Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ২৩, ২০২৩

মায়া

অরুণ কুমার সরকার
মায়া

অলঙ্করণ: দেব সরকার

 
সেদিন হঠাত নীলাঞ্জন অফিস থেকে কৌশিককে ফোন করল। ডিপার্টমেন্ট এক হলেও দু’জনের অফিস আলাদা। নীলাঞ্জনদার ফোন দেখেই কৌশিক কাজের মধ্যেও তা রিসিভ করল।
 
—‘হ্যাঁ দাদা, বল’।
 
—‘তুমি কি অফিসে? ব্যস্ত আছো ?’
 
—‘অফিসেই দাদা। বলো’।
 
—‘শোন, যে জন্য ফোন করছিলাম তোমাকে। এ মাসের ৭ তারিখ আমাদের স্টেট লেবেল একটা ভাইটাল মিটিং আছে। তোমাকে যেতে হবে।
 
—‘মিটিংটা কোথায় হচ্ছে ?’
 
—‘নদীয়ার কৃষ্ণনগরে’।
 
—‘ও আচ্ছা। আমাদের জেলা থেকে আর কে যাচ্ছে ?’
 
—‘ওই, তুমি আর আমি’।
 
—‘ঠিক আছে দাদা’।
 
—‘আর শোন, মিটিং অ্যাটেন করতে গেলে তো দু’জনের যাতায়াতে বেশ ভালোই টাকা পয়সা লাগবে। আমাদের ফান্ডে তো বিশেষ কিছু নেই। ভাবছি সবার কাছ থেকে দু’শ টাকা করে নেওয়া হবে। তুমি তা হলে তোমার অফিস থেকে কালেকশনটা করে নিও আর আমি দেখছি আমার অফিসটা’।
 
—‘ঠিক আছে ’।
 
জেলা ইউনিট প্রেসিডেন্ট নীলাঞ্জন একটা প্রস্তুতি মিটিং ডাকল। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দিয়েও দিল তা। বর্ধমানের মিটিংটাতেও নীলাঞ্জন আর কৌশিককেই যেতে হয়েছিল। কৌশিক জয়েন্ট সেক্রেটারি। সংগঠনের জন্য সব করতে রাজি সে।
 
উত্তরবঙ্গ থেকে কৃষ্ণনগর সরাসরি ট্রেন নেই বলে ওরা বাসে করেই চলে গেল। ভোর ভোর নেমে পড়ল কৃষ্ণনগর কালেক্টরেটের সামনে। ডাকবাংলোতে ফ্রেস হওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে সেখানকার মিটিংয়ের আয়োজকরা। কিন্তু ডাকবাংলোটা কালেক্টরেটের কাছে হলেও ওরা খুঁজে পেল না। অত সকালে পথে লোকও নেই যে জিজ্ঞেস করবে।
 
হাতে লাঠি নিয়ে এক বৃদ্ধাকে এগিয়ে আসতে দেখল নীলাঞ্জন। বা হাতে ছোট্ট একটা প্লাস্টিক ক্যারিবাগ। সম্ভবত ফুল তুলতে বেরিয়েছেন। নীলাঞ্জন জিজ্ঞেস করল,
 
—‘আচ্ছা মাসিমা, এখানে ডাকবাংলোটা কোথায় ?’
 
—‘ডাক বাংলো ?’
 
—‘হ্যাঁ মাসিমা’।
 
—‘ওই তো ডাক বাংলো’। মাসিমা লাঠিটা তুলে দেখিয়ে দিলেন।
 
দু’জনেই অবাক হল ! ডাকবাংলোর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থেকেও ডাকবাংলো ওরা খুঁজে পাচ্ছিল না।
 
ওরা এগিয়ে গেল। দেখল গেটে মস্ত তালা ঝুলছে। তবে, পাশের ছোট্ট গেটটায় তালা নেই, কেবল হ্যাজবোল লাগানো। সে গেট দিয়ে ওরা ভেতরে গেল। গিয়ে দেখল কেউ নেই। কেউই ঘুম থেকে ওঠেনি। অত সকালে কাউকে ফোন করতেও খারাপ লাগল। তবুও করল। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে উত্তর এল, দাদা, মানিকদাকে ডাকুন। বারান্দার ঘরটায় থাকে। জানালার কাছে গিয়ে একটু জোরে জোরে ডাকতে হবে।
 
নীলাঞ্জন তাই করল। কাজও হল।
 
মানিকদা ওদের রুম দেখিয়ে দিল। ফ্রেস হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নিল। তারপর, মিটিংয়ে চলে গেল।
 
মিটিংটা সত্যিই ভাইটাল। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হল। প্রত্যেকের মতামত শোনা হল। নতুন করে কমিটি তৈরি হল। সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিও ঘোষণা করা হল। নীলাঞ্জন নতুন কমিটিতে মনোনীত হল।
 
সমস্ত কিছু মিটে গেল বিকেল সাড়ে তিনটার মধ্যেই। ফেরার বাসগুলি থাকে সাধারণত রাতের দিকে। সুতরাং সময়টাকে কাজে লাগানোর প্ল্যান কষল নীলাঞ্জন। কৌশিককে বলল,
 
—‘কৌশিক, বাস তো সেই রাতে। ডাকবাংলোয় এতটা সময় বসে না থেকে চল মায়াপুর থেকে ঘুরে আসি। মায়াপুর এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়’।
 
—‘ঠিক আছে দাদা। কিন্তু এখান থেকে যাবো কী করে ?’
 
—‘এখান থেকে নাকি টোটো করে যাওয়া যায়। আমি আরও কয়েকজনকে বলেছি, দু’জন যেতে রাজি হয়েছে’।
 
—‘চলো তা হলে’।
 
নীলাঞ্জন পরপর তিন তিনটা টোটোকে বলল, তারা রাজি হল না। আর একজন যেতে রাজি হল, তবে চার’শ টাকার কমে যাবে না। অবশেষে তিন’শ টাকায় রফা হল।
 
পঞ্চাশ পেরোনো টোটো চালক মায়াপুর যাওয়ার রাস্তা ঠিক জানে না। তবুও রাজি হয়েছে যেতে। যাওয়ার রাস্তা জিজ্ঞেস করে নিল দু’একজনের কাছ থেকে।
 
নীলাঞ্জন কৌশিকের সঙ্গে টোটোতে উঠে বসল দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার দু’জন। তাদের সঙ্গে আগে থেকে পরিচয় ছিল না। মিটিংয়ের ফাঁকে সামান্য যা কথা হয়। পথে যেতে যেতে সংগঠন সংক্রান্ত নানান কথা হল। পরিচয় হল। তাদের একজন আবুল কালাম আজাদ, অন্যজন তাহেবুল ইসলাম।
 
শহর ছেড়ে হাইওয়ে ধরল টোটো। জিজ্ঞেস করে করে চলল। হাইওয়ে থেকে বা দিকে নেমে রেল লাইন ক্রস করে গ্রামের সরু পাকা রাস্তা ধরল। অনেকটা পথ। সামনে মায়াপুর বাজার পড়ল। কিন্তু কোনো মন্দির দেখা গেল না। আরও খানিকটা এগিয়ে গেল। এক জায়গায় রাস্তার ঠিক গা ঘেঁষে একটা মন্দির দেখতে পেয়েই চালক টোটো থামিয়ে দিল।
 
মন্দিরটা যে মূল মন্দির নয়, নীলাঞ্জন সে বিষয়ে একশ শতাংশ নিশ্চিত। টোটো চালককে এগিয়ে যেতে বলল। নীলাঞ্জন খেয়াল করেছে, খানিকটা দূরে বিশাল এক মন্দিরের চূড়া পরিষ্কার, সেখান থেকেই দেখা যাচ্ছে। খানিক এগিয়ে যেতেই নীলাঞ্জনের অনুমান সত্যি হল।
 
লোকে লোকারণ্য মন্দির চত্বর!
 
অসংখ্য দেশি বিদেশি মানুষের সমাগম। সবার মধ্যেই একটা স্থির ভক্তিভাব। মন্দিরের গা ঘেঁষে  তৈরি হচ্ছে একেবারে আধুনিক ধাঁচের অনেকটা জায়গা জুড়ে বিশাল আকারের  আরেকটি মন্দির। বর্তমান মন্দির সেখানেই শিফট করবে। নীলাঞ্জনরা সকলেই প্রায় অভিভূত।
 
ফেরার  তাড়া আছে,  নীলাঞ্জনরা খুব একটা বেশি সময় সেখানে কাটাতে পারল না। তবে, সেদিনই যে সে বছরের শেষ হস্তী পরিক্রমা সেটা না দেখে ফিরল না। সঙ্গে ঠাকুরকে নিয়ে রথ পরিক্রমা।  সবই চমৎকার।
 
রাত হচ্ছে দেখে ভিড় ঠেলে ঠেলে নীলাঞ্জনরা বাইরে বেরিয়ে এসে টোটো আর টোটো চালককে খুঁজতে লাগল। অসংখ্য মানুষের ভিড়ে পেয়েও গেল এক সময়। চালকের সঙ্গে দেখা হতেই সে মন্দিরের দিকে মুখ করে দু’হাত জোড় করে প্রণাম করল। বোঝা গেল, সে এতক্ষণ ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিল। ভাড়ার টাকা সে তখনও যে পায়নি। অত মানুষের ভিড়ে কেউ কাউকে খুঁজে না পেলে যে পুরো ভাড়াটাই মার যেত।
 
নীলাঞ্জনরা যেখান থেকে বাস ধরবে, সেখান পৌঁছাল রাতের আটটা দশ নাগাদ। চালককে অতিরিক্ত পঞ্চাশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে ওরা বাসের জন্য অপেক্ষা করল। কিন্তু সে অপেক্ষা দীর্ঘ হতে হতে রাতের প্রায় বারোটা বেজে গেল,  তবুও ওরা বাসে উঠতে পারল না। সেদিন কী হয়েছে কে জানে, কোন বাসেই ওরা সিট ফাঁকা পেল না। কেউ আর নিল না।
 
নীলাঞ্জন কৌশিক সে রাতে বাস না পেয়ে ফিরে এল ডাকবাংলোয়।
 
ওখানে রাতটা কাটিয়ে পরদিন সকালে উঠে পড়ল রায়গঞ্জগামী বাসে। সেখান থেকে আবার শিলিগুড়ির বাস ধরতে হবে। বেথুয়াডহরি পার করে বাসটা পলাশী পৌঁছালে অনেক যাত্রী উঠে পড়ল।
 
পলাশীতে ওঠা একজন যাত্রী নীলাঞ্জনের পাশে এসে বসল। অল্প বয়স। নীলাঞ্জন তাকে জিজ্ঞেস করল,
 
—‘ভাই, তোমার বাড়ি কি পলাশীতেই?’
 
—‘হ্যাঁ’।
 
—‘এখানেই কি ওই যুদ্ধটা হয়েছিল ?’
 
—‘না, এখানে ঠিক নয়। যুদ্ধটা হয়েছিল এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে’।
 
—‘ও, আচ্ছা। যেখানে যুদ্ধটা হয়েছিল, সে জায়গাটা এখন কী অবস্থায় আছে?’
 
—‘জায়গাটাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ সেখানে যায়’।
 
কৌশিক এতক্ষণ মোবাইল আর খবরের কাগজে ব্যস্ত ছিল। ঘড়িতে তখন ন’টা সাড়ে ন’টা হবে, বাসে ঝালমুড়ি উঠেছে দেখে, কৌশিক দুটো ঝালমুড়ি নিল। বেলডাঙা আসতেই ঝালমুড়ির সঙ্গে ছেলেটিও বাস থেকে নেমে পড়ল।
 
নীলাঞ্জন কৌশিকের মাঝের সিটটা দখল করলেন বেলডাঙা থেকে ওঠা মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। নীলাঞ্জনের সঙ্গে তাঁর আলাপ হল। তিনি যাবেন ফারাক্কা।
 
তখন প্রায় দুপুর।
 
নীলাঞ্জনের পেটে ছুঁচো ঘুরতে শুরু করেছে। লাঞ্চের জন্য বাস কোথায় দাঁড়াবে কন্ডাক্টারকে ডেকে একবার জিজ্ঞেস করল সে। সঠিক উত্তর পেল না। বহরমপুরের জ্যামটাকে আগে পার করে নাকি সিদ্ধান্ত নেবে। হলও ঠিক তাই। ফাঁকা  ছোট্ট একটা জায়গায় গিয়ে বাসটা সাইড করে দাঁড়িয়ে পড়ল, হোটেলের সামনে।
 
রায়গঞ্জ পৌঁছে ওরা প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করল বাসের জন্য। পেল না। মাথায় ডালখোলা জ্যামের দুশ্চিন্তা। শিলিগুড়ি শিলিগুড়ি বলে চিৎকার করতে লাগল ছোট গাড়ির ড্রাইভার। নীলাঞ্জন কৌশিক এগিয়ে গেল। ভাড়া বেশি হাঁকছে, সে নাকি ডালখোলার জ্যামকে অ্যাভয়েড করার জন্য গ্রামের ভেতরের রাস্তা দিয়ে যাবে।
 
সামনে বা মাঝের সিটে জায়গা পেল না। পেছনে বসতে হল মুখোমুখি আটজনকে। শহর ছাড়িয়ে কিছুটা যাওয়ার পর গাড়িটা সরু গ্রামের পথ ধরল। অনেকটা সাপের মতো আঁকাবাঁকা সে পথ। সরু রাস্তাটা ভুট্টা ক্ষেতসহ হাজারো সবুজ ফসলের মাঠকে হঠাৎ চিরে দিয়েছে।
 
বেলা পড়ে গেছে। খিদেও পেয়েছে সামান্য। নীলাঞ্জন ব্যাগ থেকে বারবন বিস্কুটের প্যাকেটটা বের করল। র‍্যাপার ছিঁড়ে কৌশিকের সামনে ধরল। ফসলের মাঠ দেখতে দেখতে দু’জনে বিস্কুট খেল। অনেকটা গ্রামের সেই সরু রাস্তা দিয়ে এসে হঠাৎ ইসলামপুরের খানিকটা আগে হাইওয়ে ধরে নিল গাড়িটা । তারপর সে হুহু করে ছুটতে লাগল। নিমেষে পৌঁছে গেল ইসলামপুর। চায়ের বিরতির মধ্যেই ড্রাইভার হঠাৎ খেয়াল করল, পেছনের বাঁ দিকের চাকায় হাওয়া নেই। ঝটপট তা পাল্টে নিল।
 
গাড়িটা কালাগজে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। পাংচার হওয়া টায়ারটাকে সে সারতে দিল সেখানে। রাত্রি বেশি হলে যে গ্যারেজ খোলা পাবে না কোথাও। আবার যে তাকে ফিরতে হবে রায়গঞ্জ। টায়ার সারাইয়ের ফাঁকে কৌশিক দুটি কাগজের প্লেটে ঝুড়ি আর বোঁদে নিল দোকান থেকে।
 
নীলাঞ্জন কৌশিককে নামতে হবে শিলিগুড়ি শহরে ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্তে। গাড়ি থেকে নামার মুহূর্তে নীলাঞ্জনের ফোনটা বেজে উঠল। কৃষ্ণনগর থেকে ফোন করছে। ওরা বাড়ি পৌঁছাতে পারল কিনা জানতে চাইছে। কৌশিক শুনে বলল,
 
—‘দাদা, এত ধকলের পরেও আমার এবারের মিটিংটা বেশ ভালো লাগল। গতবারের মতো নয়। তাছাড়া, আমরা বাড়ি পৌঁছাতে পারলাম কিনা, সে খবরটাও এরা দেখ নিচ্ছে’।
 
—‘ঠিক বলেছ। নদীয়া জেলার কর্মকর্তাদের প্রশংসা করতেই হবে। আর একটা কথা কী জানো, আমরা কষ্ট করলাম বলেই এবারের মিটিংটা যেমন সাক্সেসফুল, তেমনি বাড়তি পাওনা আমাদের ঈশ্বর দর্শন’।
 
নীলাঞ্জনের কথা শেষ হতে না হতেই গাড়িটা ঘ্যাঁচ করে দাঁড়িয়ে পড়ল।
 

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦

 

লেখক  শিলিগুড়ির বাসিন্দা। গল্পকার।

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!