- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জুন ১১, ২০২৩
বিলম্বিত লয়
অলঙ্করণ : দেব সরকার
সকাল আট টা বেজে পনেরো মিনিট।
ট্রেন থেকে নেমে এল পলাশ। দীর্ঘ প্রায় বাইশ বছর পর এই ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পা রাখল সে। প্রথমে সে ষ্টেশনটিকে ঠিক মতো চিনতে পারল না। তার মনে হল ভুল করে অন্য কোনও ষ্টেশনে নেমে পড়েছে। এই বাইশ বছরে ষ্টেশনের চেহারা পুরো বদলে গেছে। বাইশ বছর আগে যে ষ্টেশনকে রেখে গিয়েছিল পলাশ, তার সাথে আজকের ষ্টেশনের কোনো মিল নেই। তখন দুদিকে এমন সুন্দর উঁচু প্ল্যাটফর্ম ছিল না, ট্রেন এসে দাঁড়ালে কামরার দরজার হাতল ধরে ঝুলে অনেক কষ্টে নিচে থেকে ট্রেনের উপরে উঠে আসতে হত। সবচেয়ে সমস্যা হতো বয়স্কদের নিয়ে। প্ল্যাটফর্ম না থাকায় নিচে থেকে হাতল ধরে কিছুতেই উপরে উঠতে পারতনা তারা। সাথে কেউ থাকলে বা সহযাত্রী কেউ দয়া করে ধরে তুলে দিলে তবেই ট্রেনের উপরে উঠতে পারত । এখনকার মতো সেই সময় ট্রেনও খুব বেশি চলত না। এত লোকালও চলত না তখন। এখন আধঘণ্টা একঘন্টা অন্তর অন্তর ট্রেন চলে। আর আগে সারাদিনে চার থেকে পাঁচ খানা ট্রেন চলত।
প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ি বেয়ে ষ্টেশনের নিচে নেমে এল পলাশ। ষ্টেশনের বাইরে নিচের দিকে রাস্তার দুধারে পাশাপাশি কয়েকখানা চায়ের দোকান। বেশকিছু ট্রেনযাত্রী চায়ের দোকানে বসে আড্ডা মারছে। হাঁটতে হাঁটতে একখানা চায়ের দোকানে ঢুকে পড়ল সে। মনে পড়ল, এই যে দোকান, এখানে এক সময় একটা বড় কদম গাছ ছিল। ষ্টেশনে তখন শেড ছিলনা। প্রখর রোদ হোক বা বৃষ্টি – গাছতলাতেই যাত্রীরা আশ্রয় নিত। তাছাড়া ট্রেনের কোনো টাইম টেবল ছিলনা। কোনো ট্রেন দশ মিনিট দেরিতে আসত, তো কোনো ট্রেন আবার বিশ-ত্রিশ মিনিট দেরিতে। এখন নাকি ট্রেন লেট করেনা। টাইম টেবিল মেনে ট্রেন চলে,শুনে ভালো লাগল পলাশের।
চায়ের অর্ডার দিয়ে বেঞ্চে বসল পলাশ। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করল। মোবাইল বের করা এই সময়ে তার হয়তো কোনও দরকার ছিল না। কিন্তু মোবাইল বের করাটা আর পাঁচটা কাজের মতো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। চায়ের কাপ হাতে আসার আগে একটু ফেসবুকে, একটু হোয়াটসয়্যাপে, একটু মেসেঞ্জারে, একটু ইনস্টাগ্রামে ঘুরে আসা আর কি! কেন, কীসের জন্য ঘুরে আসতে হয় জানে না পলাশ। হয়তো কোনো বন্ধু মেসেজ করেছে, কেউ ছবি আপলোড করেছে, কেউবা কমেন্ট করেছে, কারও কমেন্টের এগেনেস্টে অন্য কেউ কমেন্ট করেছে। সেটা নিয়ে হয়তো তীব্র বাদ প্রতিবাদ চলছে। ওদিকে বন্ধুরা সিকিম বেড়াতে গেছে। ফেসবুক জুড়ে তাদের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। এসব দেখতে দেখতে সময়টা কখন পার হয়ে যায়, পলাশ বুঝতে পারেনা।
চায়ের কাপ চলে এসেছিল। মোবাইল বন্ধ করে চায়ের কাপে চুমুক দিল পলাশ।
চা-পর্ব শেষ হলে উঠে দাঁড়াল সে। এখান থেকে সে যাবে পদ্মপুর। একসময় সেখানে প্রচুর পদ্ম চাষ হত। তাই গ্রামের ওইরকম নাম। ষ্টেশন থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ। সামনের দিকে এগিয়ে গেল সে। দেখল রাস্তার দুধারে পর পর লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সার সার টুকটুকি। একটা টুকটুকিতে চেপে বসল সে। টুকিটুকিটি একা একা নিয়ে যেতে চাইছিলনা তাকে। বাধ্য হয়ে পুরো টুকটুকিটা তাকে ভাড়া করে নিতে হল।
টুকটুকি তখন একটা সরু পিচ রাস্তা ধরে সামনের দিকে গতি নিয়েছে। টুকটুকিতে চেপে বসে পলাশ আশেপাশে চেয়ে থাকল। রাস্তাটা আগে আরও বেশি সরু ছিল, এখন একটু যেন চওড়া হয়েছে। রাস্তার দুধারের চেহেরাও আগের থেকে অনেক পাল্টে গেছে, উঁচু উঁচু পাকা বাড়ি উঠেছে। সাইকেলের চেয়ে মোটরসাইকেল বেশি বলে মনে হল পলাশের। যে রাস্তায় একসময় সারাদিনে একটি থেকে দুটি মোটরসাইকেল চলত, এখন সেখানে মিনিটে মিনিটে মোটরসাইকেল, টুকটুকি আর ছেলেমেয়েদের যা ওয়া আসা। পলাশের মনে হল এই সময়ের সবচেয়ে ব্যস্ততম রাস্তা হল এই রাস্তা।
আরেকটি জিনিস লক্ষ্য করল পলাশ। আগে রাস্তার ধারে এত ইটভাটা ছিল না। রাস্তার ধারে অনেক গাছ ছিল। সেই গাছগুলোও আর দেখা যাচ্ছেনা। তারমানে গাছগুলো আর নেই। কেটে ফেলা হয়েছে। রাস্তার ধারে ধারে কয়েকটি ইটভাটা হয়েছে। সেখানে কাজ করছে বেশ কিছু শ্রমিক। এই সমস্ত শ্রমিকের কারও বাড়ি এখানেই, কারও বা আরও অনেক দূরে,- বীরভূম, বাঁকুড়া বা ঝাড়খণ্ডেরও কেউ কেউ আছে।
তারপর একসময় পদ্মপুরের মোড়ে এসে নামল পলাশ। মোড় আর আগের মতো নেই। এই বাইশ বছরে মোড়টাও বদলে গেছে। তখন এই মোড়ে এত দোকান ছিলনা। একটিও বাড়ি ছিলনা। থাকা বলতে মহীম কাকার একটি ভাঙা চায়ের দোকান। তাও সবসময় খোলা থাকত না। সকালের দিকে ঘণ্টা দুয়েক, আর সন্ধ্যার পর রাত আটটা ন’টা। পাড়ার ছেলেরা সবাই এসে মোড়ের এদিক ওদিকে আড্ডা মারত। গরমের সময় হলে রাস্তার দু ধারে বসে শুয়ে হাওয়া খেত।
ঠিক বাইশ বছর আগে এই মোড় থেকেই একটা রিক্সাভ্যানে চেপে শেষবারের মতো গ্রাম থেকে রওনা দিয়েছিল পলাশ। রিক্সাভ্যানটি ছিল বন্ধু প্রিতমের বাবার। প্রিতমই তাড়াতাড়ি করে তাকে ট্রেন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ষ্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল।
সেদিন পলাশ সকালে উঠে তাড়াতাড়ি কলেজে চলে গিয়েছিল পলাশ। গ্রামে একটা গণ্ডগোল আর আতঙ্কের পরিবেশ আগে থেকেই ছিল। আগের দিন একটি রাজনৈতিক মার্ডার হয়েছিল। তাই নিয়ে গোটা গ্রাম জুড়ে গণ্ডগোল চলছিল। কিন্তু সেটি যে ক্রমে সাম্প্রদায়িক রূপ নিবে তা জানা ছিলনা পলাশের। সারাদিন ধরে গ্রামে লুঠতরাজ চলেছিল তা জানতে পারেনি পলাশ। সেই সময় মোবাইলও ছিলনা। তাই তাঁকে কেউ ফোন করেও কিছু বলেনি। গ্রামে ফিরতেও কেউ নিষেধ করেনি। সন্ধ্যার পর গ্রামে ফিরলে পলাশ দেখেছিল গোটা গ্রাম থমথমে মুখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। গ্রামের রূপ দেখেই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল পলাশ। তাড়াতাড়ি সাইকেল চালিয়ে বাড়িতে ঢুঁকে পড়েছিল সে। বাড়িতে ঢুঁকে সে আরও ভয় পেয়েছিল। দেখেছিল বাবা গম্ভীর মুখে ঘরের দাওয়ায় বসে আছে। মা বসে আছে বাড়ির আঙিনায়। পলাশকে ঘরে ঢুকতে দেখেই প্রথমে বাবা বলেছিল, “তুই ফিরলি কেন? চুপি চুপি পালিয়ে যা। ওরা আবার আসবে বলে গেছে।”
বাবার কথার কোনও মানে বুঝতে না পেরে পলাশ বলেছিল, “কী বলছ বাবা? তোমার কথা আমি কিছু বুঝতে পারছিনা। ওরা কারা? কেন আসবে আবার?”
পলাশের বাবা সরাসরি উত্তর না দিয়ে শুধু বলল, “তুই এক্ষুনি পালিয়ে যা। বেঁচে থাকলে সব জানতে পারবি। বুঝতে পারবি।”
মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল পলাশ। দেখেছিল মায়ের শুষ্ক মুখের রূক্ষ্ম ঠোঁটের উপর চোখের পাতার একফোঁটা জল এসে পড়েছে। সেই ভেজা ঠোঁট সামান্য সরিয়ে মা বলেছিল, “তনুকে দুপুর থেকে পাওয়া যাচ্ছেনা। পাশের বাড়ির কাকু আজ দুপুরে খুন হয়েছে। তাই দেখতে বেরিয়েছিল তনু। তখন থেকে তার আর খোঁজ নেই।”
চমকে উঠেছিল পলাশ। তনু ওর ছোট বোন। নবম শ্রেনিতে পড়ে। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। পলাশ দেখল তার শরীরটা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। কিছু বলার আগেই মা আবার বলেছিল, “কিছুক্ষণ আগে একদল লোক এসেছিল। তারা বলে গেল তুই এলে ওরা আবার আসবে। তুই এখুনি বেরিয়ে যা।”
কি করবে, কী করা উচিত ভাবার আগেই বাইরে প্রচুর মানুষের হৈচৈ শোনা যাচ্ছিল। বাবা তাড়াতাড়ি বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। ততক্ষণে ওরা এসে বাড়ির দরজায় লাথি মারতে শুরু করেছিল। মুখ থেকে ভেসে আসছিল অশ্রাব্য গালাগাল আর হুমকি, “পলাশ শালা আস্যাছে। খুল দরজা। শালাকে আজ খুন করব।”
ভাবার অবকাশ পাইনি পলাশ। এক ধাক্কায় পেছনের দরজা দিয়ে ঠেলে বের করে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল মা। বাড়ির পেছনেই একটা পুকুর। পুকুরের পাড়েই ছিল বাঁশের ঝাড়। পলাশ এক দৌড়ে পুকুরের পাশ দিয়ে বাঁশ ঝাড়ের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। তারপর পেছন দিকে তাকিয়ে দেখেছিল কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই একদল লোক বাড়ির পেছনের দরজার উপর হুমড়ে পড়েছে। জোরে জোরে লাথি মেরে দরজা খুলতে বলছে তারা।
পলাশ আর দেরি করেনি। মাঠের মধ্য দিয়ে সোজা দৌড় দিয়েছিল। কিছু দূর আসার পর সে লক্ষ্য করেছিল পেছন থেকে কে যেন তাকে নিচু স্বরে ডাকছে। দৌড়তে দৌড়তেই পলাশ বুঝতে পেরেছিল এ স্বর প্রীতমের। প্রীতম ওর ছেলেবেলার বন্ধু। একসাথে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়ত তারা। বড় হয়ে ক্লাস সেভেনের পর আর স্কুলে যায়নি প্রীতম। গ্রামের মোড়ে বাবার সাইকেলের দোকানেই কাজ শুরু করেছিল প্রীতম। সেই প্রীতম পেছন থেকে ডাকছে। পলাশ আরও বিপদে পড়েছিল সেদিন। প্রীতম কী চাইছে? কেন ডাকছে? এই সময় ওকে কী বিশ্বাস করা যাবে? কোনও আক্রমণ করার জন্য আসছেনা তো? পলাশ আড়চোখে পেছন ফিরে দেখেছিল প্রীতম একা ছুটে আসছে। ওর পেছনে কেউ নেই। দাঁড়িয়ে পড়েছিল পলাশ। প্রীতম দেরি না করে তাকে চুপি চুপি মোড়ের এক কোণে দাঁড় করিয়ে রেখে বাবার সাইকেলের দোকান থেকে রিক্সাভ্যান নিয়ে এসে জোরে জোরে চালিয়ে পলাশকে ষ্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল সেদিন। মোড় থেকে রিক্সাভ্যানে চাপার সময় দূর থেকে গ্রামের দিকে তাকিয়ে দেখেছিল পলাশ দাউ দাউ করে জ্বলছে তাদের বাড়িটা।
সেই যে চলে আসা, আর গ্রামে আর ফিরে যাওয়া হয়নি পলাশের। শিয়ালদায় নেমে সোজা গার্ডেনরিচ চলে গিয়েছিল সে। শুনেছিল সেখানে গ্রামের অনেক মানুষ কাজ করে। রাস্তার কাজ। পাইপ লাইনের কাজ। সেখানেই সে কাজ নিয়েছিল। তারপর কেমন করে ধীরে ধীরে কেটে গেছে জীবনের বাইশটা বছর। বাড়ি আসতে চেয়েছিল। একদিন গার্ডেনরিচের বাজারে গ্রামের এক কাকুর সাথে দেখা হয়েছিল। পলাশদের বাড়ির কয়েকটি বাড়ি পরেই কাকুটির বাড়ি ছিল। ছিল তাদের দোকান। দোকানে বিভিন্ন ধরনের জিনিস পাওয়া যেত। কাকু সপ্তাহে একদিন কোলকাতা এসে মাল নিয়ে যেত। সেই কাকুর সাথে একদিন বাজারের মাঝে দেখা। পলাশকে দেখে চমকে উঠেছিল কাকুটি। সেদিনই পলাশ প্রথম জানতে পেরেছিল তার বাবা বেঁচে নেই। সেদিন বাবা মা আগুনে পুড়ে দুজনেই মারা যায়। তনুকে আর কোনোদিনই খুঁজে পাওয়া যায়নি। চোখের জল সেদিন সামলাতে পারেনি পলাশ। তারপরেও কয়েকদিন সেই কাকুর সাথে দেখা হয়েছে পলাশের। কাকু কোনোদিন পলাশকে গ্রামে ডাকেনি। তারপর এদিকে প্রায় পাঁচ- সাত বছর কাকুকে আর দেখতে পায়নি।
তারপর একদিন ফেসবুকে পলাশ একটি লেখা পড়ল। ঠিক লেখা নয়। কবিতা। শিরোনাম ‘পলাশের প্রতি’। লিখেছে রিয়া নামের একটি মেয়ে। পলাশ বার কয়েকবার পড়ল। রিয়ার প্রোফাইল খুলে সার্চ করল। প্রোফাইলে কোনও ছবি নেই। তবে কিছু পোষ্ট আর ছবি দেখে তার মনে হল রিয়াকে সে চেনে। রিয়াদের বাড়ি ছিল তাদেরই গ্রামে। পলাশের চেয়ে সে এক ক্লাস নীচে পড়ত। কিন্তু যাওয়া আসার পথে সে সবসময় পলাশকে ‘দাদা’ করে ডাকত। পলাশও প্রতিদিনের অভ্যাসে রিয়াকে দেখতে না পেলে মনটা তার কেমন শির শির করত। তো ফেসবুকে রিয়ার কবিতা পড়ে পলাশের মনে হল একবার সে গ্রামে যাবে। অন্তত একবার শেষবারের মতো নিজের শৈশবের গ্রামটিকে সে দেখে আসবে। তাতে কেউ চিনতে পারুক আর নাই পারুক।
পদ্মপুরের মোড়ে টুকটুকি থেকে নেমে কোনদিকে যাবে ঠিক করতে পারলনা পলাশ। মোড়ের আশেপাশে বেশকিছু দোতলা তিনতলা বাড়ি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির নিচের ফ্লোরে সব দোকান ঘর। আশেপাশে এদিক ওদিকে গোটা চারেক চায়ের দোকান দেখতে পেল। মোড়ের সামনের দিকে কয়েক পা এগোলে প্রীতমদের সাইকেলের দোকান। সেদিকে এগিয়ে গেল পলাশ। দেখল সাইকেলের দোকানটি আর নেই। সেখানে মোটর সাইকেলের সার্ভিসিং সেন্টার খোলা হয়েছে। দোকানে একটি ছেলে একটি মোটর সাইকেল ধোয়া মোছা করছিল। একটু দাঁড়িয়ে থেকে পলাশ জিজ্ঞাসা করল, “এ ভাই। এটা প্রীতমদের বাড়ি না?”
ছেলেটি পলাশের দিকে ঘুরে তাকাল। তারপর কেমন একটা সন্দিগ্ধ ভাবে বলল, “কে আপনি? কোথা থেকে আসছেন?”
পলাশ বলল, “বাড়ি বেশি দূরে না। প্রীতম আমার ছেলেবেলার বন্ধু । এখন আমি বাইরে থাকি। একটি দরকারে এদিকে এসেছিলাম। তাই…।”
ছেলেটি আর বেশি কথা শুনলনা। বলল, “বাবা মারা গেছে চার বছর হল। ক্যান্সার হয়েছিল। আপনার নাম কী?”
প্রীতম এবার একটু থামল। পলাশ হেঁটে এসে একটি চায়ের দোকানে ঢুকল।
পলাশের বয়স এখন পঁয়তাল্লিশ। তার মানে প্রীতম বেঁচে থাকলে তার বয়সও এখন পঁয়তাল্লিশ হত। প্রীতম বিয়ে করেছিল। সে এখনও বিয়ে করেনি। গার্ডেনরিচের পুরনো বস্তির এক কোণে দু কামরার একটি ছোট্ট ছাউনি তুলেছে। চায়ের দোকানে চা খেয়ে নিজের দিকে আরেকবার ভালোভাবে চেয়ে নিয়ে গ্রামের দিকে পা বাড়াল। প্রায় দশ বছর থেকে পলাশ দাঁড়ি কাটেনা। পলাশ লক্ষ্য করল, এখনও তাকে কেউ চিনতে পারেনি। গ্রামটিকেও পলাশ আর চিনতে পারছিলনা। এই বাইশ বছরে গ্রামের সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। কাঁচাবাড়ি বলতে একটাও নেই। একখানায় হোক আর দুখানায় গ্রামে সব এখন পাকা বাড়ি। রাস্তাও আর কাঁচা নেই। পাকা রাস্তা। কাউকেই সেভাবে চেনা যাচ্ছেনা।
যাবার পথেই রিয়াদের বাড়ি। পলাশ রিয়াদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল। রিয়াদের বাড়িও আর কাঁচা নেই। পাকা হয়েছে। তবে ছাদ এখনও হয়নি। টিনের ছাউনি দেওয়া আছে।
এখানে এসে পলাশ একটু হনহন করে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। আর চার পাঁচটি বাড়ি বাদেই তাদের বাড়ি ছিল। এখন কী অবস্থা কে জানে!
পলাশ একটু হেঁটে সামনে আসতেই ডানদিকে তাকিয়ে দেখল বড় একটা দোতলা বাড়ি। এই বাড়িটাই তো ওদের । কাঁচাবাড়ি। থমকে দাঁড়াল পলাশ। তাকিয়ে দেখল বাড়ির একদিকে একটি বড় দোকান। আরেকদিকে একটি ঘর। ঘরের বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই কাকু। যার সাথে কলকাতার গার্ডেনরিচে দেখা হত তার। পলাশ এক দু পা করে এগিয়ে বাড়টির দিকে। বারান্দা থেকে সেই কাকু পলাশকে দেখতে পেয়ে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। তারপর একটু ধাতস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কে গো তুমি? পলাশ মনে হচ্ছে। কখন এসেছ বাবা। বসো বসো।” কাকু ঘরের ভেতর থেকে চেয়ার টেনে এনে বারান্দায় বসতে দিল।
পলাশ না বসে তাকিয়ে দেখতে থাকল। দেখল আগের চিহ্ন বলতে সেরকম কিছু নেই। রাস্তার ধারের কদম গাছটা একইরকম আছে। আর বাড়ির পেছনে পুকুর পাড়ে যে শিমুলগাছটি ছোট্ট অবস্থায় পলাশ রেখে গিয়েছিল, সেটি শাখাপ্রশ্রশাখা মেলে আরও বড় হয়েছে। আর আছে পুকুরটি। তাদের নিজের ভিটেবাড়ির চিহ্ন বলতে কিছু নেই। পলাশের এদিক ওদিক ঘোরা শেষ হলে কাকুটি আবার তাকে বসতে বলল। এবার পলাশ চেয়ার টেনে নিয়ে বসে জিজ্ঞাসা করলল, “এ কী দেখছি কাকু? আমাদের বাড়ি কোথায়? এখানে তুমি বাড়ি করলে কীভাবে?”
কাকু যেন আকাশ থেকে পড়ল, “কী বলছ পলাশ। তুমি সব ভুলে গেলে! এর আগে তুমি সব বিক্রি করে দিলে না! গার্ডেনরিচে বসে। সব ভুলে গেলে?”
পলাশের মনে পড়ে গেল একদিন কাকু কী একটা অজুহাতে পলাশের কাছ থেকে ঠিকানা চেয়েছিল। পলাশ খুব সহজভাবে তার কলকাতার ঠিকানা লিখে দিয়েছিল। ঠিকানায় একটা সইও ছিল। পলাশের কিছু বুঝতে আর অসুবিধা হলনা। অসহায়ের মতো সে বাড়ির চারিদিকে তাকাল। তারপর উঠে দাঁড়াল পলাশ। কাকু বলল, “চলে যাচ্ছ পলাশ। বসো। চা খেয়ে যাও।”
পলাশ কোনও উত্তর না দিয়ে দ্রুত হেঁটে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। কী করবে, কোনদিকে যাবে, কার সাথে কথা বলবে, কে এখানে আছে কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না। মাথাটা হঠাৎ করেই যেন শূণ্য হয়ে গেল তার। এই সময় বছর দশেকের একটি বাচ্চা মেয়ে পলাশের হাতে একটি ছোট্ট কাগজের টুকরো ধরিয়ে দিয়ে বলল, “মা আপনাকে ডাকল।”
পলাশ মুড়িয়ে থাকা কাগজখানা খুলে দেখল, তাতে একটিমাত্র শব্দ লেখা, “রিয়া।”
সামান্য একটু দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভেবে মেয়েটির পিছু পিছু এগিয়ে গেল পলাশ।
একটু পরেই মেয়েটি রিয়াদের বাড়িতে গিয়ে ঢুকল। পলাশ দেখল রিয়া বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। রিয়াকে দেখে মরুভূমিতে এক টুকরো মরুদ্যানের মতো মনে হল পলাশের। শুষ্ক মুখে কোনোরকমে সামান্য হাসি টেনে এনে পলাশ বলল, “কেমন আছ রিয়া!”
“সেটা পরে হবে। আগে ঘরে এসো পলাশ দা। তোমার দিকে তাকানো যাচ্ছেনা।” পলাশকে ডেকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতরে চলে গেল রিয়া।
বাড়ির ভেতরে তিনটি ঘর। বাইরের ঘরটি বৈঠক ঘরের মতো। রিয়া পলাশকে সেই ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল। তারপর মেয়ের হাতে সরবতের গ্লাস আর নিজের হাতে মিষ্টি আর জল নিয়ে এল রিয়া। বলল, “খেয়ে নাও পলাশ দা। তোমাকে যেতে দেখেই আমি চিনতে পেরেছিলাম। তোমার এখানে কেউ নেই। তাই তাড়াতাড়ি মেয়েকে পাঠিয়েছিলাম।”—
পলাশ রিয়ার দিকে তাকাল। তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এটি তোমার মেয়ে? খুব মিষ্টি!”
‘হ্যাঁ আমার মেয়ে। বৃষ্টি। তোমার! তোমার খবর কী পলাশ দা?” রিয়া গ্লাসে জল ঢালতে ঢালতে বলল।
রিয়ার কথার উত্তর না দিয়ে সরবতের গ্লাসে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বৃষ্টির বাবা কোথায়? কী করে?”
রিয়া বলল, “ও প্রাইমারি স্কুলের মাষ্টার। বেশি দূরে স্কুল নয়। তুমি বসো। আমি ফোন করে ডেকে নিচ্ছি।”
পলাশ বুঝতে পারল রিয়া বেশ সুখে আছে। বলল, “না রিয়া। থাক। এই অনেক হল। আমি এক্ষুনি উঠব। কলকাতা ফিরতে হবে।”
রিয়া এবার জোর দিয়ে বলল, “সে কি পলাশ দা। তা কী করে হয়? তোমার চোখমুখ দেখেই মনে হচ্ছে, তুমি খুব ক্লান্ত। তোমার খাওয়াদাওয়া হয়নি। তোমার রেস্টের প্রয়োজন। তুমি এখন ঘরে রেষ্ট করো। আমি ততক্ষণে খাবার করি। খেয়ে বিকেল চারটের ট্রেন ধরবে। আর কোনো না চলবে না!”
পলাশ দেখল এখন সবে দুপুর বারোটা। ট্রেনের চার ঘন্টা বাকি! এই সময়টা এখানে কাটানো যেতেই পারে।
—
❤ Support Us








