- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- ডিসেম্বর ১, ২০২৪
ভুজঙ্গ দারোগার পোড়ো বাড়ি
একসময়ের নিষিদ্ধ শব্দটা কানে আসতে পিলে চমকে উঠল। কে বলল কথাটা ? এদিক ওদিকে ইতি উতি তাকালাম। কাউকে দেখতে পেলাম না। সদ্য ঝাড়খণ্ড থেকে এসেছি। এখানকার কেউ আমাকে চেনে না। মধুদা মারা যাওয়ার জন্য আমাকে এখানে আসতে হলো।
এই নকশাল। আমি আবার শুনলাম। এবং আবার শোনার জন্য কান পেতে রইলাম।
নকশাল।নকশাল। নকশাল।
কেরে ? সামনে আয়। আমি রেগে গেলাম – তুই নকশাল। তোর বাবা নকশাল। তোর দাদু– কোনো সাড়া না পেয়ে চুপ করে গেলাম। হাঁপিয়ে গেছি। বয়স তো কম হলো না। গতকাল ৭৫ এ পা দিয়েছি, সকালে হাঁটতে বেরিয়েছি। রাস্তাটা বড় নির্জন। রাস্তার পাশে একটা বটগাছ। তার পরেই একটা পোড়ো বাড়ি।একবার দেখলাম।
এখন আর কেউ থাকেনা। রাস্তার দুপাশে ঘরবাড়ি। মাঝে পোড়ো বাড়িটা বড্ড বেমানান। একটু খোঁজ নিতে হবে। ভাবতে ভাবতে বটতলায় বসলাম। গতকাল এসেছি । তেমন করে কিছুই চিনি না। অশক্ত শরীর নিয়েই বেরিয়ে পড়েছি। ভাইপো তন্ময় বলল -কাকা একটু হাটাহাটি করবে। তাই বেরিয়েছি। আমি পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালাম।
একজন পথচারী দাড়ালো, দাদু আগুন টা।
তাকিয়ে দেখলাম বছর ত্রিশের একটি যুবক আমার কাছে আগুন চাইছে।একদিন আগুন নিয়ে খেলেছি। সে আগুন এখন নিভু নিভু।তবু জ্বলছে। নেভেনা।
দাদু দিন।
আমি দেশলাই দিলাম কাঁপা কাঁপা হাতে।যুবকটি বিড়ি ধরাল।দেশলাই ফেরত দিয়ে বলল, দাদু কি এলাকায় এই প্রথম ?
হ্যাঁ।
তাই দেখিনি।
পোড়ো বাড়িটা কার ? হঠাৎ জানতে চাইলাম।
জানেন না না ?
আমি গতকাল এসেছি।
কোথায় উঠেছেন ?
তন্ময় সামন্ত আমার ভাইপো।
তন্ময় দা।
হ্যাঁ।
আগে বলবেন তো। যুবকটি বিড়ি লুকাল।
আমার হাসি পেল -খেতে পারো।
কাকা মাফ করে দেবেন। তন্ময়দার কাকা মানে আমারও কাকা।
নাও সিগারেট খাও।
যুবক সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে বলল, পোড়ো বাড়িটা শুনেছি কুখ্যাত দারোগা ভুজঙ্গ বাবুর।
আমি চমকে উঠলাম।
আমার শোনা কথা ।যুবকটি বলল, একজন নকশালপন্থী ভুজঙ্গ দারোগার গলা কেটে খুন করে। সেই থেকে ওর অতৃপ্ত আত্মা নাকি বাড়িটার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়।
এই নকশাল।
আমি শুনতে পেলাম। ঠিকই, গলাটা ভুজঙ্গ দারোগার । ভুলে গেছিলাম। আমি জানতাম না এই এলাকায় ভুজঙ্গ দারোগার বাড়ি। এখন মনে পড়েছে। একবার রণজয়ের মুখে কাটোয়ার নাম শুনেছি, এখন মনে পড়ল।
• দুই •
রনজয় সমাদ্দার। এমএসসি। ফিজিক্স ফার্স্ট ইয়ার। আমার বিষয় অংক। বিষয় আলাদা, তবুও বন্ধুত্ব হতে দেরি হয়নি। প্রেসিডেন্সির পাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে হিন্দু স্কুল, কলেজ স্কোয়ার, কফি হাউস কাছাকাছি আনাচে কানাচে বইয়ের দোকান। অফ পিরিয়ডে ঘুরে দেখি। তারপর পড়া শেষ হলেই বনগায় চলে যাব দেশের বাড়ি। ওখানে যাওয়া হলো না । রণজয় বলল– তুই বড্ড স্বার্থপর।
কেন ?
দেখছিস না সিদ্ধার্থের পুলিশগুলো কীভাবে আমাদের ছেলেগুলোকে মারছে ?
তা আমি কী করবো ?
সমাজটাকে বদলাতে হবে।
ওদের নীতি জমির মালিকানা কেড়ে নিয়ে চাষীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া। পুলিশ মালিকপক্ষ নিলে হামলা করা আর শ্রেণি শত্রু খতম করা। কিছুটা সফল হয়েছে। অনেক নিরীহ লোক মারা গেছে তাই আমি হাসলাম, যে লঙ্কায় যায় সেই রাবণ হয়।
আমরা শ্রেণিহীন সমাজ গড়ব। ধনতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে চুরমার করব।
পারবিনা। মাঝখান থেকে কেস খেয়ে যাবি।
দেখে নিস। আমি বলেই মেসের দিকে পা বাড়ালাম। সিগারেট ধরিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ একদল পুলিশ আমাকে
চ্যাংদোলা করে ভ্যানে তুলল। বললাম–কী ব্যাপার ?
কিছুক্ষণ আগে বম্বিং হয়ে।
তাতে আমার কী ? আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরছি।
কোন বিশ্ববিদ্যালয় ?
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
পুলিশ একটু হাসল— তাহলে ঠিক ধরেছি। ওখানকার সবকটা নকশাল।
চুপ করে করে রইলাম।
পুলিশ ভ্যান লালবাজারের ঢুকলো। আরও ১০ জন এর সঙ্গে আমাকে টেনে হিচড়ে ল কাপে ঢুকালো অকারনে এক প্রস্থ লাঠিপেটা করল। আমাকে ডেকে নিয়ে আলাদা করে বলল– কনা বন্দ্যোপাধ্যায় কোথায় ?
কনা তো মেসে।
মেসে নেই।
তাহলে কোথায় যাবে ? বাড়িতে যায়নি তো।
নেকামি করছিস।
সত্যি বলছি। পাঁচ দিন ধরে ওর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। আচ্ছা ওকে খুঁজছেন কেন ?
তুই কিছুই জানিস না ? কনা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন নকশাল নেত্রী।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। কণার সঙ্গে আমার দু বছরের সম্পর্ক। একবারও ঘুণাক্ষরে জানতে পারলাম না।আমার ফাঁকা মেসে বিশেষ করে আমরা দুজনে অনেকটা সময় কাটিয়েছি। একান্তভাবে কোন কোন দিন রাতে ও থেকে গেছে। মধুদার বদান্যতায়। তাতে অবশ্য আমার কিছু পয়সা খসতো। সেই কণা একজন নকশাল নেত্রী, রাজ্যস্তরের। ভাবতে পারছি না। আমি নিজেকে সামলে বললাম – আমি স্যার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কে কী করে খোঁজ রাখি না।
রাগটা চেপে চলন্ত বাসে চেপে পড়লাম। দৌড়ে এসে কেউ একজন বাসে চাপলো। আমি তাকাতেই চমকে উঠলো। লালবাজারে ওকে দেখেছি। সাধারণ পোশাকে বোধ হয় খোচর। হাতের মুঠোয় জলন্ত সিগারেট, দিলাম রড ধরা হাতে গুঁজে। ধপ করে পড়ে গেল। পেছনের বাসের প্রথম চাকায় ওর মাথাটা থেতলে গেল। আমি চোখ বুজে ফেললাম।
এবার থেকে রাখবি।যা এবার।
আমি লালবাজার থেকে বেরোলাম।পথে হাঁটতে হাঁটতে দেওয়াল লিখন দেখলাম। কালো কালিতে লেখা। ‘ চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান।’ হাসি পেল। একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে টের পেলাম, কেউ আমাকে ফলো করছে। খুব রাগ হলো। রাগটা চেপে চলন্ত বাসে চেপে পড়লাম। দৌড়ে এসে কেউ একজন বাসে চাপলো। আমি তাকাতেই চমকে উঠলো। লালবাজারে ওকে দেখেছি। সাধারণ পোশাকে বোধ হয় খোচর। হাতের মুঠোয় জলন্ত সিগারেট, দিলাম রড ধরা হাতে গুঁজে। ধপ করে পড়ে গেল। পেছনের বাসের প্রথম চাকায় ওর মাথাটা থেতলে গেল। আমি চোখ বুজে ফেললাম।
• তিন •
মধুদা আমাকে দেখে বলল, কোথায় ছিলে এতক্ষণ ?
কেন ?
তোমার ঘর লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে।
কারা ?
পুলিশ।
আর ?
ভোলা মদন তপা আরও অনেকে।
ওরা দুষ্কৃতী ওরা সরকারি দলের কর্মী, ওরা নানারকম অপরাধ করে নকশালদের ঘাড়ে দোষ চাপায়। পেছনে পুলিশের মদত আছে। ভাবতে ভাবতে জানলার কাছে দাঁড়ালাম। সামনের বিল্ডিং থেকে জানলার আড়াল থেকে আমাকে দেখছে। আমি হাসতে ভোলা ভড়কে গেল।
হঠাৎ টেলিফোন টা ঝনঝন করে উঠলো। বারান্দায় গিয়ে ধরলাম, সৌম্য। রনজয় ইজ ডেড।
গলার স্বর অমলের।বললাম, কী করে ?
পুলিশ প্রকাশ্যে দিবালোকে ওকে মেরে ফেলল। ভুজঙ্গ দারোগা গুলি করল।
ভুজঙ্গ দারোগা !
সরকারি মস্তান। অমলের ফোন কেটে গেল।
ঘরের চৌকিতে ধপ করে বসে পড়লাম। দলের কেউ নই, তবু ওদের প্রতি কেমন যেন নরম হয়ে গেলাম। জানি ওরা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছে। কত ব্রিলিয়ান্ট ছেলেমেয়ে দলে ঢুকে পড়েছে। জোয়ার লেগেছে। সরকারি দমননীতি এর জন্য দায়ী। মিশার প্রতি মানুষের ঘৃণা বাড়ছে। আমার মনেও একটু একটু করে ঘৃণা জন্মাতে শুরু করল। বন্ধুহীন হয়ে পড়লাম।
এটাই মেনে নিতে পারছি না। শরীর খুব ক্লান্ত লাগছে। চৌকিতে চিৎ হয়ে শুয়ে কপালে হাত দিয়ে ভাবছি। ভাবছি রনজয় এর কথা। কথায় কথায় বলতো আমি দশজন ধনী জোতদার, পাঁচটা পুলিশ আর কয়েকটা কংগ্রেসি গুন্ডাকে মেরেছি। বিশ্বাস হয়নি। তবে রণজয় মাঝে মাঝে উধাও হয়ে যেত। কোথায় যেত তা বলত না। ক্লাসের নোট সাপ্লাই দিত অহনা।অহনা হয়তো রণজয়কে ভালোবাসত বা ভালোবাসত না। নির্মল বন্ধুত্ব ছিল।
রোজই শুনছি শ্রেণী শত্রু খতমের কথা। নকশাল খতমের কথা। রোজ রোজ নতুন নতুন ছেলেমেয়ে নকশাল হচ্ছে। সবার লক্ষ্য বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং সাম্যবাদ। আমি জানি, এই পোড়া দেশে তা সম্ভব নয়। এখানে বিভীষণের অভাব নেই। নকশালদের কেউ কেউ নীতিচ্যুত হয়ে দালালি করছে।
আমি বিকেলে অহনার মেসে গেলাম। গিয়ে দেখি অহনা ব্যথায় ছটফট করছে।দেখলাম ওর উঁচু পেট। যা বোঝার বুঝে গেলাম। অহনা মা হতে চলেছে। সম্ভবত রণজয়ের বাচ্চা পেটে ধরেছে। ওর বাড়ি মালদহে। ওর দেখাশোনা করবে কে ? একবার ভাবলাম। ভেবেই ওকে ট্যাক্সিতে চাপিয়ে ভবানীপুরে নিয়ে এলাম। আমার বড়দার বাড়িতে। বড়দাকে বললাম, আজ থেকে অহনার দায়িত্ব তোর। বলেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলাম।
সারা বিকেলটা ইতস্তত ঘুরে বেড়িয়ে সন্ধ্যেবেলা মেসের দিকে পা বাড়ালাম। বড় রাস্তা থেকে গলিতে পা রাখলাম। চারিদিক কেমন যেন শুনশান। পথ বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। কুকুরগুলো রাস্তাতে কী যেন চেটে খাচ্ছে।হঠাৎ বারুদের গন্ধ ধেয়ে এল। বুঝে গেলাম, কিছু একটা হয়েছে।
মেসের দরজা ঠেলতে খুলে গেল।মধুদা আমার জন্য দরজায় দাঁড়িয়েছিল। দরজা বন্ধ করে বলল– ভোলারা শেষ।
কী বলছো !
কারা যেন বোম মেরে ওদের উড়িয়ে দিয়েছে। মধুদা বলল, তুমি বাপু বাইরে বেশি ঘোরাঘুরি করো না।
আমি মধুদাকে এক পলক দেখলাম।
• চার •
বিশ্ববিদ্যালয় যাই। ক্লাস করি। ক্লাসে মন বসে না। কেবলই রণজয়ের কথা মনে পড়ে। অবসর সময় যেখানে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারতাম, সেদিকে তাকালে মনে হতো রনজয় হাত নাড়ছে। কী যে হয়ে গেল। রণজয় নেই, কণার খোঁজ নেই।কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে কে জানে। বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেসে আমার আর দিন কাটেনা। চারদিক অস্থির।অস্থির সময়ের ভেতর দিয়ে ছুটছি। রোজই শুনছি শ্রেণী শত্রু খতমের কথা। নকশাল খতমের কথা। রোজ রোজ নতুন নতুন ছেলেমেয়ে নকশাল হচ্ছে। সবার লক্ষ্য বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং সাম্যবাদ। আমি জানি, এই পোড়া দেশে তা সম্ভব নয়। এখানে বিভীষণের অভাব নেই। নকশালদের কেউ কেউ নীতিচ্যুত হয়ে দালালি করছে। সেই সুযোগে কংগ্রেস নকশালদের মধ্যে নিজেদের লোক ঢুকিয়ে নিরীহ লোক মেরে নকশালদের বদনাম করছে। ভাবতে পারছি না। ভাবলাম এ নিয়ে আর ভাবব না। মেসের দিকে হাঁটা দিলাম।পথে যেতে যেতে একটা বুক স্টলে দাঁড়িয়ে খবরের কাগজ কিনে চোখের সামনে মেলে ধরলাম।
নকশাল নেত্রী কনা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত।
কণার ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে শিউরে উঠলাম। খবরের কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে ঢুকালাম। মেসে এসে পড়লাম এবং শিউরে উঠলাম। ভুজঙ্গ দারোগার নেতৃত্বে মেদিনীপুরের গড়বেতা জঙ্গলে সংঘর্ষ হয়।কোনো এক খোঁচড় খবরটা দেয়। ভুজঙ্গ দারোগা কলকাতা থেকে দলবল নিয়ে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে।
আমার বুকটা চিনচিন করে উঠলো। শরীর মন হঠাৎ চাঙ্গা হয়ে উঠল। হাত দুটো নিসপিস করতে লাগল। মাথায় যেন খুন চাপল। চোখ বুজে নিজেকে সামলে নিলাম। আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। এর শেষ দেখতে হবে। রনজয় এর খুনিদের, কণার খুনিদের দেখে নিতে হবে। কাউকে ছাড়া হবে না।
হঠাৎ মধুদা ঢুকল। হাতে একটা খাম। হাতে নিয়ে খুললাম। রায়না থানা।দারোগা রণেন পোদ্দার খতম। সহকর্মী দুলে সর্দার। বুঝে গেলাম কী করতে হবে। বললাম, কে দিল ?
জানিনা লেটার বক্সে পেলাম।
আমি রাতেই বেরিয়ে পড়লাম। কাজ সেরে দুদিন পর ফিরে এলাম। আমি ঘর থেকে কদিন বেরোলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম না। দুটো খুন করেছি। আমার হাত রক্ত রাঙা অথচ মধুদা ছাড়া কেউ জানে না।মধুদা আবার এল। হাতে এক গোছা খাম। খুলে খুলে সবকটা পড়লাম। বললাম, মধুদা কে দিচ্ছে এসব ?
জানি না।
আমি চুপ করে গেলাম।ভাবতে লাগলাম কে হতে পারে। বাবা পূর্ব পাকিস্তান থেকে ৪৬ সালে এ দেশে আসে কটা খুন করে। যারা আমার বাপ কাকাদের উপর অত্যাচার করত। তাদের কে মেরে চলে আসে। বাবা গল্প করত।আমরা শুনতাম। সেটাই হয়তো কখনও রনজয় কে বলেছি, রণজয় জেনে গেছে আমার শরীরে একজন খুনির রক্ত বইছে। সেটাই হাতিয়ার করে নিয়েছে। আর ফেরার পথ নেই। সিরিয়ালের শেষে ভুজঙ্গ দারোগার নাম। কিছুদিনের মধ্যেই অবসর নেবে তার আগেই — আমি মধুদার দিকে তাকালাম। বললাম, কি ব্যাপার ! কিছু বলবে ?
তুমি আজই এখান থেকে কেটে পড়বে।
মানে !
আমিও চলে যাব। টিকটিকি লেগেছে।
তুমি কে ?
আমি মধু মালিক বাড়ি রায়না, যাকে মেরেছ সে আমার পুরো পরিবারকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। মধুদা বলল, আমি অসীম হালদার হয়ে ঝাড়খণ্ডে যাচ্ছি। বলেই পকেটে কি যেন ঢুকিয়ে চলে গেল।
আমি থম ধরে বসে রইলাম। নিজেকে সামলাতে একটু সময় লাগলো। তারপর পকেট থেকে কাগজটা বের করে চোখের সামনে মেলে ধরে চমকে উঠলাম।
• পাঁচ •
আমি কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরলাম।
অহনা >রনজয় +কণা । কী সাংকেতিক লেখা রে বাবা। বোঝা মুশকিল।বার কয়েক লেখাটা দেখলাম। হঠাৎ মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটা হিম শীতল ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। এ কি সম্ভব ? সম্ভব না হলে মধুদা হরফে অসীম হালদার লিখবে কেন ? সব সম্ভব। দলে দুর্নীতি ঢুকেছে। টাকায় অনেকে বিকিয়ে যাচ্ছে। দমন ও একটা অস্ত্র। সে অস্ত্রে কারো কারো অভিমুখ বদলে যাচ্ছে। মনে পড়ল বন্দুকের নল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। তাই হতে পারে। নিশ্চিন্ত হয়ে গেলাম। ওর পেটে বাচ্চা। মারতে পারলাম না। কি করব ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে এলাম। স্টেশনে এসে বসলাম।নেক্সট টার্গেট কাটোয়া। ভুজঙ্গ দারোগো। অবসর নিয়ে বাড়িতে দিনযাপন করছে। ওখানে নকশাল কর্মী তপন মুদিখানার দোকান চালায়। ওর বাড়িতে উঠলাম। দিন কয়েক নজর রাখলাম ভুজঙ্গ দারোগার বাড়ির উপর।
তপন এসে বলল, আজ ভুজঙ্গ দারোগার পরিবার বাড়িতে থাকবে না।
কোথায় যাবে ?
বাপের বাড়ি।
সন্ধ্যেবেলা টার্গেট নেব। আমি সারাদিন ঘুমিয়ে বিকেলে তৈরি হয়ে নিলাম। কোমরে গুঁজলাম একটা ভোজালি আর ওয়ান শাটার। একটু আধার নামতে প্রাচীর টপকে ঢুকলাম। সদর দরজা খোলা। ঢুকে পড়লাম। কই ভুজঙ্গ দারোগা ? হঠাৎ বাথরুমে জল পড়ার শব্দ হল। সতর্ক হয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়ালাম। বেরোতেই পেটে ভোজালি ঢুকিয়ে দিলাম। বাঁ হাত দিয়ে ওয়ান শাটার মাথায় ঠেকিয়ে পরপর গুলি করলাম। ভুজঙ্গ দারোগা বিস্ফারিত চোখে আমাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল— নকশাল।
আমি চমকে উঠলাম কাঁধে শীতল স্পর্শ পেয়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে অহনাকে দেখতে পেলাম। বলল, সেই কখন বেরিয়েছিস, তোর দাদা চিন্তা করছে, তোর ভাইপো ভাইঝি চিন্তা করছে।
একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালাম। এটা যদি ভেজালি হয়ে অহনার পেটে ঢুকে যেত, তাহলে কণা আর রণজয়ের আত্মা শান্তি পেত। তা হয়নি। তা করিনি। আমি নকশাল আন্দোলনের আদর্শ থেকে বিচ্যুত । তবু নকশাল শব্দটা শোনার জন্য কান খাড়া করে রইলাম।
♦–•·•·–♦ ♦–•·•·–♦ ♦–•·•·–♦
❤ Support Us







