Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ২১, ২০২৪

ভোর ভয়ি। পর্ব ১৪: বস্তিঘরের ছেলে ‘সিআইএ-র দালাল’

মধুময় পাল
ভোর ভয়ি। পর্ব ১৪: বস্তিঘরের ছেলে ‘সিআইএ-র দালাল’

অলঙ্করণ: দেব সরকার

 
বায়োস্কোপের বাকসো। রঙের নকশা চটে খসে এখানে-ওখানে বেরিয়ে পড়েছে মৃত‍্যু-প্রস্তাব। বাকসোর গোল জানালার ঢাকনা কবে যেন হারিয়ে গিয়েছে। সেখানে তাকিয়ে আছে একজোড়া চোখ। চোখের পর্দায় আসে শূন‍্য খেয়াঘাট, দূরে দূরে সবল ডানার চিল, অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র, চাহে কোই মুঝে জংলি কহে, আরও কত রক্ত চাই তব প্রীতি তরে, ধানের ক্ষেতে মশাল আগুন, লকআপের আর্তনাদে বাতাস কাঁপে, শিক্ষকদের চেয়ারে ভাঙনের শব্দ, রং ও রেখায় জাগে পুরাণপ্রতিমা, উন্নয়ন আর উৎসব শুষে খায় জলাভূমি, কুয়াশার ওপারে পলিথিনে মোড়া চাঁদ, জোড়া চোখ ঘটনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে সাঁতরায়, দূরে কোথাও আগুনবরণ আকাশে বাজে ‘ভোর ভয়ি’।

 

পর্ব ১৪

ভেসে এল ‘সিআইএ-র দালাল’৷ কানের কাছাকাছি৷ এবং বেশ জোরে বলা৷ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই৷ দেখি সেই ছেলেটা৷ আমারই বয়সী৷ ফর্সা, সুন্দর, আদুরে চেহারা৷ দালানবাড়ির ছেলে, সম্পন্ন ঘরের সন্তান৷
 
   বসেছিল হরিপদদার চায়ের দোকান ‘ইস্ট ইন্ডিয়া রেস্টুরেন্ট’-এর ভেতর৷ আমাদের বস্তিবাড়ির দরজার গায়ে৷ নামের বাহার আছে, আসলে চা-বিস্কুট-ওমলেটের দোকান৷ ছুটির দিনে ঘুগনি বা আলুর দম হয়৷ দুপুরের দিকে দোকান ফাঁকা৷ ছেলেটা দরজামুখো হয়ে বসেছিল৷
 
  জবাব দিইনি৷ ইচ্ছে হলেও তর্কে যাইনি৷ সিআইএ কি জিনিস তা ততদিনে মোটামুটি জেনে গেছি৷ তার দালাল আমি৷ এ তো বিরাট খেতাব ! বাংলার কয়েকজন কবি-সাহিত্যিককে এভাবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ তাঁরা নাকি মার্কিন ডলারে মোটা অঙ্কের পেমেন্ট পান৷ বিনিময়ে আমেরিকার হয়ে গুপ্তচরের কাজ করেন৷ তাঁদের মুন্ডু চেয়ে পোস্টার পড়েছে, দেওয়ালে লেখা হয়েছে৷ অস্বীকার করব না, আমিও একদিন বলেছি বুদ্ধদেব বসু, গৌরকিশোর ঘোষরা সিআইএ-র এজেন্ট৷ কিন্তু, ১২ টাকা মাসভাড়ার বস্তিঘরের ছেলে আমিও এজেন্ট হয়ে গেলাম ! 
 
   ঘটনা এই, এন্টালি-পদ্মপুকুর এলাকার সিপিএম নেতা প্রদ্যোতদা (পদবি মনে নেই, সবাই বলত ‘প্রদ্যুৎদা’, আমিও বলতাম) এক রাতে আমাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে নকশালবাড়ির পথ ভুল, বিপ্লবের সময় এখনও হয়নি, ভারত আধা-সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক দেশ নয়, বিপ্লবের স্বার্থে পার্লামেন্টকে ব্যবহারের কথা লেনিনই বলেছেন, বিপ্লবকালীন চিন ও এখনকার ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা ইত্যাদি৷ ‘মাতৃ ভাণ্ডার’-এর রোয়াকে বসেছিলাম আমরা৷ রাত আড়াইটে বেজে গিয়েছিল৷ বাবা বেরিয়ে এসেছিল ঘরে না-ফেরা ছেলেকে খুঁজতে৷ কখনওই কোনোভাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন একটা ছেলেকে সিপিএম-এ টানতে প্রদ্যোতদার এই দীর্ঘ ‘ক্লাস’-এর কারণ আজও আমার কাছে অস্পষ্ট৷ কথা ছিল, দিনতিনেক পর প্রদ্যোতদার সঙ্গে বসে মতামত জানাব৷ সেটা হয়নি৷ কেননা, নকশালবাড়ি তথা কৃষকবিপ্লবের তত্ত্ব সম্পর্কে আমার জ্ঞান ছিল ভাসা-ভাসা৷ পাড়ার নকশালপন্থী রাজনীতির যুবক মানিকদাকে (পদবি ভুলে গেছি) ব্যাপারটা বলি৷ মানিকদা জর্দার সুগন্ধ ছড়িয়ে পরিষ্কার বলে দেন, ওরা কোনোদিন বিপ্লব করবে না৷ মুখে বলবে, কাজে বিপ্লবের বিরোধিতা করবে৷ ওদের সঙ্গে কথা বলা, তর্ক করার মানে হয় না৷ ভুলে যাও৷ মানিকদার কাছেও কৃষকবিপ্লবের তত্ত্ব, জনযুদ্ধ ইত্যাদি হয়তো স্পষ্ট ছিল না৷ আমি প্রদ্যোতদাকে এড়িয়ে চলি৷ প্রদ্যোতদা মুক্তা মেডিকেল হল বা শিবাজি হিন্দু হোটেল বা জগন্মাতা ভাণ্ডারের রোয়াকে বসে থাকেন৷ আমি উলটো ফুটপাথ ধরে দ্রুতপায়ে চলে যাই৷ প্রদ্যোতদা বুঝে গেলেন তাঁর শ্রম জলে গেছে৷ এর কিছুদিন পরই শুরু হল আমাকে দেখে ‘সিআইএ-র দালাল’ ছুড়ে দেওয়া৷ এবং এই ছেলেটাকেই লাগানো হয়েছিল আমাকে খোঁচানোর কাজে৷
 
   প্রদ্যোতদার ভাই খোকা নকশালপন্থী৷ ওকে জানাই৷ ও বলে দেয়, কোনোরকম ঝামেলায় যাবি না৷ ওরা একটা গণ্ডগোল চায়৷ তাতে আমাদের অসুবিধে হবে৷ আমরা পুলিশের খাতায় চলে যাব৷
 

৭০ দশকের কলকাতা। আলোকচিত্র: ল্যারি বুরোজ

পুলিশের নজর এড়িয়ে কাজ করার শিক্ষা ছিল প্রায় প্রতিদিনকার৷ কেশব সেন স্ট্রিট থেকে ‘দেশব্রতী’ নিয়ে আসার দায়িত্ব ছিল আমার৷ যেহেতু শেয়ালদা ও কলেজ স্ট্রিটে প্রায় রোজ যাই৷ কুড়িটা কাগজ নিয়ে দশটা পৌঁছে দিতে হত গোবরার ইউনিটে, দশটা বেকবাগানে৷ কাগজ আনা থেকে পৌঁছে দেওয়া সবটাই একা, এবং পায়ে হেঁটে৷ নানা সময়ে, নানা পথ ধরে চলাচল করা৷ বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করতাম৷ মনে হত, বিপ্লবের স্বার্থে রাষ্ট্রের চোখে বিপজ্জনক কিছু বহন করছি৷ যদিও ‘দেশব্রতী’র দফতর তখন প্রকাশ্যেই ছিল৷ (নিষিদ্ধ হয় ২৭ এপ্রিল ১৯৭০৷ সেদিন আমি গ্রেফতার হয়েই যেতাম৷ ‘দেশব্রতী’র গলিতে ঢোকার আগে উলটোদিকের ফুটপাত থেকে গলির পরিস্থিতি দেখে নিতাম৷ কখনও কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি৷ তবু অভ্যেসটা বজায় ছিল৷ ওইদিন চোখে পড়ে গলির মুখে জটলা৷ ভেতরে পুলিশ৷ একটু দূরে কালো ভ্যান৷ পান-সিগারেটের দোকানের ছেলেটা বলল, চলা যাইয়ে৷ চার আদমিকো অবহি উঠায়া৷ ছেলেটি হয়ত আমাকে চিনত৷) খোকা বলেছিল, সিপিএম থেকে সাবধান৷ ওরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জানতে চাইতে পারে, খবর নিতে পারে৷ ওরা পুলিশের দালাল৷ খবর পৌঁছে দেবে৷ ইচ্ছে ছিল, ওই দালানবাড়ির ফর্সা আদুরে ছেলেটাকে ‘পুলিশের দালাল’ বলি৷ বলা হয়নি৷ 
 

দুটো দলে আমরা দুটো গলি দিয়ে বেরিয়ে গেলাম ডাক্তার সুরেশ সরকার রোডে৷ একটা দল গেল গভর্নমেন্ট কোয়ার্টারের দেওয়ালে লিখতে, আর-একটা দল গোবরা রোডে৷ বহুবার লিখেছি, বন্দুকের নল হইতেই রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্ম এবং শ্রীকাকুলাম কি ভারতের ইয়েনান হতে চলেছে? সুন্দরীমোহন অ্যাভেনিউ ধরে মাঝরাতেও গাড়ি যায়৷ ডিহি শ্রীরামপুরে ঢোকে দু-একটা৷ গোবরা রোডে কারখানার লরি আসে৷ প্রতিটি গাড়িই সন্দেহজনক৷ অন্ধকারে গা ঢাকা দিই৷ ভোরের আলো ফোটার আগেই লেখা শেষ৷ বাকি রাতটা কোথাও কাটিয়ে ভোরে ঘরে ফেরা৷ মা-কে বলা থাকত, শঙ্করদের বাড়িতে আছি৷ শঙ্কর আমার ছোটোবেলার বন্ধু, পড়ালেখায় ভালো, রাজনীতি থেকে হাজার হাত দূরে

 
   বিপ্লব এসে গেছে, বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে এইসব কথাবার্তা একটা অস্থিরতা তৈরি করে৷ কলেজে শুনি, কয়েকজন গ্রামে গেছে— গড়বেতায়, গোসাবায়, শিয়াখালায়৷ মানিকদা একদিন বললেন, দেওয়াল-লেখা বাড়াতে হবে৷ নির্দেশ এসেছে৷ কোথা থেকে নির্দেশ আসে, সেকথা জানতে চাওয়া যায় না৷ গোপনীয়তার মোড়কে মোড়া বেশ রহস্যময়৷ যেমন, আমি বেকবাগানে যাকে ‘দেশব্রতী’ দিতে যেতাম, তার আসল নাম জানি না৷ সে-ও জানে না আমার নাম৷ মানিকদা বললেন, রাত বারোটার পর তালতলার মাঠে আসছি৷ তিন বা চারজনের কথা বলা হল৷ বলে দেওয়া হল, অন্যেরা যেন না জানে৷ কেমন একটা অবিশ্বাসের গন্ধ৷ মন্দ লাগত না৷ কালি এবং ব্রাশ হাতে সবার আগে হাজির মানিকদা৷ গোটা তল্লাট ঘুমে৷ সিআইটি কোয়ার্টারের দু-চারটে জানালায় আলো আছে৷ হরেন মুখার্জির বাড়ির চারপাশের বসতি নিঃশব্দ৷ মানিকদা দুটো কাগজে লেখা শ্লোগান আমাদের হাতে দিলেন৷ দুটো দলে আমরা দুটো গলি দিয়ে বেরিয়ে গেলাম ডাক্তার সুরেশ সরকার রোডে৷ একটা দল গেল গভর্নমেন্ট কোয়ার্টারের দেওয়ালে লিখতে, আর-একটা দল গোবরা রোডে৷ বহুবার লিখেছি, বন্দুকের নল হইতেই রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্ম এবং শ্রীকাকুলাম কি ভারতের ইয়েনান হতে চলেছে? সুন্দরীমোহন অ্যাভেনিউ ধরে মাঝরাতেও গাড়ি যায়৷ ডিহি শ্রীরামপুরে ঢোকে দু-একটা৷ গোবরা রোডে কারখানার লরি আসে৷ প্রতিটি গাড়িই সন্দেহজনক৷ অন্ধকারে গা ঢাকা দিই৷ গাড়ি চলে গেলে বেরিয়ে আসি৷ ভোরের আলো ফোটার আগেই লেখা শেষ৷ বাকি রাতটা কোথাও কাটিয়ে ভোরে ঘরে ফেরা৷ মা-কে বলা থাকত, শঙ্করদের বাড়িতে আছি৷ শঙ্কর আমার ছোটোবেলার বন্ধু, পড়ালেখায় ভালো, রাজনীতি থেকে হাজার হাত দূরে৷ মা নিশ্চিন্ত৷ বাবাকে নিশ্চিন্ত রাখত৷
 
   গোবরা রোডে দেওয়াল লেখাটা একসময় সমস্যা হয়েছিল৷ মালগাড়ি লাইনে ওয়াগন ব্রেকার ধরতে বা ওদের সঙ্গে ব্যবস্থা করতে মাঝরাতে পুলিশ আসত৷ আমরা গা ঢাকা দিয়ে ঝোপে বসে থাকতাম৷ ওয়াগন ব্রেকাররা আমাদের চেনা৷ পাড়ারই ছেলে৷ একটু সমঝে চলত৷ পুলিশ কবে ও কখন আসবে বলে দিত৷ ক্রমে ওরা থানার খোচর হয়ে গেল৷ গোপাল তো পুলিশের জিপে চলাফেরা করে পাড়ার ভিআইপি হল৷
 
   দিনের আলোয় ওইসব দেয়াল-লেখার পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখেছি অক্ষরগুলো ভেংচি কাটছে৷ যে বিদঘুটে হস্তাক্ষর এতদিন নিজের খাতায় লুকিয়ে রেখেছি, হাজার চোখের সামনে তাদের প্রকাশ্য করে দিলে দাঁত-মুখ খিঁচোবেই৷
 
   তিন নম্বর গোরস্থানের পা্শে এক বস্তিতে ক্লাস নিতে আসতেন চন্দন গুপ্ত ও চন্দন দত্তগুপ্ত৷ এই নামেই চিনতাম৷ তাঁরা কোথা থেকে আসতেন, জানতে চাওয়ায় বারণ ছিল৷ মাও সে-তুংয়ের লেখা পড়ে তাঁরা ব্যাখ্যা করতেন৷ নকশালবাড়ির বিদ্রোহ আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা, মাও সে-তু্ংয়ের চিন্তায় এর সমর্থন আছে, তাঁরা বোঝাতেন৷ অনেক কঠিন বিষয় নিয়েও তাঁরা বলতেন৷ সেসব আমার মাথায় ঢোকেনি৷ বস্তির ঘর থেকে বেরিয়ে আসতাম এক এক করে৷ পুলিশের নজর এড়াতে৷ ওটা ছিল চাঁদুদার ঘাঁটি৷ ওইখানে একদিন এলেন কমরেড অসিত সিনহা৷ বস্তি এলাকায় কীভাবে গণসংগঠন গড়ে তোলা যায়, পরামর্শ দিলেন৷ মানুষের নিত্যদিনের সমস্যার সঙ্গে একাত্ম হয়ে, ছোটো ছোটো কাজের মধ্য দিয়ে সমর্থন গড়ার কথা বললেন৷ কাজ সেভাবে এগোয়নি৷ কারণ পাড়া কে পাড়া তখন খোচরে ছেয়ে যাচ্ছে৷ কে যে খোচর নয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না৷ ১৯৬৯-এর ভোট বয়কটের পোস্টার লেখার কাজ এল৷ লেখা হল, ‘সাম্রাজ্যবাদের দুটি ফ্রন্ট/কংগ্রেস আর যুক্তফ্রন্ট/ভোট ভোট করে কারা/সাম্রাজ্যবাদের দালাল যারা’৷ সিপিএমের নির্বাচনী কার্যালয়ের সামনে কয়েকটা পোস্টার সাঁটা হল৷ পাকাদালনের সেই আদুরে ছেলে ও তার মেন্টর প্রদ্যোতদাকে ‘সাম্রাজ্যবাদের দালাল’ বলতে পেরে ভালো লেগেছিল৷ প্রসঙ্গত, বামফ্রন্ট যখন নিরঙ্কুশ শাসনে চলছে, প্রদ্যোতদাকে তাঁর দল দুর্নীতির দায়ে সাসপেন্ড করে৷ খবরের কাগজে দেখেছি৷  
 

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦

ক্রমশ…
 
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ১৩

ভোর ভয়ি। পর্ব ১৩: উৎপল দত্তের ‘তীর’ এবং মুচলেকা

   


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!