- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ১৬, ২০২৩
সত্যিই, ভূতের গল্প
অলঙ্করণ: দেব সরকার
শপিংমল থেকে বেরিয়েই ভূতটাকে দেখতে পেল সুপর্ণা।
উল্টোদিকের ফুটপাথে বাঁশের খাম্বা, টিনের ছাউনি দেওয়া একটা ছোটোমোটো চায়ের আড্ডা—কয়েকটা নড়বড়ে কাঠের ময়লা বেঞ্চ। দোকনের ঠিক সামনের মুখে বাঁশে আলতো পিঠ ঠেকিয়ে ধীরেসুস্থে সিগারেট টানছিল ভূতটা।
এমনিতে চোখে পড়ার কথা নয়, কিন্তু কেউ যদি তোমার দিকে হাঁ-করে চেয়ে থাকে একটানা অনেকক্ষণ— যত আনমনাই হও না কেন, চোখ বুঝবেই। টেরও পাবে। এ হল গিয়ে ইনটুইশন!
সেই ইনটুইশনের আঠাই টেনে নিয়ে গেল চাউনিকে। আর তক্ষুনি গুড়গুড় করে উঠল ভেতরে। মনে হল একটা খটখটে ‘আইস-কিউব’ যেন লুডোর ছক্কার মতো নড়ে-চড়ে ধাক্কা খেতে খেতে শিরদাঁড়া বরাবর এসে নীচের দিকে নেমে গেল।
হুঁ, ভুল হবার কথা নয়। ঠিকই দেখেছে। দিনের আলোয় জ্বলজ্বলে। একেবারে স্পষ্ট।
ওই তো সেইরকম অভ্যস্ত কায়দায় নিপুণ কৌশলে একের পর এক ধোঁয়ার রিং ছেড়ে চলেছে সেই ভূত। জ্বলজ্যান্ত শরীরের গোল গোল চোখদুটো স্থির। পা থেকে মাথা পর্যন্ত মেপে নিচ্ছে। সুপর্ণার।
কপালে অল্প অল্প ঘাম জমছে। ভয় আর বিস্ময়ের মাঝামাঝি পর্যায়ে পৌঁছে আকুলিবিকুলি করতে থাকে সুপর্ণা। দ্রুত পায়ে হেঁটে রাস্তা পেরিয়ে পার্কিং লটে পৌঁছে গেল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে যেতে হবে ওর চোখের সামনে থেকে। মুখ নীচু করে রাস্তা পেরোনোর সময়ই আড়চোখে দেখে নিয়েছে সে। হ্যাঁ, একদৃষ্টে চেয়ে আছে। চোখ সরায়নি ভূতটা।
নিজের ক্ষীর সাদা বোলেরোর একেবারে কাছ অব্দি এসেও আর পারল না। এক দুর্বোধ্য অজানা টানে পলকের জন্য পিছনে তাকিয়ে ফেলে। আর তখনই দেখতে পেল তার দিকে তাকিয়ে দাঁত-বের-করে হাসছে ভূতটা।
হাতের বিগশপারের সঙ্গে শরীরটাকেও বরফ-ঠান্ডা চারচাকার পেটের মধ্যে কোনওক্রমে ঢুকিয়েই বড় বড় শ্বাস ফেলে হাঁফাতে লাগল সে। চালকের আসনে উর্দিপরা ড্রাইভার ঘাড় ঘুরিয়েছে। দুচোখে অবাককরা প্রশ্নচিহ্ন।
গালফোলা ছোট ব্যাগ থেকে হ্যাঙ্কি বের করে ঘনঘন কপাল আর মুখ মুছে রুমাল-চাপা অবস্থাতেই কোনোক্রমে বলতে পারল, ‘লেক ক্লাব! জলদি’।
সঙ্গে সঙ্গে ক্রসিং বাঁয়ে রেখে উল্টোদিকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়েছে বৈজনাথ। অবাক হয়ে থাকলেও মুখে একটুও ভাঁজ পড়েনি তার। অন্য অনেক কিছুর মতো বিস্মিত না-হওয়াও ড্রাইভারদের আদবকায়দার মধ্যে পড়ে। সে এই ভরদুপুরে বাড়ি না ফিরে লাঞ্চ না-করে লেকক্লাব যাওয়াই হোক না কেন।
ততক্ষণে পিছন ফিরে দেখে নিয়েছে। রেয়ার উইন্ডোয় কালো ফিলমের ভেতর দিয়ে চোখে পড়ে অল্প দূরে দ্রুত পা ফেলে এদিকেই হেঁটে আসছে। সেই ভূতটা।
আবারও হাঁকড়পাঁকড় করে উঠল সুপর্ণা, ‘আঃ, একটু জোরে চালাও না বৈজনাথ!…আর এসিটা ফুল করে দাও, গরম লাগছে বড্ড’…
নবটা ঘুরিয়ে দিতে গিয়ে রেয়ার ভিউ মিররে চোখ আটকে গেল। বৈজনাথ দেখে লম্বা লম্বা দুটো সিড়িঙ্গে ঠ্যাঙ এগিয়ে এগিয়ে আসছে গাড়ির কাছে। খুব কাছে।
…সাদা বোলেরো টার্ন নিয়ে সাঁ-করে বেরিয়ে যেতেই চেপে রাখা দমটা হৃৎপিণ্ড থেকে উপুড় দিল সুপর্ণা। ঠান্ডা মিনারেল ওয়াটারের বোতলটা ঢকঢক করে গলায় ঢেলে দেয়। খসখস করছিল ভেতরে। শুখা সিমেন্ট-মেঝের মতো।…আঃ একটু একটু স্বস্তির হাওয়া পাওয়া যাচ্ছে এখন…। মুহূর্তেই ধক করে ওঠে বুকের গভীরতা।…যদি পিছু নেয়, বাস-ট্যাক্সি যাতে করে হোক ফলো করে আসে যদি!…একবার ভাবল, ধুর সেটা আবার সম্ভব নাকি!…পরক্ষণেই মনে হল, কিছুই অসম্ভব নয়। ভূতেরা সব পারে।…এখন কিছুতেই বাড়ির কাছাকাছি নয়! আরও ঘুরে যেতে হবে।… ‘আগে বিড়লামন্দির চলো। তাড়াতাড়ি। যেকোনো রাস্তা দিয়ে। শর্টকাট…’।…যন্ত্রবৎ আরেকদিকে গাড়ি ঘুরিয়ে নেয় বৈজনাথ। ‘রাম!রাম!’ জাতীয় কিছু একটা বিড়বিড় করতে-করতে কপালে হাত ঠেকায় সুপর্ণা। …জয় মা সিদ্ধেশ্বরী কালী, জয় বাবা তারকনাথ, রক্ষে কোরো, রক্ষে কোরো ঠাকুর’।…
।২।
আজকেও লাঞ্চ আওয়ারের পরে পরেই সেই ভূতুড়ে ফোনটা আবার এল রাজর্ষির কেবিনে।
রিসিভার তুলতেই কয়েকসেকেন্ড চুপচাপ। তারপরেই ফিকফিক। ঠিক যেন ওপাশে কেউ হাসছে। ব্যঙ্গের হাসি। ফাজলামির।
ইদানীং মাঝে মধ্যেই এই কলটা আসছে। দুপুরের দিকে। লাঞ্চের পরে। দুতিন সেকেন্ড শব্দহীন। তারপরেই ফিকফিক। অদৃশ্য কন্ঠস্বরের রহস্য হাসি। যেটুকু শোনা যায় তাতে মনে হয় কন্ঠস্বরটি রমণীয়ও বটে।
মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানীর রিজিওন্যাল অফিসের মেজকর্তার পদে-থাকা কোনও ব্যক্তির পক্ষে এধরনের ভৌত-ফোনকল আটেন্ড করা কিংবা এজাতীয় ভুতুড়ে রসিকতার রসগ্রহণ করবার মত সময় বা রুচি— কোনওটাই থাকার কথা নয়। স্বাভাকিকভাবেই রাজর্ষিরও নেই। এতে অত্যন্ত বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হয় সে। মুশকিল হল, এই সম্ভাব্য ভূতিনীটি কোনভাবে তার ডেস্কের ডাইরেক্ট নম্বর জোগাড় করে ফেলেছে এবং যেহেতু লাঞ্চের পরপর এলেও, ফোন না ধরা পর্যন্ত আভাস মেলে না কিছুর– সুতরাং অফিসের জরুরী ফোন হতে পারে ভেবে ফোনটা তোলে এবং প্রতিবারই বুড়বক হয়ে যায় সুপারভাইজার রাজর্ষি মজুমদার। বিরক্তির জ্বালায় চড়চড় করে মাথা। মনে হয় আছাড় মেরে টেবিলের নীচে ফেলে রিসিভারটাকে। শেষমেশ অনেক কষ্টে সংযত হয়ে ঠক-করে ক্রেডলে রিসিভার রাখে সে। সৌভাগ্যের বিষয়, সেদিন আর দ্বিতীয়বার জ্বালায় না এই বিচ্ছিরি উড়ো ফোনকল।
আজ অবশ্য ব্যতিক্রম হল খানিক। ফিকফিকের জায়গায় রমণীকন্ঠের সুস্পষ্ট খিলখিল। তারপরেই খল খল। এবং খ্যালখ্যাল। লাঞ্চ আওয়ারের পরের শিডিউল ফাঁকা ছিল বলে অসম্ভব দক্ষতায় ফেটে-পড়া রাগ দাঁতে চেপে রেখেও রিসিভার নামায়নি রাজর্ষি। দেখা যাক কতদূর এগোতে পারে ‘বিচ’টা।…তবুও খ্যালখ্যাল শুরু হতেই নিজেকে আর রুখতে পারল না; বার্স্ট করে বিকৃত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘হু ইজ দিস? ব্লাডি বিচ্!’…তৎক্ষনাৎ থেমে যায় খ্যালখ্যাল। একমুহূর্ত চুপ। তারপরেই নাকি নাকি স্বরে জড়িয়ে-জড়িয়ে বলে উঠল, ‘আঁমি ভূঁত। নাঁ নাঁ, আঁমি পেঁত্নী। রঁক্ত খাঁবো তোঁমার’।… ‘রক্ত খাবি?’…চিবিয়ে-চিবিয়ে বলতে থাকে রাজর্ষি, ‘ইউ ব্লাডি হোর !…মজা দেখাচ্ছি তোর, কল ট্রেস করে পুলিশে রিপোর্ট করব…তারপর দেখি কে কার রক্ত খায়?’…আবার চুপ। কট করে কেটে গেল লাইন। আঙুলে রগ টিপে চুপ করে বসে থাকে রাজর্ষি। চিড়বিড় করে জ্বলছে নার্ভগুলো। দপদপ করছে।… উৎপাত বন্ধ হল? নাকি আবারও করবে?.. ফারদার ডিস্টার্ব করলে একহাত দেখে নেবে এবার। মোক্ষম ভয় দেখাবে। তেমন হলে সত্যিসত্যিই কমপ্লেন করবে থানায়।… দাঁতে দাঁত ঠুকে কিড়মিড় করে সে। তারপর ঢাকনি সরিয়ে ঠান্ডা জলের গ্লাসটা গলায় ফেলে চোঁ চোঁ করে শুষে নিল জলটুকু।… কিপ কোয়াইট, শান্ত হতে হবে। বি পেশেন্স, স্থির থাকা চাই। চারটে পঞ্চান্নয় জরুরী মিটিং আছে। বোর্ডের। ধীরে সুস্থে ড্রয়ার টেনে মার্লবরোর প্যাকেট আর লাইটার বের করে টেবিলের ওপর শুইয়ে রাখল।… ভয় পেল কি মালটা? দেখা যাক।…আর তক্ষুনি তাকে চমকে দিয়ে কঁক কঁক করে আবার বেজে উঠল টেলিফোন।… ‘তোর সাহস তো কম নয়!’…একঝটকায় রিসিভার তুলে নিয়েছে রাজর্ষি।… ‘এনিথিং রঙ মজুমদার ?’ …ছিক করে জিভ কাটল সে। এই রে, রঙ কন্ট্যাক্ট হয়ে গেছে! বোম্বে অফিস থেকে তোশনিওয়াল।… ঝটিতি গলা নামিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলল, ‘সরি স্যার।…অ্যা ভেরি অ্যানইয়িং কল স্যার। আই কান্ট ট্রেস দ্য কল’।…ওপাশের ভারী গলা ক্ষনিকের জন্য মোলায়েম হয়েই ভরাট হল ফের।–‘বি কেয়ারফুল। দ্য মিটিং ইজ ভেরি আর্জেন্ট’।… থেমে-থেমে আরও অনেক কথা বলে যায় গমগমে কন্ঠ।… শুনতে-শুনতে আর হুঁ হাঁ করতে-করতে মনে মনে সেই অদেখা পেত্নীকে খিস্তি দিতে লাগল সে। ফাকিং বিচটাকে একবার হাতের সামনে পেলে…!
— নাথিং টু ওরিড। আই উইল ম্যানেজ এভরিথিং স্যার। ওক্কে।…শুভ দুপুর জানিয়ে রিসিভারটা ক্রেডলে বসিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সে। মাথার চুল মুঠো করে টেবিলে মুখ নামিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ।…তারপর আস্তে আস্তে মাথা তুলে শূণ্য চোখে চেয়ে রইল সামনের সাদা দেয়ালে। কপালের ওপর মোরগের ঝুঁটির মত একরাশ এলোমেলো লালচে চুল। চোখের মণি ঠেলে উঠেছে। গালদুটো তুবড়ে ঢুকে গেছে যেন। মনে হয়, মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই বুড়ো হয়ে গেছে, সে, রাজর্ষি মজুমদার, ইনফোটেক ইন্ট্যারন্যাশানালের পূর্বাঞ্চলীয় মধ্যম-মস্তিষ্ক।…বেয়ারাকে ডাকার বদলে যে’ তখনও অন্যমনস্কভাবে ভাবছিল, অজানা বেজন্মা কুক্কুরীটিকে, এখন হয়তবা ভয় পেয়ে ল্যাজগুটিয়ে পলাতক। আর যদি না হয়!…
।৩।
দিনকয়েক হল গা-ছমছমে ভাব একটু হলেও কমে গেছে সুপর্ণার। আস্তে-আস্তে আবার স্বাভাবিক ছন্দে বেজে উঠছে রোজকার সুর-তাল গুলো।
এই মুহূর্তে সে বসে আছে লেডিজ ক্লাবের নতুন মেম্বার আঁখি মিত্রের টালিগঞ্জের নতুন, ঝাঁ-চকচকে এবং প্রকান্ড ফ্ল্যাটের ডাইনিং হলের ফোম-আঁটা সোফায়। তাকে দেখলে এখন কেউ বুঝবে না, এই তিন-চার দিন কী বীভৎস ভীতি-উদ্বেগ আর অশান্তির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে সে।
ওই তো মিসেস মিত্রের মুখে ননভেজ-জোকস শুনে হাসতে হাসতে সোফার পিঠে একেবারে গড়িয়ে পড়ে গেছে। হাতে ধরা চায়ের পেয়ালা উপচে যায় যায়! কোনোক্রমে সামনের কাচের টেবিলে চায়ের কাপটা ঠেকিয়ে রেখে হাসতে হাসতেই দম-ধরা গলায় বলে উঠল, ‘ওঃ আঁখি, সর্দারজী ছেড়ে একেবারে বাঙালি নিয়ে পড়ে গেছ ! তাও খুল্লমখুল্লা! পারোও বটে। ইউ আর রিয়েলি হিলারিয়াস !’
হাসিহাসি মুখটা বিচিত্র ধরণের গম্ভীর করে নিয়ে উত্তর দিলেন আঁখি মিত্র, ‘ওসব সান্টা-বান্টা ব্যাকডেটেড। এখন লেটেস্ট ট্রেন্ড হল বং জোকস। বাঙালিরা বাঙালিদের দেখে হাসতে পারে কত! আফটার অল উই আর দ্য কাঁকড়া কমিউনিটি’।…আঁখি নাচিয়ে ফ্যাকফ্যাকিয়ে হেসে উঠলেন আঁখি মিত্র।
শরীর দুলিয়ে হাসতে গিয়েও মুহূর্তের জন্য ‘চিড়িক’ দিয়ে ওঠে মাথায়। ঠিক এই কথাটাই কথায়-কথায় বলত না আরেকজন ? ‘বাঙালি হল কাঁকড়ার জাত’— মুদ্রাদোষে দাঁড়িয়ে গেছিল বলাটা। স্থান-কাল-পাত্র উবে গিয়ে চোখের পর্দায় সিনেমার ছবি হয়ে আবার ফুটে উঠল ভূতটার মুখ।
হুটপাট করে অস্বস্তি। কোনও মানে হয় এইসব বস্তাপচা সেন্টিমেন্টের! এইসব শুকনো অশান্তির, বেকার জ্বালাতনের! ভুলেই তো গেছিল সে সেসব। সেদিন সামনাসামনি না দেখলে…।
কী টেনশানই না করেছে তারপর থেকে। বারবার ভেবেছে। যুক্তি দিয়ে বিচার ও বিশ্লেষণ করেছে ঘটনার শরীর। মনের ভেতর কাটাছেঁড়া চলেছে। অজস্রবার।…ভূতটা কি গন্ধে গন্ধে এসে পড়ল ! অদৃশ্য ছায়াকে ধাওয়া করে সাতশো মাইল পথ পার হয়ে সুদূর মালদা থেকে এসে হাজির হল এই কলকাতায় !
এছাড়া আর কিই বা ভাবা যায় ! … নাকি এতদিন ধরে নিঃশব্দে ছায়ার মত অনুসরণ করে যাচ্ছিল! টের পায়নি সে।…সেদিনই ইচ্ছে করে সামনে এল? দেখা দিয়ে গেল? নাহলে জানতে পারবে কীকরে সেদিন সুপর্ণা ঠিক ঐ সময় ঐ জায়গাতেই থাকবে? দেখা দিতে এসেছিল? নাকি পুরোটাই কোইন্সিডেন্স! সেদিনের দেখা হয়ে যাওয়াটা নেহাতই ঘটনাচক্র!…আচ্ছা, এখনও পেছন পেছন আসছে না তো? চুপচাপ। হাওয়ার মতন !
…শিউরে ওঠে সুপর্ণা। ওফ্, এই ক’দিন সারাক্ষণ কেটেছে বিশ্রীরকম অবুঝ ভয়ের অন্ধকারে। বাড়ির কাছেই রাস্তায়, এমনকি হাউজিংয়ের ভেতরেও পা ফেলে হাঁটার সময় বারবার শিউরে-শিউরে উঠেছে সে। চমকে উঠে ঘাড় ফিরিয়ে দেখেছে। কেউ নেই। রোদ্দুর প’ড়ে কাঁপছে গাছের ছায়া। একতলার বোসেদের কিচেনের জানলা দিয়ে লাফিয়ে বেরোল কালো বেড়ালটা। কেউ নেই। আলো। ছায়া। বাতাস। তবু শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে ঘাড়ের পেছনের রোঁয়া। হঠাৎ হঠাৎ ছমছম-করে উঠেছে ভয়।… রাতে বিছানায় চোখ বন্ধ করলেই সেই ভয়ঙ্কর ভৌতিক মুখ।… জন্ডিসের রোগীর মতো হলুদ কলেজবাড়ি… সেই অফ ডে… দুপুরের খাঁ খাঁ কমনরুম… তারপর… তারপরেই আর ভাবতে পারেনি সে…আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেছে…এসির স্পন্দনের ভেতরেও বিনবিনে ঘাম… কে জানে, রাজর্ষি কিছু বুঝতে পেরেছে কিনা…সন্দেহ করেছে কিনা… বোধহয় বারকয়েক তাকিয়েছে অবাক হয়ে…সুপর্ণা জানে না।
ঝড় আসার আগেই মানুষ প্রকৃতিকে বুঝতে পারে। জীবনের বেলাতেও কি তাই? নাহলে গড়িয়াহাট মোড়ে সিগন্যাল থেমে-থাকা বিরক্তিকর অবস্থায় ডান পাশ ঘেঁষা হলুদ ট্যাক্সিতেই বা নজর আটকাবে কেন? বাঁপাশেও তো গাড়িই রয়েছে। ইনটুইশান হোক বা অন্য কোনও চৌম্বক তরঙ্গ— দৃষ্টি গিয়ে সেঁটেছে যেখানে, সেখানে ট্যাক্সির জানলা দিয়ে একটা মুণ্ডু গোল-গোল চোখে চেয়ে আছে
কখন হাসি থেমে গেছে অজান্তেই। হঠাৎ খেয়াল হল, আরে! এসব কী আবোলতাবোল ভাবছে বসে- বসে। সে, মিসেস সুপর্ণা মজুমদার, ক্লাবের নভিস-মেম্বার আঁখি মিত্রের বাড়ি চায়ের নেমন্তন্নে এসে কীসব ভুতুড়ে চিন্তার খপ্পরে পড়ল!
তাকিয়ে দেখে আঁখি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হাসবার চেষ্টা করতেই বলে উঠল, ‘এনিথিং সিরিয়াস সুপর্ণা?… তোমার শরীর ঠিক আছে তো? হঠাৎ কী হল? কেমন যেন শুকনো দেখাচ্ছে তোমায়!’… ‘ওহ্ নো নো। অ্যায়াম ফাইন। অ্যাবসলিউটলি ওকে’।… জোর করে হাসিটা ঝুলিয়ে রাখলেও কেমন যেন কান্নার মতো দেখাল। ঢকঢক-করে চা শেষ করেই উঠে দাঁড়ায় সুপর্ণা।– ‘আজ চলি। আই জাস্ট রিকল, একজন গেস্ট আসবেন।…হয়ত এসেও গেছেন এতক্ষণে বাড়িতে। চলি। টাটা। সি ইউ অন স্যাটারডে ইভনিং’।… আঁখি মিত্রকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দরজার দিকে ঘুরে গেছে সুপর্ণা।
ঝড় আসার আগেই মানুষ প্রকৃতিকে বুঝতে পারে। জীবনের বেলাতেও কি তাই? নাহলে গড়িয়াহাট মোড়ে সিগন্যাল থেমে-থাকা বিরক্তিকর অবস্থায় ডান পাশ ঘেঁষা হলুদ ট্যাক্সিতেই বা নজর আটকাবে কেন? বাঁপাশেও তো গাড়িই রয়েছে। ইনটুইশান হোক বা অন্য কোনও চৌম্বক তরঙ্গ— দৃষ্টি গিয়ে সেঁটেছে যেখানে, সেখানে ট্যাক্সির জানলা দিয়ে একটা মুণ্ডু গোল-গোল চোখে চেয়ে আছে। বোসেদের বাড়ির বেড়ালটা লাফাতে শুরু করেছে সুপর্ণার বুক জুড়ে। তীব্র একটা ভয়ে হৃৎপিণ্ড ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে। হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছে এতক্ষণে।
বীভৎস ভৌতিক মুখটা ঝুঁকে। যেন কালো কাচের আড়াল সরিয়ে স্পষ্ট দেখে নিচ্ছে বোলেরোর পেটের লুকোনো কুঠুরি। সার্চলাইটের মতো জ্বলজ্বলে চোখদুটো ফুঁড়ে ফেলছে বিরামহীন। তন্নতন্ন করে দেখে নিচ্ছে কোথায় কতটা বদলেছে। সব । সমস্ত।
হৃৎস্পন্দন বুঝি বন্ধ হয়ে গেল তার।… সব, সবকিছু জানিয়ে দেবে ভূতটা! সবাইকে! এমনকি লজ্জা… সেই জন্ম জড়ুলটাও! তার লাল টুকটুকে রঙ !… আতঙ্কের চাপে শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো সুপর্ণার। ধরা ধরা গলায় কোনোমতে বলতে পারল, ‘বৈজনাথ। জলদি। বাড়ি’।…
প্রবল ঝড় শুরু হওয়ার আগে আকাশ যেমন থমথম করে ঠিক তেমন হয়ে আছে বোলেরোর পাকস্থলী।
।৪।
বেশিদিন দেরি না-করেই ফোনটা আবার এল। লাঞ্চের পর। মনকে মোটামুটি প্রস্তুত করেই রেখেছিল রাজর্ষি। একটুক্ষণ ফিকফিক শোনার পরেই ওপারের উদ্দেশে ঝাঁঝিয়ে উঠল সে, ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? ইউ ডার্টি বিচ!… টেল মি হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?’… খিলখিল করে হেসে পেত্নী বলল, ‘রঁক্ত খাঁব। তোঁর মুঁন্ডু ছিঁড়ে রঁক্ত খাঁব’।… ‘শাট আপ ইউ হোর! বারোভাতারি বেশ্যা কোথাকার!’
ফ্যাঁস করে উঠে পেত্নী বলল, ‘চুপ! একদম গাল দিবি না। আর একটাও খিস্তি শুনলে’…সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে গেছে সেই কন্ঠস্বর…। ‘কী করবি অ্যাঁ? কী করবি? তোকে ছাড়ব ভেবেছিস? শালী, কুত্তী, পুলিশে দোব তোকে’— রাজর্ষি শেষ করার আগেই চাপা ফোঁসফোঁসানির সঙ্গে রিসিভারের গর্ত দিয়ে বিষ উপচে আসে। শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দে কেঁপে-কেঁপে যায় টেলিফোন।
‘মনে আছে, বারাসতের বাগানবাড়ি?… সেই সমস্ত ফুর্তির সন্ধ্যেগুলো?…মনে নেই, না? আমি কিন্তু কিচ্ছু ভুলিনি— ফলস প্রেম, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে ধাপ্পা… ভুলিনি কিচ্ছু— এখনও সেই অ্যাবরশানের প্রুফ রাখা আছে আমার কাছে— তোর সই সুদ্ধু— গিয়ে দেখিয়ে আসব তোর বৌকে? কীরে হারামজাদা?’…
একসেকেন্ডের জন্য পাথর হয়ে গেছিল রাজর্ষি। তারপরই নড়েচড়ে ওঠে, ‘শোনো টুম্পা, তোমার যা খুশী তুমি করতে পারো। আমার বৌয়ের কাছে যাবে তো ? যাও, ও তোমার একটা কথাও বিশ্বাস করবে না’—শান্তভাবে একটুও না-থেমে কেটে-কেটে বলতে লাগল সে—‘আমি এখন যে পোজিশানে উঠে আছি তাতে তোমার মতো ছুটকো-ছাটকা পাতি ফ্রড মেয়ে ফলস ব্লেম না-করলে স্ট্যাটাস থাকে না। সুতরাং ইউ ডু হোয়াটেভার ইউ উইশ’—। কথা শেষ করে ফ্যাকফ্যাক-করে হাসতে শুরু করেছে রাজর্ষি। এবার তার পালা। হাসতে হাসতেই রিসিভার নামিয়ে রাখতে যাবে ওপাশ থেকে হিসহিস শব্দ ধাক্কা দিতে লাগল কানের গুহায়।
‘আর আমাকে জড়িয়ে ধরে সোহাগ মারিয়ে তোলা ছবিগুলো? আমার ফোনে সব সেভ করা আছে—সব ছবি— সেগুলো দেখালে তোর কী হবে রে শুয়োর?’
আবার পাথর হয়েই নড়ে উঠেছে, স্বর আরও শান্ত করে এনে ধীরে-ধীরে বলল, ‘কী চাও বলো টুম্পা?… এসব করে লাভ কী? কত টাকা চাও বলো?… প্লিজ, টেল মি দ্য অ্যামাউন্ট— টেল মি’।
খিলখিল করে হেসে ওঠে ওইপাশ।—‘এই তো পথে এসেছে। পথে এসো বাছা, ছোনামনা, চাঁদেল কনা’–।…একই ভঙ্গিতে একঘেয়েভাবে কথাগুলোকে টানতে থাকে সে, ‘বলো, কত টাকা চাও বলো। সে। টেল মি ইয়োর অ্যামাউন্ট।…কিন্তু এসব করে কী লাভ হবে, ফালতু ঝামেলা করে কাগজের টাকা ছাড়া আর কী পাবে তুমি?…তুমি আমার পাস্ট টেন্স, আমার গত জন্মের এরর, আমার অভীত ছাড়া আর কিছু নয় টুম্পা। বলো, সে অতীতের দাম কত হতে পারে বলো’—।
খনখন-করা নাকিস্বর বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, আঁমি পাঁস্ট। আমি লেঁট। আঁমি ভূঁত। না না পেঁত্নী। টাঁকা নঁয়, আঁমি রঁক্ত চাঁই। ঘাঁড় মঁটকে রঁক্ত খেঁতে চাঁই তোঁর’।
ফোনটা ছেড়ে দিয়ে সাদা ফ্যাটফ্যাটে প্রস্তর-মুখ নিয়ে ভাবলেশহীন বসে রয়েছে সুপারভাইজার রাজর্ষি মজুমদার। হঠাৎ দেখলে মনে হবে কোনও রক্তচোষা বাদুড় দাঁত বসিয়ে শুষে নিয়েছে সমস্ত শরীরের রক্ত।
।৫।
সিডি প্লেয়ারে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শুনতে কখন যেন ঝিমিয়ে পড়েছিল সুপর্ণা। বুকের নীচ থেকে একটা কাঁপুনি উঠে আসায় চটকা ভেঙে গেল আচমকা। ঝট করে উঠে বসে চোখ কচলায় সে।
কিছুদিন হল এই সিম্পটম শুরু হয়েছে। পাতলা ছেঁড়া-ছেঁড়া ঘুম…ঘুমের তলায় গুলোতে-থাকা দুঃস্বপ্ন… এক একটা আতঙ্কের ঝাঁকুনি… স্নায়ুতে ঝটকা লেগে ছিঁড়ে যায় সেই দুর্বল ঘোর…। বুকের মধ্যে ঠাসবুনোট ভয়…। কেমন যেন অসহায় লাগে; এমনিভাবে চললে শেষে হার্টে শক্ত অসুখ না হয়ে যায়! হরর ছবিতে দেখা কোনও মুখ হয়ে ভূতটা স্বপ্নের ভিতরেও তাড়া করতে থাকে। পাগলের মত পরিত্রাণ খুঁজে বেড়ায় সুপর্ণা।… কী হবে? সব জানাজানি হয়ে যাবে? তারপর…? তারপর আর ভাবতে পারে না সে। কেমন যেন অবশ হয়ে ঝিমোতে থাকে। ঠান্ডা নিষ্প্রাণ দিনগুলো এক একটা চেতাবনির মতো চলে যায়।…
আজও ঝিম-ভাব কেটে যেতে প্রথমে কিছুই ঠাহর হয় না।… কই, আজ তো বুকের আঁধারে ভীতির সেই নোংরা কেন্নোগুলো সরছে না ততটা!… না, ভয়-ভয় বরফটা আজ আর চেপে বসছে না অত! বরং স্নিগ্ধ হাওয়ায় দুলছে অল্প আনন্দের শিহরন…।
ভেসে-ওঠা আলতো স্বপ্নের সরগুলোকে ঠিকঠাক জুড়তে চেষ্টা করে সে।… এতক্ষণ তবে খুশিয়াল জলের গভীরে হাতপামাথা মুড়ে চুপচাপ বসে ছিল! গা-ডুবিয়ে।
কী ছিল গহন পুকুরের তলার সেই আবছায়াময় স্বপ্নরাজ্যে!… একটা প্রাচীন ছোট একতলা বাড়ি, আলসে-না-থাকা নীচু ছাদ, কাঁধ ঘেঁষে লতিয়ে-ওঠা সজীব সুপুরিগাছ…হলুদ-সাদায় ছোপ-ছোপ ল্যাজনাড়া এক দিশি কুকুর… রায়গঞ্জ নামের কোন্ মফস্সল শহরের সরু-লম্বা-প্যাঁচানো গলিঘুঁজি…চিল্ড্রেন্স পার্ক… বাবা-মা-ছুটকির মিলিত সুগন্ধে ম ম করতে-থাকা কোনও আটপৌরে সংসার— যেখানে হাসি-ঠাট্টা-আনন্দ কলুষহীন।…
মুখ দিয়ে দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ করল বের হয়।… কোথায় সেই হারিয়ে-যাওয়া-দেশ আর কোথায় এই বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড ছুঁয়ে-বেরিয়ে-যাওয়া পাহাড়প্রমাণ আর প্রকান্ড সব-পেয়েছির ডুপ্লেক্স।
বেঁচে-থাকা কত বিচিত্র। পর্দার পর পর্দা সরিয়ে আলো ফেলতে-ফেলতে নিয়ে যায় কোথায়— পর্দা সরানোর আগে পর্যন্ত বোঝা-যায়-না কিছুই। সরে গেলেই চিচিং ফাঁক। পিসি সরকারের ইন্দ্রজাল। তা নাহলে বিনুনি-দুলিয়ে কলেজ যাওয়া মেয়েরা বোলেরো চড়ে লেকক্লাবে যায় কেন? ছিটের ম্যাক্সি-পরা যে মেয়েটা দড়ি-বাঁধা বালতি ডুবিয়ে কুয়ো থেকে জল তুলছিল এই সেদিন, সে কীভাবে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত বেডরুমে ডিভানে শুয়ে সিডিতে রবিঠাকুর শুনছে?
খিড়কির দরজা তো পাকাপাকি ভাবে আঁট-করে বন্ধ করে দিয়েছিল কবেই, শুধু ঐদিন ভূতটাকে না দেখলে…। বেখেয়ালে আবারও শিউরে উঠে সুপর্ণা।
…ভর দুক্কুরবেলা, ভূতে মারে ঢেলা !… আনমনা-হয়ে বিড়বিড় করে মেয়েটা। ঠাকুমা বলতেন। হ্যাঁ, ওই দিনটাও তো ছিল ঘোরদুপুর। ভরদুপুর।
পাখির ডাকের শব্দ-করে বেজে উঠল কলিংবেল।— ‘মালতী’ বলে ডাক দিতে গিয়েও থেমে যায় সে। ভ্রু কোঁচকানো। ঝি মেয়েটা বাড়ি গেছে খানিক আগে। এতক্ষণ চলে আসার কথা। পাশেই বস্তিতে বাড়ি ওর। তবে এলে বেল বাজাবে না অবশ্যই। চাবি আছে কাছে।
আরেকবার পাখি-ডাক। এবার একটু দীর্ঘ। বিরক্তি বাড়তে থাকে সুপর্ণার।…এই ভরদুপুরে কে এল জ্বালাতন করতে?… সেলসম্যানগুলো পারেও বটে। শীত-গ্রীষ্ম-দুপুর-রাত্তির নেই !… দারোয়ানদেরও হয়েছে বলিহারি ! এতবার বারন করা আছে ভেতরে উটকো কাউকে ঢুকতে না দিতে, তবু ঢোকাবে। ফিরিওলাদের কাছ থেকেও কমিশন খায় কিনা কে জানে !…অবশ্য এখন ডিউটি-শিফটিং-এর টাইম…কোনও এক ফাঁকে সুট করে ঢুকে পড়েছে হয়ত…!
পাখিটা ডেকে উঠল আবার।…বারবার। সুইচ টিপে ‘কোন ভাঙ্গনের পথে এলে’ অফ করে দিল সে। কড়া-কড়া কয়েকটা গালাগাল মনের মধ্যে ঘুরিয়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে। চুলোয় যাক এটিকেটস। তেমন হলে অশালীন ভাষা প্রয়োগ করতে ছাড়বে না।
ম্যাজিক-আই-তে চোখ রাখা মাত্রই হৃৎকম্প। হাত-পা কাঁপছে থরথর করে। দাঁতে দাঁত লেগে গেল বুঝি। চোখ বুজে বড় করে নিশ্বাস নিয়ে আবার দেখতে থাকে ভালোভাবে।
হ্যাঁ, সেই ভয়ঙ্কর হরর ফিলমের ভূত। কোটরের ভেতর থেকে চোখ-বের-করে একদৃষ্টে ম্যাজিক-আইয়ের দিকে চেয়ে আছে। কাচ ফুঁড়ে ফেলে সেই চোখ দেখে নিচ্ছে সুপর্ণার ভীরু চোখদুটো।
ওই, আবার ডাকল পাখিটা। বেসূরো হয়ে। অধৈর্য।… হাউজকোটের ভিতরে-বাইরে দরদর ঘামতে থাকে সুপর্ণা। হাউজকোট টেনেটুনে ভালোভাবে ঢেকে নেয় নিজেকে। যেন ভরা মাঘমাসে উত্তুরে হাওয়া বইছে সারা বাড়ি ঘিরে। সেই কনকনে হাওয়ায় খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছে তার যাবতীয় প্রতিরোধ এবং নিরাপত্তার টুকরো…। যেন এক জীবনজোড়া বইতে-থাকা শীতকালের ভিতর দাঁড়িয়েও ঘেমে স্নান করে যায় সুপর্ণা।
সে কী করবে? প্রাণপণ চেষ্টায় আরও শক্ত করে এঁটে দেবে ডোর-লক…? সমস্ত শক্তি জড়ো করে শরীর দিয়ে ঠেসে আটকে রাখবে ছফুটের এই কাঠের দরজাটা…? আজীবন চেপে রাখবে দুই হাত দিয়ে…? যতক্ষণ না, আগুনে বাতাসের প্রলয়ে কবজা-ভেঙে গিয়ে ছিটকে যায় যায় পাল্লা; দাউদাউ শিখার জিভ লেগে ছাই হয়ে যায় ঘরদোর…?
কিন্তু পাখি ডাকছে আবার। এই জমাট দুপুরের ঢেলা লেগে বারবার আর্তনাদ করে উঠছে পাখিটা।
ডুবন্ত মানুষ তলিয়ে যাওয়ার আগে যেমন শেষবারের চেষ্টায় ভেসে ওঠে তেমনই শরীর-মনের সমস্ত জোর এক-করে ঝাঁকি দিয়ে নিজেকে শক্ত করতে লাগল সে। চোখ-মুখ অসম্ভব রকম কঠিন। চোয়ালের রেখায় কাঠিন্য; দাঁতে চাপা দাঁত।
মরিয়া হয়ে উঠলে যদি চেতনা লোপ পায়, তবে তাই হল সুপর্ণার। এর শেষ দেখে ছাড়বে সে। হিতাহিত না-ভেবেই ঘুরিয়ে দিল লকটা। চেন-লকে আটকানো পাল্লা ফাঁক হয়ে যায় সামান্য।
মুখের অর্ধেক অংশে আলো পড়ে রহস্যময়ী ডাকিনীর মত দেখাচ্ছে অনেকটা। লাল-হয়ে-যাওয়া একটা চোখ ফাঁক ঠেলে বেরিয়ে আসবে যেন। আলো-অন্ধকারের অবস্থান থেকে হিসহিসিয়ে ওঠে ডাইনি—‘কোন সাহসে এখানে এসেছ? কেন এসেছ? পেছু নিয়ে একেবারে বাড়ি অবধি ধাওয়া করেছ, অ্যাঁ?’
খোঁচা-খোঁচা দাড়ির ভূতটা আমতা-আমতা করে। হাসার চেষ্টা করল বোধহয়। গর্তে ঢোকা জুলজুলে চোখ, গাল বসে হনু বেরিয়ে গেছে।
— এক্ষুনি বিদেয় হও। দূর হও চোখের সামনে থেকে। আর যেন কখনও না মুখ দেখি। সাহস তো কম নয়, একেবারে বাড়ি বয়ে হামলা… কীসের জন্যে এসেছ? কী চাই অ্যাঁ?… একটানা বলে ফেলে হাঁফ ধরে যায় কেমন যেন।
খোঁচা দাড়ির মুখ মনে হয় ভয় পেয়েছে। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটে। কিছু বলতে গিয়েও চুপ হয়ে যায়।
এই সুযোগ। ভয় দেখাতে হবে। মোক্ষম ভয়। ভূত পালায় যে ভয়ের চোটে। মনে মনে প্রস্তুত হয় । অ্যাসিড ঢালতে হবে। এখনই। আরও সর্বনেশে। মারক। ছটফট করতে-করতে মুখে ফেনা তুলে মরে যাবে মড়াটা।
কিছু বলার আগেই জিভ নড়ে ভূতটার। ভাঙা-ভাঙা গলায় এক অসহায় আত্মা বলে ওঠে, ‘আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ সুপর্ণা?’… নিমেষের মধ্যে জ্বালা ধরে সুপর্ণার গলায়। ধিকধিকি ধোঁয়াতে থাকে কন্ঠস্বর। হলকা বেরিয়ে আসে আবার মুখ থেকে।–‘তাড়াবো না তো কী করব, অ্যাঁ? গলাধাক্কা দিয়ে দূর করে দিতে হয় তোমার মত ভিখিরিকে–। কোন সাহসে আমার বাড়ি পর্যন্ত এসেছ আগে বলো? কী চাও? তোমার ধান্দা ধরতে পারব না ভেবেছ?’
আবার একটু আমতা-আমতা করে ভাঙা গলায় স্বর ফোটে, ‘ছিঃ তুমি আমাকে এতটা নীচ ভাবলে? এত নীচ?…না, সুপর্ণা তোমার কাছে কোনওদিন কোনও ধান্দা ছিল না আমার। আজও কোনও ধান্দা নিয়ে আসিনি’—
— তবে কীসের জন্যে এসেছ, অ্যাঁ? কী চাই এখানে তোমার?… ‘আমার? কী চাই? আমি? আমি’… নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল ভূতটা। তারপর একটা শ্বাস ফেলে ভাঙা গলায় বলল, ‘বিশ্বাস করো, কোনও স্বার্থ নিয়ে আসিনি আজকেও… কোনও ক্ষতি করার ইচ্ছা নিয়ে আসিনি তোমার এখানে’।… লোকটা থামল, তারপর সুপর্ণা কিছু বলার আগেই নিজেকে শোনাবার মতো করে বলে যেতে লাগল… ‘শুনেছি খুব বড় বিয়ে হয়েছে তোমার।… বিয়ের পর কেমন হয়েছ, কতটা পাল্টেছ…সেসবই দেখার ইচ্ছে ছিল আর কী!… তারপর তোমার ঘরদোর…মনের মানুষটি কেমন…সেসবও দেখবো ভেবেছিলাম’…মাথা ঝুঁকিয়ে বলতে বলতে ঘাড় উঁচু করল লোকটা, সুপর্ণার মুখের ওপর ঘোলাটে চোখ দুটো বিছিয়ে রেখে হঠাৎ যেন কথা খুঁজে পেয়ে গেল, ‘ওহ হ্যাঁ, চা। ইয়েস। তোমার হাতে তৈরি এককাপ খাওয়ার ইচ্ছে ছিল…খাব ভেবেছিলাম’…তাকে থামিয়ে দিয়ে চাপা স্বর চিৎকার করে ওঠে, ‘ইয়ার্কি পেয়েছ? মিথ্যে বলার জায়গা পাওনি? চা খেতে মালদা থেকে ছুটে বালিগঞ্জে এসেছ?…ওসব ঢপ অন্য কোথাও গিয়ে মারবে’… বুঝিবা ব্যথা পেয়েছে, সেইরকম আহত ও অবাক স্বরে ভাঙা গাল বলল, ‘কেন, বন্ধুর বাড়িতে চা খেতে আসতে নেই বন্ধুর? তার নিজের জনটির সঙ্গে আলাপ করতে নেই? দেখতে নেই তিনি কত আমায়িক? কেমন সুন্দর?’… ক্রোধ সরে গিয়ে আবার ত্রাস এসে দখল করে সুপর্ণার দুই চোখ। সেই চোখের ওপর নিজের চোখ দুখানা ধরে রেখে নিষ্কম্প-হয়ে ভূতটা বলল, ‘তুমি ভয় পাচ্ছ? কিন্তু কেন ?…কেন সুপর্ণা ?…আমি তোমার কাছে যা, তুমি আমার কাছে তাই-ই। দেশের বাড়িতে আমারও বৌ আছে। ছোট মেয়ে…আমি সজ্ঞানে কারো কোনও ক্ষতি করতে পারি না’…কথাগুলো ছিনিয়ে নিয়ে ভীরু স্বর বলে উঠল, ‘তুমি আমার কাছে মরে গেছো। তুমি ভূত। আমি কিন্তু বেঁচে আছি এখনও। আমার সুখ ছিনতাই করতে ছুটে এসেছ তুমি?’…
— হ্যাঁ আমি ভূত। কিন্তু তুমিও আর বেঁচে নেই আমার জীবনে।… আর সুখের কথা বলছ, আমি দুঃখী মানুষ নই সুপর্ণা, তোমার সুখ কাড়বো বলে আসিনি আমি’—
— তবে কেন এসেছ? এখনও কীসের লোভ তোমার?
— লোভ নয়, সাধ। মরা মানুষেরও কি সাধ জাগেনা ফেলে আসা পৃথিবীতে গিয়ে একটিবার দেখে আসি কেমন আছে আপনজনেরা… কেমন আছে বন্ধুবান্ধবেরা…! একবার কথা কয়ে আসি, চা খাই তাদের সঙ্গে…! সাধ জাগেনা বলো?…থেমে যায়, আবার বলে ওঠে ভূতটা, ‘সুপর্ণা, বাঙালি কাঁকড়ার জাত হলেও আমি ‘কাঁকড়া’ নই তুমি জানো— টেনে নিচে নামিয়ে দেব না তোমাকে— যাই হোক তোমার সংসার দেখতে এসেছিলাম, দেখা হয়ে গেল— আমি যাই, ভালো থেকো তুমি’—
বিকেল থিতিয়ে গিয়ে সন্ধে নেমে আসছে। মালতীও এসে গেছে সেই কোন দুপুরবেলা। তবুও চা করতে নিজেই কিচেনে ঢুকেছে সে। বসবার ঘরে সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে হেলান দিয়ে আছে ভূতটা। এসির ঠান্ডা আরামে চোখ বুঝি বুজে এসেছে তার। মিউজিক-সিস্টেমে মৃদু হয়ে বাজছে ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে’।
কাপে চা ঢালতে ঢালতে আনমনা হয়ে যাচ্ছিল সুপর্ণা। ইশ্ কী খারাপ হয়ে গেছে চেহারাটা…। ভূতটার জন্যে একটু-একটু মায়া হচ্ছে কেমন।
পাখি ডাকছে। সুর করে। রাজর্ষি ফিরে এল বোধহয়। মানুষটার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে তার।
♦—♦—♦
লেখক পরিচিতি: গল্পকার, প্রাবন্ধিক আর বিদ্যাদাতা।একসময় কৃত্তিবাস পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হুগলির রিষড়ার বাসিন্দা।
❤ Support Us








