Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ৬, ২০২৩

চর >।পর্ব ৫।

পদ্মা এখানে কিছুটা সরু। কিন্তু, ওই পারের তীর অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই বিস্তৃত তীরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন চাঁদের আবছা আলোয় রহস্যময় হয়ে উঠেছে। আলো আঁধারির আবছা পথে টর্চ হাতে করে কারা যেন হেঁটে যাচ্ছে। সফর আলি দাঁড়িয়ে একবার সেদিকে তাকাল.... তারপর

সাইদুর রহমান
চর >।পর্ব ৫।

ধা রা বা হি ক · উ প ন্যা স

 

•৯•

সফর আলির চোখটা চেপে ধরল সকালের দিকে। বিছানায় আসার পরেও তার ঘুম আসেনি। যতবার সে ঘুমানোর চেষ্টা করেছে, পদ্মা তার বুকের উপর এসে চেপে বসেছে। পদ্মা ! রাক্ষসী পদ্মা ! কে জানত একদিন এই পদ্মা ভাসিয়ে নিয়ে যাবে মাঠ— ঘাট, গ্রাম, বাজার, হাজার হাজার মানুষের বসত বাড়ি। ভিটেছাড়া মানুষেরা আজ কোথায়। কোথায় হারিয়ে গেল বাবা, বড়ো ভাই । কোথায় হারিয়ে গেল বাড়ির পাশের সেই আবদুল চাচা, আর সেই ছেলেটি। যে রোজ বিকেল হলে ছোট্ট সাইকেলে চেপে গোটা পাড়া ঘুরে বেড়াত । সবাই তো চলে গেল পদ্মার পেটে । ছেলেবেলায় দাদুর সাথে ঘুরে ঘুরে সফর আলি পদ্মা সম্পর্কে কত কথা শুনেছিল ! আগে নাকি পদ্মা এতটা রূক্ষ্ম, বিধ্বংসী, আর রাক্ষসী ছিলনা।
 
তারও আগে পদ্মা এদিক দিয়েই প্রবাহিত হতনা। তখন পদ্মা গঙ্গা নদীর মূলধারা ভাগীরথীর পথেই প্রবাহিত হত। অনেক পরে গঙ্গার জলধারা ভাগীরথীর বদলে পদ্মাপথে প্রবাহিত হয়ে আসছে। কোশী নদীর বিপুল জলরাশি বিহারের রাজমহল পাহাড়ের কাছে এসে গঙ্গা নদীর সাথে মিশে। ফলে বিপুল জলস্রোত ও জলধারা রাজমহলের কাছে একসাথে মিলিত হয়ে রাজমহল পাহাড়ে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা মেরে জলপ্রবাহকে উত্তরমুখী করে তোলে। এরফলে মূল গঙ্গা ধীরে পদ্মার অভিমুখে ধাবিত হয়। বর্ষাকাল বাদ দিলে বছরের বেশির ভাগ সময়, বিশেষ করে খরার সময়ে ভাগীরথী নদীতে জল থাকতই না। গঙ্গা থেকে ভাগীরথী নদীতে জাহাজ ঢুকতে পারত না তখন। উত্তর ভারত থেকে সমস্ত পণ্যদ্রব্য জাহাজ থেকে মুর্শিদাবাদের সূতির কাছে নামিয়ে দেওয়া হত। তারপর স্থলপথে সেগুলো জঙ্গিপুরে নিয়ে এসে ছোট ডিঙিতে বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হত কাশিমবাজার। আর পূর্ববঙ্গ ও আসাম থেকে জাহাজ ও স্টিমারগুলো জলঙ্গি-মাথাভাঙ্গা দিয়ে যাতায়াত করতো। উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে এই নদীপথও পরিত্যক্ত হয়। গঙ্গা নদীর জল ভাগীরথী দিয়ে প্রবাহের কথা প্রথম চিন্তা করেছিল ব্রিটিশ সরকার। উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখা। এরপর ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারা ধীরে ধীরে তীব্র হতে শুরু করল। ব্রিটিশ সরকার বিষয়টি নিয়ে আর এগোল না। স্বাধীনতার পর স্বাধীন সরকার কলকাতা বন্দরকে রক্ষা করতে ভাগীরথী নদীতে পর্যাপ্ত জলের প্রবাহ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। তারা আবার তৈরি করল ফারাক্কা ব্যারেজ পরিকল্পনা। ফরাক্কা থেকে জঙ্গিপুর – প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার ফিডার ক্যানেল তৈরি করে গঙ্গা থেকে জল ভাগীরথীতে নিয়ে এসে ফেলা হল। ফরাক্কা ব্যারেজ তৈরির পর থেকে পদ্মার রূপ গেল পাল্টে। ধীরে ধীরে সে হয়ে উঠল বিধ্বংসী, রাক্ষসী। সফর আলি দাদুর কাছে শুনেছে এসব। কিছু কিছু বইতেও পড়েছে সে। এখনও সে দেখতে পায় সারাবছর পদ্মায় সমানভাবে জল থাকেনা। শীতকাল থেকে গ্রীষ্ম পর্যন্ত পদ্মায় কোনও জল থাকে না। বর্ষা শুরু হলে পদ্মায় জল বাড়তে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে পদ্মা দুকুল ভাসিয়ে হয়ে ওঠে রাক্ষসী, বিধ্বংসী! সফর আলি দাদুর কাছে শুনেছে এসব। কিছু কিছু বইতেও পড়েছে।
 
সফর আলির ঘুম এসেছিল সকালের দিকে। কিন্তু বেশি ঘুমানো হল না। ঘুম ভেঙ্গে গেল আনসার আলির ডাকাডাকিতে। বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে হচ্ছিল না তার। তবু উঠে এল। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল আনসার আলি দাঁড়িয়ে আছে। পাশে ময়না। ময়নার কোলে বাচ্চা।
 
সফর আলি তাদের চেম্বারে বসতে বলল। তারপর চোখেমুখে জল দিয়ে এসে জানতে চাইল, “কী কয়েছে আনসার ভাই ?”
 
আনসার আলি যা বলল তাতে বোঝা গেল কয়েকদিন থেকে ছেলের জ্বর হচ্ছিল। ময়না সফর আলির কাছে আসতে দেয়নি। গঙ্গার পাড়ে যে বাঁকটা আছে, সেখানে কয়েকদিন থেকে একটি লোক বসছে। তেল পড়া, জল পড়া দেয়। তাতেই জ্বর, মাথাব্যাথা, পেটের ব্যাথা, পুরনো রোগ সব ভালো হয়ে যাচ্ছে। নদীর পাড়ে সে একটা থানের মতো তুলেছে। প্রথমে পাটকাটির টাটি দিয়ে একটা ছোট্ট ঘর তুলেছিল সে। এখন ঘরটা একটু বড়ো করেছে। প্রায় প্রতিদিন লোক বাড়ছে।
 
সফর আলি দুদিন আগে ওদিকে ঘুরতে গিয়ে ঘটনাটির কথা শুনেছিল। তবে খুব একটা জানার চেষ্টা করেনি। এখনও সে বেশি কিছু জানতে চায় না।
 
আনসার আলিকে সে জিজ্ঞাসা করল, “কবে থেকে জ্বর হয়েছিল?”
 
আনসার আলি বলল, “প্রায় এক মাস আগে প্রথম জ্বর হয়েছিল সফর ভাই।”
 
“তোমার মতো মানুষ এত দেরি করল কেন ? তুমি কী ওসব তেল পড়া, জল পড়াতে বিশ্বাস করো ?” বাচ্চার হাতে হাত রেখে উত্তাপ মাপতে মাপতে বলল সফর আলি।
 
“না আমি ওসব মানিনা সফর ভাই। কী আর বলব। সবাই বলল ওর কাছে যা। ঠিক হয়্যা যাবে। তাইতো গেনু। কিন্তু ভালো হল কই। ছেলে যে দিন দিন আরও খারাপ হয়্যা গ্যাল।” উদ্বিগ্নের মতো কথাগুলি বলল আনসার।
 
“ঠিক আছে। যা হবার হয়েছে। চার দিনের ওষুধ দিলাম। এরমধ্যে যদি না কমে তবে শহরে যেতে হবে। ওখানে কিছু টেষ্ট করিয়ে বড়ো ডাক্তার দেখাতে হবে।” ওষুধ দিতে দিতে বলল সফর আলি।
 
হঠাৎ আনসার আলির মনটা কেমন ভারী হয়ে গেল। বলল, “শহর কুনুদিন যাইনি। আর যাবোনা। তুমি যা হয় করো সফর ভাই। আমার দোষ হয়্যাছে মানছি। আর এরকুম করব না। কিছু হলেই তোমার কাছে লিয়্যা আসব।”
 
সফর আলি হেসে বলল, “আমার হাতে কিছু নাই আনসার ভাই। কেশ জটিল হলে শহরে তো যেতেই হবে। কোনোদিন যাওনি বলে যে যেতে হবে না, তা ঠিক নয়। তবে এত তাড়াতাড়ি ভাবার কিছু নাই। ওষুধগুলো খাইয়েই দেখোনা।”
 
আনসারদের বিদায় করে সফর আলি চা খেল। তারপর গায়ে জামাটা গলিয়ে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পদ্মার পাড়ের দিকে এগিয়ে গেল। স্থির শান্ত পদ্মা। কুল কুল করে বয়ে চলেছে। দূরে কিছু মানুষ নৌকা বেয়ে ওপারে যাচ্ছে। কেউ ওপার থেকে এপারে আসছে। কোথাও কোনও অসুবিধা নেই।
 
পদ্মার পাড় বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে সামনের দিকে এগিয়ে গেল সফর আলি। দেখল ওদিক থেকে হন হন করে হেঁটে আসছে বসির। মুখোমুখি হতেই সফর আলি বলল, “কী ব্যাপার বসির! একা হন হন করে কোথা থেকে আসছ?”
 
“আর বলনা সফর। ওই হয়েছে এক জ্বালা। ওই যে থান হয়েছে। ঐ থান থেকে আসছি।” আমতা আমতা করে বলল বসির।
 
সফর আলি জিজ্ঞাসা করল, “কী ব্যাপার বলোতো বসির? সবার মুখে ওই থানের কথা শুনছি। ব্যাপারটা আমাকে একটু খুলে বলতো। কী হয়েছে? সবাই কেন বেশি বেশি যাচ্ছে সেখানে?”
 
বসির একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, “ব্যাপারটা এমন কিছু লয় সফর ভাই। ওপার থাক্যা একজনা মুরব্বি টাইপের মানুষ মাস খানেক আগে এসেছিল। আমার সাথেও পরিচয় ছিল। আমিই বললাম নদীর ধারে একটা ছোট্ট ঘর তোল। ধম্মটম্মও করা হবে। আবার অসুখে বিসুখে মানুষের সেবাও করা যাবে। তাই…।”
 
“তার মানে তুমি থানের সাথে সরাসরি জড়িয়ে আছ। তোমার মতেই ওখানে মাজার তোলা হয়েছে !” সফর আলি স্পষ্ট করে বসিরের দিকে চেয়ে বলল।
 
‘মাজার বলছ কেন সফর। মাজার করতে হলে পীর লাগেনা। পীর কই? কবর কই? ওই একটু ধম্ম টম্ম করা। অসুখ বিসুখে মানুষের পাশে থাকা। সেবা করা। এর বেশি কিছু না।” বলল বসির।
 
“ও আচ্ছা। বুঝেছি।”
 
সফর আলি আর বিশেষ কিছু বলল না। আর সামনে না এগিয়ে বাড়ির দিকে ফিরে এল।
 
কিছু পরে এল পরাণ। পরাণকে আসতে দেখে সফর আলি দূর থেকেই বলল, “তোমার আবার কী হল পরাণ ভাই?”
 
পরাণের কিছু হয়নি। সে ওষুধ নিতেও আসেনি। সে বলল, “না আমার কিছু হয়নি। আমি ওষুধ নিতেও আসিনি। আমি একটা কথা বলতে এসেছি।”
 
“বল পরাণ ভাই, বল। কী বলতে এসেছ বল?” সফর আলি বসতে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল পরাণকে।
 
পরাণ আরও একটু কাছে এগিয়ে এসে বলল, “তুমি কিছু শোননি সফর ভাই? গ্রামে নদীর ধারে মাজার তুল্যাছে।”
 
সফর আলি কিছুটা সময় নিল। তারপর বলল, “আগে শুনিনি। আজ শুনলাম পরাণ। তুমি জানো কারা এটা করছে?”
 
পরাণ এবার জোরে জোরে বলল, “কে আবার করবে? ওই বসর‍্যা। ওপারের এক কানা ফকিরকে ধর‍্যা নিয়া আস্যা নদীর ধারে মাচা তুল্যাছে। গ্রামের মানুষ সকাল বিকাল সব পানি পড়া, জল পড়া, তেল পড়া লিতে লাইন লাগ্যা যাচ্ছে। তুমি শোননি এসব কথা।”
 

গঙ্গার জল ভাগীরথী দিয়ে প্রবাহের কথা প্রথম চিন্তা করেছিল ব্রিটিশ সরকার । স্বাধীনতার পর কলকাতা বন্দরকে রক্ষা করতে ভাগীরথী নদীতে পর্যাপ্ত জলের প্রবাহ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল স্বাধীন সরকার । প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার ফিডার ক্যানেল তৈরি করে গঙ্গা থেকে জল ভাগীরথীতে নিয়ে এসে ফেলা হল । ফরাক্কা ব্যারেজ তৈরির পর থেকে পদ্মার রূপ গেল পাল্টে । ধীরে ধীরে সে হয়ে উঠল বিধ্বংসী, রাক্ষসী ।

 
সফর আলি একটু চুপ করে বসে থাকল। তারপর বলল, “ঠিক আছে পরাণ। জানা থাকল।”
 
পরাণ বলল, “কিন্তু সফর ভাই। এর তো কিছু একটা করা উচিত। জানা নাই, শোনা নাই, কোথাকার এক ফকির এখানে আস্যা মানুষকে বোকা বানিয়া দিচ্ছে। আর আমাদের মান্যা লিতে হবে?”
 
সফর আলি আবারও কিছুটা চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “সবই বুঝতে পারছি পরাণ। এই সবের বিরুদ্ধে কিছু করা খুব বিপদের। তবু দেখি কী করা যায়! তুমি এখন এসো।”
 
পরাণ বলল, “ওই বসর‍্যা যত নষ্টের গোঁড়া। যেখানে সেখানে মাজার তুল্যা দিলেই হল? এই আমি বললুম। কিছু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।
 
সফর আলি বলল, “ওটাকে মাজার বলছ কেন? মাজার হয় কোনও কবরকে কেন্দ্র করে। পীর থাকতে হয়। এখানে কোনও কবর নেই। পীরও নেই। ওরা থান টাইপের কিছু একটা করেছে।”
 
“সে মাজার হোক আর থানই হোক। বসর‍্যা জল আর তেল নিয়ে সবাইকে বোকা বানাচ্ছে। আর ও ব্যবসা করছে। এটা হতে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। এর কিছু একটা করা দরকার।” পরাণ উঠে চলে গেল।
 
পরাণ চলে গেলে সফর আলি উঠে গিয়ে চেম্বারে বসল।
 

•১০•

মাস খানেক থেকে গোলাম মিঞার মনটা ফুর ফুর করে উড়ে বেড়াচ্ছে। বেটা হয়েছে গোলামের। সেই খুশিতে তার আর আনন্দ ধরে না। মানত দিতেও দেরি করেনি সে। যেদিন বেটা জন্ম হয়েছিল, কথামত তার পরের দিন মাজারে গিয়ে দুটো খাশি ছাগল বকশিস দিয়ে এসেছিল। এখন কেউ জিজ্ঞাসা করুক আর নাই করুক, কারও সাথে দেখা হলেই খবরটা দিতে ভুলছেনা গোলাম, “আর ভাই বলোনা। বস্যা যে একটু আরাম করব, তার আর জো নাই। ছেলেটা সারাদিন ধর‍্যা জ্বালাচ্ছে।”
 
কেউ হয়তো জিজ্ঞসা করল, “কার ছেল্যা গোলাম? তোমার?”
 
“হ্যাঁগো। আমার বেটা হয়্যাছে জানো না। দুই বেটির পর এবার ব্যাটা হয়্যাছে।” গলাটা লম্বা করে হেসে হেসে বলে গোলাম।
 
কিংবা কাউকে বলে, “আর বলো না ভাই ! বেটাটার সারারাত কাশি। থানে যাচ্ছি। একটু জলপড়া লিয়্যা আসি।”
 
“তোমার বেটা কবে হল গোলাম ভাই?” যেতে যেতে কেউ হয়তো জিজ্ঞাসা করল।
 
“তুমি জান না। মাস খানেক হয়্যা গেল গো। বেটা হয়্যাছে আমার।” জোরে হেঁটে যেতে যেতে উত্তর দেয় গোলাম।
 
কেউ হয়তো বলল, “জলপড়া খেয়ে কাশি ভালো হবে গোলাম ভাই? তারচেয়ে একবার ডাক্তার দেখিয়ে নাও। আমাদের সফর ভাই তো ভালো ডাক্তার। তার কাছেই দেখিয়ে নাও না।”
 
গোলাম বলে, “যখন ডাক্তার ছিল না। তখন কী খাইয়্যা মানুষের অসুখ ভালো হত শুনি ? ওই পানিপড়া, জলপড়া আর তেলপড়া খাইয়্যাই তো সব ভালো হত ভাই। আমার বড়ো বেটিগুলাকে তো পানিপড়া খাইয়্যাই মানুষ কর‍্যাছি। এখন না হয় ডাক্তার হয়্যাছে। এ তল্লাটে যখন ডাক্তার ছিলনা। আমি ওপার গেলছি পানিপড়া আনতে।”
 
কেউ বলে, “সে যুগের কথা ছাড় গোলাম ভাই। তখন ডাক্তার ছিলনা, তাই ওসব করেছ। এখন তো ডাক্তার আছে। তাহলে আর ওসব জলপড়া, পানিপড়া করতে যাবা কেন ?”
 
তবু গোলামকে বোঝানো যায় না। এখন পদ্মার পাড়েই থান হয়েছে। থানে ওপার থেকে একজন ফকির আসে। নানা রকম দোয়া দরুদ জানে ফকিরটি। একেবারে খাঁটি লোক। ওর কাছে থেকে পানিপড়া খেলে রোগ সারবেই। প্রথম প্রথম দু একজন যেত পানিপড়া, তেলপড়া আনতে। ধীরে ধীরে লোক বাড়তে লেগেছে। এখন তো বিকেলে মাগরেব নামাজের পর লাইন পড়ে যায়।
 
সপ্তাহ দুয়েক ধরে পানিপড়া খেয়ে যখন ছেলের জ্বর, কাশি ভালো হলনা, গোলামের ভয় হল। ভাবল কত কষ্ট করে, মানত করে বেটা হয়েছে। যদি অঘটন কিছু ঘটে যায়। মেয়ে হলে অন্যকথা ছিল। কিন্তু ছেলেতো! না! আর রিস্ক নেওয়া যাবেনা। এবার ডাক্তার দেখাতেই হবে। আর ডাক্তার বলতে তো সফর ডাক্তার।
 
বিকেলের দিকে গোলাম মিঞা বাচ্চা নিয়ে সফরের কাছে এল।
 
সব দেখেশুনে সফর বলল, “কবে থেকে এসব বাধিয়েছ গোলাম ভাই।”
 
যাতে লজ্জায় না পড়তে হয়, গোলাম একটু কমিয়ে বলল, “এই দুদিন হল। আসব আসব কর‍্যাও আসার সময়ই কর‍্যা উঠতে পারছিনা সফর। অবস্থা খুব খারাপ দেখ্যা সব কাজ ফেল্যা আসতেই হল।”
 
“না গোলাম ভাই। এ জ্বর-কাশি দুদিনের নয়। আট দশদিন তো বটেই।” বাচ্চার মুখ পরীক্ষা করতে করতে বলল সফর আলি।
 
গোলাম মিঞা কিছু বলল না। চুপ করে বসে থাকল।
 
গোলামকে চুপ থাকতে দেখে সফর আলি আবার বলল, “এতদিন ধরে তেলপড়া, পানিপড়া খাওয়াচ্ছিলে নাকি গোলাম ভাই! বাচ্চার অবস্থা দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।”
 
গোলাম মিঞা কোনও উত্তর দিলনা। চুপ করেই থাকল।
 
সফর আবার বলল, “ শোনো গোলাম ভাই। বাচ্চার অবস্থা ভালো না। আমি রাতের মতো একটা সিরাপ দিচ্ছি। সকালে শহরে চলে যাও। বা কোনও হাসপাতালে।”
 
সফরের কথা শুনে গোলাম চমকে উঠল। বলল, “আমি তো শহরে যায়নি কুনুদিন সফর। হাসপাতালও যায়নি কুনুদিন। বাচ্চাকে কী কর‍্যা শহরে লিয়্যা যাব ?”
 
সফর বলল, “যায়নি বলে যে কোনোদিন যেতে হবে না কে বলেছে ! আমার কিছু করার নেই। কাওকে সাথে করে নিয়ে সকালে চলে যেও। আর এই দুটো ট্যাবলেট বাচ্চার মাকেও খাইয়ে দিও।”
 
“খুব ভালো করলে সফর। ওর মায়েরও খুব জ্বর।” ওষুধ নিতে নিতে বলল গোলাম।
 
সফর বলল, “মায়ের জ্বর তো নিয়ে আসনি কেন ?”
 
গোলাম মিথ্যে করে বলল, “আনা হয়নি। আসলে ও ডাক্তারের কাছে যেতেই চায় না।”
 
“ঠিক আছে। এই ওষুধগুলো নিয়ে যাও। আর বাচ্চাকে অবশ্যই সকালে হাসপাতালে নিয়ে যাবে।” সফর বলল।
 
“ঠিক আছে সফর ভাই। কাল সকালেই নিয়ে যাব। তুমি শুধু রাতখানা পার করে দাও।”
 
গোলামের কথা শুনে সফর আলি বলল, “রাত পার হয়ে যাবে। কিন্তু তুমি তেলপড়া আর পানিপড়া খাইয়ে বাচ্চাকে তো মেরেই ফেলেছিলে গোলাম। বাচ্চারই ভাগ্য ভালো শেষ মুহূর্তে আমার কাছে এনেছিলে। না হলে কী যে হত বলা যেতনা।”
 
গোলাম কিছু বলল না। শুধু চুপ করে বসে থাকল।
 
গোলামকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে সফর বলল, “একটা কথা জিজ্ঞাসা করি গোলাম। নদীর পাড়ে ওই যে থানের কথা বলছ, সেটা কে তুলেছে ?”
 
গোলাম সেই ভয়ই করছিল। প্রসঙ্গটা তুলতে চাইছিল না সে। কিন্তু সফর আলি যখন জানতেই চাইল তখন তো কিছু বলা দরকার।
 
সে বলল, “একজনের নাম বললে হবেনা সফর ভাই। আমরা কজন মিলে ব্যাপারটায় যুক্ত আছি।”
 
সফর আলি বলল, “আমরা কজন মানে কারা কারা?”
 
“এই ধরো আমি, বসির ভাই, কানা ফকির, আরও কয়েকজন। এপারে তো সেরকুম কিছু নাই। ভাবনু ওপার থাক্যা যদি কানা ফকিরকে লিয়ে আস্যা এখানে কিছু একটা করা যায়, খুব ভালো হয়। মানুষের কিছু সেবা যত্ন করা হবে, আবার…।”
 
সফর আলি আর বেশি কিছু শুনতে চাইলনা। বলল, “ঠিক আছে গোলাম ভাই। তবে সিরিয়াস অসুখ নিয়ে তোমরা ছেলেখেলামি করো না। তাদের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিও।”
 
তাড়াতাড়ি উত্তর দিল গোলাম মিঞা, “আমরা বুলি ভাই। কিন্তু ওরা শুনে না। যতই বুলি ডাক্তারের কাছে যাও, ততই বলে এখানেই ভালো হচ্ছে সব অসুখ। ওরাই এর ওর অনেক নাম শুনিয়্যা দ্যায়। আর বলে এত এত লোকের ভালো হচ্ছে, আমাদেরও হবে। কুনুদিন মগরেবের পর ওদিকে যেও। দেখবে লাইন দিয়্যা সব দাঁড়িয়্যা আছে পানিপড়া, তেলপড়া ল্যাওয়ার লাগ্যা।”
 
কথা শুনে সফর আলি অবাক হয়ে গোলামের দিকে তাকিয়ে থাকল। কী সব বলছে গোলাম ! এই সময়ে, এই যুগেও পানিপড়া, তেলপড়া নেওয়ার জন্য লোকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে গোলামের মুখে না শুনলে বিশ্বাস হতো না তার। ভাবল একদিন সে সন্ধ্যার দিকে ঘুরতে ঘুরতে ওদিকে যাবে। দেখবে কীভাবে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে।
 
এরমধ্যে আরেকটি রোগী চলে এসেছিল। গোলাম আলিকে সে বলল, “ঠিক আছে গোলাম ভাই। তুমি আজ এসো। একদিন আমি ঘুরতে ঘুরতে ওদিকে যাব। দেখে আসব তোমাদের কাণ্ডকারখানা।”
 
“ঠিক আছে। আসো একদিন।”
 
বাচ্চা কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেল গোলাম মিঞা।
 
ক্রমশ…

পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন : চর (চতুর্থ পর্ব)

চর >।পর্ব ৪।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!