- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জানুয়ারি ২৯, ২০২৩
বনমুরগি
অলঙ্করণ: দেব সরকার
সারা মাঠে হলুদ রঙের আবির কারা যেন ছড়িয়ে দিয়েছে , তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। আকাশনিঃসৃত রোদ নেমে এসেছে লকলকে ধানজমির আঁচলে । গর্ভবতীধান পেট উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কাতর চাহনি। নিজেকে উজাড় করে বিলিয়ে দেওয়ার এ এক অদ্ভুত বাসনা । পেটে বাচ্চা এলে নারীর শরীরে মায়াবীশক্তি ভর করে ; ভারি বুকের ঔজ্জ্বল্যে পুরুষ প্রলুব্ধ হয়, তেমনি শস্যবতী ধান থলথলে শরীরে সকলকে মোহাবিষ্ট করে, কাছে ডাকে, প্রলুব্ধ করে। আনন্দে মেতে ওঠে কৃষক আর মজুরেরা ।
ক’দিন পরেই ধান কাটার মরসুম ; কনের সাজে যেন দেবী লক্ষ্মীকে ঘরে তোলা হবে । মাঠের প্রসূতিকে কেটে কেটে রাখা হবে জমিতে।বুকের ফসলকে সোহাগি ধান নিজের শরীরে ঢেকে রাখে ; তারপরেই ঝাড়াই করে সোনা-দানা বস্তাভরে ঘরে তোলার সানন্দ কসরত । দু’দিনেই বাঁশবাতায় নির্মিত বড়ো বড়ো গোলার ‘হা’ হয়ে থাকা ইয়া বড়োপেট ভরে উঠবে। এই আশা বুকে নিয়েই দিন গোনে কৃষকরা। আনন্দধারা জড়িয়ে দিন কাটে শ্রমিক ও মালিকের।
জিতপুর মাঠের এক প্রান্তে লম্বা শালবাগানের বুকজুড়ে অসংখ্য তাঁবু পড়েছে। কালো, ছেঁড়া-মলিন পলিথিনের তলায় আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য পরিবার । ধানে রং ধরতে শুরু করলেই প্রতিবছর ওড়িষা, ঝাড়খণ্ড সীমান্তের সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকা থেকে কত মানুষ ঝাঁকে ঝাঁকে এখানে আসে, কাজের খোঁজে । গঙ্গার পূর্বপ্রান্তে বিশেষত বাড় অঞ্চলে সারাবছর দুই-তিন রকম ধান চাষ হয়। পয়সার টানে মৌমাছির মতো এখানে ছুটে আসে মানুষ । সিজনের সময়টা দু’বেলা কাজ করে তারা যা পায়, তাতে বছরের অনেকটা সময় চলে যায় । রাঢ় কিংবা বাঢ় অঞ্চলের লোকজন সারাবছর হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে দু’পয়সা বাঁচানোর চেষ্টা করে, স্বল্পমজুরির শ্রমিক হিসেবে তাদের বেশ চাহিদা, সে টানেই এতদূর ছুটে আসে। সাঁওতালরা বউ-বাচ্চা নিয়ে কাজে নামে, মজুরি কম হলেও পুষিয়ে যায় । তাদের বিশ্বাস, বউ-বিটিদের বসে বসে খেতে নেই । তারাই স্বামীর দায়িত্ব চিরকাল বয়ে বেড়ায়। ধানকাটা, ধানের গোছাবাঁধা, তড়পা করা, ধানঝাড়া কী না করে ! এমনকি ঝাড়া ধান বস্তায় ভরে গৃহস্তের ঘরে পৌঁছে দেওয়ারকাজ মেয়েরাই সামলায়। বিনিময়ে মণপ্রতি একহেটে ধান পায় । একহেটে মানে পাঁচসের বা পাঁচ কিলো । সারামাঠের ধান এক মাসের মধ্যে কেটে-ঝেড়ে ঘরে তুলে দেয় তারা ।
আলো আঁধারি ভোরে প্রবাসী শ্রমিক মাঠে নামে , কচকচ করে কেটে চোখের পলকে ধানশূন্য করে তোলে মাঠ । স্বমহিমায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা ধানকে শুইয়ে দেওয়া হয় মাটিতে, ডেলিভারির আগে যেমন প্রসূতিকে বেডে শোয়ানো হয়। তারপর পাশের জমিতে পা বাড়ায় । পিজুস হাঁসদা মেয়ে ও বউকে সঙ্গে নিয়ে ধান কাটতে এসেছে। সামনা-সামনি ওপারের জমিতে আরও কিছু শ্রমিক আপন মনে ধান কাটছে। “আবিনদ লগন লগন তি বাংবিন চালাও দাঁড়েয়াঃ কানা ? মাসে, উনকুমা মিৎটাং বীদরেয়াঃ ঋত হুড়ুক ইরচাবা কেদয়া । আবীনদ এঙ্গা -হন , মিৎটাং বীদরেয়াঃ কামি ইদিকাতে গেবিন তাঁকে কঃ আঃ সে চেৎ । পিযূষ হাঁসদা সাঁওতাল ভূমি থেকে কাজ করতে আসা বয়োঃজ্যৈষ্ঠ লোক । চুলে পাক লাগলেও শরীরে ভাঁজ পড়েনি । যেকোনো জোয়ান মানুষের সাথে সমানে কাজ করে যেতে পারে । আজ তাঁর বউ-মেয়ে কাজে খানিকটা পিছিয়ে পড়ে, সে রেগে যায়, কেননা যত কাজ তত পয়সা । পাশের জমিতে কাজের গতি দেখে জ্বলে ওঠে বৃদ্ধ, ধৈর্য্য হারিয়ে বউ-মেয়েকে ভর্ৎসনা করে । আরও জোরে হাত চালায় স্ত্রী, মেয়ে । হঠাৎ মাগো বলে বসে পড়ে সাদাইনি, পীযূষের মেয়ে। ষোল-সতেরোর ফুটন্ত কিশোরী । আদ্যন্ত কালো রঙে জড়ানো; পুরো শরীর আলকাতরার পালিশ। পিঠে চুঁইয়ে পড়ছে আলুথালু চুল, ঘনকালো মেঘে রাঙানো পিঠ। সর্ষেফুল রঙের শাড়িটায় তাকে বেমানান লাগে ; আভিজাত্যের কিছুমাত্র নেই, না রূপ, না রং, তবু কালো চামড়ার পেন্ট করা মুখের ওপর বসানো চোখদুটি অসাধারণ টানে। মন টানে বিশেষ করে আসফেরও, তাই তারিয়ে তারিয়ে দেখে, দেখে আর আনমনে দাঁত দিয়ে নখ কাটতে থাকে ; সাদাইনির চিৎকারে মনোযোগে আঁচড় পড়ে । কী হল তোমার ? বলেই একছুটে সাদাইনির পাশে গিয়ে দাঁড়ায় । দেখল, কাটা আঙুল থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে। কাটা মুরগির মতোই সাদাইনি তড়পাতে থাকে, ছটফট করে । আসফ খপ করে নিজ হাতের তালুতে সাদাইনির আঙ্গুল চেপে ধরে । সবাই থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, দেখে , কী যেন হয়ে গেল, বোঝার চেষ্টা করে । পাশের জমি থেকে কাজ ফেলে ছুটে আসে ক’জন । মায়ে হা-হুতাশ করতে থাকে, এই মিনষের জন্য বিটি খাম হল । স্বামীকে বকতে থাকে । চুপ করে থাকে পিযূষ , দোষ যে তারই । কেন যে জোরে হাত চালাতে বলল, অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনুতাপে জর্জরিত হতে থাকে, নিষ্পাপ শিশুর মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। শনশন করে বয়ে আসা বাতাস খোলা মাঠের উষ্ণতাকে কমিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে আসে। পীযূষ হাফ ছেড়ে বাঁচে, ধুতির পাড়ে কপালের ঘাম মোছে, হাতে কাঁচিটা তুলে নেয় আবার ।
শ্রমিকরা যে যার কাজে পুনরায় হাত লাগায়। মেয়ের হাত কাটা নিয়ে সাঁওতাল দম্পতির ঝগড়া দেখার সময় ওদের নেই, কাজ করতে হবে, নাহলে খাবে কী! সাদাইনির হাত ছাড়ে আসফ । গামছার পাড় ছিঁড়ে কাটা আঙ্গুলটি আলতো করে বেঁধে দেয় । মুহূর্তের নীরবতা কাটিয়ে সহানুভূতির সুরে বলে ওঠে, বিশ্রাম কর্, আজ আর কাজ করতে হবে না । চোখে চোখ পড়ায় সাদাইনির চোখ-মুখে লজ্জা ছলকে ওঠে ; টনটন করতে থাকা আঙুলের প্যাঁচে আলুলায়িত বুকের সাড়িটা টেনে তোলে উপরে ।
— কী হয়েছে আসফ? কী করছো? হামিদ মণ্ডল এলাকার নামি লোক, জমিদার। চল্লিশ-পঞ্চাশ বিঘা জমি, গণ্যমান্য। বাপের গলার আওয়াজে চমকে ওঠে আসফ। খানিকটা পিছনে সরে দাঁড়ায় । ইতস্তত করে, কোন কথাই বলতে পারে না । শরীর আড়ষ্ট হয়ে আসে , এভাবে বাপের সামনে পড়তে হবে , ভাবেনি । নির্বাক সাদাইনিও, ঘাস বিছানো আলে থপাস করে বসে পড়ে । হামিদ আর কথা বাড়ায় না, কী মনে করে সরে পড়ে পাশের জমিতে । নিস্তব্ধ মুহূর্ত কাটে কিছুক্ষণ; খসখস আওয়াজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে পুনরায়, কাঁচির ক্রোধের শব্দ, ধান গাছের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে এক নাগাড়ে । সাদাইনি আলে বসেই থাকে ; আঙুলের ডগায় দূবড়ো ঘাস ছিঁড়ে আনমনে চিবতে চিবতে উদাস হয়ে যায়। কখন আসফও সরে পড়ে অন্যদিকে, হয়তো বাড়ির পথে অথবা মাঠের আরও গভীরে ; বারবার সাদাইনিকে দেখতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে আসফ অনেক দূর পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে তাকায়। একসময় অস্পষ্ট হয়ে আসে ধান জমি, সাদাইনও।
বিকেলটা কেমন আত্মহারা হয়ে পড়ে, সন্ধ্যার সাথে দূরত্ব হারায় । নিমেষে দিনের ঝকঝকে আলো অন্ধকারে মুখ লুকায়। রাত যতই কালো হোক তার নিজের একটা আলো থাকে, চোরা আলো, তাতে নিজের সৌন্দর্য দেখা না গেলেও অনুভব করা যায়; ঠিক সাদাইনির মতো, তার কালো রঙ্গের মাঝে অনাবিল সুখ লুকিয়ে আছে, তা আর কেউ না খুঁজুক আসফ দেখতে পায় । রাতের কালকে আঁকড়ে ধরতে ধরতে কখন রাত গড়িয়ে আসে, অনেক রাতে বাড়ি ফিরে সে । শালবাগানের তাঁবুগুলো ততক্ষণে ঘুমের অতলে হারিয়ে গিয়েছে।
আঁধারের পেট চিরে দিনের আলো মাথা বের করার আগেই ওরা ধান কাটতে মাঠে নামে আবার। মাঠের ধান উদরপূর্তির উপযোগী হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখির মতো, বনমুরগির মতো, ডাহুকের মতো শ্রমিকের আনাগোনা বাড়ে । মাঠ জুড়ে রুকু হয়ে ওরা নিরলস ধান কেটে চলে, ছায়া ছোটো হতে হতে উল্টে পড়ে পিছনে আবার লম্বা হয়ে ওঠে, শেষে মিশে যায় সাঁঝের আঁধারে । আজও পিযূষ বউকে নিয়ে ধান কাটতে আসে , আসেনি সাদাইনি। একদৃষ্টিতে ধান কাটা দেখে আসফ,নিজের কাজ দেখে-বুঝে নিতে হবে যে, কিন্তু মন বসে না ।উদাস উদাস লাগে , গতকালের কথা গুনগুন করে ভেতরে । মেয়েটির হাতের ব্যথা কি কমেনি ! পিযূষকে জিজ্ঞেস করবে ভাবে, পারে না, পরের মেয়ে নিয়ে জানতে চাওয়াটা কেমন বেয়াদপের মতো দেখায় যে, ভাবে আর মন ভারি হয়ে আসে; কে, কী ভাববে তার ঠিক আছে ! ওদের কাজ করতে গিয়েই না…। ওষুধ কিনে দেওয়া উচিৎ ছিল । রাতে গিয়ে একটিবার খোঁজও নেওয়া হল না , কেমন মনিব সে ! ছিঃ ছিঃ , আমি কী নিষ্ঠুর ! অনুশোনায় দগ্ধ হতে থাকে আসফ । দাঁড়িয়ে থাকতে আর ভালো লাগে না । মাঠের আল ধরে হাঁটতে থাকে । দূরের মাঠে প্রায় জমিই তখনও হলুদ কাপড়ে জড়ানো, গাঢ় হলুদ রং ফনফন ফনফন করতে থাকে। আনমনে চলতে চলতে ‘ফস ‘আওয়াজ শুনে চমকে ওঠে। এক লাফে খানিকটা পিছনে সরে পড়ে । একটি মোটা ‘খরিস’ ক্যালব্যাল করে পালিয়ে যায় ফাঁকা জমির মাঝ বরাবর । দুয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস ফেলে আসফ, ভয়ে, আতঙ্কে ; আনমনে হাঁটার জন্য আপন মনে গজগজ করতে থাকে। আবার হাঁটতে থাকে।
মাঠের রাস্তা পেরিয়ে কখন মাঝপাড়ার পিচ রাস্তায় উঠে এসেছে, খেয়াল করেনি। এই সময় চোখে পড়ে, সাঁওতালদের ছোটো ছোটো তাঁবুগুলো,কেমন ড্রামলিনের মতো সারিসারি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মনে হল, মেয়েটির সঙ্গে একটিবার দেখা করে গেলে বড্ড ভালো হত। খোঁজ নেওয়াটা দরকার। অনামিকার তাঁবু খুঁজে বের করাটা কি সম্ভব ! ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখে পড়ে, তাঁবুর খাঁজে খাঁজে কয়েকটি বাচ্চা খেলা করে বেড়াচ্ছে । ঠিক খেলা নয়, তীর ধনুক দিয়ে, শালবাগানের ডালে ডালে বসে থাকা পাখি মারছে । একজনের হাতে একটা পাখি, বেচারা তড়পাচ্ছে । তাদের চিৎকার ও হুল্লোড়ের আওয়াজ ধেয়ে এসে জাপটে ধরে আসফকে ।
—এই ছেলে , এখানে পিযূষের তাঁবু কোনটা বলতে পার ?
— সাদাইনি দিদিদের তাঁবু ? ছেলেটি প্রতিপ্রশ্ন করে ।
মেয়েটির নাম সাদাইনি বোধহয় , আসফ ভাবল । ভাবনা আর বাড়ায় না , বলে, হ্যাঁ । ওইখানে , আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ছেলেটা আবার শিকার খেলায় ডুবে যায় । এক পা এক পা করে এগুতে থাকে আসফ, সব তাঁবুই ফাঁকা, জনশূন্য, কেমন খাঁ খাঁ করে । এই সময়টা বড়োরা মাঠে ধান কাটে কিনা , বাচ্চারাও এখান- সেখানে, খেলা করে, ঘুরে বেড়ায় । হঠাৎ এক তাঁবু থেকে খ্যাক খ্যাক কাশির আওয়াজ ভেসে এল, কোনও মেয়ের গলা । অপরিচিতা একজন মেয়ের সাথে কী ভাবে কথা বলবে! বুঝতে পারল না। ঘরে কোনও পুরুষ মানুষ নেই , এই সময় এক জন মেয়ের সাথে কথা বলাটা কেমন হবে, তারওপর জায়গাটা কেমন নিরিবিলি ! একবার সাদাইনি বলে ডাক দিই, ভেবেই সাহস হারায়; কণ্ঠনালি কেমন আড়ষ্ট হয়ে আসে, সাদাইনি যদি অন্য মেয়ের নাম হয় ! ঘুরে পালাবে তাও পারে না । মাটি পা’দুটোকে কামড়ে ধরে । কে কী ভাববে! আব্বা জানতে পারলে কী বলবে ! অকয় কুয়া হেজ এনাম ? অর্থাৎ কুয়া এলি? মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল , অর্থ না বুঝলেও নিশ্চিত ওই মেয়েটির গলা । তবু বুক ধড়াস করে উঠে । তাঁবুর শেষ প্রান্ত থেকে পুরুষ মানুষের গলার স্বর ধেয়ে আসে, থতমত খায় আসফ, কোথা থেকে কী ঘটে, শেষে বদনাম কুড়োতে হবে নাকি! চোরের মতো পা টিপে টিপে সরে পড়ে সে ।
সকালের হালকা আলোয় প্রকৃতি চোখ মেলেছে সবে । যে যার কাজের দিকে ছুটছে। মাছ কিনতে যাওয়ার পথে আসফ থমকে দাঁড়ায়। জিতপুরের শালবাগানে একদল বাচ্চা ছেলেমেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, হাতে তিরধনুক। কারও হাতে লগা, লগার মাথায় ধারাল বর্শার মতো ফলা। বেশ নজর কাড়ে, ব্যাপারটা দ্যাখার জন্য আসফ সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়ায় । এই সময় চোখে পড়ে, ওই মেয়েটি, হ্যাঁ সাদাইনি । সঙ্গীরা এই নামেই ডাকছিল । হাঁটু পর্যন্ত ঝুলসাড়ি, আলুথালু চুলে, লাল ফিতে বাঁধার চিহ্ন। আঁচলের কাপড় কোমরে গুঁজে আলগোছে দৌড়ায় । সামনাসামনি পড়তেই চমকে উঠে আসফ, ভয় পায় না, সাহস যোগায় মনে। দাঁড়িয়েই থাকে, ফ্যালফ্যাল করে তাকায় । বাচ্চাদের হৈহুল্লড় ছাপিয়ে ঘনিয়ে আসে সাদাইনির দৃষ্টি, নিষ্ঠুর পলক, আসফকে ক্ষতবিক্ষত করে, কেমন দুমড়ে মুষড়ে শেষ করে দেয় । একপা একপা করে কখন ওদের কাছে ঘিষে যায়, বুঝতেই পারে না । এইসময়, একটি বনমুরগি তিরবিদ্ধ হয় , ক ক করে ককিয়ে ওঠে । চমকে ওঠে আসফ, দেখে, বনমুরগিটিকে ধরে নিয়ে একজন কাপড়ের ব্যাগে ঢুকাল তারপর সোৎসাহে ছুট দেয় আরও ভেতরে, গাঢ় জঙ্গলে, যেখানে সপরিবার বনমুরগি বাসা গেড়ে আছে । এই সময় বন শ্যাওড়ার কাঁটায় সাদাইনির কাপড় আঁটকে যায় , আঃ করে ওঠে, সামনে আসফ, মিটমিট করে তাকায়। আসফ একদিন গামছা ছিড়ে সাদাইনির হাত বেঁধে দিয়েছিল, মনে পড়ে, মুচকি হাসে, হাসি লুকতে আঁচলে মুখ ঢাকে,লজ্জিত দৃষ্টিতে তাকায় । কী করবে বুঝতে না পেরে মাথা নীচু করে এক দৌড়ে বেরিয়ে যায় । আসফ তাকিয়ে দ্যাখে; মনে হয়, একটি বনমুরগি আসফের হাতের নাগালে এসেও ছুটে পালাচ্ছে । ছুটতে ছুটতে হারিয়ে গেল দূরে, অনেক দূরে ; জঙ্গলের ঝোপের আড়ালে । যেখানে বনমুরগির দল জলার ধারে শুকনো খড়, বিচুলি সাজিয়ে বাসা বাঁধে, স্বপ্নের বাসা । এখন ধানের মরসুম , পাকা ধানের দানা খেয়ে ওরা সুখে দিন কাটায়, ডিম পাড়ে ,ডিমে তা দেয়, বাচ্চা তোলে, ধান ফুরিয়ে গেলে আবার এলাকা ছেড়ে অন্যদিকে চলে যায় । পিছে পিছে আসফ কখন সাদাইনির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে , বাকিরা, কোমর জল পেরিয়ে শুকনো কাশবনের ধারে বনমুরগি খুঁজতে শুরু করে । ইঞদ দাঃ রে বউঞা আঁড়গনা ,ইঞদ অড়াঃতেঞ চালাঃ কানা আপেগে সেনঃপে– তোরা যা, আমি জলে নামব না, বাড়ি চললাম। কথাটি বলেই সাদাইনি পিছে সরতে যায়, আর আসফের বুকে ধাক্কা খায়, ইস ! বলে সরে পড়তে চায়, এই সময় আসফ খপ করে হাতটা চেপে ধরে । সাদাইনিও কেমন কুচকে যায়, বর্শায় বিঁধে যাওয়া বনমুরগির মতো; পালিয়ে যাওয়ার বৃথা চেষ্টা করে না । নীরব মুহূর্ত কাটে, সাহস বাতাস জমে ওঠে বুকে, কিছু বলবেন ? জিজ্ঞেস করে ।
— পাখি ধরে কী হবে ?
— কাল সহরায় আছে , কুটুমদের মাংস করে খাওয়াব। আপনি বনমুরগির মাংস খান না ?
— না, আমি কোনও মাংসই খাই না ।
— কেন ? ভালো লাগে না ?
— না , কাউকে কষ্ট দিতে আমার ভালো লাগে না ।
—তাই বুঝি ? তাহলে এই যে আমার হাতটা চেপে ধরে আছেন তাতে আমার কষ্ট হচ্ছে না ?
— ওহ, বলেই হাতটি ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ায় আসফ । হিহি করে হাসে সাদাইনি ।
— তবে তুমি রান্না করে দিলে মাংস খাব, বলেই জিভ কাটে দাঁতে । খিলখিল করে হেঁসে ওঠে সাদাইনি । হাসি থামিয়ে বলে, আচ্ছা, কাল আসুন তাহলে বনমুরগি রান্না করে খাওয়াব ।
— সত্যিই আসব ?
— হুম, আমাদের পরবে আপনাকে আসতে হবে। আসবেন তো ?
হঠাৎ একদল ছেলে-ছোকড়া হৈহুল্লড় করে ছুটে আসে বনের দিকে, যেখানে সাদাইনি আর আসফ দাঁড়িয়ে আছে। সবার হাতে বনমুরগি। কী একটা বলতে গিয়ে আর বলা হয় না, সাদাইনিকে চলে যেতে হয় । অনেকদূর গিয়েও ফিরে ফিরে তাকাতে থাকে ।
সাঁওতালদের প্রধান উৎসব সহরায়, মূলত চাষের সহযোগী গরু-মোষের মঙ্গলকামনায় অনুষ্ঠান পালিত হয় । অনেকে পাঁচদিন ধরে এই উৎসব করে থাকে । প্রথমদিনে ঘড়বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়, তারপর ঘট পুজো। কলা,বাতাসা,ফুল দিয়ে। পাড়ায় বেরিয়ে গোয়ালে গরু- মোষকে সিঁদুর দিয়ে, ফুল-মালা দিয়ে সাজানো হয়। নানা ধরনের আওয়াজ করে, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ছেলেরা আনন্দ জোগায় পোষ্যদের। এরপর দেবতার নামে উৎসর্গ করা হয়, মুরগি, পাখি ,কবুতর । যে যেমন পারে, সাদাইনিরা মুরগি কিনতে পারে না, তাই বনমুরগি ধরে দেবতার নামে উৎসর্গ ক’রে পুজো করে । এভাবে আরাধ্য দেবতাকে তুষ্ট করে সকলের জন্য মঙ্গল কামনা করা তাদের দীর্ঘদিনের রেওয়াজ।আনুষ্ঠানিক আচারের শেষ পর্বে মৃত ব্যক্তিদের উদ্দ্যেশ্যে হান্ডিয়া উৎসর্গ করে, পরে তা অতিথিদের পান করিয়ে নিজেরা পান করে এবং মনের সুখে নাচগান , আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকে। সারারাত তুমদাঃ, টামাক, ঘণ্টা, রেগড়া প্রভৃতির তালে তালে সাদাইনিরা নাচে । সমবয়সী কিশোরিরা লালপেড়ে সাদা সাড়ি পরে, গলায়, হাতে নানা রঙের চুড়ি, মালা পরে সেজে নাচে । সারিবদ্ধ হয়ে ওরা গায়তে থাকে—
“ মড়ে সিঞ মড়ে ঞিদা কুলহি রেগেঞ তাঁহেনা।।
দাঃদ নায় দাঃদ নায় তেতাং কিদিঞ। ”
আসফ গিয়েছিল সহরায় অনুষ্ঠানে । সাদাইনির নাচ-গান দেখতে দেখতে হাড়িয়া খেয়েছিল সেদিন, খেয়েছিল বনমুরগির মাংস । অনেক রাতে নাচ-গান শেষ হয়, সাদাইনি আসফকে বাড়ি যেতে বলে, বেহুঁশ হয়ে থাকা আসফ কেমন টলে বেড়াতে থাকে । কীভাবে কখন বাড়ি যায় সে নিজেও জানে না । এসব ঘটনা হামিদের কাছে চাপা থাকে না ।
আসফ আর কলেজ যায় না। পড়ার বই গুটিয়ে ফেলেছে। আজ বাড়িতে এক ঝড় বকা খেতে হয়েছে । বাপের একমাত্র ছেলে পড়াশোনা করবে , তা হল কই ! খালি মাঠে মাঠে ঘুরে । বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় । ওকে কে মাঠের কাজ করতে বলে ! খালি খালি বুন্যার মতো ঘুরে বেড়ায়, বাপ আপশোস করে । ছেলেকে বাগে আনতে পারে না, গালমন্দ করে। পাড়ার লোকে বলে, একখান ছেলের মতো ছেলে পায়ছে হামিদ । মাঠের সব কাজ একলাই করে, বাপকে ভাবতেই হয় না !
সে’দিন শূন্য হয়ে আসা ধানের জমিতে মশারি পেতে একটি বনমুরগি ধরেছিল আসফ, তার হাতে বনমুরগি দেখলে খুব খুশি হবে সাদাইনি, ভেবে খুব আনন্দ হচ্ছিল। সকাল সকাল মশারিসমেত মুরগিটি নিয়ে শালবাগানের দিকে হাঁটা ধরে । মাঠ থেকে সামান্য দূরে তাঁবু খাটান সাঁওতালপাড়া ধুধু করা মাঠের প্রান্ত থেকে দেখা যায় অনায়াসে। আজ কেন যেন অনেক দূর মমে হয় তার; তাই দ্রুত পৌঁছাতে মরিয়া হয়ে জোরে জোরে হাঁটতে থাকে । একরকম দৌড়াতে থাকে আসফ, নিষ্পাপ কিশোরি কাঙ্ক্ষিত পাখি হাতে পেলে কী রকম উল্লোসিত হয়ে উঠবে, তা ভেবেই আহ্লাদে সে গদ্গদ হয়ে ওঠে। শালবাগানের কোলের ওপর কালো কালো তাঁবুগুলো ছোটো হয়ে আসছে । মায়ের কোলে লুকিয়ে থাকা বাচ্চা যেমন লুকোচুরি খেলে ঠিক তেমনই, তাঁবুগুলোও নিজেকে আড়াল করতে লাগল । আরও কাছে এগিয়ে এলে বুক ধড়াস করে ওঠে , তাঁবুগুলো গেল কোথায় ! ততক্ষণে শেষ তাঁবুটির বাঁশ-বাতা-পলিথিন খুলে ফেলা হয়েছে । এক রাতের মধ্যে ক্ষণস্থায়ী সাঁওতালপাড়াটি জনশূন্য হয়ে গেল। মাঠের ধান শেষ হওয়ার সাথে সাথে তারাও কাজ হারিয়েছে ; এখানে বসে থাকলে জমানো পয়সাটা শেষ হয়ে যাবে। অন্যকোথাও, অন্যকোনও এলাকায় কাজের সন্ধানে ওরা বেরিয়ে পড়েছে, সেখানে আবার তাঁবু গড়ে উঠবে ।
আসফ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, নিস্তব্ধ মুহূর্ত কাটে, একে একে তাঁবুগুলো উঠে গিয়েছে কোথায় কে জানে ! পরিচিত মুখ চোখের আড়ালে চলে গেলে কেমন মনটা খাঁ খাঁ করে, তেমনি মন পুড়ে পুড়ে খাঁক হয়ে যায়। সাদাইনি একটিবার জানাল না ! একটি নিষ্পাপ জাতি, মানুষের কাজের যোগান দিয়ে যায় চিরকাল, অথচ সামান্য পয়সায় সন্তুষ্ট হয়েই জীবন কাটিয়ে দেয় । নদীর বহমান জলের মতো, চিরকাল বয়ে যায়, বয়ে নিয়ে চলে দু’পাশের জঞ্জাল, আবর্জনা । তারপর আদৌ মোহনা পায় কিনা কে জানে ! আসফ হাঁটতে হাঁটতে কখন মাঠের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারেনি । হঠাৎ মনমুরগির ক ক আওয়াজে চমকে ওঠে, সম্বিত ফিরে পায় , হাতে মশারির মধ্যে বনমুরগিটি ছটফট করে, স্বাধীনতা পাওয়ার আর্তি তার কণ্ঠে, মুহুর্মুহু ক ক করে চলে । সামনে শূন্যমাঠের ওপরে তুলোট মেঘের ঘনঘটা , পুরো আকাশ আছড়ে পড়ে খালি মাঠে ! কী মনে হল, মশারির ভেতরে হাত গলিয়ে বনমুরগিটি বের করে আসফ, মুরগিটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, তার গায়ে হাত বোলাতে থাকে। একসময় ধাঁ করে ওপরে হাত ছুঁড়ে মুক্ত করে দেয় , সঙ্গে সঙ্গে ফড়ফড় করতে করতে ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে উড়ে যেতে থাকে বনমুরগি, মনে হল সাদাইনি চলে যাচ্ছে, অনেক অনেক দূরে , হাতের নাগালের বাইরে।
♦♦♦—♦♦♦♦♦♦—♦♦♦
❤ Support Us







