Advertisement
  • কে | রি | য়া | র-ক্যা | ম্পা | স ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ১৪, ২০২৪

ধারাবাহিক আত্মকথা।পর্ব-৩৬ : আমাদের বিদ্যানিকেতন

জাকির হোছেন্
ধারাবাহিক আত্মকথা।পর্ব-৩৬ : আমাদের বিদ্যানিকেতন

১৭৮০। ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতায় গড়ে তুললেন মাদ্রাসা এ আলিয়া যা পরে কলকাতা মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিতি পায়


আমিত্বহীনতার বৃত্তান্ত

 
শিক্ষা প্রসারের লাগাতার প্রয়াস , অন্যান্য সাংগঠনিক কর্ম আর সমগোত্রীয় ভাবনাচিন্তার প্রেক্ষাপটের কাহিনি বলতে বলতে এন.ই.এফের স্থপতি ও শিক্ষাব্রতী বললেন, সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে, অযোধ্যার বাবরি ধ্বংসের প্রলয় কান্ড ও অন্যান্য ঘটনায় কী কী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল মহা-ভারত জুড়ে, কোন সুরচিত কৌশলে ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে ইতিবাচক অভিপ্রায়কে ছুঁয়ে , প্রান্তিকের অন্ধকারে আলো ছড়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল সামাজিক নেতৃত্ব ?  স্যার সৈয়দ আহমেদের উদ্যোগে আলীগড়ে সূচিত হল অ্যাংলো মহামেডান ওরিয়েন্টাল কলেজ, নবাব আবদুল লতিফের প্রবল আগ্রহে ক্যালকাটা মাদ্রাসা । আর তাতে কোন পথ অবলম্বন করে ইংরেজি পঠন-পাঠন থেকে দূরে অবস্থানকারী, অনুশাসিত নিম্নবর্গ ? এসব প্রশ্ন উসকে দিয়ে নিজেই ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উত্তর খুঁজেছেন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপসহীন শিক্ষাদরদী । তাঁর বিশ্লেষণে কি উঠে এল সাম্প্রতিকতার সুখ-অসুখ ?
 
সম্পাদক। ১৪.০৭.২০২৪
 

• পর্ব-৩৬ •

ভারতীয় সমাজ আর রাজনীতির জটিল সন্ধিক্ষনে, ১৯৯৩ সালে, আমরা ন্যাশনাল এডুকেশন ফাউন্ডেশন (এনইএফ) তৈরি করি।সামাজিক অভিপ্রায়কে সামনে রেখে। একার উদ্যোগে নয়, বহুজনের মত ও ইচ্ছাকে সঙ্গে নিয়ে।
 
সমাজে , রাজনীতিতে তখন নানা পরিবর্তন দেখা দিচ্ছিল। ১৯৮৫ সালে, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকান্ডের পর তৈরি হল উদ্ভট পরিস্থিতি। সহানুভূতি ভোটে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতাসহ ক্ষমতায় এলেন রাজীব গান্ধী। তাঁর আমলেই সমাজের বড় অংশ ধর্মীয় পুনরুত্থানের স্বপ্ন দেখতে থাকে। অযোধ্যার ঐতিহাসিক সৌধ বাবরি মসজিদের দরজা খুলে দিয়ে উপাসনা চালু করার আব্দার জানায় সাধু সন্তদের ঐক্যশক্তি,একপেশে ভারত-নির্মাণের দাবিদারদের রাজনীতি পেছন থেকে তাদের মদত যোগায়। বীরবাহাদুর সিং তখন উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সহযোগিতায় বিতর্কিত বাবরি মসজিদে পূজা- অর্চনার অনুমতি দিয়ে বসল কেন্দ্র। একই সঙ্গে সন্তোষ ও অসন্তোষ প্রকট হয়ে ওঠে।সুপ্রিম কোর্টে শাহ বানু মামলার রায় নিয়ে এমনিতেই ক্ষোভে ফুঁসছিল সমাজের একাংশ। বাবরি মসজিদে পুজো পাঠের রাষ্ট্রীয় অনুমোদন তাদের আরো ক্ষেপিয়ে তোলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে শাহবানু মামলার রায়কে ডিঙ্গিয়ে মুসলিম মহিলা বিল পাস করিয়ে নেন রাজীব। এ বিল দ্রুত আইনে পরিণত হল । কিন্ত সামাজিক নেতৃত্বের কোনো অংশকে খুশি করতে পারল না। একাংশ ভাবলেন, প্রচলিত শরিয়তি আইনে হস্তক্ষেপ করেছে কেন্দ্র। সংখ্যাগুরু সমাজ ভাবল, তোষণ নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে কংগ্রেস সরকার। মুসলিম মহিলা আইন চালু হলেও, সর্বত্র তার প্রয়োগ সম্ভব হল না। ফায়দা তুলতে শুরু করল উভয় পক্ষের সাম্প্রদায়িকতা আর মৌলবাদ। অস্বস্তি বাড়ল রাজীবের। ইতিমধ্যে সেকুলার-অসেকুলার রাজনীতি কংগ্রেসকে গদিচ্যুত করতে মরিয়া হয়ে উঠল। বোফর্সকে ইস্যু করল। অভিযোগ তুলল, অস্ত্র কিনতে গিয়ে উৎকোচ নিয়েছেন রাজীব। অভিযোগে গলা মেলাল গো বলয়ের রাজনীতি। বিজেপির তখনো সর্বভারতীয় গ্রহনযোগ্যতা তৈরি হয়নি । তাঁদের নেতারাও তলে তলে সুযোগ খুঁজছিলেন। পুনর্গঠিত হল জনতা দল। জনতার নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন নিষ্কলঙ্ক মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং, ভোটে জিতলেন সম্মেলিত বিরোধীরা।প্রধানমন্ত্রী হলেন বিশ্বনাথ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাশ্মীরের মুফতি মহম্মদ সৈয়দ। সংরক্ষণ ইস্যুতে ফাটল ধরল মিলিঝুলি সরকারে। অভিমানে পদত্যাগ করলেন প্রধানমন্ত্রী। পরপর তাঁর শূণ্য আসনে বসলেন চন্দ্রশেখর, আই কে গুজরাল ।  পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হল জ্যোতি বসুকে।তাঁর দল রাজি হলনা, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার মতো মানুষ নন প্রজ্ঞাবান আর প্রবল ব্যক্তিত্বময় জ্যোতিবাবু। সম্মেলিত ঐক্য জোট বেছে নিল কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী দেবগৌড়াকে। সরকার বেশিদিন টিকল না। দেশের নানা প্রান্তে উগ্রতা বাড়িয়ে তুলল সন্ত্রাসবাদীরা। কাশ্মীরে বরফ-চাপা আগুনকে প্ররোচিত করল জেকেএলএফ। ১৯৯৩ সালের শীতে তারা অপহরণ করল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মেয়ে রাবেয়া সৈয়দকে। পাকিস্তানের উস্কানিতে। অসমে জ্বলে উঠল ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট (আলফা)। আপার অসম কার্যত তাদের দখলে ।কেন্দ্র রাজ্য সরকার অসহায়। আলফার নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সরকারের ওপর কঠোর চাপ তৈরি হল গো বলয়ে, আলফা দমনে সংঘটিত হল সেনা অভিযান, অপারেশন রাইনো। তবু আলফাকে থামানো গেল না । পালিয়ে গেল তাদের একাংশ ,বাংলাদেশে ।
 
দক্ষিণেও অশান্তি। সিংহল থেকে আগত তামিল উগ্রপন্থীরা সামাজিক ভিত খুঁজে পেল। ১৯৯১ সালে, নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে, তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুমবুদুরে এলটিটিই উগ্রপন্থীদের পাঠানো মানববোমায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেন রাজীব গান্ধী। সহানুভূতি ভোটে, ১৯৯১ সালেই ক্ষমতায় ফিরল কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিংহ রাও। পন্ডিত ব্যক্তি। কিন্ত স্থিতিহীনতার আবর্তে যতটা কঠোর হওয়া দরকার, হতে পারলেন না। করসেবকরা ১৯৯২ সালের ৬ডিসেম্বর অযোধ্যায় ঐতিহাসিক বাবরির সৌধ গুঁড়িয়ে দিল। সামাজিক উত্তেজনা বেড়ে গেল আরো । দাউদ ইব্রাহিমের গ্যাং একদিনে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রক্তাক্ত করে দিল মুম্বাইকে। বাবরি ধ্বংসের পরিণামে, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে মারা গেলেন অন্তত ১০ হাজার মানুষ। দিল্লিতেও আঁচ পড়ল ক্ষমতার রদবদলে।
 

স্যার সৈয়দ আহমেদ খান

দুর্বোধ্য, রহস্যময় পরিস্থিতি। প্রান্তিক, পীড়িত সমাজের সমমনস্ক নেতৃত্ব অনুধাবন করল যে, সঙ্ঘাত নয়, প্রত্যাঘাত নয়, উন্মাদনা আর অসহিষ্ণুতার কবল থেকে মুক্তির পথ একমাত্র প্রান্তিক সমাজের শিক্ষাবিস্তার। পাশাপাশি সংগঠিত ব্যবসা। এই নিঃশব্দ উচ্চারণে সাড়া দিল ভারতের চতুষ্কোণ।
 

বাবরি কান্ডের পর বিভিন্ন সমাজের স্বচ্ছ আর কল্যাণমুখী নেতারা ঠিক একইভাবে বুঝতে পারলেন, সর্বস্তরে শিক্ষার বিস্তার অপরিহার্য। এতে দেশ বাঁচবে, ঘৃণার রাজনীতি প্রকাশ্যে মাথা তোলার সুযোগ পাবে না। সৎ দেশপ্রেমিকরা সমাজের শিক্ষিত প্রতিনিধিরা রুখে দেবেন অভ্যন্তরীণ যাবতীয় চক্রান্ত, দেশদ্রোহিতা; সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, যারা সমাজের গোষ্ঠী সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি করে, ঘৃণা, বৈরিতাকে প্রশ্রয় দেয়, উসকানি যোগায় সাম্প্রদায়িকতাবোধে, এরা দেশপ্রেমিক নয়, দেশদ্রোহী

 
আমরাও নবজাগৃতির তাগিদ অনুভব করি । সুপরিকল্পিত নীতি আর আপোসহীন ঐকান্তিক নিয়ে, এন ই এফ তৈরি করে শিক্ষা- প্রসারে মনোযোগ দিই। ভাবতে থাকি, শিক্ষা আর ব্যবসা সমাজকে পথ দেখাবে। কেবল ভাবনাচিন্তা নয়, অন্তঃস্রোতা ভাবাবেগকে যুক্তিময়, ব্যবহারযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টা শুরু হল। ভারতের সমাজ পরিবর্তনের ধারা উপধারা আমাদের সহায়ক হয়ে ওঠে।
 

ব্রিটিশ ভারতের প্রথম সরকারি শিক্ষাকেন্দ্র ‘ক্যালকাটা মাদ্রাসা

যে সমাজ সিপাহী বিদ্রোহকে (১৮৫৭-১৮৫৮) ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংঘাতের রাস্তা হিসেবে বেছে নিয়েছিল,তারই নেতারা বিদ্রোহের প্রলয়কান্ডের পর বুঝতে পারলেন, সংঘাত এড়িয়ে আধুনিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে । গড়তে হবে শিক্ষানিকেতন। এ কাজে এগিয়ে এলেন দুরদ্রষ্টা স্যার সৈয়দ আহমেদ। সমাজের বহুরকমের প্রতিবন্ধকতা আর অপবাদ অতিক্রম করে ১৮৭৫ সালে আলিগড়ে গড়ে তোলেন অ্যাংলো মহামেডান ওরিয়েন্টাল কলেজ। সামাজিক ক্ষোভ প্রশমিত করতে কলকাতায় গড়ে তোলা হল ব্রিটিশ ভারতের প্রথম সরকারি শিক্ষাকেন্দ্র ‘ক্যালকাটা মাদ্রাসা।’ নবাব আব্দুল লতিফের মতো ব্রিটিশপন্থী নেতাও জোর দিলেন আধুনিক শিক্ষার ওপর। সিপাহি বিদ্রোহে পরাজয়ের গ্লানি থেকে এভাবে ইতিবাচক শিক্ষা গ্রহণ করল সমাজ। ধীরে ধীরে তার পাশে দাঁড়াল। আলিগড়েই গড়ে ওঠে অ্যাংলো মহামেডান ওরিয়েন্টাল কলেজ, যেখানে আধুনিক শিক্ষারীতির সঙ্গে পুরনো বিদ্যারীতির সমন্বয় তৈরি হয়। স্যার আহমেদ রাষ্ট্রের সঙ্গে আঁতাতে বিশ্বাস করতেন, মঙ্গলবোধ তাঁর চিন্তা তাঁর জীবনবোধের অবিচ্ছেদ্য উৎস।
 

১৮৭৫ সালে আলিগড়ে গড়ে তোলেন অ্যাংলো মহামেডান ওরিয়েন্টাল কলেজ

বাবরি কান্ডের পর বিভিন্ন সমাজের স্বচ্ছ আর কল্যাণমুখী নেতারা ঠিক একইভাবে বুঝতে পারলেন, সর্বস্তরে শিক্ষার বিস্তার অপরিহার্য। এতে দেশ বাঁচবে, ঘৃণার রাজনীতি প্রকাশ্যে মাথা তোলার সুযোগ পাবে না। সৎ দেশপ্রেমিকরা সমাজের শিক্ষিত প্রতিনিধিরা রুখে দেবেন অভ্যন্তরীণ যাবতীয় চক্রান্ত, দেশদ্রোহিতা; সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, যারা সমাজের গোষ্ঠী সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি করে, ঘৃণা, বৈরিতাকে প্রশ্রয় দেয়, উসকানি যোগায় সাম্প্রদায়িকতাবোধে, এরা দেশপ্রেমিক নয়, দেশদ্রোহী।
 
শ্রীমতী গান্ধীর হত্যাকান্ডের পর থেকে বাবরি ধ্বংস পর্যন্ত এরকম দেশদ্রোহীদের উত্থানে বারবার কেঁপে উঠেছে ভারতাত্মা। আবার এ কম্পন থামিয়ে , শিক্ষায়ণের গতি বাড়িয়ে আবহমানের মহা’ভারতই ঘৃণাকে কবরস্থ করতে জেগে উঠেছে বারবার। তৈরি করছে সাংগঠনিক নেতৃত্ব। এনইএফ আওতায় নির্মিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আমরা এই ধরনের নেতৃত্বের হাতে হাত রেখেছি। আমাদের অঙ্গীকার, প্রেমময় ভারতের সূর্যমুখী শ্রীবৃদ্ধি।
 

♦•·——·•♦♦•·——·•♦♦•·——·•♦

ক্রমশ…

 

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦

লেখক: উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম বেসরকারি কলেজ গোষ্ঠী এন.ই.এফ-এর চেয়ারম্যান। গুয়াহাটির বাসিন্দা
 
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব-৩৫

ধারাবাহিক আত্মকথা : আমাদের বিদ্যানিকেতন


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!