Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ৩০, ২০২৩

চর >।পর্ব ৪।

কতজনের কাছ থেকে সে শুনেছে নদীর ধারে কালি বসে থাকে। মাথায় তার লম্বা চুলের ঝুটি। মানুষ পেলেই হাত বাড়িয়ে খপ করে ধরে জলে ঝুপ করে ঝাঁপ মারে। ভাবতেই সফরের গা বেয়ে একটা হালকা স্রোত বয়ে গেল..... তারপর

সাইদুর রহমান
চর >।পর্ব ৪।

ধা রা বা হি ক · উ প ন্যা স

 

•৭•

সামনে কিছুটা এগোলেই নালা। দূরে ওপারের মাঠ থেকে সোজা নেমে এসে নদীর সাথে মিশেছে। এই নালায় মাঝে মাঝে বিপদ আসে। মাছের লোভে জাল ফেলতে সীমান্ত পার হয়ে কখন যে ওপারে চলে যায় জেলে মাঝিরা – বোঝা যায় না। এখানে সীমানা নেই। তারকাটাও নেই। ভুল করে একবার ওপার গেছ কী বিডিআর খপ করে ধরে নিয়ে যাবে। তারপর একমাস, দুমাস ওপারে জেল খেটে ছাড়া পেলে বাড়ি ফিরে আসতে হবে। এরকম অনেকের হয়েছে। পরাণই তো একবার ওপারে চলে গিয়েছিল। তারপর বিডিআরকে বুঝিয়ে বলে কয়ে, অনেক অনুরোধ করে ছাড়া পায়। এখন সবাই খুব সাবধানে মাছ ধরতে যায় নালায়। ভুল করেও ওপারে যাওয়া যাবেনা।

 

আনসার আলি লগিতে একটা জোর ঠেলা দিয়ে ডিঙি নিয়ে এগিয়ে গেল নালার মুখের দিকে। সকাল হবে। সূর্যের আলো বাড়বে। নালা থেকে মাছ নেমে আসবে বড়ো নদীতে। ঠান্ডা জলের জন্য। তারপর সারাদিন নদীর শীতল জলে খেলা করে নালায় উঠে যাবে সন্ধ্যে বেলায়। সারারাত ধরে কম জলে ভেসে থাকবে। ঘুম জড়ানো চোখে জেগে থাকবে কেউ কেউ ভোরের অপেক্ষায়। ভোর হলে আবার নেমে যাবে নদীর গভীর জলে।

 

নালার মুখে গিয়ে এক ধারে খুব শক্ত করে লগি পুঁতল আনসার। দড়ি দিয়ে ডিঙি বেঁধে রাখল। তারপর সরলা জাল নিয়ে নালার এক তীর থেকে আরেক তীর পর্যন্ত টাঙিয়ে দিয়ে ডিঙির উপর চুপ করে বসে থাকল সে। সরলা জালের মাথার দিকে দড়ি বা মোটা সূতোর উপরে শোলার ফাতনা খুব শক্ত করে বাঁধা থাকে। একটি শক্ত লাঠি পুঁতে দিয়ে সরলা জালের এক প্রান্ত লাটির সাথে বেঁধে দেওয়া হয়। তারপর অনেকদূর পর্যন্ত জালটাকে টাঙিয়ে দেওয়া হয় জলের মধ্যে। জলের ভেতর দিয়ে যাওয়া আসা করার সময় মাছেরা আটকা পড়ে যায় জালের পাশে। জাল কেটে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে মাছগুলো। টান লাগে দড়িতে। জালের উপরে বাঁধা ফাতনা জলের উপর ওঠানামা করে নাচতে থাকে তখন।

 

কিছু পরে আনসার তাকিয়ে দেখল জালের ফাতনা মাছে টানাটানি করছে। চুপ করে ডিঙিতে বসে থাকল আনসার আলি। এখনই সে জাল গুটাতে চায়না। আর কিছুটা সময় যাক। আরও কিছু মাছ জালে ধরা পড়ুক। একটা বিড়ি ধরিয়ে একটা পাকা জেলের মতো নৌকার উপরে চুপ করে বসে সরলা জালের দিকে তাকিয়ে থাকল সে।

এই সময় দূর থেকে গান ভেসে এল —

 
মাঝি বাইয়া যাওরে…
অকুল দরিয়ার মাঝে
আমার ভাঙা নাওরে
মাঝি বাইয়া যাওরে ।

 

আনসার আলি তাকিয়ে দেখল পরাণ ডিঙি ঠেলে এদিকেই আসছে। বিড়ি ধরিয়েছিল সে। বিড়িতে একটা লম্বা টান মেরে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে জাল গুটাতে থাকল। সে জানে, পরাণও ডিঙি নিয়ে নালার ভেতরে ঢুকবে।

 

আজ বেশ কিছু মাছ পড়েছে। সবরকমের মাছ। তিনটি ছোট রুই, বাইলা, পুঁটি, রূপচাঁদা, কয়েকটি পিয়লি, ভেটকি, কাকিলা। সব মিলিয়ে কেজি দুয়েক তো হবেই। মাছগুলো নিয়ে সামনে আরও দুই কিমি উজিয়ে খামার মোড়ে যেতে হবে। সেখানে বিক্রি করে তেল, চাল, আলু কিনবে সে। সেখান থেকে ডিঙি ঠেলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দূপুর গড়িয়ে যাবে।

 

পরাণ এসে পড়েছিল। গান থামিয়ে জোরে জোরে ডাক দিল, “কই হে আনসার ভাই। আজ মাছ ক্যামন পাইলা?”

 

“পাইছি ভাই। কেজি দুয়েক হবে। এই তো এলুম।” আবার বিড়ি ধরিয়েছিল সে। বিড়িতে টান দিতে দিতে বলল।

 

“কে জি দুয়েক ! ভালই তো পাইছো ভাই। দেখি আমি কী পাই !”

 

কথা বলতে বলতে পরাণ আনসার আলির ডিঙার পাশে ডিঙা ভিড়াল। বলল, “দাও। একটা বিড়ি দাও। মোজ কর‍্যা আগে টানি।”

 

আনসার ট্যাঁক থেকে বিড়ির বান্ডিল বের করে পরাণকে একটি বিড়ি দিল। বিড়ি হাতে নিয়ে নিজের ট্যাঁক থেকে লাইটার বের করে বিড়ি ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিল পরাণ।

 

আনসার বলল, “কী ব্যাপার পরাণ ভাই। লাইটার রাখ্যাছ, বিড়ি নাই?”

 

পরাণ বিড়িতে আর একটা লম্বা টান মেরে বলল, “বেটিটারে বলনু লাইটার আর বিড়ি কটা দে। বেটি আমার লাইটার দিয়্যাছে। বিড়ি দিতে ভুইল্যা গ্যাছে। ডিঙাতে চাপ্যা দেখি লাইটার আছে বিড়ি নাই।” ঠোঁট সামনের দিকে টেনে এনে সামান্য হাসল পরাণ।

 

পরাণের হাসিতে আনসারও একটু ঠোঁট মেলাল। পরাণ বিড়িতে টান দিয়ে আবার বলল, “বেটিটারে লিয়্যাই চাপে আছি আনসার ভাই। দেখতে দেখতে এই বেটিটাও আমার ডাগর হয়্যা গ্যাল। এখন ভালই ভালই বিয়্যা সাদি দিয়্যা বিদ্যায় কত্তে পারি।”

 

“চিন্তা কর ক্যানে পরাণ ভাই। জন্ম দিবার মালিক আল্লা। জোড়া মিলিয়্যা দিব্যার মালিকও আল্লা। আল্লা যেদিন জন্ম দিয়্যাছে, বেটির জোড়াও সেদিন পাঠিয়্যা দিয়্যাছে। যেদিন আল্লা চাইবে, বেটির বিয়্যা হইয়্যা যাবে। চিন্তা কর‍্যা লাভ নাই!” বিড়িতে টান দিতে দিতে বলল আনসার আলি।

 

“চিন্তা আসে আনসার ভাই, চিন্তা আসে! বড় বেটিটারে এখনও ভুলতে পারিনা। চোখের সামনে থাক্যা কেমন কর‍্যা হারিয়্যা গ্যাল।” হঠাৎ যেন পরাণ অন্য রকম হয়ে গেল।

 

পরাণের বড় মেয়ে সারির বয়স তখন পনের ষোল। গায়ের রঙ কালো হলে কী হবে, গোটা চরে তার মতো সুন্দরী কেউ ছিলনা। ভগবানগোলার বাজার থেকে পরাণ মেয়েকে সাইকেল কিনে এনে দিয়েছিল। সে কী কষ্ট সাইকেল আনার। বাজার থেকে ঠেলে নিয়ে এসে অটোর পেছনে বেঁধে আখরিগঞ্জের ঘাট। ঘাট পার হয়ে কাঁচা রাস্তায় এক হাঁটু কাদা। সেই কাদা মাটি আর বালি মাড়িয়ে মেয়েকে সাইকেল এনে দিয়েছিল পরাণ। সারিকে সে খুব ভালোবাসতো। সাইকেলে পেয়ে সারি ভাঙাচোরা, উঁচু নীচু রাস্তা আর মাঠের আল বেয়ে এ পাড়া ও পাড়া চষে বেড়াত । কখনও কেষ্টপুরের দিকে চলে যেত তো কখনও টিকলিচরের দিকে। আবার কখনও নদীর ধারে একমনে বসে থাকত। ডিঙি নিয়েও বেরিয়ে পড়ত কখনও কখনও। নদীতে সাঁতার কাটত ঘন্টার পর ঘন্টা। পরাণের সাথে মাছ ধরতেও বেরিয়ে পড়ত সে। সবসময় কিসের একটা ছটফটানি লেগেই থাকত সারির মধ্যে। আশেপাশের গ্রামে এমন কোনও মানুষ ছিলনা, এমন কোনও বুড়ো বুড়ি ছিলনা, এমন কোনও যুবক যুবতী ছিলনা – যে সারিকে চিনত না। পাড়ার দু চারজন যুবকের বুকে ঝড় তুলতে শুরু করেছিল সে। সেই সারি একদিন সন্ধ্যার পর আর ঘরে ফিরল না। সারারাত এ পাড়া ও পাড়া খুঁজে ক্লান্ত শরীরে পরাণ সকাল বেলা আখরিগঞ্জের ঘাটে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জেনেছিল, মেয়ে গতসন্ধ্যায় ঘাট পার হয়েছে। সাথে দুইজন পুরুষ লোক ছিল। সেই ছিল পরাণের কাছে মেয়ের শেষ সংবাদ। আজ বছর সাতেক আগের কথা। আজ পর্যন্ত পরাণ সারির আর কোনও সংবাদ পায়নি।

 

আখরিগঞ্জের ঘাটে সবসময় বসে থাকত সালাম মিঞা। ঘাটের পারাপারের টাকাপয়সার হিসাব রাখত সে। তার সাথে পরাণের চেনা পরিচয় ছিল। পরাণ সালাম মিঞাকে ডেকে বলেছিল, “সালাম ভাই। আমার মেয়েকে পার হতে দেখেছ?”

 

সালাম পাশের জনকে বলেছিল, “কীরে ? দেখ্যাছিস ?”

 

লোকটি পান চিবোতে চিবোতে আর বিড়ি টানতে টানতে বলেছিল, “তোর বেটি কি আর আছে। সে চালান হইয়্যা গ্যাছে।”

 

চমকে উঠেছিল পরাণ। মাঠে ঘাটে, পাড়ার মোড়ের আড্ডায় লোকের মুখে সে শুনেছে মেয়ে পাচারের কথা। কারা নাকি মেয়েদের কলিকাতা, দিল্লী, মুম্বাই, চেন্নাই নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। মেয়েগুলো আর বাড়ি ফিরতে পারেনা। তাই চালানের কথা শুনে পরাণের পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। শরীরে যে দু চারটি লোম ছিল, মুহূর্তে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে গেছিল। মুখ দিয়ে তার আর কথা বের হয়নি। শুধু নিষ্পলক তাকিয়েছিল এপারের দিকে। গায়ে হাত দিয়ে সালাম বলেছিল, “কী চিন্তা করছিস পরাণ? বাড়ি যা। শান্ত হইয়া দুট্যা ভাত খায়্যা ঘুমিয়্যা পড়িস।”

 

সারির আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।

 

সারিকে পরাণ আজও ভুলতে পারেনা। রাতে শুয়ে শুয়ে, মাঠে কাজের ফাঁকে, খেতে বসে। সবসময় সে সারির ‘বাবা’ ডাক শুনতে পায়।

 

“ওইটা ভুল্যা যাও পরাণ। নইলে বড় কষ্ট পাবা। তোমার তো আরেকটা আছে। তারে লিয়্যা ভাব অখন।” বিড়িতে আর একটা টান দিয়ে বলল আনসার আলি।

 

“ভুলতেই তো চাই আনসার ভাই। ভুলতে যে পারিনা। ছোটটারে দেখলেই বড়টারে মনে আইসে।” পরাণ এমনভাবে বলল যেন সে চোখের সামনে বড় মেয়ে সারিকে দেখতে পাচ্ছে।

 

আনসার আলি কিছু বলল না। বিড়ি টানা শেষ হয়ে গিয়েছিল। চুপ করে থেকে আরেকটি বিড়ি টানবে কিনা ভাবছিল সে। এই সময় পরাণ বিড়িতে শেষটান দিয়ে বলল, “ঠিক আছে আনসার ভাই। বেলা হইছে। এগুই। দেখি কিছু পাই কিনা!”

 

তারপর গান ধরল—

 
“কাঁচা বাসের খাটলি জীবন রে,
ও জীবন শুকনো পাটের দড়ি ।
চারজনেতে কান্ধে নিয়ে
বলবে হরি হরি জীবন রে ।”

 

লগিতে একটা ঠেলা দিয়ে ডিঙা নিয়ে নালার ভেতর ঢুকে গেল পরাণ।

 

বেলা বাড়ছে। জাল গুটিয়ে, মাছগুলিকে হাঁড়ির মধ্যে ভরে নিয়ে খামার মোড়ের দিকে রওনা দিল সে। ভেবেছিল নালার ভেতরের দিকে একবার ঢুকবে। কি মনে করে আর ঢুকল না। পরাণের কথায় তার মনটা কেমন হয়ে গেছিল। মনে হল তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে হবে।

 

নদীর ঘাট থেকে কিছুটা উপরে দুই গ্রামের মাঝে এই খামার মোড়। ছয় সাতখানি দোকান আছে এই মোড়ে। দুখানি মুদিখানা, তিনখানি চায়ের, একখানি পান বিড়ি সিগারেটের। সিগারেট সাধারণত থাকেনা। এই মোড়ে সিগারেট টানার লোক কোথায়। ঈদে, বকর ঈদে, পরবের সময় সিগারেট দু চার প্যাকেট আনে। ওই সময় কেরালা, চেন্নাই, মুম্বাই থেকে যুবকেরা ঘরে ফিরে। যে কটা দিন ঘরে থাকে, বেশ ফূর্তি করে তারা। তখন সিগারেট বিক্রি হয় খুব।

 

মোড়ের ডানদিকের গ্রামটির নাম কেস্টপুর। আর বাম দিকের নাম টিকলিচর। একসময় এই দুটো গ্রামই ছিল বর্ধিষ্ণু গ্রাম। গ্রামগুলোতে বাস করত অনেক ধনী কৃষক পরিবার। এক একজনের জমি ছিল চল্লিশ বিঘা, পঞ্চাশ বিঘা। ধান, কলাই, সরিষা, গম রাখার জন্য ছিল বড় বড় মাটির কুঁঠি। এক এক জনের দু জোড়া তিন জোড়া বলদ গোরু ছিল। গোরুর গাড়ি ছিল। অতিথিদের নিত্য আসা যাওয়া লেগেই থাকত। মেয়েরা সারাদিন ব্যস্ত থাকত অতিথি আর শ্রমিকের সেবায়। তখন পদ্মা এখানে ছিল না। ছিল অনেক দূরে, রাজসাহীর দিকে। তারপর গুটিগুটি পায়ে এদিকে এগিয়ে এল পদ্মা। ভাঙনে বাড়ি, ঘর, জমি, গোরু লাঙল সব গেল। মানুষ হল ছিন্নমূল। সবহারা মানুষ এক মুঠো ভাত আর কাজের আশায় কে কোথায় চলে গেল ভিটেমাটি ছেড়ে। যারা গেল, আর ফিরে এলনা। কেউ খবরও রাখলনা।

 

মোড়ের এক কোণে ছোট্ট গোল মতন ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে। বিকেল বেলায় পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে খেলে। সকালে হাট বসে। হাট বলতে সেরকম কিছু নয়। আশেপাশের দুটি গ্রাম থেকে কয়েকজন শহর থেকে জিনিষপত্র কিনে এনে বিক্রি করে। ক্রেতার সংখ্যা কম। তাই বিক্রেতার সংখ্যা আরও কম।

 

হাটের আর এক কোণে মাছের বাজার। জনা তিনেক লোক এখানে মাছ বিক্রি করে। তারমধ্যে একজন বুড়ি। বয়সটা সত্তর পঁচাত্তরের কাছাকাছি। মোড়ের সবাই ওকে মেছেনি বুড়ি বলে ডাকে।

 

আনসার সব মাছ মেছুনি বুড়ির কাছে বিক্রি করে দুশো টাকা পেল। সেই টাকায় দু কেজি আলু, তিন কেজি চাল, পাঁচশো তেল, আর কিছু সবজি নিয়ে রওনা দিল ঘরের দিকে।

 

ঘরে যখন পৌঁছল আনসার, দুপুর গড়িয়ে গেছে। ময়না বসে গাই গোরুর চারা কাটছে। বারান্দার মেঝেতে মাটিতে শুয়ে বুকপাড়া দিয়ে একা একা খেলা করছে কোলের শিশু বাচ্চা। গোটা শরীরে তার পেচ্ছাবের কাদা লেগে আছে।

 

আনসার ঘরে ঢুকতেই ময়না চারা কাটা বন্ধ করে উঠে এল। আনসারের হাত থেকে ব্যাগ হাতে নিয়ে গামছা এগিয়ে দিল। বাচ্চা শিশুকে কাদার উপর থেকে তুলে নিয়ে সেও গেল টিউবওয়েলতলার দিকে। বাচ্চাকে স্নান করিয়ে খেতে দিবে। অনেক বেলা করে আনসার এসেছে। তাকেও খেতে দিতে হবে।

 

পদ্মা দর্শনের প্রথম দিনের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে সফর আলির। কী প্রচণ্ড ভয়ঙ্কর চেহারা ! কী ভয়ানক তার রূপ ! বিশাল ব্যাপ্তি! যতদূর চোখ যায় শুধুই জল আর জল। যেন একটা বিশাল বড় সমুদ্র হঠাৎ করেই চোখের সামনে হাজির হয়েছে। ঢেউয়ের পর ঢেউ। ঝিলমিল ঝিলমিল সেই ঢেউয়ের মাথায় সাদা সাদা ফেনা। 

 

•৮•

রাত দশটার কাছাকাছি। চেম্বার বন্ধ করে সফর আলি রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় এসে বসল। প্রতিদিন এই সময় গল্পের বই নিয়ে বসে সে। উপন্যাসের বই বেশি। শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ পড়া হয়ে গেছে। এখন ঠিক কিছু নেই। মাঝে মাঝে শহরে যায়, মনের মতো কিছু বই কিনে নিয়ে আসে। রাতে খেয়ে ঘন্টা খানেক বইয়ের পাতা উলোটপালোট করে। তারপর একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। এটা সফর আলির প্রতিদিনের অভ্যাস। যেদিন কাজের চাপে বই ছুঁতে পায়না, সেদিন তার মনে হয় জীবন থেকে আজ একটা কিছু ছুটে গেল।

 

আজও সফর আলি বই হাতে বিছানায় বালিশ বুকে নিয়ে শোবার চেষ্টা করল। কিন্তু বই এ মন বসাতে পারলনা কিছুতেই। বই পাশে রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ঘুম এলনা।

 

অন্য দিন এরকম হলে বিছানা ছেড়ে উঠে যায় সফর আলি। পদ্মার পাড়ে অনেক্ষণ বসে থাকে। বসে বসে কত কী ভাবে। নিজের কথা, গ্রামের কথা, আব্বার কথা, ভাঙনে গোটা গ্রাম তলিয়ে যাবার কথা। আব্বার মুখ থেকে শোনা নানা কথা। সব কথা একসাথে এসে তার মাথায় এসে ভর করে। ভাবতে ভাবতে অনেক রাত হয়ে যায়। তারপর একসময় উঠে আসে সফর আলি। নীরবে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। একথা সেকথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুম যায়। সেদিন ঘুম ভাঙে কখনও মায়ের ডাকে, কখনও রোগীর আত্মীয়ের ডাকাডাকিতে।

 

আজও সফর আলি দরজা টেনে দিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ধীর পায়ে হেঁটে পদ্মার পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল সে। পদ্মা এখানে কিছুটা সরু। কিন্তু, ওই পারের তীর অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই বিস্তৃত তীরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন চাঁদের আবছা আলোয় রহস্যময় হয়ে উঠেছে। আলো আঁধারির আবছা পথে টর্চ হাতে করে কারা যেন হেঁটে যাচ্ছে। সফর আলি দাঁড়িয়ে একবার সেদিকে তাকাল। দেখল, দুজন বয়স্ক লোক আর একজন মহিলা হেঁটে দক্ষিণের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু, কাউকেই চিনতে পারল না।

 

পদ্মার পাড়ে বসল সফর আলি। ওপারে রাজশাহীর দিক থেকে আলো ছিটকে আসছে এপারে। সফর আলির মনে পড়ে গেল, অনেক বছর আগে বাবার সাথে কী একটা কাজে রাজসাহী গিয়েছিল সে। তখন পদ্মা এত কাছে ছিলনা। পদ্মা ছিল ওপারে, বাংলাদেশের ভেতরে, রাজশাহীর কোল বরাবর। বর্ডার পার হয়ে পদ্মা দেখতে যেতে হত। তখন বর্ডারে কাঁটাতার ছিল না। ভাঙনে তখন গ্রামও ধ্বংস হয়নি। ইচ্ছে করলেই তখন ওপারে যাওয়া যেত। এপারের পুলিশও কিছু বলত না। ওপারের বি ডি আরও ধরত না। সে ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা।

 

তখন সফর আলির বয়স আর কত হবে! দশ বারো বছর। তারা যাত্রা শুরু করেছিল পায়ে হেঁটে। গোফুর আলি আগে আগে। সফর আলি পেছন পেছন। মাঠ তখন সবুজ ফসলে ঘেরা। কোথাও ছোট ছোট ধান, কোথাও ছোট পাট। মাঠে নির্দিষ্ট কোনও রাস্তা নেই। কোন রাস্তা দিয়ে কোনদিকে যেতে হবে তাও জানা নেই। শুধু ওপারে পদ্মার পাড়ে একটা উঁচু টাওয়ার দেখা যাচ্ছিল। আব্বার মুখে শুনেছিল ওটা ওয়াচ টাওয়ার। সেই ওয়াচ টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে সোজা হেঁটে যাওয়া। কতক্ষণ হাঁটতে হয়েছিল মনে নেই সফর আলির। তবে এটুকু মনে আছে – হেঁটে হেঁটে পা ফুলে গিয়েছিল তার। তেষ্টা পেয়েছিল খুব। প্রায় ঘন্টা খানেক হেঁটে যাবার পর ওয়াচ টাওয়ারের কাছে পৌছেছিল তারা। অবাক বিস্ময়ে সফর আলি তাকিয়ে দেখেছিল সামনে কী বিশাল বড় নদী! এপার থেকে ওপার দেখা যায়না। শুধু জল আর জল। নদীর পাড়ে অনেক বড় বড় নৌকা ভিড়ে আছে। নদীর দিকে তাকিয়ে গোফুর আলি বলেছিল, “এই দ্যাখরে সফর। এটা পদ্মা নদী!”

 

সেটাই ছিল সফর আলির প্রথম পদ্মা দেখা।

 

পদ্মা দর্শনের প্রথম দিনের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে সফর আলির। কী প্রচণ্ড ভয়ঙ্কর তার চেহারা! কী ভয়ানক তার রূপ! কী বিশাল তার ব্যাপ্তি! যতদূর চোখ যায় শুধুই জল আর জল। যেন একটা বিশাল বড় সমুদ্র হঠাৎ করেই চোখের সামনে হাজির হয়েছে। ঢেউয়ের পর ঢেউ। ঝিলমিল ঝিলমিল সেই ঢেউয়ের মাথায় সাদা সাদা ফেনা। সফর আলির চোখের সামনে হঠাৎ করেই কে যেন সেদিন একটা আলাদা জগতের দরজা খুলে দিয়েছিল। তারপরও সফর আলি বেশ কয়েকবার পদ্মা দেখতে গিয়েছিল। কিন্তু প্রথম দিনের পদ্মা দেখার অভিজ্ঞতার কথা সে ভুলতে পারেনা। পদ্মার বিশালতা সফর আলির মনে একটা আলাদা অনুভূতি এনে দিত। সেই পদ্মা যে একদিন রাক্ষসী হয়ে তাদের বাড়ি খেয়ে নিবে কে জানত। পদ্মা আব্বাকে খেয়েছে। দাদাকে খেয়েছে। ঘর-বাড়ি, জমি-জমা খেয়েছে। আর আজ আবার বাড়ির সামনে দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে আছে। এখন সে কত শান্ত, কত নীরব। যেন সে কিছুই জানে না, কিছুই বোঝে না।

 

পাড়ে বসে সফর আলি পদ্মার দিকে তাকিয়ে থাকে। মৃদুমন্দ শীতল হাওয়া উঠেছে। সেই হাওয়াতে নদীর জলে ঢেউ উঠছে। ছোট ছোট ঢেউ। ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আছড়ে পড়ছে নদীর তীরে, নদীর তীরে বেঁধে রাখা নৌকার গায়ে, পড়ে থাকা একটা ভাঙা গাছের গুঁড়ির উপর। সেই ছলাৎ ছলাৎ শব্দের সুর ধীরে ধীরে নদীর কিনারা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে আশেপাশের খোলা প্রান্তরে। ধীরে ধীরে সেই সুরের সাথে মিলে মিশে যাচ্ছে একটা হিস হিস সুর। ছলাৎ ছলাৎ তরঙ্গ আর হিস হিস একসময় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তারপর একসময় তীরের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হারিয়ে যায়। আশেপাশের মাঠ ঘাট, খোলা প্রান্তর, আকাশে বাতাস থেকে ধ্বনিত হতে থাকে হিস-হিস, হিস-হিস। আর তখনই সফর আলির ভেতরটা কেঁপে ওঠে। শরীরে হঠাৎ করেই একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে যায়। পদ্মার দিক থেকে চোখ ফেরায় সফর আলি। দুরে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো আঁধারির আবছায়াতে গোটা মাঠ চুপ করে নীরবে শুয়ে আছে। কোথাও কোনও ব্যস্ততা নেই, চঞ্চলতা নেই। কেবল একমুঠো বাতাস প্রবল দীর্ঘশ্বাসের মতো মাঝে মাঝে জোরে ধেয়ে আসছে আর দক্ষিণ থেকে উত্তর-পূর্বে ছুটে যাচ্ছে। আর গোটা মাঠের বুক থেকে একটা নীরব কান্না হিস হিস শব্দে ছড়িয়ে পড়ছে গোটা মাঠে, নদীর ধারে, জলে।  সফর আলি এই শব্দকে চিনে। জানে। তার মনে হল শান্ত নীরবে ঘুমিয়ে থাকা গ্রামটির মাথার উপর কে যেন ফণা তুলে জিভ বের করে হিস হিস শব্দ করছে।

 

হঠাৎ করেই সফর আলি নদীর জলের মধ্যে দেখতে পেল একটা অদ্ভূত ক্রুর হাসি। সেই হাসিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে পদ্মার সেই রাক্ষসী মূর্তি। যে মূর্তির সামনে একদিন অত্যন্ত অসহায়ভাবে নিজেকে সমর্পণ করেছিল তার আব্বাজান গোফুর আলি। তার বড় ভাই জামসেদ।

 

আর বসে থাকতে পারলনা সফর আলি। পদ্মার পাড় থেকে উঠে এল সে।

 

ঘরে ফেরার পথে ডানদিকে মোড় নিয়ে মিনিট খানেক গেলেই রূপসীদের ঘর। কী মনে করে সফর আলি ডানদিকে মোড় নিল। কয়েক পা এগিয়েই সামনে পড়ল রূপসীদের মাটি আর টাটি দিয়ে তৈরি করা ছোট্ট কুঁড়েঘর। চাঁদের আলো সোজাসুজি এসে পড়েছে ঘরের উঠোনে। জানালা খোলা। সফর আলি স্পষ্ট দেখতে পেল, সেই খোলা জানালায় অস্পষ্ট একটা নারী মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো সে এদিকেই তাকিয়ে আছে।

 

সফর আলি আর বেশি এগোল না। পেছন ফিরে ঘরের দিকে মোড় নিল। ঘরে গিয়ে দেখল ঘড়ির কাঁটা রাত একটার ঘর ছুঁই ছুঁই করছে। ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল সফর আলি।

 
ক্রমশ…

আরো পড়ুন : চর (তৃতীয় পর্ব)

চর >।পর্ব ৩।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!