- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- নভেম্বর ১৬, ২০২৫
শয়তান
অলঙ্করণ: দেব সরকার
সিরাজের নাম কিন্তু সিরাজ নয়। সিরাজের অনেক নাম। যেমন পাড়ায় ওর নাম শয়তান। না কোনো অভিসন্ধি বা রাগ নিয়ে কেউ ওকে শয়তান বলে না। ভালোবেসেই বলে। রফিকের দাদি বলে, তোকে ক্যান ওরা শয়তান বলে র্যা দাঁড়িয়েই ? তুই তো বজ্জাতের ধাড়ি। সিরাজ মুখটাকে ভেঙিয়ে দাঁত বার করে বলে, বুড়ি তোর বরকে বজ্জাত বলিস ক্যান ? বুড়ি হাতের বাটি ছুঁড়ে মারে। অশ্রাব্য গালি দেয়। তাই বলে কি ভালোবাসেনা ? সিরাজের বাপ মদ খেয়ে রাত দুপুরে এসে প্রায়ই হল্লা করে। ঘুমিয়ে থাকলে দমাদ্দম লাথি মেরে ঘুম থেকে জাগায়। – বাপ বাড়িতে ফেরেনি আর তুই শালা হারামি ঘুম দিচ্ছিস ? ওঠ শালা। ক্যাঁক করে আরেকটা লাথি। তাই বলে কি বাপ ভালোবাসেনা? পরদিন সকালে নিজেই ভাত সিদ্ধ বসায়, সিরাজকে বলে এটা ওটা জোগাড় দিতে। তারপর বাপ ছেলে মিলে ভরপেট ভাত সাঁটায়। এটাই তো ভালোবাসা। সিরাজের বাপের অসুখ করলে, সে ভোলা ডাক্তারের কাছে ছুটে যায়। হাসপাতালে কাজ করা কার্তিক কাকার কাছ থেকে ফ্রি তে ওষুধ নিতে যায়। এটাই তো ভালোবাসা। বাপকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, আমার নাম শয়তান কেন রে? কে দিছে এমন নাম? তুই না মায়ে ? – বাপ আঙুল চাটতে চাটতে বলেছিল, তোর মা রেখেছিল বটে। ও মাগীর মাথা থেইক্যে আর কী আসে ? মোছলমানের লগে পীরিত করলে আর ওই তো হবে – তুই কিছু বলিস নাই ক্যান? – কী বলার আছে? তুই শয়তান আছিসক্ষণে। – কী শয়তানি করেছি বল তা’লে ! নিতাইচন্দ্র মিচকে মিচকে হাসে এবার। মোল্লার বাচ্চা শালা তোমার জন্য ঘরে একখান আয়না আনতি হবে দেখছি। আয়না নাহলে বুঝবি না সেকথা। সিরাজ ভয়ানক রেগে যায় এ’কথায়। রাগলে কী হবে, এ মস্করায় কিছু সত্যি আছে। এক তো পাড়ায় সকলেই জানে সে তার মায়ের মুসলমান প্রেমিকের সন্তান। হিঁদু বাপের ঠায়ে থাকে মায়ে সঙ্গে নিয়ে যায়নি বলে। আর বয়স মাত্রে বারো হলে কী হবে, ভয়ানক চেহারা ছেলেটার। দৈর্ঘ্য পাঁচ ফুট কী বড় জোর আর এক দুই ইঞ্চি বেশি হতে পারে কিন্তু দশাশই চৌকো এক গঠন, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, মিশকালো গায়ের রং, চোখদুটো অনেক ভিতর থেকে জেগে ওঠা অথচ তীক্ষ্ণ, সবমিলিয়ে সিরাজকে অন্ধকারে দেখলে শুধু নয় আলোতে দেখলেও আলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ জন্মাবে। সিরাজের নাম তাহলে সিরাজ হল কী করে ?
ব্যাপারটা হল এই যে সিরাজের এই নাম তার স্ব-ঘোষিত। সেই ছোটবেলা থেকে এনজিও দিদিরা পাড়ায় কেলাস দিত আর সব রাজাদের গল্প বলত। গোপাদিদি গল্প শুনিয়েছিল সিরাজদ্দৌলার। পলাশীর যুদ্ধে কীভাবে বীর সিরাজউদ্দৌলা যুদ্ধ করেছিল আর মীরজাফরের বেইমানির জন্য ধরা পড়েছিল ব্রিটিশ সেনাদের হাতে। সেই থেকে সিরাজউদ্দৌলাকে ভালো লেগে যায়। অনেক অনেক যুগ আগের রাজবেশ পরা কোনো এক রাজা যে কিনা শুধুমাত্র অন্যের বেইমানির জন্য প্রাণ দিল, তার প্রতি মমতায় ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে উঠেছিল ওর মন। সারাক্ষণ নিজেকে সিরাজউদ্দৌলা ভাবতে ভালো লাগত। তারপর গলিতে সেবার এন জিও দিদিরা একটা নাটক করাল পলাশীর যুদ্ধের উপর। অনেক জোরাজুরি সত্ত্বেও ওকে সিরাজদ্দৌলার চরিত্রে অভিনয় করতে দেওয়া হল না। বরং অভিনয়ের অত আগ্রহ দেখে ওকে মীরকাশিমের চরিত্র দেওয়া হয়েছিল যাতে শেষদৃশ্যে একবারই মঞ্চে উঠে একটামাত্র সংলাপ ছিল। হলে কী হবে ওর নাম কীভাবে যেন এনজিওদিদিদের কাছে সিরাজউদ্দৌলা হয়ে গেছিল। সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে সিরাজ। অভিনয়ের সুযোগ না পেলে কী হবে এই নামটা বড় পছন্দ হয় সিরাজের। শয়তান থেকে এইভাবেই উত্তরণ হল সিরাজের। তবু মহল্লায় তত কেউ বলতে চায় না। বাপও তাই। বাপের শয়তান বলে ডাকতেই ভালো লাগে। বলে,- শালা হিঁদুর ছেলে হয়ে নিজেকে সিরাজ বলিস কেনে। মারব মুয়ে এক লাথ ফের নিজের নাম সিরাজ বলবি তো। সিরাজ মাথা নিচু করে। নামের আবার হিঁদু আর মোছলমান কীসের। যাই হোক বাপকে না বললেই হয়। বাপের জন্য সিরাজ শয়তান হয়েই থাকে। বাপের হয়তো ওই নামে একই সঙ্গে সোহাগ আর খিস্তি দুটোই চালাতে সুবিধা হয়। তবে সিরাজ নিজেকে সিরাজ বলেই ডাকে। মনে মনে বলে,- সিরাজ তরোয়াল তোল। বেপরোয়া হয়ে ওঠ। শ্ত্রুশিবিরের লোকগুলোকে ধ্বংস করে দে।
সিরাজ ময়লা তোলার কাজ করে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ময়লা তোলে শিবুকা। মিউনিসিপ্যালিটির লোক শিবুকা। বেতন পায়। বেশ মোটা মাইনে। এছাড়া ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ময়লার বালতি নিয়ে যেতে হয়। চোদ্দতলার ফ্ল্যাটের সবতলায় উঠে উঠে ময়লা নেওয়া। তা সে কী আর নিজে অত কাজ করতে পারে। সিরাজের মতো পাঁচজনকে নিয়ে রাখে। এক একজনকে পাঁচ ছ’টা করে ফ্ল্যাটের দায়িত্ব দেওয়া থাকে। শিবুকা মাইনে দেয়, পুজোর সময় বোনাস। এছাড়া ফ্ল্যাট বাড়ির অনেকে খুব ভালো হয়। ছোট বলে এটা সেটা খাবার জিনিসও দেয় অনেক সময়।
সিরাজের বাপও একই কাজ করে। তবে বড়ো ভ্যাটে ময়লা ফেলার কাজ করে কন্ট্রাকটরের কাছে। তাদের গুষ্টির সকলেই নাকি এই কাজই করে এসেছে। কাজ নিয়ে বড়ো একটা কোনো অসুবিধা নেই সিরাজের। আর কেন জানি তার মনের বিশ্বাস সে চিরকাল এই কাজ করবে না। বড়ো কিছু একটা করবে। সিরাজউদ্দৌলার মতোই একটা খুব মনে রাখার মতো কিছু। সবাই শ্ত্রুতা করবে, শুধু সে একা বীরের মতো লড়ে যাবে। তলোয়ার নিয়ে একের পর এক খারাপ লোকদের মেরে ফেলবে। কাদের কাদের তালিকায় রাখবে সেই নামগুলোর একটা লিস্ট বানিয়ে রেখেছে সিরাজ মনে মনে। খারাপ লোকের অভাব আছে নাকি। কোন খারাপটাকে আগে রাখবে সেটাই একটা ব্যাপার। তাদের পাড়ার অর্ধেক লোক রাতে নেশা করে ফিরে ঘরে হল্লা করে। বউকে ধরে মারে। অন্য মেয়েদের গায়ে হাত দেয়। জুয়া সাট্টা খেলে, চুরি চামারি পর্যন্ত করে। এদের মধ্যে কে বেশি খারাপ সেটা বাছা খুবই কঠিন। তবে সিরাজ বাচ্চুকে মারবে। বাচ্চু সিরাজের থেকে বয়সে বেশ কিছু বড়ো এবং এ পাড়ার ক্ষুদে দাদা। বেশ রোখ জমিয়ে রেখেছে। হুকুমে চালায় সবাইকে। কথায় কথায় হাত পা চলে। সিরাজকে বার দুয়েক খুব মেরেছে। অকারণে। ওদের বাড়ির পায়খানা পরিষ্কার করিয়েছে জোর করে। সে ময়লা তোলার কাজ করে বলে কী যে কেউ যা খুশি করিয়ে নেবে তাকে দিয়ে। গলিতে অনেকেই আগে এরকম আশা করত। কিন্তু পরে সবাই বুঝেছে যে মাগনায় কাজ করবে সিরাজ ততখানিও ল্যাদস নয়। কিন্তু ওই বাচ্চু আর ওরই স্যাঙাত ফোকলা এই দু’জন জবরদস্তি সিরাজকে দিয়ে নোংরা পরিষ্কার করায়। বিনাপয়সায়। না করতে চাইলে মারে। গায়ে গতরে সিরাজের চেয়ে তাগদ বেশি ওদের। তাছাড়া সিরাজরা মেথর পট্টিতে থাকে না বলে ওদের দল ভারী নয় এ গলিতে।
শেষ দুপুরের দিকে ওদের এইসব খেলা চলে। সিরাজদ্দৌলা এবং বাহিনী। সেই নাটকের ইতিহাসের সঙ্গে মাঝেমধ্যে বাস্তবের ঘটনা মিশে যায়। কখনো আবার মহাভারত রামায়নও মিশে যেতে থাকে। সিরাজদ্দৌলা রাবণ দুঃশাসন থেকে শুরু করে পাড়ার ছেলে বাচ্চুকেও রণক্ষেত্রে পরাজিত করে দেয়। বাচ্চু তাদের আরোপিত মীরজাফর
মেথর পট্টিতে সবই প্রায় মুসলমান। বাবা ওখানে থাকবে না। সে নিয়েও এক অশান্তি। বাচ্চুর দলবল প্রায়ই সিরাজের পিছনে লাগে। বলে, –তোর নাম তো সিরাজ। তুই মোছলমান। গরু খাস। যা মোছলমান পাড়ায় গিয়ে থাক। এখানে এসেছিস কেন ? সিরাজ ওদের এড়িয়ে যায়। এখন গায়ের জোরে পারবে না। তার বয়স সবে বারো। ওদের চোদ্দ পনেরো বা তারও বেশি হতে পারে। এ গলিতে জন্ম মৃত্যুর সঠিক হিসাব কে কবে রেখেছে। কে কার বাপ, কে কার মা তার কোনো সত্যি মিথ্যে নেই এখানে। মুখে মুখে যা ঘোরে এখানে সেটাই সত্যি হয়ে যায়। যেমন শিবুর বাবা। শিবু যখন জন্মায় তখন সে এখানে ছিলই না। শিবুর যখন চার বছর বয়স তখন শিবুর মা ওর বাপকে ধরে এনে ঘরে বসালো। তারপর থেকে স্বপন পাত্র হল শিবুর বাবা। বয়সে মনে হয় শিবুর থেকে বছর পনেরো বড় হবে সে। শিবুর মায়ের থেকে অনেকখানি ছোট সে দেখলেই বোঝা যায়। তাতে কিছু হয় না। স্বপন পাত্রই এখন শিবুর বাবা। আবার শিবুর জন্মানোর পর শিবুর মায়ের আর কখনো পেট হয়নি কিন্তু শিবুর বাপ কোথা থেকে একটা মেয়েকে ধরে নিয়ে এসে শিবুর বোন বানিয়ে ঘরে রেখেছে। বলে নাকি আগের পক্ষের। সেই নিয়ে শিবুর বাপ আর মায়ের মধ্যে কী মারপিট। এখন সব সালটে গেছে। তবে শিবুর মায়ে আর বোনে প্রায়ই লাগে। ঝগড়া মারপিট। যাক গে ! এসব তো হতেই থাকে। এতে সিরাজের কী যায় আসে। সিরাজ ওই ফ্ল্যাটবাড়ির ছেলেগুলোর মতো হতে চায়। ফর্সা, পরিষ্কার, ধোপ দুরস্ত জামা কাপড় পরা, কী সুন্দর। ভালো ভালো কথা বলে। ওদের মতো হলে সিরাজ নাটকে নায়কের ভুমিকায় অভিনয় করতে পারবে। কেউ আটকাতে পারবে না সিরাজদ্দৌলার চরিত্রে অভিনয় করতে। বাপ বলে, – তোর বড়ো কেতা বেড়েছে আজকাল। মেথরের ঘরে বড় হচ্চিস ব্যাটা। কথাটা মনে না রাখলে পদে পদে লাথি খেতে হবে কয়ে রাখলাম। সিরাজ এসব কথায় গুরুত্ব দেয় না। আজকাল সে পড়াশুনাও শিখছে। পাড়ায় একটা পড়ার ক্লাস দেয় এনজিও দিদিমণিরা। হপ্তায় একদিন। সিরাজ ওই ক্লাস থেকে অনেককিছু শিখেছে। ওখানে যারা যারা যায় তারা সবাই প্রায় ইস্কুলে পড়ে। ওরা বেশি জানে, অনেকটা বেশি শিখে নেয়। সিরাজ সবে ইংরেজি এবিসিডি আর বাংলার ক খ শিখেছে। একটু আটকে যায় মাঝেমধ্যে কিন্তু মোটামুটি পারে। আর সিনেমা নাটকে পাট করতে গেলে অতকিছু খুব না জানলেও চলে সেসব জানে সিরাজ। একটু ইংরেজি বলতে জানলেই হলো। আর একটু নাচ গান করতে পারলেই হবে। সেসব কোনো অসুবিধা হবে না। পাড়ার পুজোতে প্যান্ডেলে নাচে সিরাজ। সবাই হাততালি দেয়। সলমান খানকে নকল করতে পারে। রনবীর কাপুরকে নকল করতে পারে। সেসব করে আনন্দ পায় ঠিকই কিন্তু ওই সিরাজদ্দৌলার চরিত্রে অভিনয় করতে না পারা পর্যন্ত সে যেন একটা ধাপও এগোতে পারে না স্বপ্নের দিকে। জিতেন বলে, – তুই ঠিক পারবি সিরাজ। একদিন দেখবি তুই ওই রোলে পাট করে সবার চোখ এই এত বড়ো রসগোল্লা করে দিয়েছিস। হাত ঘুরিয়ে রসগোল্লার সাইজও দেখিয়ে দেয় জিতেন। জিতেন সিরাজের খুব ভালো বন্ধু। জিতেন, বিলু আর গেঁড়ি সিরাজের ভালো বন্ধু। ওরা তিনজন মিলে প্রায়ই নাটক নাটক খেলে। গোপাদিদিমণির বলা গল্পগুলো নাটকের মতো করে অভিনয় করে। মুশকিল যে ওরা কেউই এখনো লিখতে জানে না, নাহলে ডায়ালগগুলো লিখে ফেলতে পারত। বিলুর সাতকুলে কেউ নেই। দূর সম্পর্কের কোনো কাকার সংসারে ফাইফরমাস খাটে আর বিনিময়ে খাওয়া দাওয়া পায়। গায়ে দেওয়ার জামাকাপড়। পড়াশুনা শিখবে কী করে। ইচ্ছাও করে না ওর। গেঁড়ি আবার বিধবা মায়ের চার নম্বর ছেলে। সংসারে এ বেলা খাবার জোটে তো ও বেলা জোটে না। সুতরাং সিরাজই ওদের একমাত্র গুরু যার ওপর ভরসা করে ওরা তরোয়াল নিয়ে যুদ্ধ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে। শেষ দুপুরের দিকে ওদের এইসব খেলা চলে। সিরাজদ্দৌলা এবং বাহিনী। সেই নাটকের ইতিহাসের সঙ্গে মাঝেমধ্যে বাস্তবের ঘটনা মিশে যায়। কখনো আবার মহাভারত রামায়নও মিশে যেতে থাকে। সিরাজদ্দৌলা রাবণ দুঃশাসন থেকে শুরু করে পাড়ার ছেলে বাচ্চুকেও রণক্ষেত্রে পরাজিত করে দেয়। বাচ্চু তাদের আরোপিত মীরজাফর। ইসমাইলকে মীরজাফর করা হয়। জিতেন বিলু গেঁড়ি কেউ মীরজাফর হতে চাইত না বলে একটা খেজুর গাছকে বাচ্চু তথা মীরজাফর বানাতে হতো। সেক্ষেত্রে অসুবিধা বিস্তর। এখন ইসমাইল সে অসুবিধা দূর করেছে। সে কখনো মীরজাফর কখনো বাচ্চু হয়ে সহ অভিনেতার সার্থক ভূমিকা পালন করছে। ইসমাইল মেথরপট্টির ছেলে। ইদানিং ও পাড়ার কয়েকজনের সঙ্গে সিরাজের বন্ধুত্ব হয়েছে। ইসমাইল, সাকেত, মীর ওরাও নাকি পাড়ায় নাটকের মহড়া দেয়। জিতেন, বিলুরা প্রথমে একটু কিন্তু কিন্তু করছিল ওদের সঙ্গে মিশতে। তারপর সিরাজের পাল্লায় পড়ে ওরাও মিশে গেছে এখন। দলটা ভারী হয়েছে। শেষ দুপুরে ওরাও এ পাড়ায় চলে আসে নাটক নাটক খেলতে। মাঝেমধ্যে ওরাও ওদের পাড়ায় যায়। দু একদিন বিলু আর গেঁড়ি বাড়িতে বিস্তর মারও খেয়েছে মোছলমানের ছেলেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর জন্য। তাও লুকিয়ে চুরিয়ে চলতে থাকে খেলাধুলা। মার খাওয়া তো ওদের রোজকার গল্প। মার খাওয়াকে ভয় পায় না সিরাজ অ্যান্ড কো। তবে বাচ্চুদের দল কয়েকদিন রাস্তায় সিরাজকে ধরে শাসিয়েছে। – তুই ব্যাটা মোছলমানের পো ওইজন্যে ওই পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খাতির। ওদের পাড়ায় থাকিস না কেন গিয়ে ? নাহলে তোর মায়ের কাছে যা। সে তো মোছলমানের পোষা বিল্লি। তারই তো পো তুই। হাত দিয়ে বিশ্রী ইঙ্গিত করে বাচ্চু। তারপর ব’লে, – বেয়াদপি কিছু দেখলে না চামড়া ছাড়িয়ে নেব বলে দিলাম। সিরাজও গা ঝাঁকা দিয়ে উত্তর দেয়, – যা যা দেখে নেব। ভয় পাই না তোদের। বাচ্চু একটা বাঁকা হাসি দিয়ে চলে যায় যে হাসির নিহিত অর্থ হলো সুযোগ পেলে বুঝিয়ে দেব।
এ নাটক সম্পূর্ণ নতুন। আজকের সিরাজদ্দৌলা। নবজন্ম হয়েছে সিরাজদ্দৌলার। সে প্রথমেই বেইমান লোকেদের খতম করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একের পর এক অন্যায়কে দমন করছে আজকের সিরাজদ্দৌলা পলাশী যুদ্ধের শিরস্ত্রাণ পরে। নাটকের গল্প শুনে গোপাদি খুব খুশি হয়েছিল। বলেছিল, তোকে আমি পড়াব সিরাজ। এইটুকু বয়সে এত সুন্দর কল্পনা তোর তুই তো অনেক বড় শিল্পী হবি রে বড়ো হয়ে। গোপাদি ওদের উচ্চারণ শিখিয়েছে। ডায়ালগগুলো ভদ্র সভ্য করেছে। বারো বছরের সিরাজের পরিণতবোধ বাইশ বছরের যুবকের মতো শানিয়ে উঠল। শুধু সিরাজের বাপ নিতাইচন্দ্রের মুখে কোনো হাসি নেই
আশ্বিনের শুরু। চারিদিকে পুজোর গন্ধ। সিরাজদের পাড়াতেও প্যান্ডেল হয়েছে। সিরাজরা একটা ছোট নাটক তৈরি করেছে। পুজোর একদিন সন্ধেবেলা সেই নাটক প্যান্ডেলের পাশের বাঁধা মণ্ডপে দেখানো হবে সকলকে। শিবুকাকে ধরে অনুমতি আদায় করেছে সিরাজ। উত্তেজনা চরমে। নাটক সম্পূর্ণ নতুন। আজকের সিরাজদ্দৌলা। নবজন্ম হয়েছে সিরাজদ্দৌলার। সে প্রথমেই বেইমান লোকেদের খতম করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একের পর এক অন্যায়কে দমন করছে আজকের সিরাজদ্দৌলা পলাশী যুদ্ধের শিরস্ত্রাণ পরে। নাটকের গল্প শুনে গোপাদি খুব খুশি হয়েছিল। বলেছিল, তোকে আমি পড়াব সিরাজ। এইটুকু বয়সে এত সুন্দর কল্পনা তোর তুই তো অনেক বড় শিল্পী হবি রে বড়ো হয়ে। গোপাদি রিহার্সাল করতেও খুব সাহায্য করেছে। ওদের উচ্চারণ শিখিয়েছে। ডায়ালগগুলো ভদ্র সভ্য করেছে। সিরাজের ভাষা তারা রোজকার জীবনের মতো মেঠো ছিল। সেসব ঠিক করা কম কঠিন কাজ নাকি। মেথরপট্টির ইসমাইলও রয়েছে ওদের নাটকে। তাই ওই পাড়ার অনেকেও আসবে নাটক দেখতে। সিরাজ তুমুল উত্তেজিত। সিরাজের বাপ শুধু কে জানে কেন ক্ষেপে আছে ওর ওপর। বাপ বলে চলেছে,
– নালা নদ্দমার ময়লা নালা নদ্দমায় থাকো, নোংরা জলের সঙ্গে বয়ে যাও ঢিমেতালে। গিয়ে তুমি নদীতেই মিশবে কিন্তু এমনভাবে মিশবে যাতে বোঝা যাবে না। বোঝা গেলি সব্বনাশ। নোংরা ঘোলা জলই পেরানের সত্য কিন্তু সে সত্য দেখা যেতি নেই। তুই দেখা দিচিস। নদীর উপরে পাঁক হয়ে ভেসে উঠিচিস। তুই সব্বনাশ ডাকবি একদিন শয়তান। শয়তান আছিস শয়তানই থাক। দ্যাবতা হতি যাস না। তোরে খেয়ে ফ্যালাবে, তোর সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও মরতি হবে শ্যাষম্যাষ। সিরাজ ক্ষেপে যায়। সে যত বড় হচ্ছে, রাগ বাড়ছে তার। শয়তান নামটাকে আর সহ্য করতে পারে না সে।
– শয়তান শয়তান করে ডাকবি না কয়ে দিলাম। লজ্জা করে না নিজের ছেলেকে শয়তান বলে ডাকিস। আমার নাম সিরাজ। আমাকে সিরাজ বলে ডাকবি লয় ডাকবি না।
নিতাইচন্দ্র ছুটে আসে মারতে। সিরাজও দরজার খিলখানা বাগিয়ে ধরে।
–খবরদার বাপ ! গায়ে হাত দিচিস কী মরিচিস। শয়তান কস তো আমারে। দেখবি তয় শয়তানের শয়তানি।
নিতাইচন্দ্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ছেলের এইরূপ আগে দেখেনি সে। থমকে দাঁড়িয়ে বলে, শুয়ারের বাচ্চা, তর এত বড়ো কতা। মুখ আজ ভেইঙে দেব তর দাঁড়া। নিতাই এগিয়ে আসতেই সিরাজ এলোপাথারি খিল ঘুরিয়ে দেয় হাওয়ায়। কপালে গিয়ে লাগে নিতাইয়ের। শালা বজ্জাত হারামি বলে সে কপাল চেপে বসে পড়ে। সিরাজ দৌড় লাগায়। এখানে থাকলে বাপ এখন পিটোবে। নাটক ভেস্তে যাবে ঝামেলা হলে। সে দৌড়ে পালায় পাড়ার বাইরে। ইসমাইলদের বাড়িতে। একদিন ওখানেই থাকে। তিনদিন বাদে পুজো শুরু। নবমীর দিন নাটক হবে। শিবুকাকে বলেছে পুজোর ক’দিন ময়লা নিতে বেরোবে না সে। অন্যসময় হলে শিবুকা খ্যাটখ্যাট করত কিন্তু এবারে ব্যাপার অন্য। শিবুকা জানে নাটকের মহড়ার কথা। জানেনা আর কে। সবাই জানে এখন যে সিরাজ একটা ছোটখাটো দল গঠন করেছে সে নাটকে আবার মোছলমানের ছেলে অভিনয় করেছে। গোপাদি একথা শুনে হেসে আকুল। বলে,- ওমা সিরাজ চরিত্র তো মুসলমান চরিত্র। হিঁদুদের এই এক সমস্যা। ইতিহাসের পাতায় মুসলমানের ঘরে ঢুকে তাকেও হিঁদু বলে দাবি করে চলে আসে। দুর্গাপুজার নবমীর দিন এলো। সকাল থেকেই সিরাজের উত্তেজনা চরমে। সে ভাবেওনি সত্যি সত্যি কোনোদিন সে কোনো নাটক এভাবে মঞ্চস্থ করতে পারবে। পাড়ার অনেকেই তাদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে। সে ভাবতেও পারেনি যে এভাবে মানুষজনের সাহায্য পাবে সে।
একটা কথা গোপাদি বলেছিল দু’একবার নাটকের মহড়া দেওয়ার সময়ে, কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি সিরাজ কথাটায়। সেই গুরুত্ব না দেওয়া কথাটাই শেষমেশ সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল যখন নাটকের দিন ইসমাইলকে খুঁজে পাওয়া গেল না। শুরু থেকেই জিতেন গেঁড়ি সবাই বারবার ইসমাইল আসছে না দেখে চিন্তা প্রকাশ করছিল। এক সিরাজ নিশ্চিন্ত ছিল যে ইসমাইল আসবেই। হতেই পারে না যে আসবে না। এতদিন মহড়া দিয়েছে, এত কাণ্ড কারখানা করে, প্রথমে লুকিয়ে চুরিয়ে পড়ে ব’লে কয়ে সকলের মত আদায় করে তবে ছেড়েছে। সেই ইসমাইল আসবে না নাটকের মঞ্চস্থ হওয়ার দিন সেকথা ভাবা যায় কীভাবে। কিন্তু ভাবতে হলো। ইসমাইল এলো না। কেন এলো না, গেল কোথায় ইত্যাদি খোঁজ করার সময় তখন ছিল না সিরাজের হাতে। ইসমাইলের জায়গায় গেঁড়ি সাপোর্ট দিল। সারাক্ষণ নাটকের মহড়ায় পড়ে থাকার জন্য প্রায় সব চরিত্রের সংলাপগুলোই মুখস্থ হয়ে গেছিল গেঁড়ির। ফলে ও ছাড়া ইসমাইলের জায়গা আর কেই বা মেক আপ দিত ? সবটা কী আর সে সামলাতে পারে ! একটু এদিকওদিক তো হবেই। তবুও নাটক প্রশংসিত হলো। রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে গেল নাটকের শেষে। নাটকের বক্তব্য পাড়ার সকলকে কাঁপিয়ে দিল। বেইমান, শ্ত্রু এবং অপরাধীদের শেষ করে তবেই আজকের সিরাজদ্দৌলার মৃত্যু। নাটকের শেষে সবাই সিরাজকে ঘাড়ে তুলে নাচতে শুরু করল। ইসমাইলের অনুপস্থিতির ব্যাপারটা চাপা পড়ে গেল পুরোপুরি। এলাকার কাউন্সিলর পর্যন্ত নাটক দেখে বিশেষ প্রশংসা করলেন। বললেন সিরাজ এবং তার দলকে নাটক করার জন্য যা যা সাহায্য করার তিনি করবেন। তাছাড়াও বেশ কিছু মেলা ও অনুষ্ঠানে যাতে ওদের নাটক করতে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় সে ব্যবস্থাও তিনিই করে দেবেন। বারো বছরের সিরাজের পরিণতবোধ বাইশ বছরের যুবকের মতো শানিয়ে উঠল। শুধু সিরাজের বাপ নিতাইচন্দ্রের মুখে কোনো হাসি নেই। সে যেন কেমন মিইয়ে গেল। আর কয়েকজনের মুখেও সেদিন অন্ধকার ছিল। সে ওই বাচ্চুদের দল। সমস্ত ঘটনাটাই তারা যেন লক্ষ্য করে যাচ্ছিল চুপচাপ।
স্বপ্নের মতো করে পরের দুটোদিন কেটে গেল। ইসমাইলের খোঁজ নিতে তাদের বাড়ি গেছিল সিরাজ। ওর কোন দূরসম্পর্কের চাচা মারা গেছে বলে ওকে নাকি হঠাৎ দেশের বাড়ি চলে যেতে হয়েছিল। অবাক লাগলেও সিরাজ আর রাগ পুষে রাখল না। হতেই পারে। ফিরে আসলে তখন দেখা যাবে নাহয়।
কিন্তু দু’দিন পর উৎসবের রং ছিটকে পড়া ওই কলোনি পাড়ার রূপ বদলে গেল। আর এভাবে যে এই রূপ বদল হবে সে আঁচ টের পেতে বেশ কিছু সময় লাগল অনেকেরই। ঘটনাটা সুত্রপাত হলো তখন, যখন পাড়ার দুর্গা মণ্ডপে লক্ষ্মী পুজোর দিন সকালে কেউ কোনো মৃত জন্তুর অবশেষ ফেলে গেল। যেই করুক এ-কাজ যে ইচ্ছাকৃত করা হয়েছে সে বোঝাই গেল। প্রথমে চারদিক নিস্তব্ধ, থমথমে থাকলেও কয়েকঘণ্টার মধ্যে শরৎ পল্লীর চেহারা চরিত্র পালটে গেল। একটা চাপা হুঙ্কার গর্জে উঠল যেন। কোত্থেকে একদল লোক দা হেঁসো সব নিয়ে এসে হুঙ্কার দিতে থাকল। বাড়িতে বাড়িতে দরজা বন্ধ হতে থাকল। পাড়ার রাস্তা শুনশান হতে থাকল। শুধু এক জয় শ্রীরাম ধ্বনি আর মুহুর্মুহু চিৎকার। পাড়ার হাতে গোনা কয়েকটা মুসলমান পরিবার ঘর ছেড়ে যে যার মতো পালাল। সিরাজ গেঁড়িদের বাড়িতে ছিল। ওকে জোর করে ঘর থেকে বার করে গেঁড়িদের বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিল ওর মা। সিরাজ নিজের ঘরের দিকে আসতে গিয়ে দেখল ডানদিকের উঠোনে দরজার বাইরে থেকে রফিকের দাদির পা দুটো দেখা যাচ্ছে। বুড়ি সর্বদা ওখানেই বসে থাকে। সিরাজ এগিয়ে গেল। সামনে যেতেই শিউরে উঠল। শরীর নিজে থেকেই কাঁপতে শুরু করল। রফিকের দাদির গলাঅর্ধেক লেগে আছে ধড়ের সঙ্গে। রক্ত ভেসে যাচ্ছে। সিরাজের গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না তবু সে ফিসফিসিয়ে রফিকের নাম ধরে দু’একবার ডাকল। কেউ নেই। সব দরজা জানলা খোলা। জিনিসপত্র লন্ডভণ্ড। সিরাজের গলা শুকিয়ে গেল। এতক্ষণ ও মেন রাস্তা ধরে হাঁটছিল এবার আড়াল খুঁজতে শুরু করল। ঘরগুলোর পিছন দিয়ে বেড়া ডিঙিয়ে নিজের ঘরে পৌঁছল। ঘরের দরজা বন্ধ। তালা ঝুলছে। একী! বাপ তো সেই সকালবেলা বেরিয়ে গেছে। আর এ তালাই বা কোথা থেকে এলো। কস্মিনকালে তাদের ঘরের দরজায় তালা পড়েনি। তালাটা ধরে বার চারকে টেনে ধরতে পাশ থেকে একটা গোঙানির শব্দ শুনতে পায় সিরাজ। লাফিয়ে বাঁ দিকে উঁকি দিতেই দেখে নিতাইচন্দ্র পড়ে আছে। পা দুটো হাঁটুর নিচ থেকে কেমন যেন কোণ তৈরি করেছে শরীরের উপরের অংশের সঙ্গে। মাথা থেকেও রক্ত পড়ছে। সিরাজ এক লাফে নিতাইয়ের কাছে আসে। – এ কী অবস্থা হয়েচে ? কে করল ? নিতাই হাত তুলে ইশারা ক’রে তাকে পালাতে বলে। সিরাজ এভাবে নিতাইকে ফেলে যায় কীভাবে। যাই বলুক না কেন নিতাই তো তার বাপ ! যত গালমন্দ করুক না কেন এ লোকটার গালমন্দ শুনে বেঁচে থাকাই তো তার অভ্যাস। সিরাজের গলা দিয়ে কেন জানি শব্দ বার হচ্ছিল না। সে আগের মতো ফিসফিসিয়ে বলে, – দাঁড়া বাপ, সবুর কর খানিক। কাউরে ডেইকে আনি। একদম ভয় পাবিনে। সিরাজ ঘর থেকে রাস্তায় নেমে আসে। চারদিক থেকে দৌড়ানোর শব্দ। তার ভয় করে। কিন্তু বাপটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দরকার। কাউকে ডাকতে হবে। সিরাজের কাছে মোবাইল ফোনও নেই। একটা ভাঙা ফোন জোগাড় হয়েছিল। ক’দিন আগে নিতাইচন্দ্র সে ফোন কেড়ে নেয়। সেকথা মনে পড়ে ফের নিতাইয়ের কাছে গিয়ে ওর জামা প্যান্টের পকেট হাতড়ায় সিরাজ। যদি পাওয়া যায় ফোনখানা। যদি পাওয়া যায় ! কিন্তু পাওয়া যায় না। ঘরেও ঢোকার উপায় নেই তালা ভাঙা ছাড়া। তালা ভাঙবে কী দিয়ে সে। রাস্তায় নেমে এসে কিংকর্তব্যবিমুঢ় এর মতো হাঁটতে থাকে সিরাজ। কান্না পায় তার। গলা ছেড়ে কান্না আসে। মায়ের কথা মনে পড়ে। কেন ছেড়ে চলে গেল মা। সে এখন কোথায় যাবে। পিছন থেকে জয় শ্রীরাম ধ্বনি এগিয়ে আসে। সিরাজ পাশের আম গাছের ঝোপের পিছনে চলে যায়। গুঁড়ি মেরে বসে থাকে। পাতার ফাঁক দিয়ে দলটাকে দেখে। কী আশ্চর্য অর্ধেক লোক তো এ-পাড়ারই নয়। এরা কারা কোথা থেকে এসে হাঙ্গামা করছে ! তবে বাচ্চুকে দেখতে পায় সিরাজ। হাতে একটা দাঁ নিয়ে ঘুরছে। সঙ্গে ওর দু’একজন সাঙ্গপাঙ্গ রয়েছে। দলটা ওদের বাড়ির কাছে এসে একবার থামল। জানলা দিয়ে উঁকি মেরে ভিতরটা দেখে, নিতাইয়ের দিকে তাকিয়ে ফের চলে গেল। ওরা মনে হয় ওকেই খুঁজছে। একবার হাতে পেলে আজ আর রক্ষে নেই। প্রায় এক ঘণ্টা ওই ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকার পর বেরোল সিরাজ। ঘুরপথে এ গলি, ও-গলি ঘুরে বড় রাস্তায় এলো। হাসপাতালে যেতে হবে তাকে। ওখানে কার্তিককাকা আছে লিফটের দারোয়ান। খুব ভালোবাসে সিরাজকে। ওকে বলে বাপের কিছু একটা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। করতেই হবে। সিরাজ দৌড়তে গিয়েও পিছন থেকে কারো গলার শব্দ শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে। এ তো ইসমাইল। এ কোত্থেকে এলো ? শালা বেইমান ! মুখ ঘুরিয়ে নেয় সে। ইসমাইল ছুটে আসে। সিরাজের হাত টেনে ধরে। রাগ করিস না ভাইজান। আমার উপায় ছিল না কোনো। কিন্তু সে পরে বলব নাহয়। এখন তুই চল আমার সঙ্গে। – কোথায়? সিরাজ হাত ছাড়িয়ে নেয়। কোথায় যাব আমি ?
– তোর মায়ের কাছে।
– মায়ের কাছে ?
– হ্যাঁ, আমিনুল চাচার বাড়ি। তোর মা তো তাকেই নিকে করেছে।
– ঘেন্নায় নাক কুঁচকে ওঠে সিরাজের। সে পিছন ঘুরে ফের চলতে শুরু করে।
ইসমাইল পিছন পিছন আসে। – সিরাজ আমার সঙ্গে চল ভাই। এখানে মেরে ফেলবে তোকে। সবাই জানে তুই আমিনুল চাচার সন্তান। মণ্ডপে পশুর দেহ ফেলার ঘটনাটা ইচ্ছে করে করেছে তোকে মারার জন্য। চল ভাই আমার। ইসমাইল সিরাজের কাঁধে হাত রাখে।
সিরাজ হাত সরিয়ে নেয়। কান্নায় গলা আটকে আসে তার।
– বাপ রে মেরিচে ইসমাইল। মরে কী বাঁচে ঠিক নেই তার। চিকিৎসে করাতে হবে। আমি মায়েরে চিনি না। আমিনুল চাচাকে চিনি না। আমার বাপের নাম নিতাইচন্দ্র। আমি শুধু তারেই চিনি।
– তোর কথা কেউ মানবে না সিরাজ। সবাই তোকে মোছলমানের ছেলেই জানে। মেরে ফেলবে তোকে।
– ফেলুক গে। তুই যা। নিজে বেইচে থাক যা। মা’রে কয়ে দিস আমি যাব না। বাপ মরলেও নয় বাঁচলেও তো নয়ই। সিরাজ আমার সত্যকার নাম নয় ইসমাইল। আমি শয়তান। শয়তানের বাচ্চা শয়তান। না হিঁদু না মোছলমান। ইসমাইল আর কিছু বলার আগেই সিরাজ হাসপাতালের দিকে রওনা দেয়। বাপরে বাঁচাতেই হবে। বেইমানেদের সঙ্গে লড়েছিল আজকের সিরাজদ্দৌলা। এখন ভগবানের সঙ্গে লড়বে শয়তান।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us








