- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ৩, ২০২৫
স্বগতোক্তির আয়না থেকে
চিত্রকর্ম: নীলোৎপল ভট্টাচার্য
কোথাও অন্ধকার নেই। অথচ একদিন, এই যে হাহুতাশ সমস্ত ক্রিয়াশীলতাকে গ্রাহ্য না করার একটা চেষ্টা, কি দিচ্ছে আমাকে ? আমার ক্ষোভ বা মরিয়া হয়ে ওঠাও কি ক্রিয়া ? কি বলে ব্যাকরণ ? মুল বিষয় হল আমি কি পাচ্ছি। হ্যাঁ আমি এখন পাচ্ছি ঝকমকে সব দিন আর ফটফটে রাত। না না, চাইছি না। রোজ রোজ কত ক্রিয়ার সমাপতন যেখানে, সমস্ত শোক পুড়িয়ে ফিরে যাওয়া যেখান থেকে, সেই স্থবিরতার তো অন্তত নিজস্ব একটা হেঁশেল দরকার। সে দুটি ফুটিয়ে খাবে, ফলিয়ে নেবে পছন্দের ডানা। ‘দিতে হবে, দিতে হবে’দের ও আর দেখি না তেমন। সুযোগ বুঝে যে ঝাণ্ডায় উঠে বসবো সে উপায়ও নেই। এখন তো যাহা পাই তাহা বদান্যতায় পাই। ‘জেলুসিল’ ঢেকুরে তাই এখন বড় প্রশান্তি। ‘তবুও তো’– বলে কি যে কলসির কানা না দেখার সারল্য। ঘুরে ফিরে সেই ‘ছিল’ আর ‘নেই’ এর মধ্যে আটকে পড়া লাট্টু। পাক খাও, জিরোও, আবার পাক খাও। তা বেশ খাচ্ছি। কিন্তু এই যে গা থেকে রোজ একটু একটু জামা কাপড় খুলে খুলে পড়ছে, তার কি হবে ? ‘আহা ,কুকুর বলে কি মানুষ না’ ভাবা যায়, আর আমার বেলা একি জুলুম ? শেষে কি ন্যাংটো হয়ে –
বছর দু’এক আগে একটা ছোঁড়া ডুমুর গাছের নিচে গাঁজা খেয়ে কি এক বই পড়ছিল। সবে দিবানিদ্রার ঝিমুনি এসেছে, ছোঁড়াটা জোরে জোরে পড়তে শুরু করলো, ‘আজকাল শ্মশানে ভয় থাকে না। দোলনা থাকে’। কানটা আটকে গেল, এ তো দেখি আমার কথাই বলছে। সত্যি কথা বলতে কি ওই ভয়, ভক্তি যে একটু থাকুক তা আমিও চাই। ওই ছবি বিশ্বাস মার্কা বাবাদের মত আর কি। আমার ওইটুকুই। আমার সঙ্গে ওই যে তেনারা থাকেন, ভয় বলুন, আর ভক্তি বলুন আসলে সবটাই তারা পান। তেনাদের বাজারও আর তেমন নেই । কাজেই আমাকে আর কে পাত্তা দিচ্ছে। বর্ষা এলে এক মাসের মধ্যে ঝোপঝাড়গুলো বেশ জাঁকিয়ে বসে। আড়াল দেয়। ভেজাভেজা বুনো গন্ধ বলে ‘খানিক নাও, খানিক তুলে রাখো।’
এখন বসন্ত। ঝোপঝাড় শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে। ফ্ল্যাটবাড়ি এগোতে এগোতে প্রায় গায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। পাশের চওড়া পিচরাস্তা দিয়ে মাংস কিনে বাড়ি ফিরছে অসুখ পুষে রাখা সুখী মানুষের দল। আর আমার আবডাল খসে যাওয়া শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছে বিকেলের নরম গা ধোওয়া বোধটুকু। রহস্য হীন প্রেমিকার মত উপেক্ষা জড়ো করছি, আর নিজেই নিজের প্রহরী হয়ে জেগে থাকছি। আধপোড়া চিতাকাঠে লেগে থাকা জীবনের গল্পগুলো বারবার শুনি। এ এক প্র্যাকটিস, মনে রাখার।
জোট বাঁধা মানেই একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস। শিকার, কৃষি, সমাজ, জন্ম, মৃত্যু। সেখানে কি আমি নেই ? এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমি ঠিক কাদের মত হব ? কোন ভাষা আমার ভাষা হবে ? এসব বলছি বটে, কিন্তু যা সব দেখছি ‘তা বটে, তা বটে’ না বলার পরিণাম। মোদ্দা কথা দেবার মত আমার আর কোন ভয় নেই। বরং বাইরের ভয় ঢুকছে আমার অন্দরে। স্যাঁতস্যাতে, আঁশটে নয়। জুজু টাইপও নয়
বড় বেশি কথা বলে আলো। স্তর খোলে, ভাঁজ খোলে, খোলে প্রবণতার প্রিয়তা। তাই নিস্বঃ নিস্বঃ বোধ। সোঁদাগন্ধ নেই। ছোট্ট বাঁশের ঝোপ, একটা নিম, বেল, দুটো শিরিষ, কাঠচাঁপা আর ধুতরো, আকন্দ। আকন্দ বেশ ফুল দিচ্ছে। ঝুরি নামা বাঁধানো বটগাছটাই যেটুকু রহস্য ধরে রেখেছে। চিতা নেভানো ভেজা ছাই এখন বেশ ফুরফুরে। পাতায় পাতায় খুব ওড়াউড়ি। হয়ত অনিশ্চয়তার গল্প বলে। পাতারা কি তখন হলুদ জমাতে বসে ? ঠিক বুঝি না। এটুকু না বোঝা থাক ওদের জন্য।
দূরের মাঠ পেরিয়ে সন্ধ্যে আসতো। দেখতাম। মনে হত পৃথিবী বিশ্রাম নিতে আসছে এখানে। আলোর ঘাম মাখা বাদামি সময়কে কাছে টেনে নিতাম। আর মাঠ নেই। কোন বিস্তৃত দেখা নেই। ফ্ল্যাটবাড়িগুলো থেকে চৌকো জীবন গড়িয়ে নামে। পঞ্চায়েত এলাকা। জঙ্গল কেটে হাউজিং কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে। এখন আমার অবস্থান স্বাভাবিক ভাবেই অস্বস্তিকর। চারপাশে গড়ে ওঠা বসতি থেকেও আপত্তি। মড়া পোড়ার গন্ধ আর ছাই দূষণ ছড়ায়। যদিও এ শহর কারখানার ছাইএ প্রায় ঢেকে থাকে। প্রযুক্তির ছাই, লোকে বলে ‘ডাস্ট’। এবার আমি যদি বলি তার বেলা ? তখন নিশ্চয়ই বলবেন ‘কেন মশাই দশ বছরের ভুল বললেই চৌত্রিশ বছরের কথা তুলছেন ? গুজরাত বললেই..। বলতে হবে। আপনিও তো ওদের মতই হলেন।’ ওরা মানে দল। দল মানে জোট বাঁধা। জোট বাঁধা মানেই একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস। শিকার, কৃষি, সমাজ, জন্ম, মৃত্যু। সেখানে কি আমি নেই ? এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমি ঠিক কাদের মত হব ? কোন ভাষা আমার ভাষা হবে ? এসব বলছি বটে, কিন্তু যা সব দেখছি ‘তা বটে, তা বটে’ না বলার পরিণাম। মোদ্দা কথা দেবার মত আমার আর কোন ভয় নেই। বরং বাইরের ভয় ঢুকছে আমার অন্দরে। স্যাঁতস্যাতে, আঁশটে নয়। জুজু টাইপও নয়। খটখটে এবং বেশ পালোয়ান গোছের। আমাকে ঘিরে পার্ক তৈরী হয়নি। তবে অদৃশ্য দোলনাটা আছে। মানে ওই দোদুল্যমান অবস্থা। যাওয়া আর আসার মাঝে এক ঝুলন্ত অস্তিত্ব।
গণতান্ত্রিক দেশ। ‘বাকস্বাধীনতা’, ‘শোষণ’, ‘সংগ্রাম’ এসব শব্দ ঘুরে বেড়াতো ঝোপে ঝাড়ে। কত ঝোলাওয়ালা লোক আসতো। বলতো, ‘এ হল সংগ্রামকে পরিচর্যা করার জায়গা। খানিক নীরবতা নাকি তাদের চিন্তাকে আরও পুষ্ট করে তোলে।’ সেদিন সব বুঝিনি। আজও কি সবটা স্পষ্ট ? ওই যে মন্দিরের সামনে সাইকেল রেখে যে লোক দুটো বটগাছটার নিচে বসলো তাদের সব কথাও কি আমি বুঝি ? ওদের তর্জনীতে ভোটের কালির টাটকা ছাপ। ওদের পায়ের নিচের মাটিতে একটা টাইলসে লেখা,
আমাদের আদরের শেরুর আত্মার শান্তিকামনায়
তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে
আমরা সবাই
জন্ম- ২৮ শে এপ্রিল ১৯৯৪
মৃত্যু- ৮ই জুন ২০০৪
শেরু যখন চিতাকাঠে ঢেকে যাচ্ছিল তখন ওর দশ বছরের শরীরটাকে যেন গ্রহণ করতে চাইছিল না সব আয়োজন। আমার এই আপাত নিরাসক্ত বোধও যেন বিদ্রোহ করে উঠেছিল। পৃথিবী যাকে ঠিকমত গ্রহণই করলো না কে এই চলে যাওয়া ? এভাবেই কত প্রশ্ন বেড়েছে। তারা ভোঁতা হয়েছে। এখন অনীহা এসে সরিয়ে দেয় সেইসব ঝুলন্ত অস্বস্তিদের। টাইলসে চোখ পড়তেই ওই বিধান নামের লোকটা বলছে, ‘দেখতে দেখতে পনেরো বছর হয়ে গেল বল’। বিধানের ঝুঁকে পড়া দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে সঙ্গী কার্তিকের উক্তি, ‘শেরুটা চলে যাবার পর ওদের সংসারটাই ভেসে গেল। বাপ মা ও মরে গেল। ছোট ভাইটার এখন কি দশা।’ ‘হুঁ, আর সংসার। নে আজ ভালো চাট পাইনি।’ সন্ধ্যে গাঢ় হচ্ছে। প্লাস্টিকের গ্লাসে ঢালা সস্তা বাংলা মদের গন্ধ থোকা থোকা অন্ধকারে হৈহৈ করে উঠলো। যেন ওরাও নেশার জন্য অপেক্ষা করছিল। ‘শেরুর ভাইটার এইবার কি হবে ?’ ‘কি হল আবার ?’ ‘শুনিসনি ? ইস্কুল তো দু’মাস বন্ধ থাকবে। মন্ত্রী বলে দিয়েছে। ওই মিড-ডে মিলই তো ভরসা ছিল। কি খাবে ছেলেটা ? ওই রমা কাকী বলছিল।’ ‘থাম দেখি ওইসব শুনতে চাই না বলেই তো এইখানে সেঁধিয়ে থাকি। সারাদিন সাইকেলে দোকানে দোকানে মাল দিয়ে আর বাড়ি ঢুকতে ইচ্ছে করে না। অভাবের গল্প আর শোনাস না তো। আর ওই নেতা মন্ত্রীদের কথা শালা যত না শোনা যায় ততই ভালো।’ ‘শুনবি না ?’ ‘শালা না শুনে বাঁচবি ? ভোটও তো দিয়ে এলি।’ ‘না দিয়ে কি করবো, ওরা বলছে ভোট না দিলে কার্ড নাকি বাতিল হয়ে যাবে। তখন তো আরও ঝামেলা। তুইও তো দিলি।’ ‘শোন, কিন্তু কাউকে বলবি না, আমি দুই দলের কাউকে ভোট দিইনি। নোটায় দিতে পারলে ভালো হত, কিন্তু কি সব ঝামেলা আছে। খানকির ছেলেরা ধরে ফেলত। তাই জোড়া গাছে দিয়েছি।’ বিধান একটা ফিচেল হাসি ছড়িয়ে বলে, ‘সত্যি বলতে কি আমিও তাই। বৌকেও তাই দিতে বলেছিলাম।’ ‘ঠিক করেছিস। সব শালা সমান। এ নকুলদানা খাওয়াচ্ছে, ও বলছে ঘর থেকে টেনে টেনে মারবো।’ ‘ঠিক বলেছিস। সব হারামী। টিভি খুললেই দ্যাখ কেমন কুত্তার মত কামড়া কামড়ি করছে। হিন্দু মুসলমানের মারামারির ট্রেনিং দিচ্ছিল, এখন আবার এখন আবার রাম দুগগার মধ্যে লড়াই বাধাচ্ছে। দেবতারাও শান্তিতে থাকতে পারবে না এই শালা নেতাদের জ্বালায়।’ ‘দে মা সব শালাদের নিবংশ করে দে।’ ‘কেউ মরবে না। ওই দ্যাখ ‘ফনী’ ঝড়ও ঘুরে গেল। পশ্চিমবঙ্গে ঢুকলই না।’ ‘আরে ঝড় এলে তো আমরা মরবো। ওরা মরবে ?’
ওদের মাথাগুলো বটের গুঁড়িতে হেলান দিয়েছে। মন্দিরের আলো জ্বলে গেছে অনেকক্ষণ। ঘণ্টার শব্দ শোনা যাচ্ছে। একটা দলছুট গরু এখনও ঘুরে ঘুরে কি খেয়ে যাচ্ছে কে জানে ? উচু ফ্ল্যাটবাড়ির আলো চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। নতুন পাতার আড়াল খুঁজে নিয়েছে পাখিরা। বিধান ও কার্ত্তিক দুজনেই আধশোয়া। প্রসাদ হাতে পুরোহিত এসে ওদের ঠেলে তুলে দিচ্ছে। প্লাস্টিকের গ্লাসে নিজেও ঢেলে নিচ্ছে। ‘জয় মা’ বলে একবারে ঢেলে দিচ্ছে গলায়। প্রসাদী সন্দেশ খেয়ে ওদের নেশা চড়ে যাচ্ছে। বাইরে সাইকেলে রাখা সংসারের টুকিটাকি ক্রমশ ঘেমে উঠছে। রাত বাড়লে নেশা হাল্কা হলে ওরা উঠে যাবে। পড়ে থাকবে ওদের ফিরে আসবার প্রতিশ্রুতি। শঙ্করপুর গ্রামের দরিদ্র বুড়োবুড়ি মরলে তবেই এখন আমার কাছে আসে। তাও বছরে দু’চারজন। গ্রামবাসীরা বলে ‘আর দু একজন, এরপর আর কেউ আসবে না।’ পাশের কাঠের ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় ভাঁটা পড়েছে অনেকদিন। তবে যত লরি এসে দাঁড়ায় তাতে মনে হয় ওদের ব্যবসা আর চিতাকাঠের উপর নির্ভর করে না। কাঠচেরাইয়ের শব্দও প্রমাণ করে সাফল্যের। আমার সাফল্য কি প্রতিদিন না নেভা চিতার রিলে রেসে ? আচ্ছা, ভাবনাটা কি শকুনগন্ধী ? খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে যাবার দীর্ঘস্থায়ী কুফল সম্পর্কে আমার কি কিছু বলা উচিৎ ? এসবের উত্তর যখন পাওয়া যাচ্ছে না তখন আমি বরং নশ্বরতার গেরুয়া পাঠে মগ্ন হই। দলবদ্ধ গেরুয়ার অবশ্য অন্য গ্ল্যামার আছে। রমরমিয়ে চলছে তার কাজ কারবার। এই যেমন আমি যখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছি তখন কিন্তু ফ্ল্যাটবাসীদের প্রণামী বাড়ছে মন্দিরের বাক্সে। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুরোহিত মায়ের জাগ্রত মহিমার কথা জানাচ্ছেন। প্রোমোটারের বউ স্বপ্নে দেখছেন মাকে। পুজো পাঠাচ্ছেন নিজের অবস্থানকে সম্মান দিয়ে। পুরোহিত বলছেন ‘এই স্থান মহাসাধনার স্থান। তান্ত্রিক প্রণবানন্দ এইখানে সাধনা করে শিব পেয়েছিলেন। তারপর সাধারণ মানুষদের দর্শনের জন্য এই মন্দির নির্মাণ করেন। সময়ের ভিত্তিতে আমি মন্দিরের চেয়ে প্রাচীন। অবশ্য সেই প্রাচীনত্বের জন্য কিছু দাবী করছি না। জন্ম বা খুব ছোটবেলার স্মৃতি তো মনে থাকার কথা নয়। তবে পুরোনো সেই দিনের কথা মানেই প্রিয় নির্জনতা। রহস্যে মোড়া কত আড়ালকথা। চারদিকের জঙ্গলের রহস্য বা ভয়কে অতিক্রম করে মানুষ সাধারণত এদিকে ঘেঁষতো না। একটা বড় ডোবা ছিল। সেই জলেই চিতা নিভতো। সেই জল এখন সরতে সরতে অনেক দূরে চলে গেছে। প্রায় রোজই চিতা জ্বলতো। পাশের হসপিটালগুলো থেকে বেওয়ারিশ লাশ আসতো। দূর থেকে খুন করে ফেলে যাওয়া হতো। আর কত ছাই হওয়া জীবনের গল্প। এত যে নিথরতা, পচন, মায়ার পরিণতি সব তো দেখা হল। শুধু দেখা নয়, কিছুই না থাকার প্রমাণ পাঁজরে জমিয়েও কেন মুছে যাবার ভয় পাচ্ছি ?
কুসুম পুড়ছিল। তার পেটের ভেতর একটা ভ্রূণ। বিষয়টা জানতে পেরে পাগল হয়ে উঠেছিল মা। জামাইবাবুই ভরসা। হাতুড়ে ডাক্তারের ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন। লোক জানাজানি হয়নি। কে কাজটা করেছে অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারে নি কুসুমের মা। কুসুম চলে গেল। মায়ের লড়াই শেষ হল। শেষ হল বেআব্রু হবার ভয়
ভোর হবার আগের মুহূর্তের আকাশে সেদিন কিছুটা দ্বিধা ছিল। নিঃশব্দে সব কাজ চলছিল। খুব নিবু নিবু হরিধ্বনি ছিল। সাধারণত শবযাত্রায় একটা লুকোনো উল্লাস থাকে। ‘বলহরি, হরিবোল’ এর তালে ছন্দে তা ঢুকে যায়, এবং প্রকাশও পায়। শোক বা সম্ভ্রম কোনটাই দেখা যায় না। বরং একটা অস্থিরতা স্পষ্ট হয়। কাজ শেষ করার তীব্রতার সঙ্গে বিনা পয়সায় পাওয়া মদের আহ্বান যেন অস্বাভাবিক গতি দেয়। সেদিন সেই দ্রুততা ছিল না। শবযাত্রীর সংখ্যা ছিল সাত আট জন। চারপাশ লাল আলোর নতমুখ। সাজানো চিতায় পনেরো ষোল বছরের কিশোরীমুখ ফুটে ছিল। চোখ খুলে গাছেরাও যেন শ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিল। বাতাসের পা চলছিল না। চিতা জ্বলে উঠতেই নিবে গেল একজোড়া চোখ। একটা সান্ত্বনা বাক্য, ‘এসব ছেলেমেয়ে বেশীদিন বাঁচে না। আর এ কি বাঁচার মত বাঁচা, ভালই হয়েছে। কি করবে, তুমি তো অনেক দেখেছ স্বপন দা।’ নিভে যাওয়া চোখের মালিক চিতার ধোঁয়ার ভেতর থেকে উঠে আসা ছবিটা সরাতে পারছিল না। সে কুসুমের মেসো। বাপ মরা অর্টিস্টিক মেয়ে কুসুম ও তার আয়ার কাজ করা মায়ের অভিভাবক। কুসুম পুড়ছিল। তার পেটের ভেতর একটা ভ্রূণ। বিষয়টা জানতে পেরে পাগল হয়ে উঠেছিল মা। জামাইবাবুই ভরসা। হাতুড়ে ডাক্তারের ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন। লোক জানাজানি হয়নি। কে কাজটা করেছে অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারেনি কুসুমের মা। কুসুম চলে গেল। মায়ের লড়াই শেষ হল। শেষ হল বেআব্রু হবার ভয়। একটা বড় না হওয়া মনের পুষ্ট শরীর পুড়তে পুড়তে একজন পরিণত শরীর ও মনের মানুষকে জাগিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। অস্পষ্ট ‘মেসো’ ডাক বুক খোলা জামার বোতাম লাগিয়ে দেওয়ার আর্জি, সেই সারল্য চিরে ফেলছিল মানুষটিকে। সব কিছু ছুঁয়ে বসে ছিলাম আমি। থাকাটা বাধ্যতা। বাধ্যতা অভ্যেস দেয়। নিরাসক্তি দেয়। সবশেষেও কেন যে একটা ‘তবু’ থেকে যায়। কেন্নোর স্তুপের মত জড়ো হয়ে আছে জিজ্ঞাসা। কিলবিল করে। উসকে দেয়। বিবর্তনে টান হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ। নুয়ে পড়েছে ভেতরের ঋজুতা। তরল পৃথিবী জমাট বেধেছে। আলগা হয়েছে স্বচ্ছতার আঠা। রহস্যের মেদুরতা। আমার এই ফুরিয়ে যাবার ভয় তাই বড় তুচ্ছ বড় ছেলেমানুষি বলে মনে হয়। সময়ে স্থিত হবার চেষ্টা করি।
ফ্ল্যাটবাড়ির সাততলার জানলা থেকে একজোড়া চোখ আমাকে লক্ষ করে। আর আমি সেই দৃষ্টি ধরে উঠে যাই পনেরো তলার ব্যালকনিতে। চোখ এতটা জুড়ে থাকে যে আমার আর ভেতরে ঢোকা হয় না। গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ, যে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, আমি আমার বেঁচেবর্তে থাকা সবটুকু আড়াল দিয়ে তাকে টানি। চিতার ধোঁয়া যখন তালগাছকে ছাড়িয়ে যায়, তখন ওই একটা ব্যলকনির কাঁচের পাল্লা বন্ধ হয় না, শরীর পুড়িয়ে যে জীবনের গন্ধ ওড়ে সেকি তা সংগ্রহ করে ? সে কি শেষ পরিণাম আত্মস্থ করে মনে মনে খুব নির্লিপ্ত হয়ে ওঠে ?
এই যে মেয়েটা বেশ কিছুদিন আসছে, সারা রাত চিতাকাঠে বসে থাকছে, ফিরে যাচ্ছে ভোর হতেই। ওর কালো পোশাক আর ফর্সা শরীর কি আরও গাঢ় হয়ে উঠছে ? কি পেরোচ্ছে ওর অঘোরপন্থী মন ? মন কি কোন পন্থায় স্থিত হয় ? ভাবাচ্ছে, এইসব ভাবাচ্ছে এখন। হয়ত এ ও কোনও প্রাজ্ঞতার অসুখ।
তবে কিছু ভিটামিন ট্যাবলেটও জুটে যায়। জমিয়ে রাখা কবেকার আধপোড়া তাবিজ, ইমিটেশন দুল, রঙ ওঠা চুড়িতে আটকানো সেফটিপিন জুড়ে জুড়ে অন্ধকার বানাই। এই নির্মাণ স্বস্তি দেয়। বিবর্তন ঘুরে ঘুরে বলে, ‘আছে’ বলে ‘উলটো জামার গায়ে রোদের এমব্রয়ডারি করে নিতে শেখো’। শিখি । আলো আর রোদের সংস্কার। আড়াল খুলে যাওয়া দ্বিধায় জড়তা কাটানো স্মার্টনেস শেখাই। ভয় শিখে ভুলে যেতে শিখি।
রোজ ভয় দেখায় মা, ‘খেয়ে নাও ওইখানে জুজু আছে।’ মায়ের হাত ধরে যেতে যেতে বাচ্চাটা পুটুস ঝোপের ভেতর ছুঁড়ে দিয়ে গেল ছোট্ট পুতুল। হাতের টান উপেক্ষা করে পিছন ফিরে বলে গেল ‘এই নাও জুজু আমার পুতুল নিয়ে খেলা কোরো।’ জুজুর জন্য রেখে যাওয়া এই পুতুল বেলাই আমার অনিবার্য আগামী…
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us








