- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- মে ১১, ২০২৫
পথ ভুবনের দিনলিপি। পর্ব ৪
পূর্ণ না হয়ে
একটা বিশেষ কাজে আমাকে ঝামাপুকুর লেনে যেতে হল৷ মহাত্মা গান্ধি মেট্রো স্টেশনে নেমে বেশির ভাগ মহাজাতির পিছনের রাস্তা ধরে হেঁটেই যাই৷ দুএকদিন অটো ধরে৷ এই অটো কলেজস্ট্রিট বাটার সামনে দিয়ে রাজবাজার চলে যায়৷ কলকাতার পুরোনো রাস্তাগুলোর মধ্যে এটি একটি৷ কতরকম জিনিসের যে দোকান৷ পুরোনো তালা থেকে শুরু করে যাদবচন্দ্রের সাদা মিষ্টি দইয়ের দোকান৷ আবার যাদবচন্দ্র থেকে শুরু করে মাংস, চপ চাপাটি, কাটা ফল সাজানো দোকান -কী নেই এখানে৷ নানা সম্প্রদায় নানা ধর্মের মানুষ এখানে মিলেমিশে ব্যবসা করছেন৷ ছোট মাঝারি৷ হয়ত বড়ো ব্যবসাদারও আছেন৷ আমি অত তফাৎ বুঝতে পারি না গো৷ মানুষের মিলটুকু আমায় আনন্দ দেয়৷ ঝামাপুকুরের কাছে যাত্রিক লেখা একটা পুরোনো বাড়ি আছে৷ ভেতরে প্রেসের কাজ চলে৷ সেদিন বিকেলে দেখলাম, বাড়িটার সিঁড়িতে বসে এক বুড়ি ঠোঙা নিয়ে কী যেন খাচ্ছে৷ পাশে দুটো বাচ্চা৷ একই রকম নীল জরির টুপি পরা৷ বুড়ি তাদেরও ঠোঙার খাবার কিছু কিছু দিচ্ছে৷ তিনজনের মুখে বিকেলের মরা আলো৷ আকাশে সেদিন শীতের পুর দেওয়া মেঘ ছিল৷ তার মধ্যে দিয়েই আলো মানুষ তিনটের কাছে আসার চেষ্টা করছিল৷ হয়ত তাদের এক ঠোঙা থেকে খাবার খাওয়া দেখে৷ আমি জিজ্ঞেস করিনি, তারা কে কার কী হয় ! জানায় যেমন জ্ঞান আসে, কিছু না জানায় আনন্দ আসে৷ আলবত আসে৷ বাচ্চাগুলোর মুড়িতে কেন এত আগ্রহ সেটা অবশ্য জানার ইচ্ছে হচ্ছিল৷ কাছে গিয়ে দেখলাম, দুটোই মুড়ি থেকে নকুলদানা বেছে খাচ্ছে৷ আর মুড়িগুলো ফের ঠোঙায় রেখে দিচ্ছে৷ শিশুর জন্য নিজের মিষ্টান্ন চলে যাওয়া বুড়ি তো মেনেও নিচ্ছে বেশ !
এসব দেখে আমারও খিদে পেল। প্রেসের কাজে অনেকসময় অপেক্ষা করতে হয় তো ৷ খানিক দূরে আলুর চপের দোকান ৷ দোকানঘর ওপরে৷ নীচে বোধহয় দোকানদারের থাকার খাটো ঘর ৷ এরকম দোকান কলকাতায় এখনো অনেক মেলে ৷ দোকানদারের হিন্দুস্থানী বউ রাস্তার কলের জলে সাবান মাখা পায়ে ছোবড়া ঘষছিল আর জল ঢালছিল ৷ পা দুটো খুব ফর্সা ৷ তার গা ভিজে হলেও শুকনো মাথায় ঠাসা সিঁদুর ৷ পাশে বাচ্চা ৷ এই ঠাণ্ডায় ! এবার তো কথা বলতেই হয় !
– আরে তুমি এত শীতে বাচ্চাকে জামাকে পরাও নি কেন ?
উত্তর না দিয়ে নির্বিকার মুখে বাচ্চাটারও হাত পা জলে ধুয়ে দিল ৷ তারপর জামা প্যান্ট পরাল ৷ মানতের জন্য মনে হয় বাচ্চার চুল বড় করছে ৷ সেদিন উত্তরের হাওয়া এত কনকনে , মনে হল চুলগুলোরও ঠাণ্ডা লাগছে। সেগুলো একটার সঙ্গে একটা জড়িয়ে যাচ্ছে ৷ পথের খোকার চুলও পথের ৷ হাত পাও পথের ৷ সব্ব অঙ্গে তাপ তো চাই মা !
বাচ্চা ব্যাটা তো চিল্লাছে আর দোকানের নীচের ঘরটায় গিয়ে ঢুকবে বলে বারবার আঙুল দেখাচ্ছে ৷ নীচের ছোট ঘরে খুব উজ্জ্বল বাল্ব ৷ তার নীচে একটা চৌকিতে তার ছোট্ট বিছানা ৷ চৌকির ওপর হওয়ায় বিছানায় বাল্বের গরমটা সরাসরি লাগছে ৷ শিশুটি এখনো পুরো বাক্য বলতে পারে না অথচ তাপের মহিমা বুঝেছে ৷
গরম চপ ভাজছিল বলে দেরী হচ্ছিল আমার ৷ হয়ত এ দেরি চেয়েছিলামও আমি ! বউটা বাচ্চাটাকে বাল্বের আলোর তলায় বসিয়ে দিয়েছে আর একটা গরম ফুলুরির একটুখানি দিয়েছে ৷ বাচ্চা আরামে খাচ্ছে ৷ না না আমার কষ্ট হয়নি ৷ kFC এর বিষের চেয়ে ব্যাসন আর সর্ষের তেল ওকে অনেক নিরাপদে রাখবে ৷
চলে যাবার সময় ঘাড় ফিরিয়ে দেখি মা টা ঘর থেকে আবার বাইরে এসে একটা মোটা ঠেলাওয়ালার সঙ্গে গল্প জুড়েছে ৷ সেই বিকারহীন মুখ, নির্দিষ্ট ভাবহীন হাসি ৷ বউটা কি ওই দোকানদারের বউ ! নাকি ঠেলাওয়ালার বান্ধবি হিসেবে নীচের ঘরটায় আলাদা সংসার পেতেছে !
নাহ ! ভালোবাসায় সম্পক্ক নির্ধারণ বড্ড পাপ কাজ গো ! খুঁজে বেড়ানোই ওকে পাওয়া ৷
২
তারপর এই ধর না কেন গতকাল ৷ কলেজস্ট্রিট থেকে ট্যাক্সিতে নাগেরবাজার ফিরছিলাম ৷ ইদানিং হলুদ ট্যাক্সি পাওয়া যায় না ৷
কাল পেয়ে গেলাম ৷ মন ভালো হল ৷ পথে বেলগাছিয়া ব্রিজ পড়ল ৷ এ ব্রিজ আর জি কর হাসপাতাল গেট থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় বেলগাছিয়া বাসস্টপে ৷ পুরোনো ব্রিজ ৷ তাই ঘন ঘন সারাইয়ের নামে ধ্যাসস্টামো করা যায় না ৷ জন্মকাল থেকে দেখছি অজগর হয়ে পড়ে আছে ৷ গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ বসন্তে ৷ বসন্তের গোড়ায় , যখন শীত অল্প হয়ে আছে আবার বসন্তও মধুর শ্বাস ফেলছে কানে গলায় –ঠিক সেই সময় কতবার যে হেঁটে ব্রিজ এপার ওপার করতাম ৷ নীচ দিয়ে রেলগাড়ি যেত ৷ ধাড়ি হয়েও ব্রিজ থেকে চলন্ত মালগাড়ি দেখতাম ৷ মনে হত ব্রিজও রেলগাড়ির মাথায় চেপে বসেছে ৷ এপার ছুটবে !
দর্শন কি ভাইস ভার্সা হয় ! দৃষ্টিতে মোহ থাকে ৷ লোভ থাকে ৷ এগুলো যখন জীবন থেকে যায় তো একেবারে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় ৷ কিন্তু থাকাকালীন হৃদয়নন্দিত লোভ কখনো দিকভ্রষ্ট হয়েছে বলে জানি না
ব্রিজের একপাশে পরেশনাথের মন্দির ৷ অন্যদিকে মুসলিম পাড়া ৷ তখন অবস্থানগত বিভাজন ছিল ৷ মনের নয় ৷ মনে আছে ইদের দিন মুসলমানরা ব্রিজের ওপর বসে নামাজ পড়তেন ৷ খুব আনন্দ সেদিন আমাদের ৷ আরে আমার জীবনের প্রথম বাড়িটাই তো বেলগাছিয়ায় ৷ ঠাকুরদাদার ভাড়া করা বাড়ি অবিশ্যি ৷ তাতে কী ! বাড়ি আবার একার হয় নাকি ! বাড়ি তো সবার ! আত্মীয় পরিজন এমনকি প্রতিবেশীরও ৷ ফলে ফ্ল্যাটবাড়িগুলোকে আলাদা না করে গোটা বাড়ি ভাবতাম ৷ বাড়ির অবাঙালি ছেলেগুলোকে জুটিয়ে চলে যেতাম ব্রিজে নামাজ পড়া শুনতে ৷ সাদা টুপি পরা মানুষগুলো সেদিন আমার ত্রাতা ৷ মনে মনে বলতাম, কাকুরা আরো নামাজ পড়ুন ৷ রাত অব্দি যেন ব্রিজ বন্ধ থাকে ৷ যাতে আমার স্কুলের যাওয়ার চান্সটাই না থাকে ৷
কখনো কখনো রাতের বেলা মায়ের সঙ্গে শ্যামবাজার যেতাম ৷ শুধু ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ব্রিজ দেখব বলে ৷ পরেশনাথ আর রেলপথের মাঝে শিবমন্দির তখন জমাটি হত দুধ বেলপাতায় ৷সে সময় মন্দির মসজিদ কোনোটায় টুনির আলোর বাড়াবাড়ি ছিল ৷ কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলত ৷ মানুষের বোধহয় দেবতায় বিশ্বাসটা অগাধ ছিল ৷ তাই টুনি কি গুচ্ছের টিউব জ্বালাতেন না কোনো ধর্মের ভক্তরা৷ পরেশনাথের ঝিলে কম আলো ছায়া তৈরী করত ৷
ব্রিজ থেকে নজর করলে পরেশনাথ টপকে আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদ দেখা যেত ৷ ব্রিজ থেকে নিজের বাড়ির ছাদ খোঁজ এক মস্ত নেশা হয়ে দাঁড়াল আমার ৷ মা খুব বকতেন ৷ বারবার আমায় ছাদে নিয়ে গিয়ে বলতেন, উল্টোটা কর ৷ ছাদ থেকে ব্রিজ খোঁজ ৷ পারতাম না ৷ দর্শন কি ভাইস ভার্সা হয় ! দৃষ্টিতে মোহ থাকে ৷ লোভ থাকে ৷ এগুলো যখন জীবন থেকে যায় তো একেবারে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় ৷ কিন্তু থাকাকালীন হৃদয়নন্দিত লোভ কখনো দিকভ্রষ্ট হয়েছে বলে জানি না ৷
ফলে কাল রাতেও যখন জ্যামে গাড়ি থামল ব্রিজে
বাড়ির ছাদ খুঁজলাম আমি ৷
না আমি দেখতে পাই নি ৷
তবে দেখতে যে পাইনি সেটা বুঝেছি ৷
যা দেখতে পারতাম তা দেখিনি !
পুরোনো লোভ নতুন করিনি ৷
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: পথ ভুবনের দিনলিপি । পর্ব ৩
❤ Support Us








