Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ১৪, ২০২৪

ভোর ভয়ি। পর্ব ১৩: উৎপল দত্তের ‘তীর’ এবং মুচলেকা

মধুময় পাল
ভোর ভয়ি। পর্ব ১৩: উৎপল দত্তের ‘তীর’ এবং মুচলেকা

 
বায়োস্কোপের বাকসো। রঙের নকশা চটে খসে এখানে-ওখানে বেরিয়ে পড়েছে মৃত‍্যু-প্রস্তাব। বাকসোর গোল জানালার ঢাকনা কবে যেন হারিয়ে গিয়েছে। সেখানে তাকিয়ে আছে একজোড়া চোখ। চোখের পর্দায় আসে শূন‍্য খেয়াঘাট, দূরে দূরে সবল ডানার চিল, অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র, চাহে কোই মুঝে জংলি কহে, আরও কত রক্ত চাই তব প্রীতি তরে, ধানের ক্ষেতে মশাল আগুন, লকআপের আর্তনাদে বাতাস কাঁপে, শিক্ষকদের চেয়ারে ভাঙনের শব্দ, রং ও রেখায় জাগে পুরাণপ্রতিমা, উন্নয়ন আর উৎসব শুষে খায় জলাভূমি, কুয়াশার ওপারে পলিথিনে মোড়া চাঁদ, জোড়া চোখ ঘটনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে সাঁতরায়, দূরে কোথাও আগুনবরণ আকাশে বাজে ‘ভোর ভয়ি’।

 

পর্ব ১৩

 
নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান এবং ‘তীর’ নাটকের কথা যখন এল, কিংবদন্তি নাট্যকার ও অভিনেতা উৎপল দত্ত প্রসঙ্গও এখানেই বলতে হয়৷
 
১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর মিনার্ভা হলে ‘তীর’ নাটকের প্রথম অভিনয় হয়েছিল৷ ৮ দিন পর, ২৪ ডিসেম্বর মুম্বইয়ে গ্রেপ্তার হন উৎপল দত্ত৷ নকশালবাড়ির অভ্যুত্থানের কমবেশি ছয় মাস পরের ঘটনা৷ ওই বছর ১০ সেপ্টেম্বর কোচবিহার জেলার শহিদ বাগে ‘নকশালবাড়ি ও কৃষক সংগ্রাম সহায়ক কমিটি’ আয়োজিত প্রকাশ্য জনসভায় উৎপল দত্ত বলেন, উষার সূর্যোদয়ের মতো নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলন বিপ্লবের প্রথম আলোকপাত এবং প্রকৃত কমিউনিস্টরা এই পথ গ্রহণ করবে৷ কারণ মাতৃজঠরের শিশুস্পন্দন যেমন মায়েরাই গ্রহণ করতে পারেন, অপরে নয়— তেমনি নকশালবাড়ির কৃষকবিপ্লব সাচ্চা বিপ্লবীরাই ধরতে পারবেন৷ 
 

অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রীয় গণহত্যার ঘটনাস্থল বড়োঝড়ুজোত ও প্রসাদুজোত সরজমিন দেখা, কৃষকদের অভিজ্ঞতা শোনা এবং তাঁদের গান শোনা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে নকশালবাড়ির বাস্তবকে আত্মস্থ করেন উৎপল দত্ত৷ সব রেকর্ড করেন৷ দিনরাত রিহার্সাল চলে পুরোদমে৷ হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনা করেন তার সঙ্গীত৷’ উৎপল দত্তের এই সফরে সঙ্গী ছিলেন আলোকশিল্পী তাপস সেন এবং মঞ্চস্থপতি নির্মল গুহরায়৷ নাটকটি কী হতে চলেছে তা জানতে একদিন চারু মজুমদার নিজে রিহার্সাল দেখতে আসেন

 
শিলিগুড়িতে নকশালবাড়ি রাজনীতির প্রবক্তা চারু মজুমদারের বাড়ি গিয়ে তাঁর সঙ্গে এবং অন্যতম প্রধান  নেতা সৌরেন বসুর সঙ্গে কৃষকবিপ্লবের রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং ঘটনাবলির নানা দিক নিয়ে আলোচনা, অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রীয় গণহত্যার ঘটনাস্থল বড়োঝড়ুজোত ও প্রসাদুজোত সরজমিন দেখা, কৃষকদের অভিজ্ঞতা শোনা এবং তাঁদের গান শোনা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে নকশালবাড়ির বাস্তবকে আত্মস্থ করেন উৎপল দত্ত৷ সব রেকর্ড করেন৷ একটি নাটক নির্মাণের আদর্শগত ও ঘটনাগত উপকরণ সংগ্রহের নিবিড় সময় সেটা৷ লিখেছেন, ‘গাঁ থেকে গাঁয়ে ঘুরে জঙ্গি চাষি আর তাদের পরিবার— ওঁরাও, রাজবংশী, গোর্খা আর বাঙালিদের সঙ্গে কথা বলি৷ পক্ষকালের শেষে টেপ করা গান আর ট্রাইবাল সঙ্গীতের একডজন স্পুল আমাদের সংগ্রহে আসে৷ এরপরই আমি ‘তীর’ নাটকটা লিখে ফেলি৷ দিনরাত রিহার্সাল চলে পুরোদমে৷ হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনা করেন তার সঙ্গীত৷’ উৎপল দত্তের এই সফরে সঙ্গী ছিলেন আলোকশিল্পী তাপস সেন এবং মঞ্চস্থপতি নির্মল গুহরায়৷ নাটকটি কী হতে চলেছে তা জানতে একদিন চারু মজুমদার নিজে রিহার্সাল দেখতে আসেন৷
 

১৯৬৭ সালে শিলিগুড়িতে চারু মজুমদারের পৈতৃক বাড়িতে, কুমকুম ভট্টাচার্য, লিটল থিয়েটার গ্রুপের নিরিমল গুহ রায়, উৎপল দত্ত, চারু মজুমদার, পবিত্র সেনগুপ্ত, তাপস সেন, সৌরীন বসু


ইতিমধ্যে উৎপল দত্তকে বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিপিএম৷ ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭ দলের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি এক বিবৃতিতে জানায়, ‘বিখ্যাত নাট্যশিল্পী উৎপল দত্ত কখনও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না, এখনও তিনি ভারতের কমিউনিস্ট (মার্কসবাদী)-র সভ্য নন৷ অতীতে তাঁর শিল্পকর্মের মারফতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে এবং পার্টি বিভক্ত হওয়ার পরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র পক্ষে তিনি প্রচার করেছেন৷ তাতে পার্টির লাভ নিশ্চয় হয়েছে, তাঁর নিজের ও তাঁর দলের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে৷ আজ উৎপল দত্ত হঠকারীদের দলে ভিড়ে গিয়ে আমাদের পার্টির বিরুদ্ধে প্রচারকার্য চালাতে আরম্ভ করেছেন৷ তিনি নিজের পথ বেছে নিয়েছেন৷ আমাদের পার্টির সভ্য তিনি নন যে তাঁর বিরুদ্ধে কোনও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা আমরা নেব৷ আমাদের পার্টির সভ্য ও বন্ধুগণের নিকট আমরা অনুরোধ জানাই যে তাঁরা যেন শিল্পী উৎপল দত্ত ও তাঁর দলের সঙ্গে কোনও সংস্রব না রাখেন— কোনও সভাসমিতি ও অভিনয়ে তাঁদের যেন নিমন্ত্রণ না করেন৷’
 

তখনও নকশালন্থীদের কোঅর্ডিনেশন কমিটি বা বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়নি৷ আমি ছিলাম দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে৷ ‘অভিযান’-এর সংগঠক এবং বামপন্থী ছাত্র-যুবরা নকশালবাড়ির প্রকৃত ঘটনা জানতে উদগ্রীব ছিলেন৷ ঘণ্টাখানেকের ভাষণে উৎপল দত্ত স্বভাবসিদ্ধ আকর্ষণীয় ভাষা ও ভঙ্গিতে গ্রামীণ জনতার অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় বর্বরতার ছবিটি তুলে ধরেন৷ মঞ্চে সেদিন ছিলেন ঋত্বিক ঘটকও, যথারীতি নীলকণ্ঠ৷ শূন্যে হাত তুলে মুঠিবদ্ধ করে বলেছিলেন, ভান্তু ঘোষের মতো সমাজশত্রুদের ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে…

 

একফ্রেমে উৎপল দত্ত এবং ঋত্বিক ঘটক । কত অজানারে চলচ্চিত্রের শ্যুটিং এ। ছবিটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি


 
উত্তরবঙ্গ থেকে ফেরা ও ‘তীর’ নাটক মঞ্চস্থ হবার মাঝথানে একদিন উৎপল দত্ত কলকাতায় এক সভায় এলেন৷ দৃশ্যত গান ও নাটকের অনুষ্ঠান, ভেতরে রাজনৈতিক কর্মসূচি৷ ‘অভিযান গোষ্ঠী’ আয়োজক৷ বামপন্থী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘অভিযান’ তখন আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেছে৷ সাবেক সিপিএম আর নকশালপন্থী সিপিএম-এ৷ তখনও নকশালন্থীদের কোঅর্ডিনেশন কমিটি বা বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়নি৷ পার্টি হতে আরও অনেক দেরি৷ সুন্দরীমোহন এভেনিউয়ে ন্যাশনাল মেডিকাল কলেজের ‘দেশবন্ধু ছাত্রাবাস’-এর উলটোদিকে লেডিজ পার্কে সভার আয়োজন করা হয়েছিল৷ আমি ছিলাম দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে৷ ‘অভিযান’-এর সংগঠক এবং বামপন্থী ছাত্র-যুবরা নকশালবাড়ির প্রকৃত ঘটনা জানতে উদগ্রীব ছিলেন৷ ঘণ্টাখানেকের ভাষণে উৎপল দত্ত স্বভাবসিদ্ধ আকর্ষণীয় ভাষা ও ভঙ্গিতে গ্রামীণ জনতার অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় বর্বরতার ছবিটি তুলে ধরেন৷ তাঁর বক্তৃতায় অনেকেই সংশয় কাটিয়ে উঠে বুঝে নেন বিপ্লবী লড়াই শুরু হয়ে গেছে৷ মঞ্চে সেদিন ছিলেন ঋত্বিক ঘটকও, যথারীতি নীলকণ্ঠ৷ শূন্যে হাত তুলে মুঠিবদ্ধ করে বলেছিলেন, ভান্তু ঘোষের মতো সমাজশত্রুদের ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে৷ প্রসঙ্গত, প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে কংগ্রেসের সমর্থনে প্রফুল্ল ঘোষকে ক্ষমতায় বসানোর ম্যানেজার ছিলেন ভান্তু ঘোষ এবং তাঁর বাসস্থান লেডিজ পার্কের সভাস্থলের গায়ে৷ 
 
নকশালবাড়ির ঘটনা নিয়ে কেন তিনি নাটক করতে গেলেন, সে-বিষয়ে অনেক পরে ইতালিয় কমিউনিস্ট নেতা গ্রামশিকে উদ্ধৃত করে উৎপল দত্ত লেখেন, আমাদের কাছে ছোটোখাটো আন্দোলনও বড়ো হয়ে দেখা দিতে পারে৷ কারণ আমরা তাকে অন্যান্য আন্দোলনের পাশে রেখে দেখি৷ সেগুলো কেবল আমরাই অনুভব করি৷ আমাদেরই প্রত্যহের সঙ্গে সেঁটে থাকে সেগুলো, আমরাই তো সেগুলো এক অন্তর্বর্তী পৃথিবীর অণু বলে অনুভব করি৷ ‘তীর’-এ কোনো মিথ্যের অবতারণা করা হয়নি৷ কৃষকদের বীরত্ব যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি পুলিশের বেপরোয়া বর্বরতা৷ শ্রেণিসংগ্রামের মুহূর্ত এটা একটা, ইতিহাসের রশ্মিকেন্দ্রে এক অনাবৃত বিস্ফোরণ৷
 
নকশালপন্থায় বিশ্বাসী নেতাদের অনেকের সঙ্গে উৎপল দত্তের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক৷ তাঁর জীবনীলেখক জানাচ্ছেন, শহিদ মিনারে নকশালপন্থীদের প্রথম প্রকাশ্য সমাবেশে উৎপল দত্ত ছিলেন প্রধান বক্তা৷ এই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মুখপত্র ‘দেশব্রতী’র ১৯৬৭-র শারদ সংখ্যায় তিনি লেখেন, ‘শাহেনশা, তোমার পুরস্কার তোমারই থাক’: ‘শাহেনশা,— যে হাতে তুমি দিতে এলে পুরস্কার/ সচকিত তাকিয়ে দেখি— কৃষ্ণনগরের রক্তের ছাপ তাতে রয়েছে এখনো৷/ ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়াচ্ছে মেঝেয়, নূরুল নামে আমার একটি ছোট্ট ভাইয়ের খুন৷’ ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর, ‘তীর’ নাটকের মহলা চলছে তখন, নকশালবাড়ি আন্দোলনের ডজনখানেক নেতার সঙ্গে উৎপল দত্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়৷ উৎপল আত্মগোপন করেন৷ গ্রেপ্তার হলেন মুম্বইয়ে৷ তখন তিনি ইসমাইল মার্চেন্টের ‘গুরু’ ছবিতে কাজ করছেন৷
 
কেন গ্রেপ্তার হলেন? উৎপল নিজেই বলেছেন, ‘তীর’ নাটকের জন্য নয়৷ হয়েছিল অন্য কারণে৷ নকশাল নেতৃত্বের নির্দেশে একটি ‘আর্মস ডিল’ অর্থাৎ অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে গোপনে অস্ত্র কেনার চুক্তি করতে গিয়ে৷ Towards A Revolutionary Theatre গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশদে লিখেছেন নাট্যকার৷ তাঁর এই বয়ান নিয়ে সংশয় আছে, তর্ক আছে৷ আমরা সেদিকে যাচ্ছি না৷
 

যে-রাজনীতি সম্পর্কে একদিন তিনি বিপুল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, সেই রাজনীতিকেই শেষ পর্যন্ত আক্রমণ করলেন উৎপল দত্ত৷ তাঁর জীবনের নকশাল-পর্বকে বললেন ‘রাজনৈতিক স্খলন, মোটা দাগের যত সব ভুল আর দুঃসহ প্রগলভতার পর্যায়’৷ বললেন ‘শ্রেণিসংগ্রামে সত্যিকার যোদ্ধার পংক্তি ত্যাগ করে এক দল পাতিবুর্জোয়া সন্ত্রাসবাদীর খাতায় নাম লেখা্নোর পিছনে ছিল আমারই নিজেরই ভেতরে প্রচ্ছন্ন সব হঠকারী প্রবণতা, পাতিবুর্জোয়া অহমিকা৷’

 
মুম্বই পুলিশ দীর্ঘ জেরার পর উৎপল দত্তকে বিমানে উড়িয়ে আনে কলকাতায়৷ নিয়ে যাওয়া হয় দমদম সেন্ট্রাল জেলে৷ বঙ্গবাসী কলেজের ছাত্রনেতা অচিন্ত্য গুপ্ত তখন ওই জেলে বন্দি৷ তাঁর পাশের সেলে ঠাঁই হয় নাট্যকারের৷ অচিন্ত্য গুপ্তের লেখা আত্মকথা-নির্ভর উপন্যাস ‘একজন নকশালপন্থীর অর্ধেক জীবন’ থেকে এই সময়টা আমরা পড়ে নিতে পারি: জেলার সাহেব নিজে দাঁড়িয়ে থেকে লোক ডেকে সেলটি পরিষ্কার করালেন৷ যেন জেলারের ব্যক্তিগত কোনো ভিআইপি অতিথি আসছেন৷ সকালবেলার খাবারের ব্যবস্থা করে রাখতে বললেন৷ এই সমাজে সফল, জনপ্রিয় মানুষের মর্যাদা যে কোনো অবস্থাতেই বেশি৷ ঠিক এগারোটায় জেলখানার গেট পেরিয়ে হাতে একটা সেতার [অন্য এক জায়গায় আছে, তানপুরা] নিয়ে উৎপল দত্ত ঢুকলেন৷ পাশে জেলার ওঁর পারিষদবর্গকে সঙ্গে নিয়ে বেশ অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে আসছেন৷ আজিজুল হক, অরিন্দমরা [উপন্যাসে লেখকের নাম] এগিয়ে গিয়ে লাল সেলাম জানিয়ে হাত মেলাল৷ আজিজুলদার সঙ্গে অনেক আগে থেকেই পরিচয়৷ অরিন্দম উৎপল দত্তর তিন-চারটে জিবি-তে হাজির থেকে দীর্ঘ আলোচনা মুগ্ধ হয়ে শুনেছে, ব্যক্তিগত আলাপ ছিল না৷… উৎপল দত্তকে ঘিরে কমরেডদের বেশ বড়ো জটলা তৈরি হল৷ তিনতলায় ওঁর জন্য নির্দিষ্ট করা সেল উপচে পড়ল৷ উৎপল দত্ত আসার পর থেকে জেলখানার একঘেঁয়েমিটা খানিকটা কাটল৷ ওঁরই উদ্যোগে নিয়মিত স্টাডি ক্লাস শুরু হল৷ উৎপল দত্ত, আজিজুল হক, অশোক দত্ত ক্লাস নিতেন৷ দেশ-বিদেশের বিপ্লবী লড়াইয়ের নানা ইতিহাস শোনাতেন৷ পাশাপাশি সেলে থাকার কারণে অরিন্দমের সঙ্গে উৎপল দত্তের বেশি ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে৷ গ্যাস্ট্রিকের কারণে জেলের খাবার উৎপল দত্ত খেতে পারছিলেন না৷ জেল কমিটির সেক্রেটারি হিসেবে অরিন্দমই কমিটির কয়েকজন মেম্বারকে রাজি করিয়ে উৎপল দত্তের বাড়ির খাবার খাওয়ার অনুমোদন আদায় করে নেয়৷ দু-চারজন কমিটি মেম্বারের ঘোরতর আপত্তি ছিল৷ উৎপল দত্তের স্ত্রী শোভা সেন দু-বেলা খাবার পাঠাতেন৷ উৎপল দত্ত মাঝে মাঝে অরিন্দম, সব্যসাচীকে স্পেশাল কোনো আইটেম হলেই খাওয়াতেন৷ আর হাভানা চুরুট তো ওদের জন্য দুটো করে বরাদ্দ ছিলই৷ উৎপল দত্তের সান্নিধ্যে গল্প, আড্ডা মেরে ছাত্র কমরেডদের ভালোই দিন কাটছিল৷’ ক-দিন পর [৬ জানুয়ারি ১৯৬৮] সরকারের বিশেষ ‘অনুমতি’তে উৎপল দত্ত জেল থেকে বিদায় নিলেন৷
 
এই ‘বিশেষ অনুমতি’র পেছনে ছিল উৎপল দত্তের ‘মুচলেকা’৷ রটে গেল জনে জনে, শহরে ও গ্রামে৷ নাট্যকারের তরফে মুচলেকার গুজব অস্বীকার করা হল৷ মু্খ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল ঘোষ এক জনসভায় জানালেন, উৎপল দত্ত মুচলেকা দিয়েছেন৷ আজ আর তেমন সংশয় নেই যে যশস্বী নট ও নাট্যকার মুচলেকা দিয়েছিলেন৷ সরাসরি স্বীকার না করলেও Towards A Revolutionary Theatre-এ ‘মুচলেকা’র পক্ষে যুক্তি সাজিয়ে গেছেন৷ কথায় কথায় একদিন অচিন্ত্যদা বলেছিলেন (রেকর্ড-করা নেই), সম্ভবত বাড়ি থেকে খাবার আসতে শুরু করার পরই ‘মুচলেকা’-তৎপরতার সূচনা৷
 
যে-রাজনীতি সম্পর্কে একদিন তিনি বিপুল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, সেই রাজনীতিকেই শেষ পর্যন্ত আক্রমণ করলেন উৎপল দত্ত৷ তাঁর জীবনের নকশাল-পর্বকে বললেন ‘রাজনৈতিক স্খলন, মোটা দাগের যত সব ভুল আর দুঃসহ প্রগলভতার পর্যায়’৷ বললেন ‘শ্রেণিসংগ্রামে সত্যিকার যোদ্ধার পংক্তি ত্যাগ করে এক দল পাতিবুর্জোয়া সন্ত্রাসবাদীর খাতায় নাম লেখা্নোর পিছনে ছিল আমারই নিজেরই ভেতরে প্রচ্ছন্ন সব হঠকারী প্রবণতা, পাতিবুর্জোয়া অহমিকা৷’ তখন তিনি সিপিএমের খুব কাছের৷
 

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦

ক্রমশ…
 
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ১২

ভোর ভয়ি। পর্ব ১২: কলেজের লড়াই থেকে কৃষকের যুদ্ধে


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!