Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • নভেম্বর ১০, ২০২৪

নজরবন্দী সময়ের উপকথা

হেদায়েতুল্লাহ
নজরবন্দী সময়ের উপকথা

অঙ্করণ: দেব সরকার

 
নূন্যতম ফি নিয়ে নগর আর গ্রামের প্রান্তজনের চিকিৎসা তাঁর পেশা।স্থায়ী নগরবাস তাঁকে উৎসচ্যুত করতে পারেনি। সময় অথবা পূর্বস্মৃতি ছুঁয়ে থাকে তাঁর অস্তিত্ব আর মননকে।মূলত গল্প লেখেন।এপর্যন্ত গল্প সংকলনের সংখ্যা পাঁচ, উপন্যাস দুটি। সৃজিত উপন্যাসে, গল্পে ছড়িয়ে থাকে তাঁর পারিপার্শ্বিক আর মনোজগতের বৃত্তান্ত। কৃত্রিম নাগরিকতা অথবা দূষিত অতীতমুখিতাকে অতিক্রম করে স্বতন্ত্র মানচিত্র সৃষ্টিতে ব্যস্ত ৭০ ছুঁইছুঁই লেখক। কোনো ‘ইজম’ নেই, চিন্তার স্বাধীনতাই তাঁর দিবারাত্রির অনুশীলন। এই সময়, সমকালীন সঙ্কট এবং চাকরিপ্রার্থী ছেলেমেয়েদের সংশয়, আরোপিত প্রতারণা নিয়ে শুরু হল ডা. হেদায়তুল্লাহ-এর নতুন উপন্যাস

 

শাঁখ বাজিয়ে ট্রেন আসে

জীবনে এক একটা ঘটনা ঘটে যা বিশ্বাস করা যায় না।স্বপ্নেও ভাবা যায় না।কবির প্রথমে ভেবেছে রং মেসেজ।কেউ ঠাট্টা করেছে।শ্যামল মনির কিংবা পূজা।তারা একসঙ্গে ফর্ম ফিলাপ করেছে।কেউ হয়তো ভাববে এ এমন কী ব্যাপার ? সেজন্যে এত কথা বলতে হবে ? কী এমন চাকরি ?
 
কবির সেভাবে কোনদিন রাজনীতি করেনি।গাঁয়ে তার বয়েসি ছেলেরা অল্পবিস্তর রাজনীতির প্যাঁচে জড়িয়েছে।কবির তখন মাঠে আব্বাকে সাহায্য করেছে।বাকি সময় পড়াশুনো করেছে।লেখাপড়ায় সে খুব খারাপ না।আবার এমন মেধাবী নয় যে ব্লকে সংবর্ধনা পাবে।তবে সে খেটেখুটে ভালোভাবে বিএসসি পাশ করেছে।
 
বাতাসে অনেক কথা ভাসে।আট দশ পনেরো ।যা ঘটে তা কিছু হয়তো রটে।এসব লাখ কথার হাবভাব বোঝার জন্যে তারা দেওয়ানি আমে হাজির হয়।
 
সে আগের দলে অ্যাকশান স্কোয়াডে ছিল। তার তীক্ষ্ণ নজর, হাওয়া কোনদিকে ঘুরছে।এখন শাসক দলের হোমরা চোমরা নেতা।দাড়িগোঁফ ছেঁটে সাদা পাজামা পাঞ্জাবিতে ধোপদুরস্ত চেহারা।রাজনীতিতে চেহারা বদল এখন দস্তুর।ট্যাঁকে গোঁজা থাকে বুলেট ভর্তি পুরোনো সেই অস্ত্র।কবির আর ডালিয়া যখন সিরাজ সাহেবের দরবারে হাজির হলো, তখন মাছির মতো মাথা থিকথিক করছে।সূর্য আড়মোড়া ভাঙেনি।হাজারো রকম তামাশা দেখার পর ঘণ্টাদুয়েক বাদে তাদের ডাক পড়ে।
 
শাজাহান একটা দামি সিগারেট ধরিয়ে নেতাসুলভ গলায় বলে,তোমাদের কী সমস্যা ?
 
সাহেব ! আমরা টেট পরীক্ষা দিয়েচি।
 
সে তো ত্রিশ লাখ ছেলেমেয়ে দিয়েচে।
 
আমরা পাশ করেচি।মিনমিন করে বলে কবির।
 
দশ লাখ গণ্ডি পেরিয়েচে।
 
সেখানেই তো সমস্যা।এবার মুখ খোলে ডালিয়া।
 
আপনি যদি ইন্টারভিইয়ের সময়—বুকে সাহস এনে বলে কবির।
 
কার জন্যে বলব ?
 
সেজন্যে তো আপনার কাছে ছুটে আসা।ডালিয়া বলে।
 
এর মূল্য কী জানো ?
 
আপনি বলুন।
 
এভাবে হয় না।তোমরা পরশু সাঁজবেলায় এসো।
 
সাজাহান আবার ছলাকলায় ব্যস্ত হল।
 
দুজনে সাইকেল নিয়ে এসেছে।বাইরে বেরিয়েই ডালিয়া বলে,কী বুজলি ?
 
তুই বল।
 
আমি আর আসব না।
 
টাকার জন্যে ভয় পেলি ?
 
মেয়েদের ভয় অন্য।তুই বুজবি নে।
 
তোর কথা কে বুজবে ?কবিরের গলায় হালকা অভিমান।
 
তুই এক ন্যাকাচন্দর ! রেগে গেলে ডালিয়ার মুখে লাগাম থাকে না।
 
তার নাকের ডগা লাল হয়ে যায়।একটা লঙ্কায় যেন পাক ধরেছে।ডালিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রাগটুকু উপভোগ করে কবির।তারপর বলে,আমি একা আসব ?
 
সে তোর ইচ্ছে।
 
এমুন কথা বলতে পারলি ?
 
ডালিয়া গরম মাথা ঠান্ডা করে বলে,চল ! কোথাও নির্জনে বসি।
 
গাঁয়ের ঈশান কোণে চাঁপাদিঘি।একবারে নিরিবিলি।সাইকেলে তারা এখানে এসে হাজির।পুরোনো এক মস্ত চাঁপাগাছের নীচে বসে পাশাপাশি।ডালিয়া প্রথমে মুখ খোলে,চাকরি নাহলি আমাদের ভবিষ্যত কী ?
 
চাঁপাফুলের গন্ধ ছাড়িয়ে আরেক সুবাসে বোধহয় আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে কবির।ডালিয়ার বাস্তবে নামে, আমাদের আবার ভবিষ্যত ?এখনও যা তখনও তা।
 
বাজে বকিস নে।
 
তাহলি কাজের কথা বল।
 
ডালিয়া একটু ইতস্তত করে।নীল আকাশের দিকে তাকায়।সেখানে কে যেন এক বোতল বিষ উপুড় করে দিয়েছে।তারপর স্বগোক্তির মতো বলে,আমি সিরাজের চোখে সাপের ছোবল দেকেচি।
 

চাঁপাপুকুর গাঁয়ের মাঝ দিয়ে চলে গেছে শিয়ালদা হাসনাবাদ লাইন।উত্তরদিকে মুফতিপাড়া।পাড়ার পুবগায়ে তাদের বাড়ি।সামনের ইঁট বিছানো রাস্তায় ঢুকে দেখে,তার আব্বা একটা অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলছে।পাশে একটা ঝাঁকড়া কামিনি ফুলগাছের গায়ে ঠেস দিয়ে সাইকেল রেখে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়

 
অবাক হয়ে তার দিকে তাকায় কবির।ডালিয়াকে আজও ঠিকমতো চিনতে পারেনি।অথচ তারা একসাথে ক্লাস ওয়ান থেকে পড়াশুনো করেছে।মাঝে ক্লাস ফাইভ থেকে ছাড়াছাড়ি।কবির বয়েস আর ডালিয়া গার্লস স্কুলে।ক্লাস ইলেভেনে আবার হাড়োয়া স্কুলে।তারপর টাকি সরকারি কলেজে।দুজনে কেউ আর কোন কথা বলে না।হয়তো তারা নিজেদের ভাবনার বৃত্তে ঘুরপাক খায়।ডালিয়া মামার বাড়ি মানুষ।মা আইসিডিএসে চাকরি করে।তা আবার নেতাজনের দয়ার ওপর নির্ভর।তাকে একটা কিছু করতে হবে।অন্যদিকে কবির ? ডালিয়া তার ভবিষ্যত। সেছাড়া তার কোন স্বপ্ন নেই। নিস্তব্ধ চরাচর।দিঘির দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস ভেসে আসছে।দুজনে চুপচাপ হাত ধরাধরি করে বসে আছে।এমন সময় মোবাইল বেজে ওঠে।পকেট থেকে ফোন বের করে কবির।তার আব্বা মকবুলমিঞার গলা,খোকা ! কোথায় আচিস ?
 
কেন ?
 
জরুরি দরকার বাড়ি আয়।
 
হয়তো এরকম একটা ডাকের জন্যে তারা অপেক্ষা করছে।নইলে আরো কিছু সময় তাদের কেটে যেত।সাইকেলে উঠে পড়ে দুজনে।
 
দিঘির নামে নাম।চাঁপাপুকুর গাঁয়ের মাঝ দিয়ে চলে গেছে শিয়ালদা হাসনাবাদ লাইন।উত্তরদিকে মুফতিপাড়া।পাড়ার পুবগায়ে তাদের বাড়ি।সামনের ইঁট বিছানো রাস্তায় ঢুকে দেখে,তার আব্বা একটা অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলছে।পাশে একটা ঝাঁকড়া কামিনি ফুলগাছের গায়ে ঠেস দিয়ে সাইকেল রেখে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়।কী ব্যাপার ?
 
ইনি একটা খবর এনেচেন।মকবুলমিঞা একটু উচ্ছ্বাসের স্বরে বলে।
 
লোকটার দিকে তাকায় কবির।মাথায় কালো টুপি।পরণে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি।অচেনা বটে।খবরটা কী হতে পারে যখন মনে মনে আন্দাজ করছে তখন ভেতর থেকে মা টগর বেগম বেরিয়ে এল।সাথে নাস্তাপানি।আসলে কবির বাপমায়ের একমাত্র সন্তান না।এক বোন আছে।কলেজে পড়তে চেয়েছিল।বাপ মা অনুমতি দেয়নি।হাসনুহেনা বারোক্লাস পাশ করে বসে আছে বাড়ি।কিন্তু তাতে স্বস্তি কই ? মেয়েটা কারো কথা শুনতে চায় না।সবসময় ফোন নিয়ে ব্যস্ত।একটা অকারণ জেদের বশে ঘোরাফেরা করে। এরমধ্যে বারদুয়েক বদনাম রটেছে।পর ঘর করে দিলে মকবুলমিঞা হালকা হয়।
 
খাওয়া দাওয়ার পর মকবুলমিঞা বলে,ঘটকসাহেব ! এবার তাহলি কথাবার্তা হোক।
 
দেখুন মিয়াভাই ! আমি কোন পেশাদার ঘটক নই।জ্ঞান তো একাজ কখনো করিনি।তবে একজনের উপরোধে পড়ে আসা।তা সে যাকগে।এবার আসল কথায় আসা যাক।তিনজনের মধ্যে আলাপ সালাপ হয়।শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় সামনে সপ্তায় মঙ্গলবার ছেলে আর তার ঘরবার দেখতে যাওয়া হবে।
 
মানুষের চোখে সাপের ছোবল ? এসব মাথামুণ্ড সে কিছুই বুঝতে পারে না।ডালিয়াকে ফেলে সে একা যেতে পারে ? এর ভেতর ডালিয়ার সাথে বারকয়েক কথা হয়েছে।তাদের সময় নষ্ট করলে হবে না।কবির রসায়ণে অনার্স আর ডালিয়া অঙ্কে।তারা হাড়োয়া বাজারে ঘর নিয়ে কোচিং সেন্টার খুলবে।মন থেকে সেখানে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে সে একটা কাজের সন্ধানে ঠাকুরনগর গিয়েছিল।প্রাইভেট স্কুলের চাকরি।সেখান থেকে ফিরতে রাত হয়ে গেল।বাড়ি এসে শোনে সিরাজের লোক এসে তার খোঁজ করে গেছে।চমকে ওঠে সে।
 
পরদিন সকালে আমদরবারে পৌঁছে দেখে,আজকে আরো বেশি ভিড়।কারণটা সে একটু পরেই জানতে পারে।আজকে যে কতক্ষণ বসতে হবে তা কে জানে ! আসবে না আসবে না করেও নিজেকে স্থির রাখতে পারে না।তারা ছাপোষা মানুষ।চুল ধরতে মূল নেই।নদীতে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ ? যতই ডালিয়া বলুক।তবে তার দেরি করতে হল না।একটু পরেই ডাক পড়ল।তাকে দেখে সিরাজ ভুরু কুঁচকে বলে,সেই মেয়েটা কই ? ইতস্তত করে কবির।সত্যি না মিথ্যে বলবে ? এদের সঙ্গে সেকথা বললে ডালিয়ার বিপদ হবে না ? শেষ পর্যন্ত ঘুরিয়ে বলে,হয়তো কোনভাবে আটকে পড়েছে।
 
তাহলে মাসখানেক পরে দেখা করো।
 
একমাস ! কবির ঠিক বুঝতে পারে না।তার ওপর বিরক্ত হয়ে সে কি এমন লল। সিরাজের ডান পাশে একটা কপাল কাটা লোক বসে আছে।সে এবার মুখ খোলে,সাহেব চেকআপের জন্যি ভেলোর যাচ্ছে।মাসভর তো লাগবে।
 
কবির পা বাড়ায়।আর কোনো কথা বলা মানায় না।ভিড়ের কারণ বুঝতে অসুবিধে হয় না।ত্রিশদিনের কাজ সেরে সে যাবে।বাইরে বেরিয়ে খনিক স্বস্তি নিশ্বাস ফেলে কবির।একমাস মানে অনেক সময়।তাতে অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে।
 
ভ্যাবলা স্টেশানে নেমে অটোতে বিশ মিনিট।রাজাপুর চৌরাস্তার মোড়।জমজমাট গঞ্জ।বড়ো রাস্তার ধারে দোতলাবাড়ি।নিচে বিল্ডার্সের দোকান।দেখে বোঝা যায় আমিরমিঞা পয়সাওয়ালা লোক।দেখাশুনোর পর দোতলায় বসে কথাবার্তা চলছে, এমন সময় ফরিদ এসে ডাকে,দাদাভাই ! তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।কবির একটু অবাক হয়।এই ছেলে যাকে বোনের বিয়ের জন্যে যাচাই করতে এসেছে।কবির ভাবে, সে এমন কথা হয়তো বলতে চাইছে যা মুরুব্বিদের সামনে দ্বিধা করছে।
 
নীচে নেমে আসে তারা।দোকানের ভেতরে একটা আলাদা অফিসঘর।এসি করা।সেখানে তারা মুখোমুখি বসে।প্রথমবার কবির অত খেয়াল করেনি।এখন চারিদিকে তাকিয়ে দেখে মনে মনে তারিফ করে।ছেলেটা বেশ শৌখিন।গ্লাস ঢাকা টেবিলের ওপর ফুলদানিতে টাটকা রজনীগন্ধা ফুল।দেয়ালে সিনারি টাঙানো।ফরিদ কিছু বলার আগে কবির একটা কৌতূহল মেটাতে চায়।আচ্ছা ! সেজনকে তো দেকচি না।
 
কোন জন ? কবির জিজ্ঞেস করে।
 
আমাদের বাড়ি যিনি গিয়েচিলেন।
 
চুপ ! চুপ ! দেয়ালেরও কান আচে।
 
কেন ? কবির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।
 
আমিই তাকে ঘটক সাজিয়ে পাঠিয়েছিলুম।
 
বিশেষ কোন কারণ আচে ?
 
ফরিদ একটু ইতস্তত করে।তারপর বলে,সবটাই আমার কারসাজি।
 
তার মানে ? 
 
সবটা জানাজনি হলে তিনি বিগড়ে বসবেন।
 
কে ? 
 
ফরিদ চুপ করে যায়।তারপর মাথা নীচু করে বলে,তার সঙ্গে আমার ফেসবুকে আলাপ।আমি হাসনুহেনাকে ভালোবাসি।
 
কবির চমৎকৃত হয়।ছেলের এলেম আছে।তাকে যেন আরো ভালো লাগে কবিরের।টাকাপয়সা ঘরবাড়ি তারা দেখতে এসেছে।ফরিদের হাবভাব তাকে আরো বেশি আকৃষ্ট করে।হঠাৎ তার হাতদুটো ধরে ফরিদ বলে,দাদাভাই ! তুমি দেখো।
 
কী ?
 
বিয়েটা যেন ঘেঁচে না যায়।
 
তোমার এরকম মনে হচ্ছে কেন ?
 
আমার আব্বা খুব কড়া আর পুরোনো ধরণের লোক।
 
অনেক আলাপ সালাপের পর ঠিক হয় তারাও যাবে।পরশু জুম্মার নামাজের পর ছেলেপক্ষ কন্যা দেখতে যাবে।ছেলের মামা তোতামিয়া বললে,ফরিদ যাবে না ? 
 
আমিরমিঞা চোখ পাকিয়ে বলে,আমাদের যা পছন্দ ছেলের তা।সে গিয়ে কী করবে ? বোনাইয়ের মনমেজাজ জানে ভালোরকম।কোন বাগবিতণ্ডায় ঢুকতে চায় না তোতামিয়া।
 
শুক্রবার সকালবেলা ফোন করে ডালিয়া।তোর সঙ্গে জরুরি দরকার।
 
কেন ? 
 
আমার মামাতোভাই বল্টু হাড়োয়া বাজারে একটা ঘর ঠিক করেছে।দেকতি যেতে হবে। 
 
আজগে আর সম্ভব না।
 
কী এমন রাজ কাজ পড়ল ?
 
আজ বোনের দেখাশুনো।
 
সে তো প্রেম করচে।
 
চমকে ওঠে কবির।এসব কথা জানাজানি হলে তো সব্বোনাশ ! সে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করে,তুই জানলি কী করে ?
 
এ তো সবাই জানে।তবে ভয় নেই।আমি তোর বোনের বিয়ে ভেঙে দোব না।
 
তার কথায় খুব ভরসা পায় না সে।আমিরমিয়ার কানে কেউ যদি এরকম আভাস দেয় তো বিয়ে ঠেকানো কী যে হবে ? ফরিদের ঝকঝকে মুখ ভেসে ওঠে।তা ম্লান হতে সময় লাগবে না।
 
বেশ উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে কবির।পাড়ার পাঁচজনকে বলতে হয়েছে।আমিরমিঞা যথাসময়ে সপার্ষদ হাজির।কবির সব কাজ ছেড়ে কুটুম্বদের চোখে চোখে রেখেছে।কেউ যেন কোন ফুসমন্তর দিতে না পারে।দুপুরের খাওয়া খেয়ে  তারা বেরিয়েছে।শেষ বিকেলে আলোচনা শুরু হয়েছে।তোতামিয়া পান চিবোতে চিবোতে বলে,সবই তো ঠিক আচে।লেনদেনের ব্যাপারটা কী হবে ?
 
লেনদেন আবার কী ? যার যা খুশি তাই দেবে।আমিরমিঞা বললে।
 
তাহলি তো মিটেই গেল।
 
আমার একটা কথা আছে।তাররপর চারিদিকে তাকিয়ে, আমার কত বড়ো ব্যবসা তা তো সবাই দেখেচে।দৃষ্টি তখন তার মকবুলমিঞার দিকে।মকবুলমিঞা ঘাড় নাড়ে।
 
বাজারে আমার একটা মানসম্মান আচে।কাকে ফেলে কাকে নেম্নতন্ন করব।আমার পাঁচশোজন বরযাত্রী হবে।চারিদিকে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল।বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ।তারপর আমিরমিঞা গলা ঝেড়ে বলে, এখন শেষ হয়নি।
 
বলুন আপনার কথা ! কবির যেন বিমূর্ত গলায় বলে।
 
এতো ভেতরে বড়ো গাড়ি ঢুকবে না।বাজারে হল ভাড়া নিতে হবে।
 
এসব কথা শোনার পর মকবুলমিঞা একটু কিন্তু কিন্তু করে।বাপকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দেয় কবির।আমিরমিঞা উঠতে উঠতে বলে,পরে জানালেও হবে।
 
তারা টাটা সুমোয় এসেছে।মগরেবের নামাজ শেষ করে আবার তাতে রওনা দেয়।
 
মোবাইলের মেসেজটা সে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে।তাকে কি একবার ফোন করবে ? কিন্তু থেমে যায়।শোনামাত্র সে হিহি করে হেসে উঠবে।তারপর হাসি থামিয়ে বলে উঠবে,তুই একটা হ্যাঁদারাম ! সব মেসেজ কি সবাই বিশ্বাস করে ? তুই দেকিসনি, মাঝে মাঝে কোটি টাকা জেতার খবর আসে।তোকে ফ্যাসানো খুব সহজ।ডালিয়া খুব চৌকশ।দিনদুনিয়ার অনেক খবর রাখে।সে অতটা বহির্মুখী নয়।উত্তাল সমুদ্রে নয় নিস্তরঙ্গ নদীতে ভেলা ভাসাতে সে স্বচ্ছন্দবোধ করে।তবে তারা পড়াশুনোয় সমান সমান।
 
এসব বাদ দিলেও, সে মনে মনে উত্তেজনা অনুভব করে।তাদের গ্রুপে শেয়ার করবে ? কিন্তু খবরটা যদি মিথ্যে হয় ? সবাই তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করব।লজ্জার সীমা থাকবে না।কাল রোববার।পরশু সোমবার।সে একবার লজ্জার মাথা খেয়ে বসিরহাট ডিআই অফিসে যাবে।এমন সময় ফোন।
 
হল নারে !
 
তোর মেসেজ আসেনি ?
 
কী পাগলের মতো কথা বলচিস ? ডালিয়া বিরক্ত হয়ে বলে।
 
না।ঠিক আছে।
 
কিছুই ঠিক নি।
 
তা হবে বোধহয়।নিজেকে সামলে নেয়।মুখ ফসকে গিয়েছিল আর কী।
 
ডালিয়া একটু সময় নেয়।তারপর বলে,হারামিটা ঘর দিল না।
 
এবার বুঝতে পারে সে।ডালিয়া কী নিয়ে কথা বলতে চাইছে।তারা দুজনে গিয়েছিল।হাড়োয়া মার্কেটের ঘরও পছন্দ হয়েছিল।মালিক আকরামমিঞা বলেছিল, সে পরে বলবে।
 
কী বলল আকরাম মিঞা ?
 
সে এক অদ্ভুত কথা।
 
মানে ?
 
কোচিং সেন্টার মানে পড়াশুনোর নামে ছেলেমেয়েদের আড্ডাবাজি আর গাঁজা বিড়ির আড্ডা। যাকগে, যেজন্যে তোকে ফোন করেচি।পূর্ণিমা ম্যাডামের কথা মনে আচে ?
 
তিনি তো আমাদের কলেজ থেকে রিটায়ার করেচেন।
 
এখন তিনি স্কুল বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত।
 
বাপরে ! তুই এত খবর রাকিস। 
 
রাকতে হয়।শোন।কালকে তাঁর বাড়ি যাব।তোকেও যেতে হবে।
 
তোর সঙ্গে নরকেও যেতে পারি।
 
ওসব ছ্যাবলামি বাদ দে।কাল তৈরি হয়ে থাকিস।সকাল সকাল সকাল বেরব।
 
দুটো ট্রেন পাল্টে তবে অশোকনগর আসতে হয়।পূর্ণিমা ম্যাডাম বাড়িতে ছিলেন।দুই পরিশ্রমী ছাত্রছাত্রী সহজেই মনে করতে পারলেন।তিনি তাদের কথা শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।তারপর বেদনাক্ত কণ্ঠে বলেন, তোমাদের জন্যে ভয়ানক কষ্ট পাচ্ছি।সবটাই ধোঁয়াশা।যেমন তোমাদের কাছে তেমনি আমার কাছে।
 
আমরা তাহলি আসি,ম্যাম।
 
কী আর বলি তোমাদের ! একথা বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
 
ম্যাডামকে প্রণাম করে তারা বেরিয়ে আসে।
 
এবার তাহলি কী করবি ? কবির জিজ্ঞেস করে।
 
কী আর করব ! বাড়ি ফিরব।ডালিয়া অন্যমনস্কভাবে বলে।
 
আমি সেকথা বলিনি।
 
তবে কি বেড়াতে যাবি ?
 
চুপ করে যায় কবির।কথা আর বাড়াতে চায় না।হয়তো যে উদ্দেশ্য করে তারা তা ব্যর্থ হওয়ায় খানিক মুচড়ে পড়েছে ডলিয়া।স্টেশানে এসে সে এক অদ্ভুত কথা জিজ্ঞেস করে,হ্যাঁরে ! বুলেট সিরাজের কোন খবর রাকিস ?
 
তার কথা তুই বলচিস ? তার চোখে যে নীলের আভাস !
 
আমি না।বল্টু বলচিল।এভাবে তোমরা ঘুরে মরবে ? সেই হচ্ছে আসল লোক।বল্টু এখন পার্টিতে নাম লিখিয়েচে।
 
আরো কিছু বলার আগে শাঁখ বাজিয়ে ট্রেন এসে হাজির।চটপট তাতে উঠে পড়ে তারা।রবিবার ট্রেনও ফাঁকা নেই যেন।
 

♦·♦–♦·♦♦·♦–♦·♦

ক্রমশ..


  • Tags:
❤ Support Us
ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
ঈশানবঙ্গের শক্তি পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!