- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- অক্টোবর ৫, ২০২৫
শার্দুল
অলঙ্করণ : দেব সরকার
১
ইস !
তীব্র অস্বস্তি প্রকাশ করলেন ঈশা খাঁ ।
হাটখোলার তলপেট থেকে কসাইগুলো তাদের দোকান রাজ্য সড়কের উপরে এনে হাজির করেছে । আর কোনো রাখঢাক রইল না ।
সারি সারি দোকানে রক্তমাখা ঝুলন্ত সিনা ও পাটায় পাতা দাপনা চোখে পড়তেই গা ঘিনঘিন করে ওঠে ঈশা খাঁর। মাংসের তিনি ভক্ত, কিন্তু এতটা নগ্নতা তাঁর সয় না ।
গাড়িতে পাশে বসা স্ত্রী ফুলমতিকে কনুইয়ের ধাক্কা দিয়ে ঈশা খাঁ বিস্ময় মিশ্রিত উষ্মা প্রকাশ করে বললেন, কাণ্ডজ্ঞান দেখেছ শালা কসাইগুলোর !
রাগের মাথায় মনিবের মুখ থেকে ফচ করে একটা অশালীন শব্দ বেরিয়ে পড়ায় ফিচ করে একবার হেসে ফেলে ড্রাইভার নফর ।
ফুলমতি যথেষ্ট অস্বস্তি প্রকাশ করে বলল, এক সপ্তা আগেও তো এই রাস্তা ধরে গেলুম, তখন তো দেখিনি এতটা খোলামেলা !
ঈশা খাঁ খানিকটা উদ্বিগ্ন, বাজার কমিটির লোকজনের উদ্দেশে ভর্ৎসনাজ্ঞাপন করে স্ত্রীকে বললেন, বিশ্বাসরাও একবার ভাবল না যে, গ্রামে ক-ঘর প্রামাণিক রয়েছে ? তাদের তো খারাপ লাগতে পারে !
স্বামীর মতিগতি বুঝে তালে তাল মিলিয়ে ফুলমতি বললেন, এরেই বলে পায় পা দে ঝগড়া করা ! একটা করে পর্দা অন্তত টাঙাতি পারত !
লজ্জায় আত্মধিক্কারে ফেটে পড়ে ঈশা খাঁশিউরে উঠলেন, ছি ছি ছি !
পুরোনো অ্যাম্বাসাডর হাটখোলা পেরিয়ে রাজ্য সড়ক ছেড়ে ক্লাবের পাশ দিয়ে ডাইনে নেমে গেল খাঁ-পাড়ার পথে । একটু গিয়েই নাপিতপাড়া । তারপর মসজিদ । তারপর ঈশা খাঁর দু-তলা বাড়ি ।
পাড়ার এমুড়ো থেকে ওমুড়ো পর্যন্ত সব ঘুরে ফিরে ঈশা খাঁ প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে নফরকে বললেন, সব উচ্ছন্নে গেল যে, নফো ! একটা ‘হেই’ বলার লোক নেই ! পাঁচ বছর আগেও তো এরকম ছিল না। এদের যে আচ্ছা করে সব টাইট করা দরকার !
ঈশা খাঁ সস্ত্রীক পাঁচ বছর খাঁ-পাড়ার বাড়িতে ছিলেন না । ছিলেন না মানে কলকাতার কলুতলায় তাঁর দাদুর আমলের দু-তলা বাড়িতে থাকতেন, আর পনেরো দিনে একবার বা কখনো মাসে একবার, গ্রামে এসে একদিন করে কাটিয়ে যেতেন । তাঁর একমাত্র ছেলে মিশা ডাক্তারি পড়ছিল, মেডিকেল কলেজে । পাশ করে মিশা বেরিয়ে গেছে ।
আমেরিকায় সুপরিচিত গবেষক । শিকাগোয় থাকে । কাজে কাজেই ঈশা খাঁর আর কলকাতায় পড়ে থাকার দরকার নেই । সেখানে বাড়তি কিছু জিনিস ছিল । গত সপ্তাহে টেম্পু করে সেসব মালপত্র আনা হয়ে গেছে । আজ তাঁরা নিজেরা ফিরছেন ।
কিন্তু ফেরার পিণ্ডি চটকে গেল হাটখোলায় ওই রক্তমাংসের দৃশ্য দেখে। পাড়ার পথে ঢুকেও শুধু খারাপ খারাপ দৃশ্য চোখে পড়ছে । ঢালাই পথের দু-ধারে পাতলা পাতলা বুনো কচুগাছ আর তার তলায় ঢালু হয়ে নেমেছে দুর্বাদাম। এই সবুজের উপরে তাল তাল মলমূত্র । দুর্গন্ধ ছাড়ছে। কোন্ জানোয়ারের কাজ ? মনে মনে অকাজ করা মূর্খকে গালিগালাজ করেন ঈশা খাঁ আর নাক সিটকান । ইত্যবসরে আধঘোড়ে দুটো ছোকরা বিড়ি টানতে টানতে বেরিয়ে গেল গাড়ির ধার ঘেঁষে, কোনো তোয়াক্কা করল না। উজবুক দুটোর ভাবভঙ্গি দেখে পিত্তিজ্বলে গেল মোড়লপোতার । তাঁর মনে হল টেনে দুটো চড় কষিয়ে দেন তাদের কানের গোড়ায়। টগবগ করে ফুটতে থাকল তাঁর রক্ত । রক্তের প্রবাহে ফোঁস ফোঁস করে উগ্র হলো তাঁর চোদ্দ পুরুষের রাশ মেজাজ । ঈশা খাঁর ইচ্ছে করে, এক্ষুনি বাপদাদার মতো মোড়ল হয়ে ছড়ি ঘোরাবেন যত বেয়াদব যত বদমায়েশের উপর । ইচ্ছে করে মোড়ল হয়ে পাড়ার যত ছেলেপিলে আর তাদের বাপচাচাদের আচ্ছা করে দাবড়ে দেন । দাবড়ে দিয়ে সাইজ করেন !
২
কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরে কোথায় দুদিন বসে শুয়ে ঘুমিয়ে আয়েশ করবেন, তা নয়, ঈশা খাঁ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন বাড়িতে ফিরতে না ফিরতে ! ফুলমতি জানে, মাঝেমধ্যে বাতিকগ্রস্ত হয়ে পড়ার ব্যায়রাম অবশ্য আগাগোড়াই ঈশা খাঁর রয়েছে । রাতে তাঁর ভালো ঘুমই হলো না ।
সকালে খাঁ-পাড়ায় সূর্য উঠলে সঙ্গে সঙ্গে আলো ছড়িয়ে পড়ে নাপিতপাড়ার দিকে। বিছানা থেকে উঠে ঈশা খাঁ নফরকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ায় বেড়াতে বেরিয়ে পড়লেন । দেখলেন, পাড়ার ছেলেপিলের লেখাপড়ায় মন নেই। তারা যা খুশি করে। সকাল হতে না হতেই তারা খেলতে শুরু করেছে। শুধু খেলা আর খেলা ! স্কুলের বেলা বয়ে যায়। তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা খেয়াল থাকে না। দুপুর হয়ে যায়, তবু তারা খেলা শেষ করে খেলার মাঠ থেকে বাড়ি ফেরে না । তাদের সময়মতো গা ধোওয়া নেই, খাওয়া নেই। খালি চিৎকার চেঁচামেচি। খিস্তি খেউড়।
পাড়ার এমুড়ো থেকে ওমুড়ো পর্যন্ত সব ঘুরে ফিরে ঈশা খাঁ প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে নফরকে বললেন, সব উচ্ছন্নে গেল যে, নফো ! একটা ‘হেই’ বলার লোক নেই ! পাঁচ বছর আগেও তো এরকম ছিল না । এদের যে আচ্ছা করে সব টাইট করা দরকার !
নফর মাইনে পায়, সঙ্গত দেয়। অবাস্তব বাসনাকে সে প্রশ্রয় কেন দেবে ? বলল, তাই বলে পরের ছেলেপিলেকে আপনি টাইট দেবেন ? গাঁয়ে মানবে না, আপনি মোড়ল হলি তো হবে না, মনিব ! যুগ বদলে গেছে। আপনি কী করবেন ?
ঈশা খাঁ রুখে উঠলেন নফরের উপরে এবং চড়া সুরে ধমক দিয়ে বললেন, কী করব মানে ? এই সব উচ্ছৃঙ্খলা আমি মুখ বুজিয়ে দেখে যাব ? এখন আমি সম্পূর্ণ ফ্রি । দরকারে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াব।
নফর বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল, সাবধান, মনিব ! নতুন ভূমিকায় যদি নামতি চান, তবে একটু সতর্ক হয়ে নামবেন। নিজে নিজে মোড়ল হয়ে বসলেন, আর কেউ আপনাকে মানল না, এমন ঘটলে, ব্যাপারটা পুরোপুরি ফালতু হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, সেটা হাস্যকর হবে ।
গোসলের আগে গায়ে সর্ষের তেল মর্দন করিয়ে চামড়া করলেন টানটান ছিলার মতো। ক-দিনেই তিনি হয়ে উঠলেন শাণিত তরোয়াল। মাথার চুল ছাটা বন্ধ করে বাবরি করলেন বড়ো ঝাঁকড়া। সিংহের কেশরেরমতো ঘাড় পর্যন্ত ঝুলে পড়ল তাঁর কেশগুচ্ছ। ঈশা খাঁ আর সেই ঈশা খাঁ নয়, হয়ে উঠলেন সত্যিকারের পুরুষসিংহ, চোখে মুখে বিস্ফারিত যাঁর বীরবিক্রম !
ঈশা খাঁ মুখে কোনো জবাব না দিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। ভাবলেন সত্যি কথাই বলছে নফর। মোড়লই যদি হতে হয়, তবে তাঁকে হতে হবে নামেও মোড়ল, কাজেও মোড়ল। সবাই তাঁকে মান্য করে চলবে । শুধু ছেলেপিলে নয়, ধ্যাঙড়া চ্যাঙড়া আধঘোড়ে ছোকরাগুলোও যেন ভয় পায় তাঁকে। কোনো অন্যায় অপরাধ করার আগে তাঁর ভয়ঙ্কর চেহারাখানা চোখের সামনে যেন ভেসে ওঠে গুন্ডা বদমায়েশদের !
মোড়ল হবেন, মোড়ল হবেন, মাথার মধ্যে সারাক্ষণ এই চিন্তা । তীব্র একটা তাগিদ, স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত একটা জেদ প্রবল হয়ে ওঠে ভেতরে ভেতরে। ঈশা খাঁ মনে মনে ঠিক করলেন তবে উপযুক্ত রকম একখান ভাবমূর্তিও তো গড়ে তোলা চাই । কী করা যায় তাহলে ? অনেক ভেবেচিন্তে তিনি নফরের সঙ্গে শলা পরামর্শ করে শরীরচর্চা শুরু করে দিলেন । খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে মনোযোগী হলেন । ছোলা বাদাম আর কাজু আখরোট খেয়ে মেদ ঝরালেন।
নফরকে দিয়ে গোসলের আগে গায়ে সর্ষের তেল মর্দন করিয়ে চামড়া করলেন টানটান ছিলার মতো। ক-দিনেই তিনি হয়ে উঠলেন শাণিত তরোয়াল। মাথার চুল ছাটা বন্ধ করে বাবরি করলেন বড়ো ঝাঁকড়া। সিংহের কেশরের মতো ঘাড় পর্যন্ত ঝুলে পড়ল তাঁর কেশগুচ্ছ। ঈশা খাঁ আর সেই ঈশা খাঁ নয়, হয়ে উঠলেন সত্যিকারের পুরুষসিংহ, চোখে মুখে বিস্ফারিত যাঁর বীরবিক্রম !
মনিবের চেহারাখানা দেখে নফরের পর্যন্ত ভাব হয়ে গেল শুরু গম্ভীর। নফর তো শুধুমাত্র ড্রাইভার বা তালবেলেম নয়। ঈশা খাঁর সে খয়ের খাঁও। মনিবকে তোষামোদ করে তার দিন কাটে। ঈশা খাঁকে খুশি করতে নফর বলল, মোচটা কি আর একটু ঝুলিয়ে দেবেন, মনিব, তাহলেই একেবারে বীরাপ্পন। আর শুধু বাবরিতে হবে কেন ? শিরোচূড়ায় চড়াতে হবে সাহেবি হ্যাট। তবেই তো পুরোপুরি মানাবে।
অতএব ঝুলে গেল মোচ । কলকাতা থেকে এল দামী একখান সাহেবি টুপি । টুপি মাথায় পরে ঈশা খাঁ আয়না দেখলেন । নিজেকে তাঁর মনে হল জবরদস্ত এক বাহাদুর । তিনি নফরকে জিজ্ঞেস করলেন, কি রে, খুব কি রাগী রাগী লাগছে ?
নফর ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, ঠিক যেন ওয়ারেন হেস্টিংস !
হেস্টিংসের গল্প নফর তার মনিবের কাছে শুনেছে । মনিব তো ইতিহাসে অনার্স !
ওয়ারেন হেস্টিংস। ঈশা খাঁ চোখ উল্টে বললেন, বড়োলাট তো জানি খুব ঠাণ্ডা মাথার মানুষ ছিল ! মাথায় তো চুল ছিল না !
নফর বলল, ওই হল আর কী !
ঈশা খাঁ বললেন, আচ্ছা সে না হয় হল ! বাবরিতে যে পাক ধরেছে । মেহেন্দি করলে কেমন হয় ? মোড়ল বলে মানাবে, না কি খেলো হয়ে যাবেন ?
নফর স্মিত হাসি ছড়িয়ে বলল, খেলো কেন হবে, মনিব ? এই বয়সে নবাব বাদশারা তো হেয়ার ডাই করতেন ! আপনি কি ভুলে গেছেন ? আপনার আব্বাজান মরহুম মুশা খাঁ তো শেষের দিকে চুলে মেহেন্দি করতেন !
হাঁ হাঁ, মনে পড়েছে ঈশা খাঁর ।
নফরের কথা মতো মোকাম থেকে স্বপন প্রামাণিককে ডেকে এনে ত্বরিতে বাড়িতে বসল টেম্পোরারি সেলুন । সাফসুতরো করার জন্যে স্বপনের সঙ্গে এল তার ভাই সঞ্জয় । তিন ঘণ্টা ধরে শ্যাম্পু দিয়ে বাবরি সাফ করে পরম যত্নে মেহেন্দি লাগিয়ে কেশরঞ্জন করা হলো । ঈশা খাঁর গোঁফ দাড়ির জঙ্গল প্রুনিং করে এমন বানানো হল শাকল যে, তিনি অবিকল হয়ে গেলেন নয়ের দশকের যাত্রাপালার শার্দুল জারাক খাঁ !
নফর তুড়ি মেরে বলল, হেব্বিহেব্বি !
সে সখ করে তার মনিবের হাতে দিল গালা বার্নিশ করা একখান বেত্রযষ্ঠি । ঈশা খাঁআন্ডার ওয়ারের উপরে পরলেন ধবধবে সাদা আর তুলোট নরম ঈজিপসিয়ান থান । শীত গত হয়ে বসন্ত এসে গেছে । তাই গায়ে চড়িয়ে নিয়েছেন খাঁ চারখানা পকেটের একখানা গেরুয়া ছলুকা ।
ঈশা খাঁ এবার নফরকে বললেন, চল !
৩
বিরাট বড়ো গ্রাম। পুবে, মাঝে ও পশ্চিমে তার তিনখানা পাড়া । সবটাই এককালে মুশা মোড়লের বাপচাচা হাজের মোড়ল ও নাজের মোড়লের জোতদারিতে ছিল। তাদের দুই ভাইয়ের দাপটে টু শব্দটি করতে সাহস পেত না কেউ । তখন তো সবাই ছিল গরিব প্রজা । দুই মোড়ল ছিল জীবন মরণের হর্তাকর্তা । এখন সেদিন গেছে। দেশে গ্রামে সবাই রাজা । কে আর কাকে পৌঁছে ? তবু সাধ হলো খাঁর মোড়ল হবেন। ঈশা খাঁ মোড়ল সেজে বের হচ্ছেন তাঁর গ্রাম পরিদর্শনে।
খাঁদের দু-তলা বাড়ির চুড়োয় চিলেকোঠা পর্যন্ত ছাদ । ছাদের বর্ডারে চকচক করে সবুজ রং । সাদা রঙের চিলেকোঠার সবুজ রঙের বর্ডার চোখ বশ করে নেয় । চুড়ো পর্যন্ত মাথা তুলে আবিষ্ট চোখে ইশারা করে ঈশা খাঁ বললেন, আমি চললাম ।
উপর থেকে ধীরে নেমে এল প্রসন্ন, উদ্বিগ্ন নারীকণ্ঠের আওয়াজ, সা ব ধা ন !
ফুলমণির এইরকম বাতিক ভালো লাগে না। একমাত্র পুত্রকে নিয়ে জীবনের দিনগুলি আর রাতগুলি তার নির্ঝঞ্ঝাটে কেটেছে এতদিন । ছেলেটি চলে গেল। একটা শূন্যতা হৃদয়জুড়ে হাহাকার করে যায় । ঈশা খাঁ এই সব হুড় হাঙ্গামা করে দেশ উদ্ধারে না নেমে শান্তিতে ঘরে থাকলেই তার ভালো লাগত। কে আর কার কথা শোনে ? এক কালে ইয়ার গান দিয়ে পাখি মারার বাতিক উঠেছিল খুব। বারন করলে তিনি শোনেননি । ফুটবল নিয়ে কিছুদিন তিনি কী পাগলামি না করলেন ! এখন আবার এই নতুন বাতিক । মোড়ল হবেন ! সব দাবড়ে সাইজ করবেন। এসব পছন্দ না হলেও মুখ ফুটে বারন করার জো নেই ফুলমতির । ঈশা খাঁকে সাবধান করে দিয়ে ফুলমতি নফরের বিবি রাইমাকে নিয়ে হেঁসেলে ঢোকে ।
নফর একটু বাড়তি সতর্ক হয়, জিজ্ঞেস করল, বন্দুকটা কি সঙ্গে করে নিতে হবে না, মনিব ?
সে গল্প শুনে রেখেছে তার মনিবের দাদাজি হাজের মোড়ল তাদের বেজুয়ার বিলে যখন জমি দখলের লড়াই হয় তখন সঙ্গে ফটাং করে দুনলা বন্দুক বের করেছিল। সে ভাবল বাইরে বের হবার সময় জমিদার জোতদার লোক বন্দুক টন্দুক সঙ্গে রাখতেই পারে !
ঈশা খাঁ আদৌও পছন্দ করলেন না নফরের অতি সতর্কতা । চোখে তাঁর দাদাজানহাজের মোড়লের চাদির চশমা । চশমার ডাংখান নেড়েচেড়ে কানে ঠিক করে বসিয়ে নিয়ে নফরকে আচ্ছা করে একখানা খিস্তি দিয়ে ঈশা খাঁ বললেন, জ্ঞানবুদ্ধি আর কবে তোমার হবে ? এই তুমি পরামর্শদাতা ? যাচ্ছি আমি গ্রাম পরিদর্শনে, আর তুমি ভাবলে বন্দুক নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিলে আমি খুশি হব ? বাতা চাটুকার ! আমি কি জমির লড়াই করতে যাচ্ছি ? আমি কি ভড়কাতে যাচ্ছি কাউকে ? অকালপক্ক ! আমড়াকাঠের ঢেঁকি । বেরুনোর মুখে দিল আমার মুডখানা খারাপ করে !
মোড়ল সকাল সন্ধ্যা নফরকে সঙ্গে নিয়ে কড়া পাহারা দিয়ে হাঁক ছেড়ে যান, খবরদার ! বইখাতা ছেড়ে বাইরে বের হলেই আমি পিটিয়ে লাল করে দেব ! প্রাইভেট টিউটর পর্যন্ত খাঁ-পাড়ায় তটস্থ। কখন ঈশা খাঁ এসে কী ধরে বসেন তার ঠিক নেই! তিনি খাতা কলম যোগান দিয়ে দিচ্ছেন। ফুটবল কিনে দিচ্ছেন। খেলায় হুইসিল বাজিয়ে নিজেই হচ্ছেন রেফারি।
নফর সঙ্গে সঙ্গে, কান মলল, নাক মলল, বলল, সরি, মনিব, সরি ! ঘাট হয়েছে আমার। অনেক দিন পরে বের হচ্ছি কি না, তাই মনের খুশিতে বেফাঁস বলে ফেলিছি বন্দুকের কথাটা ! আর ভুল হবে না, মনিব !
অল্পতে ক্ষমা করে দিয়ে ঈশা খাঁ হাত বাড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন, পান লাগবে একখান !
এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে নফর কাঁধের সাইডব্যাগ থেকে পানের কৌটো বের করে একটা জর্দাপান বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এই তো পান !
ঈশা খাঁ মুখে পান চিবুতে চিবুতে, হাতে ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে, যতদূর পর্যন্ত দু-চোখ যায়, ততদূর পর্যন্ত আকাশ দেখলেন, গাছপালা দেখলেন। তারপর নীল আকাশ যেখানে মাটিতে নেমে গেছে সেখানে আটকে গেল তাঁর চোখ। গ্রামের মানুষের ঘরবাড়ি ও তাদের উন্নয়ন দেখলেন। রাস্তা হয়েছে। মোড়ে মোড়ে দোকান হয়েছে। ঘরে ঘরে সেলাইয়ের কারখানা ও ভাজাভুজির আড়ৎ হয়েছে। বুঝতে পারলেন উড়ে উড়ে টাকা আসছে মেয়ে-মরদের হাতে। কিন্তু তবু তাঁর মনে হলো, কী যেন একটা নেই। কী যেন একটা খুঁজে পান না ঈশা খাঁ, আগের মতো ।
ঈশা খাঁ নফরকে জিজ্ঞেস করলেন, এত কিছু তো হয়েছে দেখছি । তবু কী যেন একটা খুঁজে পাচ্ছিনে। কী যেন নেই ! অভাবটা কি বুঝছ ? নফর বলল, হুঁ, একটা অভাব আমিও টের পাচ্ছি । তবে আমি যেটা ভাবছি, সেটা আপনি নাও ভাবতে পারেন । ঈশা খাঁ বললেন, সে হতে পারে । কিন্তু তবু তুই কী অভাব টের পাচ্ছিস সেটা তো বল, শুনি ।
নফর মাথা চুলকে বলল, আমি দেখছি মানুষের আর আগের মতো ভয়ডর নেই । তাদের ভয়ের বড্ড অভাব। তারা মোড়ল টোড়ল আর মানে না । মোড়লের সামনে বিড়ি টানে। মোড়ল পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে, তা দেখেও নির্ভয়ে তারা রাস্তার পাশে পেচ্ছাপ করতে বসে। মোড়লের সামনে ঝগড়া করে, খিস্তি করে। এমনকি, ছোটো ছোটো ছেলে ছোকরা পর্যন্ত পাশ দিয়ে হুস করে মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বেরিয়ে যায়।
ঈশা খাঁ বললেন, এটা তো তুই ঠিকই ধরেছিস যে, মানুষ আর আগের মতো ভয় পায় না । আমি অবশ্য এই ভয়ের অভাবের কথা ভাবিনি । তাহলে কি আপনি শৃঙ্খলার অভাবের কথা ভেবেছেন ? জিজ্ঞেস করল নফর।
বটে, এটাও একটা অভাব, বললেন ঈশা খাঁ, আমি এই অভাবের কথাও ভাবিনি।
তবে কি শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে কিছু অভাব আপনার চোখে ধরা পড়ল, জাহাঁপনা ? নফর মাথা চুলকাতে চুলকাতে জিজ্ঞেস করল।
ঈশা খাঁ বললেন, ব্যাপারটা এ রকমই কিছু একটা হবে মনে হচ্ছে । ভীষণ ফিশি ! ফিনফিনে বাতাসের মতো সূক্ষ্ম। বোঝা যাচ্ছে, বলা যাচ্ছে না । আমার দাদাজানের জামানায়, আমার পরিষ্কার মনে আছে, সকাল সন্ধে পাড়ার ছেলেপিলে বইখাতা আর স্লেট-পেনসিল নিয়ে না বসলে বাঁচতে পারত না । দাদাজানের কড়া পাহারা ছিল । আমাদের উঠোনে বিরাট যে বেলগাছটা ছিল না ! নিশ্চয়ই তার কথা তোর মনে আছে । উঠোনে তিন চারটে ধানের গাদা থাকত। শীতকালে ধানের গাদা ঝাড়া হত । থেকে থেকে বেল গাছের পাকা বেল একটা একটা করে পড়ত খানিক পরে পরে। দাদাজান বেল কুড়িয়ে এনে বিচলির উপর বসে ফাটিয়ে তা কেঁকেকেঁকে খেত আর খেয়াল রাখত সারা পাড়ার দিকে। হাতের কাছে থাকত লাঠি, পাকা বাঁশের মাথামোটা লাঠি।
বউ-ঝিদের কেউ-কেদুলি করার সাহস ছিল না। ছোটো ভাইরা, ভাইপোরা পর্যন্ত সামনে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে কথা বলতে ভয় পেত। তখন দাদাজানের দাপটে থরহরি কম্পমান ছিল এ তল্লাট।
মনিবের প্রতিটি কথায় তাল ঠুকে যায় নফর, দাপট বলে দাপট ! তা কি আর আমিও নিজের চোখি দেখিনি ?
নফর তার মনিবের থেকে মাত্র দু-বছরের ছোটো । মনিবের বাপ তাকে এক প্রকার পথের থেকে কুড়িয়ে এনে ঠাঁই দিয়েছিল বাড়িতে নিজের ছেলের খেলার সাথী করে । নফর বড়ো হয়েছে । বিয়ে করেছে । তারও এক ছেলে। কিন্তু তার খাঁ-বাড়ি ছাড়ার উপায় হয়নি । ছেলে তার বউ ছেলে নিয়ে তার মতো আছে । নফর সস্ত্রীক তার ওমর কাটিয়ে দিল ঈশা খাঁর সাথী হয়ে থেকে, অবিচ্ছেদ্য । কদর করে খাঁকে সে ‘মনিব’ বলে ডাকে । সে সায় না দিলে ঈশা খাঁ তাঁর কথায় কাজে কোনো জোর পান না ।
ঈশা খাঁ বললেন, সে দাপট আবার দেখাতে হবে ! পাড়ার আমি হাল ফিরিয়ে ছাড়ব !
নফর সঙ্গত দিয়ে বলল, ধরেন দেখি হাল ! সব একেবারে যা মনে করেছে তাই মনে করেছে !
8
এরপর নফরকে সঙ্গে নিয়ে কী এক খেলায় যেন মেতে উঠলেন ঈশা খাঁ ।
ভাবলেন, ছেলে মিশা তার জীবনের সাফল্যের রাজপথে উঠে গেছে । তাই আর কেন পিছুটান ? নিজে তিনি জীবনে এক দিনের জন্যও কোনো কিছুর অভাব বোধ করেননি । বাপের রেখে যাওয়া অগাধ সঞ্চয় তাঁর ব্যাঙ্কে । সুদে আসলে বেড়েই চলেছে সেই আমানত। নিরবধি আসছে তাঁর ঘেরির জমির লিজ, চাষের জমির লিজ, আমবাগানের লিজ । কলকাতার বাড়ির নীচের তলার ছ-টা ঘরের মোটা ভাড়া আসছে মাসে মাসে । কী হবে এত টাকা ? তিনি জানেন বাকি জীবন দুই হাতে উড়িয়ে দিলেও ফুরিয়ে যাবে না তাঁর টাকা । উৎসর্গের খেলায় মেতে উঠলেন । উজাড় করে দিতে লাগলেন নিজেকে ।
সরকার গরিবের ঘরের টাকা দেয়। সেই টাকায় শেষ পর্যন্ত আর চাল ছাওয়ার পয়সা থাকে না কুরবানের । ঈশা খাঁ ঊনপাঁজুরে কুরবানকে বলে দেন, কেষ্টকাকার টালি কারখানায় যা, কাকাকে বলা আছে, টালি দিয়ে দেবে !
বঙ্কোর ছোটো মেয়ে বারো ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে । সরকার তার বিয়ের জন্যে পঁচিশ হাজার দিয়েছে। ওতে কি আর সবটা হয় ? হাত খুলে দেন ঈশা খাঁ । কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে বঙ্কো বলে, বড়ো বাঁচালেন, চাচা !
খাঁ-পাড়ার একটা ছেলেপিলেরও আর উড়নচণ্ডী হবার উপায় নেই এখন ।
মোড়ল সকাল সন্ধ্যা নফরকে সঙ্গে নিয়ে কড়া পাহারা দিয়ে হাঁক ছেড়ে যান, খবরদার ! বইখাতা ছেড়ে বাইরে বের হলেই আমি পিটিয়ে লাল করে দেব ! প্রাইভেট টিউটর পর্যন্ত খাঁ-পাড়ায় তটস্থ। কখন ঈশা খাঁ এসে কী ধরে বসেন তার ঠিক নেই ! তিনি খাতা কলম যোগান দিয়ে দিচ্ছেন । ফুটবল কিনে দিচ্ছেন । খেলায় হুইসিল বাজিয়ে নিজেই হচ্ছেন রেফারি।
তাঁর পাল্লায় পড়ে নফর আধঘোড়ে ছেলেদের সাথে মাঠে নেমে বলে কিক করতে গিয়ে চিৎপাৎ হয়ে উল্টে পড়ে হাসির খোরাক হচ্ছে ছোটোদের ।
ঈশা খাঁ দোরে দোরে গিয়ে বউ-ঝিদের বলছেন, তোমরা বসে থেকো না, সময় নষ্ট কোরো না । টাকা দিচ্ছি, নাও । হাঁস মুরগি কিনে পোষো। ছাগল গোরু কিনে পোষো। কামাই করো কামাই। তোমার টাকা না থাকলে তুমি মানুষ না !
বউ-ঝিরা অবলম্বন পেয়ে মাজা সোজা করে। মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় ।
মন খুশ হলে ঈশা খাঁ তাদের কিনে এনে দেন ছাপা শাড়ি, কাঁচের চুড়ি ।
এইভাবে কায়েম হল দাপট, ভয় ও ভরসার ।
ঈশা খাঁ অসাধারণ তৃপ্তি পান মনে। মিশা রাতে ফোন করলে, উৎফুল্ল হয়ে তিনি বলেন আমি গ্রামে এখন মোড়ল হয়ে গেছি রে ! আমাকে সবাই যমের মতো ভয় করে । আমার বিনা হুকুমে কিছু হতে পারে না । ভরসা করে সবাই ।
মিশা দূর থেকে মিচকিমিচকি হাসে, তুমি সাবধানে থেকো ।
৫
দেখতে দেখতে বসন্ত গত হয়ে গ্রীষ্ম এল তেড়েফুঁড়ে ।
ঈশা খাঁ নফরকে বললেন, সকাল সকাল চল। যা তেজ রোদের !
নফর সুধায়, ছাতা কি নেবেন, মনিব ?
ঈশা খাঁ বলল, না । ছাতা বওয়া ঝামেলা ।
বন্দুক ? মুখ ফসকে বলে ফেলল নফর ।
ঈশা খাঁ উদাস হয়ে চোখ উল্টে একটু কী ভাবলেন, তারপর দৃঢ় কন্ঠে বললেন, হাঁ, নে ।
হাঁ ! বন্দুক নিতে বললেন মনিব ? তার হুঁশ ফিরতেই নিজের কানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না নফর । খটকা লাগে । তার স্পষ্ট মনে পড়ে মাত্র ক-দিন আগে এরকম পরিদর্শনে বের হবার সময় সে বন্দুক সাথে নেবে কি না জিজ্ঞেস করতেই যেন গিলে খেয়ে ফেলতে গিয়েছিলেন মনিব। অথচ আজ বেমালুম বলে দিলেন, হ্যাঁ, নে ! ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল নফর ।
ঈশা খাঁ বললেন, কী হলো, হা-করে দাঁড়িয়ে রইলি কেন ?
মনিবের মুখের উপর আর দ্বিরুক্তি করার সাহস হয় না নফরের । সে সোজা উপরে উঠে মনিবের ঘরে ঢুকে খাটের বক্স খুলে চামড়ার খাপে ঢাকা দাদাজির আমলের মুঙ্গেরি অস্ত্রখানা কাঁধে নিয়ে নেমে এল ।
হাঁটতে হাঁটতে দুজনে খাঁ-পুকুরের কাছে এসে পৌঁছলে ঈশা খাঁ বললেন, পুকুরের লিজের টাকা তো বেল্লা এখনো দিলনা, নফর। তাকে বলিস তো !
নফর বলল, আচ্ছা বলব ।
নফর মুখে চ্যাং-ছাবালদের প্রতি বিদ্রুপের খোঁচা ফুটিয়ে বলল, না না, কিচ্ছু জানে না, মনিব । ওরা শুধু নষ্ট হতি জানে ! পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে স্মৃতিমেদুর হন ঈশা খাঁ, দূর অতীতের শোনা কথা স্মরণ করতে করতে বললেন, এই পুরো তল্লাট একসময় বাদাবন ছিল। কেটে পরিষ্কার করে এখানে বসতি করে দাদাজির পোবাপ । সে কি আজকের কথা
ঈশা খাঁ বলে চলেন, জোল বুজিয়ে গ্রামের রাস্তা করতে দাদাজি ওই বিরাট পুকুর কাটে । রাস্তার জমি নিয়ে কী ঝগড়া ঝঞ্ঝাট ! লাঠির বাড়িতে মাথা ফেটে মরে গেল রাজ্জাক মশিয়ানের বাপ বোকো । পুলিশ এল। ধরপাকড় করল। দাদাজি টাকা দিয়ে জমি দিয়ে মেটাল। আজকের চ্যাং-ছাবালেরা কি এসব ইতিহাস জানে ?
নফর মুখে চ্যাং-ছাবালদের প্রতি বিদ্রুপের খোঁচা ফুটিয়ে বলল, না না, কিচ্ছু জানে না, মনিব । ওরা শুধু নষ্ট হতি জানে ! পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে স্মৃতিমেদুর হন ঈশা খাঁ, দূর অতীতের শোনা কথা স্মরণ করতে করতে বললেন, এই পুরো তল্লাট একসময় বাদাবন ছিল। কেটে পরিষ্কার করে এখানে বসতি করে দাদাজির পোবাপ । সে কি আজকের কথা !
কথায় কথায় গল্পে গল্পে ঈশা খাঁ মসজিদ পেরিয়ে এলেন । তাঁর পিছনে বন্দুক কাঁধে নফর ।
তিনি নাপিতপাড়ায় এসে উঠতেই স্বপন প্রামাণিকের ছোটোভাই সঞ্জয় তাঁকে দেখামাত্রই ছুটে এল কাছে । ছোকরা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, কাকা, একবার আসেন এদিকে, বাবা একটু ডাকছে !
আশ্চর্য ! সঞ্জয় কি জানত ঈশা খাঁ ঠিক এই সময়ে এই পথে আসবেন ? সে ওৎ পেতে অপেক্ষায় ছিল নাকি ? তার বাবা নকুল প্রামাণিকই তো বেজুয়ার বিলে জমি দখলের লড়াইয়ে ঝাণ্ডা ধরেছিল । ভেস্টেড হয়ে গিয়েছিল তাঁদের বিঘে বিঘে জমি । স্মৃতিস্তব্ধ হলেন ঈশা খাঁ ।
কাকা !
সঞ্জয় হৃদয়কাড়া কণ্ঠে আবার ডাকল একবার ।
ঈশা খাঁ বললেন, চলো ।
নাপিতদের ছোট্ট একটা ভিটে । তাতে আট দশটা ঘর । সংকীর্ণ গলি । ভালো করে হাঁটা যায় না । ঈশা খাঁ কষ্ট করে এগিয়ে গিয়ে উঠলেন নকুলের দাওয়ায়।
নকুল চৌকি এনে দিল ।
ঈশা খাঁ বসলেন ।
সঞ্জয় নালিশ করে বলল, কাকা, হাটখোলার কসাইগুলো যা শুরু করেছে তাতে যেকোনো মুহূর্তে কিন্তু ঝামেলা বেধে যেতে পারে । আপনি একটু দেখেন ব্যাপারটা !
অমনি তড়িৎ খেলে গেল ঈশা খাঁর ভাবনায়। মুহূর্তে তাঁর মনে পড়ল, সেই রক্তমাংসের দৃশ্য । সেদিনই তিনি মনে মনে অশান্তির আশঙ্কা করেছিলেন । তারপর আর মাথায় ছিল না ব্যাপারটা।
নকুল বলল, শুনলুম তুমি গ্রামের সব ব্যাপারে মাথা দেচ্ছ, তাই সঞ্জয়রে বললুম, তোর কাকারে একবার জানা। খুনোখুনি করে কী লাভ ?
ঈশা খাঁ বললেন, প্রধানকে বলো ।
সঞ্জয় বলল, বলেছি । বলল, মাংস কি অখাদ্য ?
নকুল বলল, থানায় যেতি বলে। বলো দেখি, ঈশা, এইসব ব্যাপার লে কি থানা পুলিশ করা যায় ।
ছেঁচেয় দাঁড়িয়ে নফরের পায়ে ঝি ঝি ধরে যায় । উসখুস করে সে ।
নকুল নফরকে বলল, ছেঁচেয় দাঁড়িয়ে রইলে কেন, ও নফর ? দাওয়ায় উঠে বোসো ।
সঞ্জয় বেরিয়ে গেল গলি দিয়ে ।
নকুল দেশকালের গল্প ধরে ।
সঞ্জয়ের মা চা করে আনে ।
ঈশা খাঁ বললেন, আবার চা কেন, বৌদি ?
বৌদি বলল, সঞ্জয় যে বলে গেল, কাকারে চা দাও, বিস্কুট দাও !
কথাটা আর একটু লম্বা করে সঞ্জয়ের মা ভালো রকম আদিখ্যেতা করতে যাচ্ছিল ।
ঠিক এই মুহূর্তে তীব্র একটা হইচই বিকট শব্দে ভেসে এল নাপিতপাড়ার দিকে ।
নকুল লাফিয়ে উঠল, বিরস স্বরে বলল, ওই বেধে গেল !
৬
চা ফেলে দৌড়ে এলেন ঈশা খাঁ। হতভম্ব হয়ে তিনি দেখলেন আবুল কসাইয়ের ষণ্ডমার্কা ছেলেটা হিংস্র মূর্তি ধরে প্রচণ্ড আক্রোশে গর্জন করছে, এককোপে তোর মুন্ডু ছেদ করে দোবো শালা !
সমান আক্রোশে সঞ্জয় গর্জে উঠছে, তোর কত হিম্মত আজ দেখে ছাড়ব বর্বর কসাই !
ইতোমধ্যে নাপিতপাড়ার মেয়ে মর্দে দল বেঁধে এসে গেছে নকুল প্রামাণিকের পিছুপিছু ।
রাস্তার ভালোমন্দ লোকও জড়ো হয়ে গেল এক লহমায় । হাটখোলার দোকানগুলো থেকে সঞ্জয়কে যারা ভালোবাসে তারা এল হন্তদন্ত হয়ে। বিশ্বেসরা এল হেলেদুলে । রাস্তায় শ্লথ হয়ে গেল গাড়ির গতি ।
নকুল প্রামাণিক রুষ্ট ত্রস্ত কণ্ঠে চিৎকার করে, কী হল রে সব ? কী হলো এক মুহূর্তে ?
এক দোকান থেকে শোনা গেল, সঞ্জয় হঠাৎ এসে গরম স্বরে বললে, দোকান সব যেখানে ছিল সেখানে সরিয়ে ফেল ! তারপর এক কথায় দু কথায় গণ্ডগোল বেধে গেল ।
সঞ্জয় এক নাগাড়ে ফোঁস ফোঁস করছে, ওর এত সাহস ।
আবুলের ছেলে নাকি তার মুখের কাছে ঠেকিয়ে দিয়েছে ওর দোকানের মাংসপিণ্ড !
রুক্ষ বচসার মাঝে ঈশা খাঁ রাশ ভারী করে বললেন, কী দরকার বাবা এই অশান্তির ? মাংসের দোকান যেমন হাটখোলার আড়ালে ছিল তেমন আড়ালে থাকলেই তো ভালো হতো ।
যূথবদ্ধ জনতার একটি অংশ মুখ ফুটে বলল, ঠিক ঠিক !
জনতার বাকি অংশ ঈশা খাঁর মুখের উপরে কোনো কথা বলার যুক্তি খুঁজে পেল না। তারা সমীহ করে তাঁকে !
সঞ্জয় শক্তির যোগান পেয়ে হুঙ্কার দিল, হঠাও সব, হঠাও !
কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে ভেবে অমনি ধারাল কোপা উঁচিয়ে রুখে উঠতে উদ্যত হল কসাইয়ের বেটা ।
তাকে দাবড়ে সাইজ করতে ‘হেই’ বলে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠলেন ঈশা খাঁ । বীরবিক্রমে তিনি বললেন, হেই থাম !
প্রতিস্পর্ধী খুনি ছোঁড়া তার অগ্নিমূর্তি প্রকম্পিত করে সমান তেজে গর্জে উঠল, কেড়া তুমি মোড়লি করতি এয়েচ ? হটো ! ভিড় ঠেলে ছোটো বিশ্বেস এগিয়ে আসতে থাকে আবুলকে তাসন দেবে বলে ।
ঈশা খাঁ আর আত্মসংবরণ করতে পারলেন না ।
তবে রে, দাঁড়া তবে ।
বলে তিনি হাঁক ছাড়লেন, নফর, খাপ খোল !
নফর তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে বলল, এই ছোঁড়া, দোড়ো, না হলে মরবি কিন্তু !
দেরি সয় না ঈশা খাঁর। তিনি নফরের কাঁধ থেকে ছিনিয়ে নিলেন বন্দুক ।
সহসা ভড়কে হাতের কোপা ফেলে দৌড় মারল ছোঁড়া ।
বন্দুক ফেলে কাছা বাগিয়ে ঈশা খাঁ ধাওয়া করলেন তাকে।
দৌড়া দৌড়া
পালা ! পালা !
বদমায়েশটা রাজ্য সড়কের বাঁ দিকে নেমে যেতে চেয়ে পারল না । ধীর বেগের এক লরি এসে রোধ করল তার গতি । অমনি চোঁ করে গতিমুখ ঘুরিয়ে সে ক্লাবের পাশ দিয়ে ডান দিকে নেমে গেল ।
প্রচণ্ড বেগে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলেন ঈশা খাঁ ।
এক হাটখোলা লোক হা-করে দেখছে ।
দিশেহারা হয়ে ছেলেটা প্রাণ হাতে নিয়ে ঢুকে গেল নাপিতপাড়ার সরু গলিতে । ছুটছে ! ছুটছে ! সে কেবলই ছুটছে, ছুটতে ছুটতে সম্মুখ দিকে এগোছে !
পিছনে তাকে তাড়িয়েই চললেন মোড়ল !
♦–♦–♦•♦–♦–♦
❤ Support Us








