌতে হাজিরা দিতে নোটিশ পাঠিয়েছিল। কিন্তু তিনি উপস্থিত হননি। তদন্তকারীদের ধারণা, শুভম দেশ ছেড়ে দুবাইয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, যেখানে থেকে তিনি আগেও একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তাঁর বাবা ভোলা প্রসাদকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। এ পর্যন্ত ওই র‌্যাকেটের সঙ্গে যুক্ত ৩২ জনকে আটক করা হয়েছে। কিন্তু মূল হোতা অধরা থাকায় তদন্তকারীরা বলছেন, এ চক্রের পুরো কাঠামো এখবো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, বরং আরো অনেক স্তর উন্মোচিত হওয়া বাকি।

মামলার গুরুত্ব বুঝে উত্তরপ্রদেশ সরকার ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ তদন্ত দল বা সিট গঠন করেছে। তাদের কাজ হলো রাজ্য পুলিশ, ইডি, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা দপ্তরের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান ও সমন্বয় ঘটানো। ইডির এক আধিকারিক বলেন, ‘এ মামলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, অপরাধের শারীরিক নেটওয়ার্ক এবং আর্থিক নেটওয়ার্ক দুটিই একইসঙ্গে সমান শক্তিশালী। যে ভাবে ওষুধ সরানো হয়েছে, অর্থ হাতবদল হয়েছেক, সবকিছু মিলিয়ে তদন্তকারীরা এমন এক চক্রের মুখোমুখি, যা শুধুমাত্র পাচারচক্র নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অপরাধচক্র।’ ইডি এখন সব অভিযুক্তের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, জিএসটি রেকর্ড, আয়কর নথি, সম্পত্তির খতিয়ান এবং ফোন–ল্যাপটপের ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করছে। কোথা থেকে অর্থ এসেছে, কোথায় গেছে, কার নামে জমা হয়েছে, কোন পরিবহন রুট ব্যবহার হয়েছে, সমস্ত তথ্য খুঁজে বার করে একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করার চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীদের মতে, এই অভিযান শেষ নয়, বরং মাত্র শুরু। চক্র যত গভীরে লুকিয়ে, তদন্তও ততটাই বিস্তৃত হবে। দেশজুড়ে অবৈধ ফার্মাসিউটিক্যাল র‌্যাকেট ভাঙতে সাম্প্রতিক কালে এমন পরিসরের অভিযান আর দেখা যায়নি, ঠিক সেই কারণেই গোটা ঘটনার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রয়েছে দেশ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!