- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ৯, ২০২৩
চর
অলঙ্করন: দেব সরকার
ধা রা বা হি ক · উ প ন্যা স
•১•
পাশেই কাঁটাতারের বেড়া। বেড়ার পাশ দিয়ে বি এস এফের সরু পিচ রাস্তা সোজা উত্তর দিকে বয়ে যাচ্ছে। বেড়ার ওপাশে বাংলাদেশ। পেছন দিকে যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। পদ্মার নীল শীতল জল। রাজশাহীর পাশ দিয়ে যেতে যেতে এখানে এসে পদ্মার একটা প্রবাহ কিছুটা দলছুটের মতো পেট ফুলিয়ে, বাঁক নিয়ে এপারে ঢুকে পড়েছে। তারপর নশিপুরের কাছে এসে আবার কিছুটা বাঁক নিয়ে সামনের দিকে ছুটতে ছুটতে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ করেই বাঁ দিকে মোড় নিয়ে আবার রাজশাহীর দিকে ছুটে গিয়ে পদ্মায় মিশেছে। আর পদ্মা ছুটছে রাজশাহীর কোল ঘেঁসেই। পদ্মার এই বিস্তৃত গতিপথে রাজশাহী থেকে নশিপুর পর্যন্ত তৈরি হয়েছে চওড়া চর। নির্মল চর। কিষ্টপুর, পাইকপাড়া আর টিকলিচর – এই তিন গ্রাম নিয়ে নির্মল চর। তিন গ্রাম দুটি মৌজায় বিভক্ত, ডিহি ডুমুরিয়া ও খামার দিয়ার। ডিহি ডুমুরিয়া উত্তর পশ্চিমের অংশ। আর খামার দিয়াড় দক্ষিণ পুর্বের। প্রায় ৬০ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত নির্মল চরের চারিদিকেই জল আর জল। পদ্মার নীল-শীতল কালো জল। চরের উত্তর-পুর্ব জুড়ে ভারত – বাংলাদেশ দীর্ঘ সীমান্ত এখানে এসে পদ্মার নীল জলে মিশেছে। কোথাও বা সাপের মতো পদ্মার আঁকাবাকা খাঁড়ি সীমান্তের এদিকে ওদিকে যাওয়া আসা করে সীমান্তের সীমারেখাকে করেছে এলোমেলো। এখানে তাই মাঝে মাঝেই সীমান্ত হারিয়ে যায় পদ্মার জলে। জেলে মাঝিদের মাঝে ভ্রান্তি আসে। এপারের জেলেরা কখন ডিঙি চেপে মাছ ধরতে ধরতে ভুল করে চলে যায় ওপারে। তখন বিডিআর তাদের ধরে নিয়ে যায়। আবার কখনও ওপারের জেলেরা ভুল করে এপারে চলে আসে। বিএসএফ তাদের ধরে নিয়ে আসে। এভাবেই চলছিল। কিছুদিন আগে বিএসএফ – বি ডি আর একসাথে বসে একটা সমাধান বের করেছেন। এখন দু দেশের জেলে মাঝিদের নৌকায় নিজ নিজ দেশের পতাকা লাগিয়ে রাখতে হয়। এখন আর ভ্রান্তি আসেনা। কখনও কখনও সে ভ্রান্তি এলেও পতাকা দেখে বুঝে নেওয়া যায় কোন দেশের ডিঙি। কোন দেশের জেলে মাঝি। চরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বালিগ্রাম, মেহেদিপুর, রমনাপাড়া, অনুপনগর, মালিপুর গ্রাম। পশ্চিম-দক্ষিণে হরিরামপুর, লহরি, ছাতাই, মোল্লাডাঙা, ভাতাপাড়া, ঝাউবোনা, জাজিরা, ডুমুরিয়া, কুঠিবাড়ি। গ্রীষ্মে ধু ধু বালি, বর্ষায় ভাঙন আর আদিগন্ত পরিব্যাপ্ত ঘোলা জল নির্মল চরের বিধিলিপি। বর্ষার মরশুমে বন্যা এখানে নিয়ম করেই আসে, ভাঙন এখানে নিয়তি নির্ধারিত।
আগে মুর্শিদাবাদ জেলায় বন্যা হত, সে বন্যা নিয়মিত ছিল না। ছিলা বিধ্বংসী। ফরাক্কা ব্যারেজ হওয়ার পর মুর্শিদাবাদের বন্যার প্রবণতা বাড়ে, বাড়ে ভাঙনের তীব্রতাও। সেই তীব্র বন্যা আরও তীব্রতর হয়ে এই একদিন ভগবানগোলা ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মারগর্ভে চির-নিশ্চিহ্ন করে দেয়। জেলার মানচিত্র থেকে চিরদিনের মতো মুছে যায় আখরিগঞ্জ, হনুমন্তনগর, টিকলিচর, চরকেষ্টপুর, চিলমারি, হাসানপুর, গিরিধারীপুর, রাজাপুর সহ আরও অনেক গ্রাম, স্থানীয় বাজার, স্কুল, ব্যাঙ্ক। সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় জলঙ্গিগামী পাকা সড়ক। ঘরছাড়া হয় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষ। তারপর ধীরে ধীরে সরতে থাকে বন্যার ঘোলা জল। জলের মাথায় জাগতে শুরু করে একটু একটু করে চর। ধীরে ধীরে চরও বড় হয়। এই চরই আজকের নির্মল চর।
এই চরেও শব্দ ওঠে ।
হিস-হিস শব্দ ।
গোটা চর জুড়েই শব্দ শোনা যায়। সবাই শুনতে পায় সেই শব্দ। কোথা থেকে এই শব্দ আসে কেউ জানে না। কেউ দেখেনি শব্দের উৎস কোথায়। দিনের বেলায় আকাশে বাতাসে ভেসে থাকে সেই শব্দ। রাতের বেলায় নদীর তীরে এসে থিতু হয়। চরের সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, আকাশে চাঁদ ওঠে, কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ, তখন নদীর বুকে থেকে শব্দেরা একে একে উঠে আসে। নদীর তীর ছাড়িয়ে গ্রাম ভাসিয়ে গোটা মাঠে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত শব্দ, হিস-হিস, হিস-হিস। ধীরে ধীরে তার সাথে যুক্ত হয় এক মায়াবী সুর। মনে হয় গ্রাম, মাঠ, নদী, নালা ছাড়িয়ে বহুদূরে কোথাও কোনও এক নদীর তীরে কোনও এক নারী বসে কাঁদছে। সারারাত জুড়ে কাঁদে।
রাত দুপুরে পরাণের বউ মালতী পরাণকে ডেকে বলেছিল, “ওগো! শুনতে পাচ্ছ! ক্যামন হিস হিস শব্দ হয়! য্যান কার জিভ লকলক করছে। কিছু খাতে চাচ্ছে গো! লক্ষণ ভাল নাই!”
পরাণ মালতীকে বুকে টেনে নিয়ে বলেছিল, “নদীর পাড়ে কত জন্তু জানোয়ার ঘুর্যা ব্যাড়াই। চিন্তা করিস না মালতী। ঘুমিয়্যা পড়।”
“ঘুম যে আসে না গো! আনসার ভাইয়ের বউটার প্যাটে বাচ্চা। দশ মাসের পুয়াতি। কি জানি কী হয়!” পরাণের বুকে নিজেকে সঁপে দিয়ে বলেছিল মালতী।
“তুই অ্যাত ভাবিসরে মালতী! এর লাগ্যায় তোকে এত ভালো লাগে।” মালতীকে বুকের ভেতরে টেনে নিতে নিতে বলেছিল পরাণ।
“ভাবিনা গো। এমনি এমনি ভাবনা চল্যা আসে। আজ ওদিকে গেছুনু। দ্যাখা হয়্যাছিলো। প্যাট উঁচু কর্যা উঠানে বস্যা ছিল মাগীটা।” পরাণের বুকে ঢুঁকে যেতে যেতে বলেছিল মালতী।
“আজ সাঁঝে মোড়ে আনসার ভাইয়ের সাথে দ্যাখা হয়্যাছিল। বড়ই চিন্তায় আছে আনসার ভাই।” বলেছিল পরাণ।
“তো যাওনা ক্যানে অ্যাকবার নদীর ধারে। কে অমন শব্দ কর্যা মায়াকান্না করে দেখ্যা আসনা অ্যাকবার! অ্যাকলা না পার মহিরুদ্দি ভাইকে ডাক্যা লাও।” মালতী বলেছিল।
আর কথা বাড়ায়নি। বিছানা ছেড়ে উঠে বসেছিল পরাণ। একটা লাঠি আর টর্চ হাতে বেরিয়ে পা টিপে টিপে মহিরুদ্দির ঘরে গিয়ে ফিসফিস করে ডেকেছিল, “মহিরুদ্দি ভাই। নদীর চরে কে য্যান কাঁদে। আর হিস হিস শব্দ হয়। যাবা নাকি দেখতে।”
“ওরকুম তো রোজই হয়রে পরাণ। আজ তোর কী হল! এত রাতে উঠ্যা আলি!” মহিরুদ্দি বিছানা চেড়ে উঠে বলেছিল পরাণকে।
পরাণ বলেছিল, “আজকে মনটা কেমন ছ্যাঁত ছ্যাঁত করছে গো। মনে হচ্ছে খারাপ কিছু অ্যাকটা হবে। মালতীও খুব চিন্তা করছে। তো চলনা একবার দেখ্যা আসি। কে কাঁদে?”
“যাবি তো চল। কিন্তুক কিছুই পাবিনা। এ ডাক আমি কতদিন শুন্যাছি।”
লাল্টুকে ডেকে নিয়েছিল মহিরুদ্দি। পরাণ, মহিরুদ্দি, লাল্টু লাঠি – বল্লম নিয়ে নদীর তীরে গিয়েছিল। যতই এগিয়ে যাচ্ছিল তারা, ততই শব্দটি নদীর কুল বেয়ে আরও দূরে দূরে সরে যাচ্ছিল। ঠিক কোথা থেকে শব্দ আসছিল বুঝতে পারছিলনা তারা। একবার মনে হচ্ছিল নদীর ওপার থেকে আসছে। আবার মনে হচ্ছিল চরের সমস্ত দিক থেকে আসছে সেই শব্দ। একটু পরে মনে হল নদীর চড়া থেকে একটা অদ্ভূত সুর ভেসে আসছে। সেইসাথে একটা গোঙানি। তারসাথে হিস-হিস-হিস সেই শব্দ। নদীর তীরে গিয়ে তারা টর্চ মেরে অনেকদূর পর্যন্ত তাকিয়ে দেখেছিল তারা। দেখেছিল নদীর জল কেমন শান্ত, স্থির। সেই স্থির জলে পূবের মৃদু মন্দ হাওয়া জলে মাঝে মাঝে হালকা ঢেউ তুলছে। ছলাৎ ছলাৎ করে নদীর পাড়ে এসে ধাক্কা মারছে সেই ঢেউ। নদীর ধারে কাছেই একটা ছোট্ট ডিঙি বাঁধা আছে। ঢেউয়ের তালে তাল রেখে দোল খাচ্ছে ডিঙি। মাঝে মাঝে দু একটি যুবক মাছ অতি চঞ্চলতায় জলের নিচে থেকে প্রচণ্ড গতিতে জলের উপরে উঠে এসে ঠোঁট বাড়িয়ে উপরের ঠান্ডা হাওয়া ঠোঁটে পুরে আবার প্রচণ্ড গতিতে লেজ ঘুরিয়ে জলের নিচে চলে যাচ্ছে। দু একটি শেয়াল এদিক ওদিক চক্কর দিয়ে পরাণদের কোনও পাত্তা না দিয়েই আপন মনে সামনের দিকে চলে গেল। পরাণ টর্চের আলো লম্বা করে দূরে নদীর তীর বরাবর জলে ফেলে দেখল। একটা বন বিড়াল নদীর তীরে দাঁড়িয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। টর্চের আলোয় জ্বল জ্বল করছে তার সুচতুর চোখ। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ তখন পশ্চিম দিগন্তে অস্ত যাচ্ছে।
পরাণ টর্চ বন্ধ করে মহিরুদ্দিকে ফিস ফিস করে বলেছিল, “কিছু বুঝতে পারছ মহিরুদ্দি ভাই! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিন্যা।”
“বুঝা খুব শক্তরে পরাণ! আর বুঝ্যা কুনু কাম নাই। চল। এবার ঘরে যায়।” অন্ধকারে নদীর কালো জলের উপর টর্চ মারতে মারতে বলেছিল মহিরুদ্দি।
“কিন্তুক ওই শব্দ আসে কোথা থাক্যা?” পরাণের কথায় জানার প্রবল ইচ্ছা।
মহিরুদ্দি আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বলেছিল, “সেই কবে থাক্যা লিশি লাগ্যা আছে এই চরে। লিশি রাতে পদ্মার বুক থাক্যা রাক্ষসী উঠ্যা আসে। গোটা চর জুড়্যা রাক্ষসী ঘুর্যা বেড়াই। রাক্ষসীর যখন কিছু খাতে ইচ্ছ্যা হয়, তখন এমনি কর্যা শব্দ করে। দেখছিস ন্যা, গোটা চর জুড়্যা শব্দ আসছে। চল আর বেশি থাকা ঠিক হবে না।”
মহিরুদ্দির পিছু পিছু ঘরের পথে পা বাড়িয়েছিল পরাণ, লাল্টু। ফিরতে ফিরতে মহিরুদ্দি আবার বলেছিল, “বুঝলে পরাণ ভাই। মাঝে মাঝে রাতের ব্যালায় আমি নদীর ধারে অ্যাকলা ঘুরতে আসি। একরাতে দেখি নদীর ধারে বস্যা অ্যাকটা রাক্ষুসী মতো কুচকুচে কালো চেহারার মাইয়্যা মানুষ চুল শুকাচ্ছে। মাথা ভর্তি কালো ঘন চুল। আমাকে দেখ্যা ঝুপ কর্যা নদীতে ঝাঁপ দিল। আমি আর ভয়ে এগুতে পারিনি। শরীর কাঁপতে লাগ্যাছিল। সেদিন থাক্যা রাতে আমি আর অ্যাকলায় নদীর ধারে আসিনা।”
লাল্টু এতক্ষণ কোনও কথা বলেনি। চুপ করে দুজনের কথা শুনছিল। মহিরুদ্দির কথা শেষ হলে সে বলল, “আমিও অ্যাকবার দেখ্যাছি। কী কালো আর কত লম্বা চুল! আব্বার কাছে শুন্যাছি নদীতে কালি বাস করে। কালির যখুন মানুষ খাতে ইচ্ছ্যা করে, তখন মাঝ নদীতে মানুষকে ডুবিয়্যা মারে।”
“আরে গতবার বাহার ভাই ডুব্যা মরল না ! কত আর পানি ছিল শুনি ! ওপার থাক্যা হেল্যা আসছিল। মাঝে ছোট মতোন একটা কূপ। ঢেউ নাই, স্রোত নাই। বাহার ভাই হেলতেও ভালো পারত। সে কিনা হাঁটুপানিতে ডুব্যা মরল।” মহিরুদ্দি লাল্টুর কথার রেশ টেনে কথাগুলো একটানে বলে গেল।
“বাহার ভাইয়ের লাশটাও তো পাওয়া গেছিল সেই কূপেই। ক্যামন নীল আর কালো হয়্যা গেছিল অতবড়ো জোয়ান শরীলটা!” লাল্টু বলল।
মহিরুদ্দি লাল্টুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “ওটাই তো রাক্ষুসী ভাই! আমাদের এই লদীতে রাক্ষুসী বাস করে। রাতের ব্যালায় রাক্ষুসী গোটা মাঠ জুড়্যা ঘুর্যা বেড়ায়। এখুন অ্যাত কথা বুলা ঠিক লয়। রাক্ষুসীর লোভ হতে পারে।”
পরাণ বলল, “আমিও শুন্যাছি লদীতে কালি বাস করে। মানুষ খাবার ইচ্ছ্যা হলে মানুষকে ডুবিয়্যা মারে। রাতের ব্যালায় নদীর পাড়ে বস্যা বাতাসে চুল শুকায়। আমি কুনুদিন দেখিনি। শুন্যাছি।”
মহিরুদ্দি পরাণকে থামিয়ে বলল, “বুলনু তো। এসব কথা আর বুলিস না। রাতের ব্যালায় এসব কথা বুলতে নাই।”
পরাণেরা নদীর চড়া থেকে ঘরের কাছে চলে এসেছিল।
ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই আবার সেই হিস – হিস শব্দ।
পরাণ মালতীকে বুকে চেপে ধরে বলেছিল, “কিছুই দেখা গ্যালনারে মালতী! চোখ বুজ্যা ঘুমিয়্যা পড়।”
বারোমাসে চর বারো রকমের। তাই চরের মানুষের রকমারি বারোমাস্যা। মাঝে মাঝে চরকে দেখে গিরগিটি মনে হয় পরাণের। বারোমাস জুড়ে কত রকমের রঙ বদলায় এই চর। গ্রীষ্মকাল জুড়ে চরের সব নদী, খাল, বিল, নালা শুকিয়ে থাকে। নদীর চড়া থেকে কিমির পর কিমি মাঠ ঘাট সাদা বালিতে ধু ধু করে তখন। মাঠে-ঘাটে বা বাজারে যেতে হলে একেবারে সকাল সকাল বেরতে হয়। বেলা বাড়লে বালির উপর আর পা রাখা যায়না। ধীরে ধীরে বালি গরম হতে থাকে। বেলা যত বাড়ে, বালি তত গরম হয়। দুপুরে বালি আর বালি থাকেনা। বালি হয়ে ওঠে আগুন। তখন বালিতে পা রাখলে সেকেন্ডে পা হয়ে যায় কই ভাজা। দুপুর থেকে বিকেল এর তীব্রতা বাড়তেই থাকে। তখন মাঠেও যাওয়া যায়না। মাঠে যেতে বা বাজার থেকে ফিরতে হলে সেই সন্ধ্যার পর। মাঠের মাঝে জায়গায় জায়গায় পড়ে থাকে পলি পড়ে থাকা কিছু পতিত জমি। সেখানে চাষীরা ধান কাটে। পাট বোনে। ধূ ধূ করা সাদা মাঠ ধীরে ধীরে সবুজে ভরে যায়। ধান, পাট বড় হতে না হতেই বর্ষা নামে। যত বর্ষা নামে, চরের রূপও তত পাল্টাই। সবুজ মাঠ রূপ পরির্তন করতে থাকে। তারপর আসে বন্যা। মরা পদ্মা তখন যৌবনে পা দেয়। বন্যার জল ক্রমশ দুকূল ছাপিয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে। নিচের দিকে গড়িয়ে যাওয়ায় জলের ধর্ম। বন্যার সময় জল উল্টো পথে চলে। বন্যা যত বাড়ে, নিচের দিক থেকে জল উপরের দিকে উঠে আসে। খাঁড়ি, খাল, বিল ছাড়িয়ে বন্যার জল গোটা মাঠকে গ্রাস করতে থাকে। তারপর ঢুকে গ্রামে। গ্রাম ভাসতে থাকে জলে। ভাসতে থাকে গোটা চর। তখন এই নসিপুরের ঘাট থেকে রাজশাহীর কোল পর্যন্ত পদ্মা নদী আর নদী থাকেনা। তখন তাকে দেখে মনে হয় একটা আসত সমুদ্র। এক কূল থেকে আরেক কূল দেখা যায় না। জলে সমুদ্রের ঢেউ উঠে। তখন পদ্মা হয়ে ওঠে বিধ্বংসী। রাক্ষসী।
গোটা চর জুড়েই শব্দ শোনা যায়। কোথা থেকে এই শব্দ আসে কেউ জানে না। কেউ দেখেনি শব্দের উৎস কোথায়। দিনের বেলায় আকাশে বাতাসে ভেসে থাকে সেই শব্দ। রাতের বেলায় নদীর তীরে এসে থিতু হয়। চরের সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, আকাশে চাঁদ ওঠে, কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ, তখন নদীর বুকে থেকে শব্দেরা একে একে উঠে আসে
তারপর একদিন বন্যার জল নামে। ফসল আর আবর্জনার পচা গন্ধে ভরে ওঠে চারিদিক। বাড়ে মশা আর মাছির অত্যাচার। রাতে গোয়ালঘরে গোরুকে ঢুকিয়ে দিয়ে কাঁচা আবর্জনা গুছিয়ে আগুন দিয়ে ধোঁয়া করে চাষীরা। মশার তাড়ানোর জন্য তারা সারারাত ধরে আবর্জনায় আগুন দিয়ে ধোঁয়া করে রাখে নিজেদের ঘরও। সারারাত ধোঁয়ায় থেকে বিছানা পত্তর কালি ঝুলির রঙ নেয়। সকালে উঠে গা গন্ধ করে। ধোঁয়াটে গন্ধ। তাতে তারা ভ্রুক্ষেপ করেনা। সকালে উঠে মাথল মাথায় আর গামছা কাঁধে মাঠে যায়।
বন্যার জল নামলে নিয়ম করে আসে কলেরা, ওলা ওঠা, নিউমোনিয়া। আর জ্বর। গোটা চরে একটা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নেই। অসুস্থ হলে চিকিৎসা পায়না কেউ। চিকিৎসা পেতে হলে বিশ বাইশ কিলোমিটার রাস্তার জল কাদা আর বালি পেরিয়ে যেতে হয় নশিপুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখান থেকে লালবাগ, না হয় বহরমপুর। বেশিরভাগ চাষীর পক্ষেই সেটা সম্ভব হয়না। পচা জল আর আবর্জনার পচা স্তুপে পড়ে থেকে অনেকেই মারা যায়। মারা গেলেও তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা আসেনা। স্বাস্থ্য সচেতনতার কোনও ক্যাম্পও হয়না।
এই সময় চরের ভুবন জুড়ে পলি পড়ে। কোথাও এক হাঁটু, কোথাও এক কোমর। কলাইয়ের বীজ নিয়ে মাঠে নামে চাষীরা। চাষীদের তখন ব্যস্ততার শেষ থাকেনা। বড়োরা বলে গেছে, মাথায় গামছা বাঁধতে বাঁধতেই কলাই নামলা হয়ে যায়। তাই, ঠিক ঠিক সময়ে কলাই বুনতেই হয়। না হলে কলাইয়ের ভাল ফলন হবে না।
কলাই বোনা হয়ে গেলে চাষীদের আর বেশি কিছু কাজ থাকেনা। পলুই, ভুমরি জাল, ফাসজাল নিয়ে মাছ ধরতে নামে নদী, নালা, খালে-বিলে। পদ্মায় ডিঙি ভাসিয়ে তারা যায়, কিন্তু বেশি দূর যাওয়া যায়না। ওপাশে বাংলাদেশ। কয়েক কিমি গেলেই পদ্মার জল ভাগ হয়ে যায়। তবে জল ভাগ হলেও মাছ ভাগ হয়না। ওপারের মাছ ডুব দিয়েই অনায়াসে এপারে চলে আসে। আবার এপারের মাছ ওপারে। প্রত্যেকের নৌকায় থাকে নিজের দেশের পতাকা। সারা রাত ধরে তারা মাছ ধরে। ভোরের বেলা সেই মাছ নিয়ে যায় আখরিগঞ্জের বাজার। আড়তে মাছ বিক্রি করে তারা আবার ফিরে আসে ঘরে।
•২•
সেই চরের ভুবন জুড়ে আজ আকাশ ভাঙল সন্ধ্যার পর।
সেদিনও সন্ধ্যার পর আকাশ ভেঙেছিল। ব্যথাও উঠেছিল সেই সন্ধায়। ব্যথা উঠেছিল সফর আলির বউ নুরুর। নুরুর পেটে তখন দশ মাসের বাচ্চা। রাত দশটার পর ব্যথা চরমে উঠেছিল। সঙ্গে চাপ চাপ রক্ত। কী করবে আর কী করবে না, ঠিক করতে পারছিলনা সফর আলি। তখনও চরে কোনও প্রাথমিক হাসপাতাল ছিলনা। ছিল না কোনও কক ডাক্তারও। কাছাকাছি হাসপাতাল বলতে সেই নশিপুরে, সরকারি গ্রামীণ হাসপাতাল। বিশ বাইশ কিলোমিটার দূর রাস্তা বেশি কিছু নয়। লোকে বলে ‘এক নদী হাজার ক্রোশ’। এখানে কথাটা বড্ড খাঁটি বটে। ঘর থেকে বেরিয়ে কিমি খানেক গেলে একটা ছোট্ট সরু নালা। এই কদিনের বৃষ্টিতে নালার দুকূল জলে ছাপিয়ে গেছে। নালা পেরিয়ে আরও কিমি তিনেক গেলে একটা ছোট্ট বিল। সেই বিলও এখন জলে ভর্তি। বিলের পাশ দিয়ে মানুষের পায়ে হাঁটা রাস্তা। তাও এখন বৃষ্টির জলে ডুবে গেছে। তারপর আরও কিমি চারেক গেলে আখরীগঞ্জের ঘাট। পদ্মার মরা প্রবাহে এই ঘাট প্রায় শুকনো থাকে। পুষ্টিহীন বুড়ির মতো মাটিতে লেপ্টে পড়ে থাকে নদী। বৃষ্টির জলে সেই ঘাটও এখন জলে টইটম্বুর। দুকূল ছাপিয়ে সে এখন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ঘাটের এপারে নৌকা বাঁধা থাকলে ভালো। না থাকলে ডেকে হেঁকে ওপার থেকে নিয়ে আসতে হবে নৌকা। সে-ও প্রায় ঘন্টা দুই-তিনের ব্যাপার। নৌকায় পার হয়ে হাসপাতাল প্রায় আরও আধ ঘন্টার রাস্তা। বিশ – বাইশ কিমি রাস্তা। কিন্তু সব মিলিয়ে প্রায় ঘন্টা পাঁচ-ছয়েকের ব্যাপার।
সফর আলি ঠিক করেছিল নুরুকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। কিন্তু নিয়ে যাবে কিসে! মহিরুদ্দি ভাইয়ের একটা গোরুর গাড়ি আছে। কিন্তু সে কি এত রাতে যেতে চাইবে? এদিকে বিছানায় ছটফট করছিল নুরু। নুরুর বাচ্চা হবে বলে ওর মা দু দিন থেকে বাড়িতে এসে আছেন। সন্ধ্যা থেকেই নুরুকে খালাস করতে চেষ্টা করেছিলেন নুরুর মা। কিছুতেই কিছু করতে পারছিলেন না তিনি। সফর আলি শুনেছে অনেক মেয়ের বাচ্চা হইয়ে দিয়েছে্ন শ্বাশুড়ি মা। কিন্তু নিজের মেয়ের বেলা কিছু করতে পারছেন না।
রাত বারোটার পর বৃষ্টি ছেড়েছিল। আকাশটাও মনে হয়েছিল পরিষ্কার। সফর আলি বাড়ি থেকে বেরিয়ে মহিরুদ্দির কাছে গিয়েছিল। বলেছিল, “মহিরুদ্দি ভাই। নুরুর অবস্থা খুব খারাপ। ওকে একবার হাসপাতলে নিয়ে যাওয়া দরকার। তোমার গোরুর গাড়িতে নিয়ে চলনা আখরীগঞ্জ ঘাট পর্যন্ত।”
সব শুনে মহিরুদ্দি দেরি করেনি। গোরুর গাড়িতে টাপ্পর চাপিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল সে। কিন্তু, তাকে আর যেতে হয়নি। মহিরুদ্দির গাড়ি নিয়ে ঘরে এসে সফর আলি দেখেছিল নুরু একেবারে নেতিয়ে পড়েছে। গাড়িতে তোলার আর দরকার হয়নি। রাত দেড়টার সময় মারা গিয়েছিল নুরু। সাথে নুরুর পেটের বাচ্চাও। সফর আলি সেদিন কেঁদেছিল খুব।
সেই থেকে সফর আলি আর বিয়ে করেনি। ঠিক করেছিল বিয়ে আর করবেনা। মাকে সেকথা জানিয়েও দিয়েছিল সে।
সব কথা শুনে মা বলেছিল, “সে কী কথা রে সফর। তোর কষ্টের কথা বুঝি। তাবলে আর বিয়ে করবি না কেন? এমন কী বয়স হয়েছে তোর? সারাটা জীবন তো পড়ে আছে এখনও!”
মাকে বলেছিল সফর আলি, “সে সব কথা জানি মা। কিন্তু আমি আর বিয়ে করব না। এটাই আমার সিদ্ধান্ত।”
খুব কষ্ট করে কলেজ পাশ করেছিল সফর আলি। কষ্টটা অর্থের ছিলনা, ছিল যাতায়াতের। ঘর থেকে বেরিয়ে আধ ঘন্টার বেশি সাইকেল চালিয়ে আখরীগঞ্জের ঘাট। তারপর ঘাট পার হয়ে ট্রেকার বা বাস ধরে আরও পঁয়তাল্লিশ – এক ঘন্টা গেলে ভগবানগোলা স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেন ধরে কলেজ। যেদিন সফর আলি কলেজ যাওয়ার জন্য বের হত, সেদিন তার কাছে ছিল রীতিমতো যুদ্ধের দিন। তো এইভাবে যুদ্ধ করেই সে একদিন কলেজ পাশ করেছিল। সেই সফর আলি ঠিক করেছিল মাঝে মাঝে শহরে গিয়ে সে ডাক্তারি শিখে আসবে। এই চরের মানুষের যতটুকু পারে ডাক্তারি পরিষেবা দিয়ে সাহায্য করবে। সফর আলি বহরমপুর শহরে একটা ডাক্তারি শেখার কেন্দ্র থেকে এক বছরের একটা ডিগ্রি করে গ্রামে নিজের ঘরে একটা ছোট্ট করে চেম্বার করেছিল। এখন সে চরের সফর ডাক্তার। ডাক্তার সফর আলি।
আজও আকাশ ভাঙল সেই সন্ধ্যার পর। আর সন্ধ্যার পর আনসার আলির বউ ময়নার ব্যাথাও শুরু হল। বাচ্চা হওয়ার ব্যথা। সে এক চরম ব্যাথা। চরম ছটফটানি। এপাশে একবার উঠে বসেতো আবার শুয়ে পড়ে ওপাশে। একবার দাঁড়িয়ে থাকেতো মুহূর্তে আবার বসে পড়ে। লোকে বলে মেয়েদের বাচ্চা হওয়ার মতো ব্যথা নাকি আর কিছুতেই নেই।
রাত আটটার দিকে সফর আলির দরজা খটখট করে উঠল, “সফর ভাই ঘুমিয়্যা পড়্যাছ নাকি?”
সফর আলি দরজা খুলে দেখল একটা ভাঙা মাথল মাথায় দাঁড়িয়ে আছে আনসার আলি। বৃষ্টিতে তার গোটা শরীর ভিজে গেছে। মাথা থেকেও চুইয়ে পড়ছে বৃষ্টির জল। মালকোঁচা করে লুঙ্গিটাকে পেছনের দিকে একটা পাক দিয়ে বেঁধে রেখেছে। পায়ে হাঁটু পর্যন্ত লেগে আছে হালকা কাদা।
সফর আলি তাড়াতাড়ি আনসারকে ঘরে ঢুকিয়ে নিয়ে বলল, “কী হয়েছে আনসার ভাই?”
আনসারের সব কথা শুনে একটা ব্যাগে কয়েকটি ব্যথার ট্যাবলেট, ইঞ্জেকশন আর কিছু তুলো নিয়ে ছাতাটা মাথায় দিয়ে আনসার আলির পেছন পেছন বেরিয়ে পড়ল সফর আলি। আনসার আলির বাড়ি গিয়ে দেখল প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ময়না। থেমে থেমে খিচুনিও হচ্ছে।
ময়নাকে ভালোভাবে দেখেশুনে সফর আলি আনসারকে আলাদা করে ডেকে বলল, “লক্ষণ ভাল না আনসার ভাই। ময়না ভাবিকে এখনই শহরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”
রোগী নিয়ে আনসার কোনোদিনও শহরের হাসপাতালে একা যায়নি। দু একবার কারও দরকারে কারো সাথে গেছে। তাও দিনের বেলা হলে না হয় সে চেষ্টা করা যেত। এখন এই দুর্যোগের রাতে কী করে ময়নাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে একা? ময়না অসুস্থ হলে আনসার সফর আলির কাছ থেকেই মাঝে মাঝে ট্যাবলেট নিয়ে আসত। পেটে বাচ্চা থাকা অবস্থাতেও সফর আলির কাছে থেকেই ওষুধ খেয়েছে ময়না।
সফর আলির কথা শুনে আনসার আলির চোখে ঘোর অন্ধকার নেমে এল। বলল, “এখন ক্যামুন কর্যা লিয়্যা যাব সফর ভাই! যা হয় তুমি অ্যাকটা কিছু কর।”
“সে তো বুঝতে পারছি আনসার ভাই। যে ভাবে আকাশ ভেঙে পড়েছে, এখন তো যাওয়ার উপায় নাই। কিন্তু আমিও তো বেশি কিছু বুঝতে পারছিনা। কাছে যন্ত্রপাতিও কিছু নাই। যদি কিছু হয়ে যায়। তাছাড়া এই সব কেশ মেয়েদের ডাক্তার দিয়ে সামলাতে হয়।” চিন্তিত মুখে কথাগুলি বলল সফর আলি।
আনসার আলি সফর আলির হাত ধরে বলল, “কী সে কী হয় জানিন্যা সফর ভাই। ভালোমন্দ তুমিই কিছু অ্যাকটা কর। ময়না খুব কষ্ট পাচ্ছে।”

অলঙ্করণ: দেব সরকার
সফর আলি কিছুক্ষণ চুপ করে অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল। বাতাসের সাথে জলের ঝাপটা এসে আনসারের বাড়ির পাটকাটির টাটিতে জোরে জোরে ধাক্কা মারছে। মনে হচ্ছে প্রকৃতির রোষ শুধু এই বাড়িটার উপরে এসে পড়েছে। কিছু পরে পুরো বাড়িটাই উড়িয়ে নিয়ে যাবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা। মাঝে মাঝে বিজলি চমকাচ্ছে। বিজলির সেই আলোতে দেখা যাচ্ছে দূরের মাঠ, গাছ, পাটের জমি। বাতাস আর বৃষ্টির তালে তালে গাছপালা মাথা দুলিয়ে কান ধরে উঠবোস করার মতো করে ওঠানামা করছে। জমির ছোট ছোট পাট একবার শুয়ে পড়ছে। শুয়ে পড়ে আবার দাঁড়াচ্ছে। দাঁড়িয়ে আবার শুয়ে পড়ছে। প্রকৃতির রুদ্র মূর্তির কাছ থেকে যেন নিস্তার নেই ওদের। এত বছর ধরে যেন কিছু ভুল করেছিল ওরা। আজ তার শাস্তি পাচ্ছে। সেই ভুলের শাস্তি। চারিদিকে চক চক করছে বৃষ্টির জল। আর গর্জন! ঝড়ের গর্জন! বৃষ্টির গর্জন! তার সাথে যুক্ত হয়েছে হিস – হিস ধ্বনি। গোটা চরটাকে গিলে খাবার জন্য কে যেন জিভ দেখাচ্ছে। আকাশ, বাতাস, জমি, মাঠ, ঘাট, নদী, নালা – সমস্ত দিক থেকে ভেসে আসছে সেই শব্দ। আজ যেন ধ্বংসের দিন। শুধু চর নয়। গোটা পৃথিবীটাকে ধ্বংস করার দিন। আর ভোর হবেনা। গোটা চরের মানুষ আর ভোরের মুখ দেখতে পাবেনা।
এই সময় সফর আলির মনে পড়ে গেল নুরুর কথা। সেই রাতে নুরুরও ঠিক এমনি ব্যথা উঠেছিল। ঠিক এমনি ভাবেই ছটফট করছিল নুরু। প্রকৃতিও ঠিক এমনিভাবে মেতে উঠেছিল সে রাতে। আর সেই হিস হিস ধ্বনি! কার জিভ যেন লকলক করছিল। লকলকে জিভের মাথায় সাদা সাদা ফেনা! জিভের ডগা দিয়ে আকাশ থেকে অনবরত যেন কেউ বিষ ঢালছিল! কেন করছিল? কেন মেতে উঠেছিল? সে কি কিছু ভোগ চেয়েছিল! তা নাহলে সেই রাতে উন্মত্তের মতো মেতে উঠেছিল কেন সে? আজও কী সে কিছু একটা ভোগ চায়?
হঠাৎ করে সফরের সারা দেহ দিয়ে একটা রক্ত স্রোত বয়ে গেল। গোটা শরীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা লোমগুলো যেন খাড়া হয়ে উঠল। এই পাগলিনী, এই উন্মাদিনী আজও কি কিছু চায়! কিছু ভোগ চায়! ভোগ! খুব শক্ত হয়ে দাঁড়াল সফর আলি। বাইরে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল বৃষ্টি ছাড়ার কোনও লক্ষণ নেই। কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল সে। তারপর আনসারের দিকে তাকিয়ে বলল, “ময়নাকে আমার ঘরে নিয়ে যেতে হবে আনসার।”
ধড়ে প্রাণ পেল আনসার। খুশি খুশি মুখ করে কিছু একটা বলতে যাবে, সফর আলি আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে আবার বলল, “না থাক। ময়নাকে এই অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। তুমি বরং আমার সাথে একবার আমার ঘরে চলো আনসার।”
আনসার মাথল মাথায় দিয়ে সফর আলির পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল। বাতাসের ঝাপটায় হাতে ছাতা ধরে রাখতে পারছিল না সফর আলি। ছাতা এদিকে একবার উড়েতো একবার ওদিকে। একবার উল্টে যায় তো আরেকবার বন্ধ হয়ে যায়। ঘরে পৌঁছতে পৌঁছতে আধভেজা হয়ে গেল সফর আলি। তোয়ালেতে মাথাটা মুছে নিল। একটা ব্যথার ইনজেকশন, কিছু হাত মোজা, আর বেশি করে তুলো, স্যালাইন, ব্লেড একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে বেঁধে নিয়ে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে এল সে।
মাকে বলে এল, “আজ রাতে ঘরে ফিরতে দেরি হবে মা।”
সফর আলির মা খুব শান্ত আর পরোপকারী মানুষ। সফর আলির কথায় তিনি বললেন, “ঠিক আছে। সাবধানে যাস।”
আনসার আলির ঘরে গিয়ে সফর আলি দেখল ময়না আরও জোরে চিৎকার করছে। আর গলা কাটা মুরগির মতো মাটিতে পড়ে ধড়ফড় করছে সে। যেন আর বেশি সময় নেই। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই এই জগৎ থেকে বিদায় নিবে সে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।
ময়নার দিকে তাকিয়ে আনসার বলল, “কিছু একটা কর সফর ভাই। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। ময়নার কিছু হয়ে গেলে সংসারটা অথই জলে ভেসে যাবে।”
আনসারের হাত চেপে ধরে সফর আলি বলল, “আমাকে রিস্ক নিতেই হবে আনসার ভাই। বাকিটা আল্লার উপর ভরসা কর। আশা করছি ময়নার কিছু হবেনা।”
প্রথমেই সফর আলি ময়নার হাতে স্যালাইন লাগিয়ে দিল। স্টেথিস্কোপ লাগিয়ে দেখল বিপি ১৫০। ভয় নেই। তারপর এপিডিউরাল পদ্ধতিতে কোমরের নিচে একটা ব্যথার ইঞ্জেকসন দিল। কিছু পরে ময়নার ছটফটানিও কমল কিছুটা। এরপর ঘণ্টা খানেকের চেষ্টায় ময়নার পেট থেকে বের করল এক সুস্থ নবজাতককে। প্রকৃতির গর্জন আর চোখরাঙানির চোখে চোখ রেখে চিৎকার করে কেঁদে উঠল সেই নবজাতক, “মা…”।
ময়নার জ্ঞান ফিরল আধ ঘণ্টা পর। জ্ঞান ফিরে এদিক ওদিক চেয়ে আনসারের দিকে তাকিয়ে প্রথমেই বলল, “আমার বাচ্চা কই গো!”
সফর আলি বাচ্চাটা পরিষ্কার করে খুব হালকা ভাবে ময়নার বুকে রেখে দিয়ে বলল, “এই নাও তোমার বাচ্চা ময়না। তোমার কোনও ভয় নাই। আরেকটু পর তুমি আরও সুস্থ হয়ে যাবে।”
আনসার আনন্দ আর বেদনায় চোখের জল মুছতে মুছতে সফর আলির হাত চেপে ধরে বলল, “আল্লার ফেরেস্তা তো দেখিনি। তুমি তো আইজ রাইতে আল্লার ফেরেস্তা হয়্যা আস্যাছ সফর ভাই। আমার ময়নাকে বাঁচিয়্যা দিল্যা। আল্লার কাছে আজ হাজার হাজার শুকরিয়া আদায় করব সফর ভাই।”
আনসারের পিঠে হাত দিয়ে একটা হালকা চাপ দিয়ে সফর আলি বলল, “আর ভয় নাই আনসার। এখন ঘরে যাই। সকাল আটটার দিকে আবার আমি আসব।”
এই সময় হঠাৎ করেই সফর আলির চোখে জল চলে এসেছিল। কিন্তু কেন বুঝে উঠতে পারল না। সে কি নুরুর জন্য! মাঝে মাঝেই সফর আলির এমন হয়। কারও কোনও দুঃখের কথায়, কষ্টের কথায়, বা দুঃখ কষ্ট থেকে নিরাময়ের কথায় তার চোখে জল চলে আসে। তখন লজ্জায় পড়ে যায় সে। চুপি চুপি চোখের কোণ মুছে নেয়। কিংবা উঠে পড়ে কিছুক্ষণের জন্য। কিন্তু এইরকম কেন হয়, বুঝতে পারেনা। কতদিন ভেবেছে সফর আলি। এমন যাতে না হয়, তারজন্য চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি।
প্যান্টের পকেট থেকে রূমাল বের করে চুপিচুপি চোখ মুছে ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল সফর আলি। যেতে যেতে আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল পূব আকাশের একেবারে নিচের দিকে হালকা আলোর মতো রেখা দেখা দিচ্ছে, আবার মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে। সফর আলি বুঝতে পারল সকাল হতে হতে মেঘ ছুটে যাবে।
ব্যাগপত্র হাতে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হল সফর আলি। আনসার ব্যাগপত্র হাতে নিয়ে এগিয়ে দিতে এল। নিষেধ করল সফর, “না থাক। আনসার ভাই। আমি একাই চলে যেতে পারব। তুমি বরং ময়নার পাশে থাক। ওর পাশে থাকাটা এখন খুব জরুরী।”
এই সময় কাছের মসজিদ থেকে ভেসে এল ভোরের আজান। সফর আলি বুঝতে পারল ভোরের আর দেরি নেই।
ক্রমশ…
লেখকের জন্ম মুর্শিদাবাদে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম এ। পেশা শিক্ষকতা। সম্পাদনা করেন ‘অত:পর…’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন। উল্লেখযোগ্য সম্পাদনা নারীর আধুনিকতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দেশবিভাগের প্রভাব, বাংলা সাময়িক পত্রের দুশো বছর, মানবতাবাদ। গবেষণা – ভারতীয় সমাজ ও সাহিত্যে দেশবিভাগের প্রভাব, সমকালীন মুসলিম পত্রপত্রিকায় নজরুল বিরোধিতা। প্রবন্ধের বই – বহুমাত্রিক ভারতের উত্তরাধিকার ও অন্যান্য, শিল্পীর স্বাধীনতা, শিল্পের স্বাধীনতা। ছোটগল্প সংকলন – এক টুকরো ব্রহ্মপুত্র। উপন্যাস – কোভিড কাল।
❤ Support Us









