- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- নভেম্বর ৩০, ২০২৫
পথের কবি
অলঙ্করণ : দেব সরকার
এক ধূসর বিকেলে ভূমিযুদ্ধ শেষ করে ঘরে ফিরছে মানুষগুলো। রাজা ঔপল তখন চলেছেন মূর্তি দর্শনে। তাঁর নিজের মূর্তি। পথ সামান্যই । রাজা পদব্রজে চলেছেন শিল্পী তীর্থঙ্করের কর্মক্ষেত্রে। প্রাসাদের অ-দূরেই সেই ফাটক । নাম ছিলো দ্রোহপুরী। এককালে এখানে থাকতো বন্দীরা। এখন নিরাপত্তাজনিত কারণে পর্বত শীর্ষে স্থানান্তরিত করা হয়েছে সেটিকে।
এদেশের মহান মূর্তিকার তীর্থঙ্কর ভট্ট প্রথমে রাজি হননি জীবিত রাজমূর্তি নির্মাণে। অর্থের প্রলোভনেও না। শেষে তরবারির ঝিলিকে ভেবেছেন এক পক্ষকাল। তারপর শর্ত দিয়েছিলেন,কক্ষটির উত্তর দিকে বড় খোলা জানলা চাই তাঁর। উত্তরের আলো না হলে নির্মাণ হবে না রাজার মুখমন্ডলের রেখা।
বুড়ো তালগাছগুলোর মাথা থেকে অজস্র আলোর স্রোত এসে পড়ে দ্রোহপুরীর মেঝেতে এখন। ফুটে ফুটে ওঠে নিপীড়িত প্রজাদের রক্তের দাগগুলি। থমথম করে তখন সেই দাঁড়ি দাঁড়ি আলো । সেই আলোয় শিল্পী নির্মাণ করতে থাকেন রাজার পিঙ্গল অবয়ব।
রাজা যখন মৃত্তিকার উপর দিয়ে হাঁটেন, তখন তাঁর দর্পিত পদভারে শুষ্ক হয়ে যায় ঘাস। সহচর মন্ত্রী নিকষোপলকে দেখে মনে হয় তিনিও যেন রাজারই আত্মজীবনীর অংশ।
রাজ্যের কিছু প্রজা বস্তুগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করে। বেশিরভাগ প্রজা তা করে না। তারা চলাফেরা করে নীরবে । আগুন আর অশান্তির ভেতর দিয়ে। সেই নীরবতা নিঁখুত। মন্ত্রী এটাকে বলেন রাজত্বের ভেতরের শান্তি।
রাজ্যের আটপৌরে কুঁড়েঘরগুলোর মাথায় এখন সন্ধ্যা। খুব ভোরে যারা খাটতে যায় মাঠে, সন্ধ্যায় তারা ফেরে পাথর হয়ে। এ রাজ্যের রাষ্ট্রযন্ত্র আর ক্ষেতে কাজ করা মানুষের হৃদযন্ত্রের মধ্যে খুব রুক্ষ সম্পর্ক। এখানে লেখকেরা ফুলের জীবন বৃত্তান্ত লেখে। রাজা ঔপল শুনে মুগ্ধ হন। মন্ত্রী পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন তাদের জন্য।
রাজ্যের একটি জনপদের শেষাংশে খানিকটা ফাঁকা জমি। তার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদী। স্থানীয়রা বলে তৃষ্ণাতট।নদীর ধার ঘেঁসে চিহ্ন নিয়ে টিকে আছে নদীর ছিন্ন ঘাট। তার স্থাপত্যে ফাটল। সেই ঘাটের পাশেই পাশাপাশি দুটো মন্দির। বোঝা যায় মন্দির দুটির নির্মাণকাল অভিন্ন। তবু একটিকে দেখে মনে হয় তার বয়স বেশি। সে আরো বৃদ্ধ। সেটি যেন তার আত্মার উপর ভগ্নতা নিয়ে বেশি নির্জন। মন্দিরটির এই মৌন আত্মকথার পিছনে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে অন্য দেবালয়টি।
সেই দেবালয়ের চাতালে কদিন আগে কোত্থেকে এক উটকো লোক এসে জুটেছে। নদী থেকে জল তুলে এনে এনে মন্দিরের চাতাল ধোয়। স্থাপত্যের ক্ষয়ের প্রমাণে জল ঢালে। মন্দিরের পদপ্রান্তে দেওয়ালগাত্রে একটি কোঠর আছে । সেখানে বসে থাকে চুপচাপ। মালসায় ফোটায় ডাল আর চাল। কলাপাতায় আহার করে। সাধু,সন্ন্যাসী না পাগল, বিতর্ক হয় গাঁয়ের মানুষের মধ্যে।
সত্যরূপ দিনের আলোয় দীর্ঘতম আকাশের দিকে তাকালো একবার। সেই অসীমতায় কাটাকুটি খেলছে চিলের ডানা। সে বললো, সেই কবিতাগুলো যারা লেখে তারা সব আমাদের রাজার আহ্বানে নাকি জড়ো হবে রাজসভায় !
ক-দিনের মধ্যেই মন্ত্রীর কানে কথাটি যেতেই তিনি ধরে নিলেন ব্যাটা নির্ঘাত কোন গুপ্তচর হবে। তদন্তে পাঠালেন অমাত্যকে। অমাত্য সরজমিনে তদন্ত করে রিপোর্ট দিলেন লোকটা যথার্থই পাগল। মন্ত্রী নিকষোপল বললেন, “পাগল মানে !”
অমাত্য বললেন, “মহামাত্য, পাগল হল সে, যে সামনে যা দেখে তার অর্থ করে ভিন্ন ।
– যেমন ?
– যেমন লোকটি নদীটিকে মনে করছে সমুদ্র ! আর মন্দিরটিকে গৃহ ! আর দেবতাটিকে রাজার পাহারাদার ! তবে বেশ মজার মজার কথা বলে লোকটা !
মন্ত্রী বললেন, “পাগল কয় প্রকার হয় জানো ?
– আজ্ঞে না । এ বিষয়ে তেমন পড়াশোনা করি নাই ।
– সে এক পাগল যে এক সঙ্গে চারখানা বই লিখছে । অথবা পাগলে কি না বলে, ছাগলে কিনা খায় !
– এই দু-ধরনের মধ্যে লোকটা কোন ধরনের ?
– আজ্ঞে লোকটি ওই দ্বিতীয় ধরনের ।
হুঁ, দেখো প্রথম ধরনের পাগলগুলো বড় বিপজ্জনক হয় ।
– তা বটে, লোকটি মন্দিরের দেবতাকে পুজোআচ্চা না করে মন্দিরটাকে যত্ন করছে বেশি ।
– কি ভয়ংকর ! তুমি তাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর পাগল বলছো !
– আজ্ঞে মহামাত্য, লোকটি বদ্ধ পাগলই । না হলে এই ঠান্ডাতে তার শরীরে স্বল্প পোষাক ! এমন কি এই যে শীতকালে অকাল বর্ষণ হল, ভেসে গেলো মন্দিরের খোলা চাতাল, লোকটিকে তেমন বিচলিত দেখালো না !
– বেশ, নজর রাখো লোকটার ওপর ।
পথের ধারে প্রাচীন পাথরের মত পড়ে থাকে লোকটা । সকালে যারা কাজে যায়, তারা দেখে বেসামাল হাওয়াকে তেমন তোয়াক্কা করছে না তার শরীর । পায়ের কাছে পড়ে আছে আগের রাতে জোটা খাবারের পাত । নদী থেকে উঠে এসেছে যেন কোনো গ্রামীণ অলৌকিক । ক্ষণস্থায়ী দৃষ্টি -বন্ধুত্ব হয়েছে তার সঙ্গে এরই মধ্যে কিছু নাগরিকের । একদিন সত্যরূপের সঙ্গে কথাও হয়েছিল লোকটার । একটিমাত্র বাক্যই বলেছিল সত্যরূপকে। বলেছিলো, “যেভাবেই পারো জেগে থাকো ।”
সত্যরূপ বুঝতে পারেনি এ কথার অর্থ। সে সাদামাটা লোক । যাচ্ছিল পূবের মাঠে । সঙ্গে ছিল জীবক ও চরণ পাল । সে বলল, “কি বলে রে ফকির ! জেগে না থাকলে হাঁটছি কেমনে ! এখন মাঠে যেয়ে ঝোড়াভর্তি ঘাস নিড়োতে হবে । কদিন আগের বৃষ্টিতে জল পেয়ে চড়চড় করে ঢ্যাঙা হচ্ছে ঘাস । এই ঘাস মাটির রস খেলে কত ক্ষতি বলো দেখি ! বিদেকাঠি দিয়ে তুলবে কে ! ঘুমোলে ঘাস নিড়োবে কে গো খুড়ো ? ও বুড়ো নির্ঘাত গাঁজা খায় রাতে !”
চরণ পাল উত্তর দেয় এবার। বলে, “ না রে দাদার পো, লোকটা ইঙ্গিতে কথা বলে ! এর আগেও বলতে শুনেছি !”
জীবক বলে, “শুনেছ নাকি ? কি কথা বলো দেখি ?”
চরণপাল বলে, “এ রাজ্যে চাঁদ আর সূর্যই স্বাধীন।আমাকে একদিন ডেকে বলেছিল কথাটা ।”
– তা তুমি কি বললে ?
– আমি বলেছিলাম, একটু খোলসা করে বলোনা ফকির ! আমাদের মাথা হলো গে ওই জষ্টি মাসের মাটি । বিদেকাঠি সহজে ঢোকে না ।
– তারপর ?
– তারপর আর কি ! কথাই বলে না বুড়ো । চুপ ।
সত্যরূপ বলে, “ছাড়ো । নতুন খবর শুনেছো ! উৎসব হবে গো দেশে !”
জীবক বলে, “উৎসব তো লেগেই আছে ! নদী উৎসব, মাটি উৎসব, ধামসা উৎসব, কুমারী উৎসব !”
– না গো আর একটা নতুন উৎসব হবে ফাগুনে !
– এই ফাগুনে ?
– হ্যাঁ গো , কবিতা উৎসব !
জীবক বলে, “সে আবার কেমন উৎসব গো ! কবিতা তো বইয়ে লেখা হয় জানি ! তা নিয়ে আবার উৎসব !”
সত্যরূপ দিনের আলোয় দীর্ঘতম আকাশের দিকে তাকালো একবার। সেই অসীমতায় কাটাকুটি খেলছে চিলের ডানা। সে বললো, “সেই কবিতাগুলো যারা লেখে তারা সব আমাদের রাজার আহ্বানে নাকি জড়ো হবে রাজসভায় ! ”
জীবক বললো, “তাই বুঝি ! তারপর !”
– তারপর তারা নাকি তাদের লেখা পড়ে শোনাবে। আচ্ছা, তুমি কোনোদিন শুনেছো কবিতা ?
– না ভাই, ও সব চোখেও দেখিনি কোনোদিন ।
– কিন্তু আমি শুনেছি, পণ্ডিতেরা আমাদের নিয়ে অনেক কবিতা লিখে থাকে ।
– আরে ধুর । তুমি কিছুই জানো না ! আমি শুনেছি কবিতা লেখা হয় নারী, প্রেম, ফুল, পাখি, চাঁদ, তারা এইসব নিয়ে ।
– ও ! তাহলে হয়তো তাই । ছাড়ো ভাই ওসব কথা । আমাদের মাটির বুকে ফলা গিঁথে একমুঠো অন্ন জোগাড় করতে হয় । তাতে আবার কত উৎপাত । রোদ, জল, ঝড়, কীটপতঙ্গ, লেঠেল, হাতির পাল–
এতক্ষণ চুপচাপ হাঁটছিল চরণ পাল । নিভে আসা বিড়িটায় বড় করে টান দিয়ে বলল, “আমি একটা পদ্য জানি । বাপের মুখে শুনেছি ।
রুকু মাটি শুকু মাটি
মাটির নিচে রস
শক্ত হাতে লাঙল ধর
আর মাটি চষ
জীবক বলে, “তোমার বাপ কবিও ছিল, চাষিও ছিল ?
– তা জানি না । তবে কিনা এসব লেখা বেশ কঠিন । এ সব চাষাভূষোদের কাজ নয় । তবে এখন চাষাভুষোদের নিয়ে নাকি লেখা হচ্ছে পদ্য ।
সত্যরূপ বলল, “আমাদের নিয়ে ! কই এ সব কথা শুনিনি তো !” চরণপাল বলল, “হ্যাঁ গো, চাষীরা গায়ে গতরে খাটে, আর রাজা তাদের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করেন, এসব নাকি লেখা হচ্ছে তাতে ।”
জীবক বলে, “কথাটা বড় মনে ধরলো গো খুড়ো । পন্ডিতেরা ভেবেছে বটে বেড়ে ভাবনা । আমার ভেতরেও ভাবনাটা জাগে । এত কষ্ট করে দেশের লোকের পেটে অন্ন তুলি, আর আমাদেরই এই দুর্দশা ! তা, আমাদের নিয়ে পন্ডিত ভদ্রলোকেরা ভাবছে, এ যে বড় সুখের কথা গো ! এবার মনে হচ্ছে আচ্ছাদিন আসবে আমাদের !”
সত্যরূপ বলল, “তা খুড়ো এত কথা তুমি জানলে কি করে ?”
–সে সব কথা পরে হবে । শুধু জেনে রাখ ওই ফকিরটা যে সে লোক নয় ! ধানের খোসার মতো ভাবিস না লোকটাকে । ওর ভেতরে চালের শাঁস আছে ।
২
আকাশে আজ ঝলমল করছে রোদ্দুর। রাজপ্রাসাদের শীর্ষে পতপত করে উড়ছে মহাকাল। ফুল পাতা দিয়ে সাজানো হয়েছে আজ তোরণ। তোরণের ভগ্নতা চাপা পড়েছে অনেকটাই। দেবতাদের মতো সুপুরুষ রাজকর্মচারীগণ ব্যস্ত তদারকিতে। দেবীর মতো সুন্দরী পরিচারিকাগণ পুষ্প হাতে অপেক্ষা করছে তোরণ পার্শ্বে। ফকিরটি দেখলো বহিরঙ্গে শোভিত নরনারীদের। মনে মনে ভাবল এদের আসলে কোন হৃদয় নেই। হৃদয়হীন মূর্তির মত দেখাচ্ছে ওদের। ওদের চলাফেরার ভঙ্গিমা মাপা মাপা। নিখুঁত নীরবতা ওদের মুখমণ্ডলে।
আজ কবিতা উৎসব ।
এই কবিতা উৎসবের একটা নিয়মাবলী আছে । সেই শর্ত মেনে অংশগ্রহণ করতে হবে সকলকে । দূর দূরান্ত থেকে আগত কবিকুল। মন্ত্রী নিকষোপল উদ্ভাবন করেছেন সেই পদ্ধতি। রাজকবি হিসেবে চিহ্নিত হবে মাত্র একজন। একটি কবিতাকে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত করবে রাজার জুরিগণ। বাকি কবিতাগুলোকে ফেলে দিতে হবে জ্বলন্ত আগুনে।
সভায় আগত কবিদের করতলে উর্বশীসদৃশ সুন্দরীরা ধরিয়ে দিচ্ছে একটি করে পুষ্পগুচ্ছ । তারপর তাঁরা গিয়ে বসছেন নির্দিষ্ট আসনে । জ্যোৎস্না মাখা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা আলোর মতো ঝলমল করছে কবিদের পোশাক । সমবেত কবিদের দেখাচ্ছিলো, তারা যেন দূর আকাশের তারার মতো একা একা ।
লোকটির উচ্চারণ গুলো বেশ গম্ভীর আর উষ্ণ । প্রাসাদের বিরাট দালান সদৃশ কক্ষটির দেওয়ালে দেওয়ালে তার কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়ালো কিছুক্ষণ । তারপর নেমে এলো নীরবতা । অনেকটা মোমবাতির মতো । যার শব্দ নেই, আছে আগুন ।
ফকিরটি দৃঢ় পায়ে এসে দাঁড়ালো তোরণ পার্শ্বে । প্রহরী সঙ্গীন উঁচিয়ে এসে বলল, কে তুমি ?
–কবি ।
প্রহরীর বাদামি চোখের তারা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো আগুন । বললো, তফাৎ যাও । পাগল কোথাকার !
ফকির বলল, আমি একজন কবি । আমাকে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হোক ।
– তোমার পোশাক বড় বিশ্রী । পুরোনো এবং ছেঁড়া ।
– আমার পোশাক পরিচ্ছন্ন ।
– এক্ষুনি বিদেয় হও এখান থেকে ।
একটা বচসা তৈরি হল তোরণ প্রান্তে । কয়েকজন রাজকর্মচারী এলো ছুটে । মন্ত্রী স্বয়ং কারণ জানতে পাঠালেন তার সহকারিকে । সব শুনে বললেন, “ঢুকতে দাও লোকটাকে ।”
লোকটিকে পুষ্প স্তবক দেওয়া হবে কিনা দ্বন্দ্বে পড়লো সুন্দরী যুবতীরা । ভাবছিল ক্ষণিক । লোকটি সেসব তোয়াক্কা না করে গিয়ে বসলো আসনে ।
যথাসময়ে মঞ্চে উপস্থিত হলেন রাজা । এলেন জুরিগণ । শুরু হল কবিতা পাঠ । কবিরা একে একে পাঠ করলেন তাদের লিখে আনা শ্রেষ্ঠ কবিতাটি । লোকটিকে ডাকা হলো সবার শেষে ।
পুষ্প ও রজনীসখার কথোপকথন নিয়ে লেখা কবিতাটিকে প্রথম করেছেন জুরিগণ । বাকি কবিরা শর্ত মতো তাদের আনা কবিতা ফেলে দিল সুদৃশ্য তাম্রপাত্রের ওপর প্রজ্বলিত আগুনে । ফকির লক্ষ্য করল, তাদের মধ্যে অনুতাপ যতটা না কবিতাটি ভস্মীভূত হওয়ার জন্য, তার চেয়ে বেশি এবারে রাজকবি হতে না পারার যন্ত্রণায়
এতক্ষণ ধরে শুনছিল বেশিরভাগ কবিতায় ফুল,পাখি, প্রেম, প্রকৃতির বর্ণনা । অবশ্য বেশ কয়েকটি কবিতায় এর ব্যতিক্রমও আছে। সেই কবিতাগুলোতে ছিল মানবতার কথা । রাজার দিকে আঙ্গুল তোলা কোনো কবিতাই নেই । লোকটি শুরু করলো –
আমাকে তোমরা পাগল বলো
তোমরা কি সুস্থ ?
রাজার কাছে আমার প্রশ্ন এটাই
তোমার হাটে তবে মানুষ কেনাবেচা হয় কেনো ?
সভার কাছে প্রশ্ন আমার
রাজার যেকোনো কথায় কেনো সবার ঘাড় হেলে একদিকে ?
তোমরা দেখেছো কি কেউ যন্ত্রণার পেট চিরে
মাটিতে জেগে ওঠে মানবের শ্রম ?
হৃদয়ে বিস্ফোরণ ছাড়া বাঁচেনা কোনো কবি
আর দেরি নয়, সূর্যের মতো স্বাধীন হও এবার –
লোকটির উচ্চারণ গুলো বেশ গম্ভীর আর উষ্ণ । প্রাসাদের বিরাট দালান সদৃশ কক্ষটির দেওয়ালে দেওয়ালে তার কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়ালো কিছুক্ষণ । তারপর নেমে এলো নীরবতা । নীরবতাটি অনেকটা মোমবাতির মতো । যার শব্দ নেই, আছে আগুন ।
নিকষোপল রাজার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললেন, “লোকটি বহিরাগত। এ নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই মহারাজ । কবিকুল আমাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে । এভাবেই আমরা প্রতিবছর একবার করে মেপে নেবো আমাদের সুশীল সমাজকে । আপনি আজকের শ্রেষ্ঠ কবির নাম ঘোষণা করুন ।
গভীর রাতে প্রস্ফুটিত একটি পুষ্প ও রজনীসখার কথোপকথন নিয়ে লেখা কবিতাটিকে প্রথম করেছেন জুরিগণ । বাকি কবিরা শর্ত মতো তাদের আনা কবিতা ফেলে দিল সুদৃশ্য তাম্রপাত্রের ওপর প্রজ্বলিত আগুনে । ফকির লক্ষ্য করল, তাদের মধ্যে অনুতাপ যতটা না কবিতাটি ভস্মীভূত হওয়ার জন্য, তার চেয়ে বেশি এবারে রাজকবি হতে না পারার যন্ত্রণায় ।
সেই লোকটি আগুনে ফেললো না তার লেখা কবিতাটি । চিৎকার করে বললো, “যারা নিজের কবিতাকে আহুতি দিলো, তারা কাপুরুষ। সূর্যের মতো স্বাধীন হতে হবে কবিকে । জেনে রাখুন কবিতা হল কবির আত্মজীবনীর অংশ। যে কবি নিজের সমাজ ও সময় নিয়ে সন্তুষ্ট, তিনি গিয়ে দাঁড়ান আয়নার সামনে । ”
তারপর হনহন করে এগিয়ে গেল সে তোরণের দিকে।
পরদিন আর তাকে দেখা গেল না মন্দিরের চাতালে।
♦–♦•♦–♦•♦–♦•♦–♦
❤ Support Us








