Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • মে ১১, ২০২৫

হিরণবালা । পর্ব ৪

গোয়ালন্দ থেকেই তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে একা একাই স্টিমারে চড়ে বসল হিরণবালা । ভয় লাগছে একটু ঠিকই । কিন্তু লতানে গাছ হলে আর ওর চলবে না বুঝে গেছে হিরণ। মোটা গুঁড়ি আর শক্ত কাণ্ড নিয়ে মাটির ওপর ওকে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকতে হবে...তারপর

অংশুমান কর
হিরণবালা । পর্ব ৪

 
৫

 
সালকিয়াতে দাদার ভাড়াবাড়িতে পৌঁছে হিরণ বুঝতে পারল যে, দাদাকে লেখা ওর চিঠিটা এসে পৌঁছয়নি। তিন সন্তানকে নিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর সালকিয়াতে দাদার বাড়িতে হিরণ যখন পৌঁছল, তখন সন্ধে প্রায় হব হব। এই অসময়ে এমন একখানি উটকো বিপদ বউদি আশালতা একেবারেই আশা করেনি। তিন ছেলেমেয়ে সহ হিরণকে দেখে সে একেবারে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। আশালতা কোনোদিনই তিন ননদ বা শ্বশুর-শাশুড়িকে পছন্দ করত না। মাসে মাসে বাড়িতে টাকা পাঠানোও ভালোভাবে নেয়নি আশালতা। হিরণ আশালতাকে দোষ দিতেও পারে না। দাদার তিন সন্তান। দুই মেয়ে, এক ছেলে। এদের মানুষ করাই এক ঝক্কি। তার ওপরে আরও অনেকগুলি পেটের দায়িত্ব নেওয়া মুশকিলের তো বটেই। হিরণের সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলে আশালতা যখন বুঝতে পারল যে, হিরণ একখানি চাকরি পেয়েছে, বেশিদিন তাদের বাসায় থাকবে না, তখন খানিকটা সহজ হল সে। গীতা এবং সত্য প্রথমে খানিকটা হকচকিয়েই গিয়েছিল মামির ব্যবহারে। তারপরে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হল। মামাতো দুই বোন মমতা আর সমতা ওদের দেখে খুবই খুশি। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারজনে বেশ মিলেমিশে খেলতে শুরু করে দিল শোয়ার ঘরের তক্তপোষের ওপরে। ছোটোদের জগতটি একেবারেই বড়োদের মতো নয়। সে জগতের হিসেব-নিকেশ আলাদা। দাদার ছেলেটি প্রায় গোবিন্দরই বয়সি। নাম শান্ত। শান্ত আর গোবিন্দর বন্ধুত্ব হতেও বেশি দেরি হল না।
 
 দাদা ফিরল বেশ রাত করেই। মানুষটা নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর দাদা বেশ লম্বা একটা চিঠি হিরণকে লিখেছিল। তাতে মূলত উপদেশ দিয়েছিল কষ্ট করে, মানিয়ে নিয়ে, ওই বাড়িতে থেকে যাওয়ারই। হিরণ যে নিজের পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে পারে এমনকি চাকরিও জুটিয়ে নিতে পারে একটা, সেটা দাদা ভেবে উঠতেই পারেনি। কিন্তু হিরণের চাকরি পাওয়ার খবরটায় দাদা বেশ খুশিই হয়েছে মনে হল। বলল যে, পরের দিন একটা ছুটি নিয়ে হিরণকে নিয়ে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে যাবে হরিহর ভৌমিকের সঙ্গে দেখা করতে।
 
 রাতে শুয়ে শুয়ে হিরণ ভাবছিল, তার যে এতখানি মনের জোর ছিল, সে নিজেই বোধহয় জানত না। ফরিদপুর জেলার বাইরে সে কখনও পা দেয়নি। সেই জেলার মধ্যেও যেখানেই গেছে চিরকাল সঙ্গে কেউ না কেউ থেকেছে। এবার এতটা পথ সে পাড়ি দিল একদম একা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল এই যে, একটি বারের জন্যও তার ভয় লাগেনি। বুক দুরুদুরু করেনি। স্টিমার, ট্রেন, বাস বদল করে করে ঠিকানা খুঁজে খুঁজে সে ঠিক এসে পৌঁছেছে দাদার ভাড়াবাড়িতে। ছিদাম একবার তাকে বলেছিল দাদার বাড়ি অবধি হিরণকে পৌঁছে দিয়ে যাবে কি না। হিরণই তাকে নিষেধ করেছিল। ও বুঝতে পেরেছে যে, একটা উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে সে ঝাঁপ দিতে চলেছে একা। সাঁতার তাকে একাই কাটতে হবে। নুলিয়াদের সাহায্য নিলে চলবে না। নড়িয়ার বাড়ি থেকে সালকিয়াতে দাদার ভাড়াবাড়ি পর্যন্ত এতটা পথ তিন নাবালক ছেলেমেয়েকে নিয়ে পাড়ি দিয়ে হিরণ এটুকুও বুঝেছে যে, দায়িত্ব মানুষকে অনেকখানি শক্তপোক্ত করে দেয়। রাস্তায় ঘাটে দরকার পড়লে সাহায্য করার জন্য মানুষজনও এখনও প্রস্তুত। শিয়ালদা স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাওড়া আসার জন্য একটা ভুল বাসে হিরণ চেপে পড়েছিল। ওর পাশের সিটে বসে থাকা এক ভদ্রলোক পরের স্টপেই হিরণের সঙ্গে বাস থেকে কেবল নেমেই আসেননি, সঠিক বাসে দায়িত্ব নিয়ে ওদের চারজনকে তুলেও দিয়েছিলেন। এখন হিরণের মনে পড়ছে তাড়াহুড়োয় ওই ভদ্রলোকের নামটাও ওর জিজ্ঞেস করা হয়নি। আর হয়তো কোনোদিন ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখাই হবে না। পৃথিবীতে এই রকম কত মানুষের কাছেই ঋণ রয়ে যায়। অপরিশোধ্য সেই সব ঋণ। ছিদামের ঋণও কি ও কোনোদিন শোধ করতে পারবে ?
 

হিরণ প্রায় গড় হয়েই একটা প্রণাম করেছিল হরিহর ভৌমিককে। উনি কুণ্ঠাতে ‘হাঁ হাঁ’ করে উঠেছিলেন। কিছুতেই প্রণাম নিতে চাইছিলেন না। হিরণ ওঁর বাধা মানেনি। বাবা বলতেন, ঠাউর নানা রূপে ভক্তের সামনে খাড়ান। আমরা তাঁরে চিনতি পারি না। হরিহর ভৌমিককে চিনতে কিন্তু হিরণের ভুল হয়নি। ঈশ্বর ছাড়া উনি আর কে ?

 
রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে হিরণের কিন্তু সত্যিই বুক দুরুদুরু করতে লাগল। বিশাল বড়ো কলকাতা শহরে সে একটা পিঁপড়ের মতো এসে যখন নেমেছিল গতকাল, তখন তার এতখানি ভয় করেনি। কিন্তু এখন করছে। সঙ্গে দাদা রয়েছে, তাও। হিরণের দাদা অশোকতরু বসুর কলকাতা শহরটা হাতের তালুর মতো চেনা। কলকাতা শহরেই কলেজের পড়াশুনা করেছে দাদা। চাকরিও এখানে। সেই যে পড়াশোনা করতে কবে গোয়ালন্দ থেকে কলকাতায় এসেছিল দাদা আর পাকাপাকিভাবে ফিরে যায়নি। সেই দাদার সঙ্গেই আজ হিরণ এসেছে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। দাদার সঙ্গে ছিল তাও বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ই ওর একটু একটু ভয় লাগছিল। আর এখন তো রীতিমত মনে হচ্ছে বুকের ভেতরে কেউ ঢোল বাজাচ্ছে।
 
হরিহর ভৌমিক ছোটোখাটো চেহারার অতি শান্ত, ভদ্র একজন বয়স্ক মানুষ। ছোটোবেলা থেকেই বাবা-মা ভীষণভাবেই ঠাকুরের ভক্ত। হিরণের সেভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাস ছিল না। যেটুকু ছিল সেটুকুও চলে গিয়েছিল মানুষটা নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায়। কিন্তু হিরণের চাকরিটা হওয়ার জন্য দাদা হরিহর ভৌমিককে ধন্যবাদ জানানোয় উনি  যা বললেন তা শুনে হিরণের মনে হল, ঈশ্বর আছেই, না হলে ওর এই চাকরিটা হয় না।
 
 চাকরির দরখাস্ত ঠিক যেভাবে লেখা উচিত সেভাবে তো হিরণের দরখাস্তটা লেখা হয়নি। দরখাস্তুর জায়গায় ছিদাম লিখে দিয়েছিল হিরনের জীবনবৃত্তান্ত। চাকরিটার জন্য দরখাস্তগুলো বাছাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন যে-ভদ্রলোক, তিনি বুঝতেই পারেননি যে, হিরণের চিঠিটা আসলে চাকরির দরখাস্ত। চিঠিটা তিনি ফেলে দিয়েছিলেন বাজে কাগজ ফেলার ঝুড়িতে। হরিহর ভৌমিক বললেন কলমের নিব থেকে কালি বেশি ঝরছিল তাই বাজে কাগজ ফেলার ঝুড়ি থেকে উনি তুলে নিয়েছিলেন হিরণের দরখাস্তটা, কালি মুছবেন বলে। তুলে দেখেন যে, সেটা বাজে কাগজ নয়, একটা চিঠি। কৌতূহলবশত তিনি চিঠিটা পড়তে শুরু করে বুঝতে পারেন যে, হিরণবালা কর আসলে স্বাস্থ্য দফতরের নার্সের চাকরির আবেদন করেছেন। টেবিলের উলটোদিকে বসে থেকে শান্ত, সুভদ্র মানুষটি বললেন, তোমার চিঠিটা পড়ে আমার চোখে জল চলে এসেছিল মা। আমার নিজের জামাইবাবু দিদি আর দুই সন্তানকে ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। আর ফিরে আসেননি। আমিই তাদের খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি। কিন্তু মানুষ করতে পারিনি মা। আমি এ কারণেই তোমাকে লিখেছিলাম, এখানে এসে একবার আমার সঙ্গে দেখা কোরো। আমি তোমাকে শুধু এইটুকু বলতে চাই, আমাদের সাহেব না চাইলে তোমার চাকরিটা হত না। আমি নিমিত্ত মাত্র। আমার কলমের নিবটাই তোমাকে সাহেবের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল বলতে পারো। এই যে চাকরিটা পেলে, একে ঠিকঠাক ভাবে ব্যবহার কোরো। ছেলেমেয়েগুলো যেন মানুষ হয় দেখো। জন্ম নিলে মানুষকে দু-টি অন্নসংস্থান ঈশ্বর যেভাবে হোক করে দেন। কিন্তু খেয়ে পরে বেঁচে থাকাকে তো আর মানুষ হওয়া বলে না। মানুষ হতে গেলে আরও বাড়তি কিছু কিছু জিনিস দরকার। এই চাকরিটা তোমার ছেলেমেয়েদের সেই বাড়তি জিনিসগুলোর ব্যবস্থা করে দেবে।
 
 রাইটার্স বিল্ডিং ছেড়ে আসার আগেই হিরণ প্রায় গড় হয়েই একটা প্রণাম করেছিল হরিহর ভৌমিককে। উনি কুণ্ঠাতে ‘হাঁ হাঁ’ করে উঠেছিলেন। কিছুতেই প্রণাম নিতে চাইছিলেন না। হিরণ ওঁর বাধা মানেনি। বাবা বলতেন, ঠাউর নানা রূপে ভক্তের সামনে খাড়ান। আমরা তাঁরে চিনতি পারি না। হরিহর ভৌমিককে চিনতে কিন্তু হিরণের ভুল হয়নি। ঈশ্বর ছাড়া উনি আর কে ?
 
 হরিহর ভৌমিকই জানালেন, হিরণের পোস্টিং হয়েছে কাঁথি হাসপাতালে। এখানে চাকরিতে যোগ দিয়েই অবশ্য হিরণকে যেতে হবে বর্ধমান মেডিকেল কলেজে। ট্রেনিং হবে সেখানে হিরণের। মানুষের শরীরের গঠন সম্পর্কে জানবে। প্রেসার মাপতে শিখবে। ইনজেকশন দিতে শিখবে। নিজেরই জীবন বিপন্ন হয়ে গেছিল যে-মেয়ের, সেই হিরণবালা কর এবার কত কত মানুষের জীবন বাঁচাবে।

 

৬

–দ্যাশের অবস্থা বালা না। কলকাতাও আর আগের মতো শান্তিতে থাকনের যায়গা নাই।
 
 দাদা বলছে। খেতে বসে। ছেলেমেয়েদের খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর রাত্রিবেলা হিরণ দাদা আর বউদি একসঙ্গে খেতে বসে। খেতে খেতেই দাদা নানা ঘটনার কথা বলে। কোথায় কী হচ্ছে সে সম্বন্ধে একটা আন্দাজ দেয় হিরণকে। সামনের মাসের এক তারিখে তার জয়েনিং। তার আগে এখন দিন সাতেক ছেলে মেয়েদের নিয়ে হিরনকে থাকতে হবে দাদার আশ্রয়েই। তারপরে কাঁথি হাসপাতালে চাকরিতে জয়েন করেই হিরণ চলে যাবে বর্ধমান মেডিকেল কলেজে ট্রেনিং নিতে। গীতা, সত্য আর গোবিন্দ ওই সময়টা থাকবে দাদার কাছেই। এমনটাই ঠিক হয়েছে।
 

এসব কথা শুনে হিরণের ভয় লাগে। নইড়্যা ছেড়ে সে এদেশে এসেছে জীবনকে নতুন করে গড়ে নেবে বলে। তার তিনটি ছেলেমেয়ে বড়োই ছোটো। দেশে শান্তি না-থাকলে, ওরাই বা ভালোভাবে বড়ো হবে কী করে ! একটাই যা স্বস্তি। দাদা যেসব কথা বলে সেসব কলকাতার কথা। ও তো কয়েক মাস থাকবে বর্ধমানে। তারপর কাঁথিতে। সেখানে তো আর এই সব গোলমাল নেই

 
দাদা আবার বলল, মুসলিম লিগ যেমন দাপাইতাছে, তেমন হিন্দুরাও এহানে কম যায় না। তারাও দাপায়।
 
হিরণ জিজ্ঞেস করে, হিন্দুরা দাপায় ক্যান ?
 
দাদা বলে, তারা কয়, মোসলমানের আন্ডারে থাকুম না।
 
 খেতে খেতেই দাদা বলতে থাকে গত কয়েক বছরে কলকাতা শহরে একাধিক হিন্দু সংগঠন বা ক্লাবের জন্ম হয়েছে। খুবই সক্রিয় এখন হিন্দু মহাসভা আর ভারত সেবাশ্রম সংঘ। শরীরচর্চার নামে এরা নাকি যুবকদের মিলিটারি ট্রেনিং দিচ্ছে। বড়ো কিছু একটা কলকাতা শহরে যে কোনোদিন ঘটতে পারে।
 
 দাদার কথা থামিয়েই বউদি জিজ্ঞেস করে, মোসলমানরে রাজা কওন লাগব কী লাইগ্যা ? রাজা তো গোরারাই। মোসলমানের অধীন হওনের প্রশ্ন ক্যামনে ওঠে?
 
দাদা বলে, পরিস্থিতি বালা না। সোহরাওয়ার্দি খাইদ্য মন্ত্রী হইয়া দুর্ভিক্ষের সময় যা করসেন তাতে উনার উপর হিন্দুদের ক্ষোভ বাড়সে। মিউনিসিপ্যালিটিগুলায় হিন্দু প্রতিনিধিদের সংখ্যা কমসে। স্কুল বোর্ডেও তাই। এসব লইয়াই হিন্দু মহাসভা আর সংঘ বাজার গরম করতাসে। সাপোর্ট পাইতাসে। এইরমটাই হইতে থাকলে, কিসু একখান বড়ো বিপদ হইব।
 
 এসব কথা শুনে হিরণের ভয় লাগে। নইড়্যা ছেড়ে সে এদেশে এসেছে জীবনকে নতুন করে গড়ে নেবে বলে। তার তিনটি ছেলেমেয়ে বড়োই ছোটো। দেশে শান্তি না-থাকলে, ওরাই বা ভালোভাবে বড়ো হবে কী করে ! একটাই যা স্বস্তি। দাদা যেসব কথা বলে সেসব কলকাতার কথা। ও তো কয়েক মাস থাকবে বর্ধমানে। তারপর কাঁথিতে। সেখানে তো আর এই সব গোলমাল নেই। গোলমাল বাঁধলে বড়ো বড়ো শহরেই গোলমাল বাঁধবে। ঢাকা আর কলকাতা অশান্ত হবে হয়তো। সে গোলমালের আঁচ নিশ্চয়ই গোয়ালন্দ বা কাঁথিতে গিয়ে পৌঁছবে না। ঘুমোনোর আগে এইসব কথা ভেবে নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দেয় হিরণ।

 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

ক্রমশ..
 
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ৩

হিরণবালা । পর্ব ৩


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!