- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ১৮, ২০২৪
মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৩৯
।। শুকনাকান্ড ।।
রাজন সূত কথা
বৈশম্পায়ণ যথাবিহিত সম্মানপ্রাপ্তি পরান্তে, উপবিষ্ট হলেন, নরেশ জনমেজয় বললেন, — হে মহাত্মা, আপনি বহুদিবস পূর্বে ভূমির প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। এই ভূমিরূপের মধ্যে ভূমিকম্প নামক এক প্রকারেরও উল্লেখ করেছিলেন সেদিন। আজ এই ভূরূপের সৃষ্টি, স্থিতি ইত্যাদি জানতে আমি বড়ো উৎসুক। আপনি, আমার প্রতি স্নেহবশত, সবিস্তারে বর্ণনা করুন।
তখন বৈশম্পায়ণ বললেন, — হে রাজার্ক, আমি প্রয়াস করছি। যে প্রকৃতি সকল ভূমির জন্মদান করে থাকেন তিনিই মরুভূমির সৃষ্টি করেন। কেন তিনি এ জাতীয় ভেদকর্ম করেন, নশ্বরমানব কেউই জানে না। আমরা এটিকে খেয়াল বলে উল্লেখ করি মাত্র, এ কারণে যে হেতু আমাদের অজ্ঞাত।
— দেবর্ষি, এই মরুভূমির সঙ্গে অপরাপর ভূমির পার্থক্য কী?
— মহারাজ, মৃত্তিকার তলদেশে জল, প্রকৃতে বহমানা স্রোতস্বতী। অন্তর্গত নদী। ফল্গু বলেও লোকসাধারন তাকে চিহ্নিত করে। এই নীরধারা সময় দেবীর স্নেহধারার সমর্থক। মরুর গোপন ওষ্ঠমুখে এই পীযূষ নেই। সন্তান মরুর গাত্রদেশ তাই উষর। তাকেও যদি কন্যামূর্তি বলে ধারণা করি, তবে সেও নিস্তন্যা, সে কখনোই মাতৃরূপা হতে পারে না। সে চিরকালের শাপগ্রস্তা।
— দেবরাজ মেঘবাহন কি সেখানে বারিদান করেন না?
— করেন নিশ্চয়ই, কিন্তু জানি না সঠিক, মনে হয় সে আকাশধারা মৃত্তিকা স্পর্শ করার আগেই বাস্পীভূত হয়ে যায়। তাই মরুভূমি অবহেল্যা ভূদেশ, অহল্যা নয়।
— অবহেল্যা এবং অহল্যা কীসে পরস্পর স্বতন্ত্র?
— অহল্যা ভূমিতে ফলন হয়নি, কিন্তু হওয়া সম্ভব। সেখানে হয়তো তখনও মানবজাতির পা পড়েনি। মানুষ সে ভূমি কর্ষণ করলেই হল্যায় রূপান্তরিত হবে। মৃত্তিকা নিজে ধন্যা হন, মানবজাতিকে ধন্য করেন, দেবগণকে প্রীত করেন। মহারাজ, আপনার শাষণাধীন ভূমিও একদা অহল্যা ছিল। দেবরাজ ইন্দ্র অমেয় বৃষ্টি দান করেছেন, বরুণদেব ভূস্তরের গহ্বরে, গভীরে ধারণ করেছেন জলরাশি। ঈশ্বরনির্দেশে শত কলস্বরা সমুদ্রগামিনী হলেন, পুষ্ট করলেন দুই তীরভূমি স্নেহে মমতায়। আপনার পূর্বপুরুষগণ প্রজাকূলের হাতে তুলে দিলেন হলযন্ত্র। আপনার রাজ্য এই পবিত্র ভারতভূমি সুজলা সুফলা শষ্যশ্যামলায় পরিনত হল। অবহেল্যক ভূমিতে কোনও হলচিহ্ন নেই, সে মানবের, দেবলোকের ঘৃণার পাত্রী। অভিশপ্ত ভূমি।
— দেবর্ষি, মার্জনা করবেন, একটি অবান্তর প্রশ্নের উদয় হচ্ছে মনে। জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?
— অবশ্য, মহারাজ। নির্ভয়ে করুন। প্রশ্নই তো নতুন এষণার মুখ উন্মোচন করে, দর্শনের জন্ম দেয়।
— মহাত্মন, মনুষ্যজাতি নিজে কি মরুভূমি সৃজন করতে পারে?
— পারে, মহারাজ। কেবল পারে নয়, করেও। স্বকৃত অপরাধ। আপনি যদি আপনার ভূমিতে জলসেচ না করেন, নতুন বৃক্ষের বীজ অঙ্কুরিত হবে না। আপনি যদি আপনার পূর্বের সংস্কারের ধারা বহন না করেন, তবে প্রবাহে শৈবাল জন্মাবে, তটিনীবক্ষ ক্রমশই ভরাট হয়ে উঠবে, গতিমুখ রুদ্ধ হবে। মরুর অভিসম্পাত নেমে আসবে তখন। এই নবজ মনুষ্যসৃজিত মরুলোকের জাতিসমূহ তখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এটিই বিশ্বপ্রকৃতির বিধান, মহারাজ। আজ বিদায় দিন। অনন্তর একদিন এই পৃথিবীতে এরূপ মরুবিনাশের কথা আপনাকে শোনাবো।
♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦
ক্রমশ…
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ৩৮
❤ Support Us







