- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- অক্টোবর ২৬, ২০২৫
ভেতরে মা ভূমি
মা ভূমির শ্যুটিং-এ মঙ্গলপার্থির পথে । সুরেশ, গৌতম ঘোষ, ভি রভিন্দ্রনাথ,, বি নরসিং রাও, ভূপাল রাও, বিজয় প্রকাশ, মোহন কোতাত এবং নীলাঞ্জনা ঘোষ
গৌতম ঘোষ-এর বহুত্বমাত্রিকতা সর্বজনবিদিত। তাঁর উত্তরাধিকার, তাঁর অঙ্গীকার এবং পূর্বগামী চলচিত্রকারদের ঐতিহ্যের বিস্তারে তাঁর আপোসহীনতা— যুক্তির সঙ্গে বিবেক আর ভাবাবেগের সংযোগ অবাক করে দেয় আমাদের।
আচমকা মহাজগতের দ্যুতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেলেন গৌতমদার সহজিয়া জীবনসঙ্গী নীলাঞ্জনা। মৃত্যুর পরেও ব্যক্তি প্রতিভা হাসে, স্বপ্ন দেখায় এবং সঙ্কটে, আনন্দে স্বজন আর বন্ধুদের ভাবনা-চিন্তায় প্রেরণা যোগায়, নীলাঞ্জনা এরকমই এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে থাকবেন। গৌতম ঘোষের প্রস্তুতি পর্ব থেকে তাঁর আনুপূর্বিক উদ্ধারোহনে, তাঁর ক্রমাগত পরিমিতিতে সঙ্গ দিতেন নীলাঞ্জনা, এ শুধু সঙ্গ নয়, তাঁর চেয়েও বেশি, ‘শঙ্খচিল’-এর মতো সর্বক্ষণ, গৌতমদার সব কাজের ভেতরে আর বাইরে জড়িয়ে রাখতেন নিজেকে।
আরম্ভরও নিবিড় আত্মীয় ছিলেন নীলাঞ্জনা। বহুধরনের ব্যস্ততা সত্ত্বেও, অপ্রতিহত হরফে লিখে গেছেন, ‘আলো ছায়ায় গৌতম’। গৌতমদার নির্মাণ আর সৃষ্টি নিয়ে সে এক বুদ্ধিদীপ্ত, ধারাবাহিক রচনা। মৃত্যুহীন নীলাঞ্জনার হঠাৎ বিচ্ছেদে আমরা স্তম্ভিত। তাঁর দক্ষতার স্বরূপ, তাঁর বহুমুখী কারুকার্য বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে বেদনাসিক্ত আমরা-র অনুভব আর স্বজন-হারানো গম্ভীরকে। এ থেকে সহজমুক্তির পথ বেয়েই, আরম্ভ-য় প্রকাশিত নীলাঞ্জনার প্রথম লেখা, পুনর্মুদ্রণ করে খানিকটা স্বস্তিবোধ করছি। সঙ্গে থাকল, প্রয়াত বুটিক শিল্পীর স্মরণে, বাংলা কবিতার সুপুরুষ ফিরোজ চৌধুরীর বন্ধু-বিয়োগের মর্মধ্বনি ।বাহার উদ্দিন
২৬.১০.২০২৫
তেলেঙ্গানার নাল্লাগোন্ডা জেলার সিরিপুরম গ্রাম । সেখানে হাজার খানেক দরিদ্র কৃষকের বাস। ভিরাইয়ার ছেলে রামাইয়াও তাদের একজন। এই গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে সামন্ত প্রভুদের দ্বারা শোষিত। রামাইয়ার যখন ১০ বছর বয়স, সেই সময় তাকে জোর করে গ্রামের জমিদার জগন্নাথ রেড্ডির পশুখামারে কাজে লাগানো হল। শিশু মনে প্রশ্ন জাগে, সে কেন এই কাজ করবে । বাবাকে জিজ্ঞেস করে। ভিরাইয়া ছেলেকে উত্তর দেয়, আমরা গরিব কৃষক। সারা জীবন এইভাবেই আমাদের কাজ করে যেতে হবে । এটাই আমাদের নিয়তি। এখানেই এখানকার দরিদ্র কৃষকদের অবস্থা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। ১৯৭৯ সালে গৌতমের প্রথম কাহিনিচিত্র মা ভূমি শুরু হয় এইভাবেই। রামাইয়া এই সিনেমার নায়ক। ছবিটি নির্মিত হয় তেলুগু ভাষায়। তখন থেকে শুরু করে ২০২১-য় বাংলা কাহিনিচিত্র শূন্য অঙ্ক, এই দীর্ঘ সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের যে প্রক্রিয়া আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, তা খুবই মূল্যবান। অনেক স্মৃতি হয়ত হারিয়ে গেছে। তবু যা জমে আছে, তা বলে রাখা প্রয়োজন।
এটাই গৌতমের প্রথম কাহিনিচিত্র, ক্যামেরাম্যান হিসেবে কমল নায়েকের প্রথম ছবি, ভৈকুন্ঠমের শিল্প নির্দেশনা ও আমার পোশাক পরিকল্পনা করার অভিজ্ঞতাও প্রথম। এ ছাড়া চিত্রনাট্য রচনা, বিভিন্ন বিভাগের সহায়তায় যাঁরা ছিলেন তাঁরাও নবীন। সংগীতে ভিনজামুরি সীতা ও গৌতম। সংলাপে ছিলেন নরসিং রাও, ভি প্রাণ রাও। সম্পাদনায় ডি রাজগোপাল
মা ভূমির শুটিং হয় অন্দ্রপ্রদেশে। গৌতম এবং পার্থদা (কবি পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়) কলকাতায় কৃষণ চন্দরের উর্দু উপন্যাস যব খেত জাগে থেকে প্রথমে একটি বাংলা চিত্রনাটন তৈরি করেন। এর ঠিক পরে পরেই ওঁরা হায়দরাবাদে চলে যান। মা ভূমি-র পটভূমি তেলেঙ্গানা। স্বাধীনতার আগে নিজামের শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অন্ধ্রের বেশ কিছু জায়গায় মানুষ গর্জে ওঠেন, তাকে সমূলে উৎখাত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে জমিদাররা রাজনীতিতে যোগ দিয়ে আবার হারানো ক্ষমতা ফিরে পান। মানুষ আবারও তাদের দাসে পরিণত হয়। সেই সময় তেলেঙ্গানা আন্দোলনের কিছু নেতার সঙ্গে দেখা করে গৌতমরা নানা তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর চিত্রনাট্যটি পরিমার্জনা ও পরিবর্ধন করা হয় । প্রযোজক বি নরসিং রাও ও জি রভীন্দ্রনাথ এ ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতা করেছিলেন। নরসিং নিজেও নাগাইয়া নামে একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। আমি তখন এমএ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি । পরীক্ষার পর আমারও হায়দরাবাদ যাওয়ার কথা। সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করার জন্য। দারুণ রোমাঞ্চ মনের মধ্যে কাজ করছে। এটাই আমার প্রথম একা দূরপাল্লার যাত্রা। তখন হায়দরাবাদে ছোটোখাটো সাম্প্রদায়িক অশান্তি চলছে । ট্রেন পৌঁছোনোর কথা ছিল রাত সাড়ে আটটায়। পৌঁছোলো রাত দুটোয়। ট্রেন থেকে নেমেই শুনতে পেলাম, মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, যাত্রীরা কেউ স্টেশন থেকে বেরোবেন না। শহরে কারফিউ জারি হয়েছে। কী করব, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। ভেতর চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল, টের পেলাম। সেই সময় মিডিয়ার এত রমরমা ছিল না, মোবাইল ছিল না। তাই বাড়ির লোকজনের কাছে খবরটা পৌঁছে ছিল দেরিতে। কিছুক্ষণ পরেই একজন অপরিচিত মানুষ আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। কিছু বলার আগেই তিনি আমার নাম জানতে চাইলেন। তারপর বললেন, উনি আমাকে গৌতমদের ঠিকানায় নিয়ে যেতে এসেছেন। এত বড়ো শহরে একজন অপরিচিত লোকের সঙ্গে যেতে হবে ? ভেবেই মনটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। কী করব ? যাওয়াটা কী ঠিক হবে ? কিছুটা দ্বিধা নিয়েই তাঁর সঙ্গে রওনা হলাম। একটি টু-হুইলারের পিছনের সিটে সুটকেস আকড়ে বসে পড়লাম। অন্ধকার রাস্তায় শুধু পুলিশের গাড়ি আর সাইরেনের আওয়াজ। সমস্ত শহরটা যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। পরিস্থিতিটা এতটাই অপরিচিত যে সেই মুহূর্তে কী করা উচিত বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একটা বাড়ির সামনে এসে থামল স্কুটার। চারিদিকে গভীর অন্ধকার। আশেপাশে কোনও মানুষজন নেই । বাড়িতে ঢোকার পর দেখি, একটা মোমবাতির আলোয় ঘিরে গৌতমরা বসে আছে। পরদিন ধীরে ধীরে শহর শান্ত হলে আমরা চিকড়পল্লির একটা বাড়িতে গেলাম। ওটাই মা ভূমি-র অফিস এবং টিমের অস্থায়ী আস্তানা। রান্নাবান্নায় আমার কোনো পারদর্শিতা তখন ছিল না। আমাদের সাহায্য করার জন্য তেরো-চোদ্দো বছরের একটি ছেলে এল। নাম ভেঙ্কটেশ। তার অবস্থাও প্রায় আমার মতো। এর ওপর ভাষা সমস্যা। আমি এক বর্ণ তেলুগু জানি না। আর সে তেলুগু ছাড়া কিছু জানত না। সবাই মিলে ছবির কাজ আর বাড়ির নিত্যকর্ম মোটামুটি চালিয়ে নিতাম। ওখানেই গদর (গণসংগীত শিল্পী), ভারভারা রাও (কবি ও তাত্ত্বিক), চেরাবান্ডা রাজু (প্রখ্যাত কবি) সহ অন্ধপ্রদেশের বহু গুণীর সঙ্গে আলাপ হয়। গৌতম শুরু থেকেই ছবির বিষয় নির্বাচন নিয়ে খুবই সতর্ক। যে সিনেমাটা তৈরি করবে, তার যেন একটা সামাজিক বার্তা থাকে-এই বিষয়টা ওঁকে প্রথম থেকেই ভাবাত। মা ভূমি ব্যতিক্রম নয়। কীভাবে সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে ভূমিহীন কৃষকরা গর্জে ওঠে, ছবিতে তার খুব সুন্দর একটা চেহারা গৌতম ফুটিয়ে তোলে। সিনেমার শুরুতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কীভাবে খাজনা আদায় করছে এলাকার জমিদার জগন্নাথ রেড্ডি। অনাদায়ে লেঠেল দিয়ে মেরে শরীরের সমস্ত হাড় ভেঙে দেওয়ারও বিধান দেওয়া হচ্ছে। যাইহোক, শুটিং-এর কাজকর্ম শুরু হওয়ার আগে আমরা হায়দরাবাদে পাঞ্জাগুট্টার একটি বাড়িতে চলে যাই। সেখানে সকাল থেকে ছবির প্রস্তুতি শুরু হত। একই সঙ্গে বাড়িটিকে বাসযোগ্য করে রাখা আর খাবারের ব্যবস্থা করার দায়িত্বও আমাদের ছিল । গৌতম, আমি আর ভেঙ্কটেশ মিলে রান্না করতাম। ধীরে ধীরে আবিষ্কার করলাম, আমাদের ইউনিট মেম্বাররা ছাড়াও বেশ কিছু মানুষ দুপুরের খাবারের সময় চলে আসতেন । মানুষের ভালোবাসা প্রথম থেকেই আমরা পেয়েছি। পরিস্থিতির সঙ্গে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে পড়লাম। ছবিটির যে পটভূমি আর যে সংখ্যক চরিত্র সে তুলনায় আর্থিক সংগতি যথেষ্ট ছিল না। শুধু ছিল অদম্য জেদ আর কাজের প্রতি ভালোবাসা। অনেক কিছুই বেশ কষ্ট করে আমাদের করতে হয়েছিল । কিন্তু তার জন্য কোনও তিক্ততা বা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়নি। সকলে মিলে মনের আনন্দে কাজ করেছি। প্রযোজকদেরও ছবিটি তৈরি করার জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। একদিন রভি একটা বড়ো লক্ষ্মীর ভাঁড় নিয়ে এল। আমরা সবাই অবাক। ইতিমধ্যে আমাদের পরিবারের আয়তনও বেশ বড়ো হয়ে গেছে। রভি ভাঁড় ভেঙে টাকা ও খুচরো পয়সার হিসাব করল। সেদিন তা দিয়েই আমাদের বাজার হল।
একদিকে সিনেমার কাজের চাপ অন্যদিকে এতজন মানুষের খাবারের দায়িত্ব। মাঝে মাঝে আমরা বিরক্ত হয়ে যেতাম। হায়দরাবাদে সূর্যম নামে একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়েছিল। যাঁর জীবন নিয়ে বিখ্যাত চিত্রপরিচালক শ্যাম বেনেগাল অঙ্কুর ছবিটি তৈরি করেছিলেন। উনি শ্যাম বেনেগালের ছোটোবেলার বন্ধু। আমাদের বড়ো দাদার মতো। অভিযোগ, অনুযোগ আমরা সাধারণত তাঁর কাছেই করতাম। একদিন গৌতম নানা কারণে অধৈর্য্য হয়ে বলল, আমাদের এই বন্দি জীবন আর ভালো লাগছে না, আমরা চললাম। আমরা সূর্যমের কাছে চলে গেলাম। উনি আমাদের খুব আদরযত্ন করলেন, তাঁর চাইনিজ রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে খাওয়ালেন। আস্তে আস্তে আমাদের উত্তেজনা প্রশমিত হল। প্রযোজকরা ভালো করেই জানতেন, আমরা কোথায় যেতে পারি। কিছুক্ষণ পরে এসে নরসিং আমাদের ফেরত নিয়ে গেলেন। মা ইউনিটে সবার সঙ্গে সবার একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সাময়িক মনোমালিন্য কখনো দীর্ঘস্থায়ী হত না।
আমি, গৌতম, ভেঙ্কটেশ, মেকআপ ম্যান মিস্টার কুমার আর এখানকার প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী হি ভৈরন্টম, যিনি মা ভূমি-র শিল্প নির্দেশক এই অস্থায়ী আস্তানার বাসিন্দা। এছাড়া আরও অনেকেই আসতেন। যেহেতু দুপুরে ১৬ কতজন থাকবেন, জানা থাকত না, তাই অনেক সময়েই দেখা যেত তরকারি আর ডাল ছাড়া আমাদের আর কিছু অবশিষ্ট নেই। লক্ষ করলাম, অন্ধ্রপ্রদেশের রীতি আগে আমিষ, পরে অন্যান্য পদ খাওয়া। অভ্যস্ত হয়ে উঠতে বাধ্য হলাম। মা ভূমি-কিছুদিন আগে একই প্রযোজনায় মৃণালদা তেলুগু ভাষায় ‘ওকা উরি কথা’ তৈরি করেছিলেন। সেখানে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নারায়ণ রাও। ঠিক হয়েছিল, এই সিনেমার প্রোটাগোনিস্ট রামাইয়ার চরিত্রে উনিই অভিনয় করবেন। চরিত্রটি যথেষ্ট কঠিন। গ্রাম্য চরিত্র থেকে কারখানার মজদুর ও পরে বিপ্লবীতে রূপান্তর। শ্যুটিং-এর অল্প কিছুদিন আগে জানা গেল, বিশেষ কারণে উনি অভিনয় করতে পারছেন না। সকলের মাথায় হাত। একে অল্প সময় তার উপর এমন কঠিন চরিত্র। একদিন গৌতমের সহকারী মোহন একটি ছেলেকে নিয়ে আসে। ওর নাম টি সাঁইচাঁদ। প্রথিতযশা লেখক গোপীচাঁদের ছেলে। সিনেমার সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনও সম্পর্ক ওঁর ছিল না। ওঁকে কেন ডেকে আনা হয়েছে, সেটা সাঁইচাঁদ জানত না। অভিনয়ের কথা শুনে ভীষণ ঘাবড়ে গেল। যে খবরের কাগজটা পড়ছিল, তা দিয়েই মুখ ঢাকল। গৌতমরা অনেকক্ষণ ধরে ছবির বিষয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে ওঁর সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করল। শেষ অবধি সাঁইকে রাজি করানো গেল।
এটাই গৌতমের প্রথম কাহিনিচিত্র, ক্যামেরাম্যান হিসেবে কমল নায়েকের প্রথম ছবি, ভৈকুন্ঠমের শিল্প নির্দেশনা ও আমার পোশাক পরিকল্পনা করার অভিজ্ঞতাও প্রথম। এ ছাড়া চিত্রনাট্য রচনা, বিভিন্ন বিভাগের সহায়তায় যাঁরা ছিলেন তাঁরাও নবীন। সংগীতে ভিনজামুরি সীতা ও গৌতম। সংলাপে ছিলেন নরসিং রাও, ভি প্রাণ রাও। সম্পাদনায় ডি রাজগোপাল। তবে নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও সবার একটাই লক্ষ্য-ছবিটাকে ভালোভাবে বানাতে হবে। এত আনন্দ করে কাজ করার সুযোগও হয়ত খুব কমই পাওয়া যায়।
জগন্নাথ রেড্ডির ছেলে প্রতাপ রেড্ডি চল্লিশটা গ্রামের জমিদার। প্রায় দুহাজার একর জমির মালিক। নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য গ্রামবাসীদের উপর তাদের অত্যাচার বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে রামাইয়া বড়ো হতে থাকে। ক্রমশ সে এই পরিস্থিতিতে হাঁপিয়ে ওঠে । এক সময় গ্রাম ছেড়ে সূর্যাপেটে এক ব্যবসায়ীর কাছে কাজ করতে শুরু করে। এখানেই রামাইয়ার পরিচয় হয় ভেঙ্কাইয়ার সঙ্গে। সে এক মদ্যপ ভবঘুরে। অন্যদিকে মনিবের স্ত্রী ভাজরাম্মা রামাইয়াকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতে থাকে। রামাইয়া তাতে সাড়া না দিলে তার মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা কাজ করতে শুরু করে। ভেঙ্কাইয়া একদিন প্রমাইয়াকে জোর করে মদ্যপান করিয়ে নিষিদ্ধপল্লিতে নিয়ে যায়। এরপরেই সে সূর্যাপেট ছেড়ে হায়দরাবাদে চলে আসে। এখানে প্রথমে সে রিকশাচালকের কাজ নেয়। যদিও শারীরিক কারণে যা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পরে একটি কারখানায় কাজ করতে গিয়ে মকবুল নামে এক শ্রমিকনেতার সঙ্গে আলাপ হয় । মকবুল চরিত্রটি তৈরি হয়েছিল প্রখ্যাত উর্দু কবি মকবুল মহীউদ্দিনের ছায়া অবলম্বনে। তাঁর সাহচর্যেই রামাইয়া লেখাপড়া শেষে এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠে। একসময় কারখানায় লকআউট হয়। শ্রমিকবিক্ষোভে শামিল হওয়ায় তাকে জেলে যেতে হয় । জেল থেকে বেরিয়েই মকবুলের সঙ্গে দেখা করে রামাইয়া। মকবুলের সহযোগিতায় রমাইয়া অত্যাচারী জমিদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে । তার গ্রাম আল্লিপুরমের মানুষও তাঁকে সমর্থন জানায়।

শ্যুটিং-এ গ্রামবাসীদের সঙ্গে গৌতম ঘোষ, নরসিং রাও, ভূপাল রেড্ডি ও সাঁই চাঁদ
রামাইয়া এমন একটি চরিত্র যেখানে প্রতি পদে নিজেকে ভাঙতে হবে। সেখানে সাঁইয়ের মতো নতুন কাউকে নেওয়া যথেষ্ট ঝুঁকির কাজ ছিল। অবশ্য গৌতম সারাজীবনই এমন। মোটামুটি প্রস্তুতি শেষ করে আবার লোকেশনে যাওয়ার পালা। ইতিমধ্যে কিছু গ্রামে ঘুরে আর নানা স্থির চিত্র দেখে চরিত্রগুলোর চেহারা কেমন হবে, সে সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল। আমি যদিও সহকারী পরিচালকের কাজ করব বলে গিয়েছিলাম, কিন্তু গিয়ে দেখি পোশাক পরিচ্ছদের সয়িত্বে কেউ নেই । সে দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত হল। ঠিক হল নতুন পোশাক কিনে গ্রামবাসীদের সঙ্গে সেগুলি পালটে নেব যাতে চরিত্রগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা যায়।
যুদ্ধের মুহূর্তগুলিকে শুট করার জন্য আমাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হল। আমি আর পার্থদা একটা গাছের নিচে বসে গাইড ট্র্যাক রেকর্ড করছিলাম। ক্যামেরা চালু হতেই গ্রামবাসীরা প্রবল উৎসাহে লড়াই শুরু করলেন। দেখতে দেখতে জায়গাটা একটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হল যে সবাই ভয় পেয়ে যাই। অনেকে আহতও হয়েছিলেন। গ্রামের বৃদ্ধ মুখিয়া বলেছিলেন, গ্রামে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময়েও এত মানুষ আহত হননি
এবার আমাদের গন্তব্য মঙ্গলপার্থি। আমরা কয়েকজন মিলে, মিনিট্রাকে রওনা হলাম। গ্রামটি রত্ন থেকে বেশ কিছুটা ভিতরে। বর্ষায় পথ আরও দুর্গম। এত ছোটো গ্রামে ইউনিটের প্রায় ষাট জনের থাকার ব্যবস্থা করাও খুব কঠিন। একটি স্কুলবাড়ির দু-তিনটি ঘরে মেঝেতে সতরঞ্চি বিছিয়ে থাকার বন্দোবস্ত হল। নরসিং-এর এক শ্যালক ওই গ্রামের সরপঞ্চ। তাঁর বাড়িতেই বয়স্ক অভিনেতা আর তিলাদের থাকার ব্যবস্থা । কলাকুশলীদের মধ্যে আমিই একমাত্র মহিলা।
নিজের দায়িত্ব নিয়ে আমি খুবই উত্তেজিত। সকালবেলায় নিজেই কিছু নতুন জামাকাপড় নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। ভাষা জানা না থাকায় ইশারায় গ্রামের মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করি আমার উদ্দেশ্য। অচেনা এক মহিলাকে এরকম ইশারা করতে দেখে তারা উলটো দিকে হাঁটা দিল। হতাশ হয়ে ঘরে ফিরে এলাম। পরে অবশ্য স্থানীয় লোকেদের সাহায্যে পোশাক জোগাড় হল। একটি দৃশ্য ছিল, যেখানে রাজাকারদেরসঙ্গে গ্রামবাসীর মুখোমুখি লড়াই হবে। অভিনেতারাও প্রায় সবাই নতুন। রামাইয়া আল্লিপুরম গ্রামের মানুষদের নিয়ে একসময় জমিদারের দুর্গ দখল করে চাষিদের মধ্যে জমি বিলি করে দেয়। কিন্তু ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে জমিদাররা রাজনীতিতে যোগ দিয়ে পুনরায় ক্ষমতা দখল করে নেয়। শেষে গ্রামে ভারতীয় সেনা ঢুকে বিদ্রোহীদের ঘিরে ফেলে। রামাইয়া সেনার সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় মারা যায়। যুদ্ধের মুহূর্তগুলিকে শুট করার জন্য আমাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হল। আমি আর পার্থদা একটা গাছের নিচে বসে গাইড ট্র্যাক রেকর্ড করছিলাম। ক্যামেরা চালু হতেই গ্রামবাসীরা প্রবল উৎসাহে লড়াই শুরু করলেন। দেখতে দেখতে জায়গাটা একটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হল যে সবাই ভয় পেয়ে যাই। অনেকে আহতও হয়েছিলেন। গ্রামের বৃদ্ধ মুখিয়া বলেছিলেন, গ্রামে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময়েও এত মানুষ আহত হননি। এইভাবে নানা বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে শ্যুটিং চলতে থাকে।
জমিদার বাড়ির শ্যুটিং-এর জন্য আমরা দন্তি গ্রামে যাই। ওখানে একটা গেস্ট হাউসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়। একদিন শুটিং শেষ করে ফিরতে রাত হয়ে গেল। গেস্ট হাউসে পৌঁছে দেখি ইউনিটের লোকজন সব রাস্তায় বসে আছেন। কী ব্যাপার। জমিদার নাকি জানতে পেরেছেন, তাদের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের আন্দোলনকে নিয়েই তৈরি হচ্ছে এই ছবি। তাই তিনি এখানে আর শ্যুটিং করতে দেবেন না। অনেক কষ্টে পরের দিন গেস্ট হাউসে থাকার অনুমতি পেলেও শ্যুটিং বন্ধ। গ্রামবাসীদের সলো আলোচনায় বসলাম আমরা। ঠিক হল ফিলমি কায়দায় আক্রমণ করা হবে জমিদার বাড়িতে। সাতসকালে দলের একজন পাঁচিল টপকে ঢুকে দালানের সদর দরজা খুলে দিল। গ্রামবাসীরা হুড়মুড় করে বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। যেন সত্যি সত্যি তারা জমিদারের ওপর হামলা করেছেন। অতর্কিত হামলায় বাড়ির লোকজনও ঘাবড়ে গেছেন। গৌতম তৎক্ষণাৎ ক্যামেরাবন্দি করল শটটি। এমনই বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে শুটিং শেষ হল।
মা-ভূমি-র মুক্তির দিন ভয়ে সিনেমা হলে ঢুকিনি। গভীর উৎকণ্ঠায় একটা চায়ের দোকানে বসে আছি। হঠাৎ আমাদের বন্ধু গোপী এসে খবর দিল যে দর্শক ছবিটিকে সার্বিকভাবে গ্রহণ করেছেন এবং হলে হাততালি পড়ছে। আমরা সবাই আনন্দে হইচই শুরু করলাম। এই ছবি সাধারণ মানুষ এমন ভাবে গ্রহণ করবেন আমরা ভাবতেও পারিনি। গরুর গাড়ি করে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ হলে ছবিটা দেখতে আসতে লাগলেন
সাদাকালো ছবির কিছু সুবিধা আছে। জমিদার বাড়ির একটি ঘরের দরজার জন্য পর্দা দরকার ছিল। কিন্তু গ্রামে সেসব পাব কোথায় । আমার একটা শাড়িকে সেলাই করে পর্দা বানিয়ে ফেলি। রঙিন ছবিতে যেটা কখনওই সম্ভব ছিল না।
শ্যুটিং -পরবর্তী বেশিরভাগ কাজই হায়দরাবাদে হয়। মা-ভূমি-র মুক্তির দিন অর্থাৎ ১৯৮০-র ২৩ মার্চ, ভয়ে সিনেমা হলে ঢুকিনি। গভীর উৎকণ্ঠায় একটা চায়ের দোকানে বসে আছি। হঠাৎ আমাদের বন্ধু মোহনের ভাই গোপী এসে খবর দিল যে দর্শক ছবিটিকে সার্বিকভাবে গ্রহণ করেছেন এবং হলে হাততালি পড়ছে। আমরা সবাই আনন্দে হইচই শুরু করলাম। তখন প্রায় সব তেলুগু ছবিতেই হয় পৌরাণিক নয়তো হিরো-হিরোইন আর ভিলেনের গল্প। তাই এই ছবি সাধারণ মানুষ এমন ভাবে গ্রহণ করবেন আমরা ভাবতেও পারিনি। গরুর গাড়ি করে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ হলে ছবিটা দেখতে আসতে লাগলেন।
বিদেশের কার্লোভি ভ্যারি, কায়রো এবং সিডনি চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়েছিল। সিএনএন-আইবিএন-ও শতাব্দীর সেরা আলোড়ন সৃষ্টিকারী একশোটি ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সেরা ছবির স্বীকৃতি দেয়। এই চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা এখনো আমাদের প্রাণিত করে, উৎসাহ জোগায় নতুন কাজে। ছবিটি মুক্তির পর ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে । এখনো অন্ধ্রপ্রদেশের কোথাও অন্য কোনো কাজে গেলে মা-ভূমি-র প্রসঙ্গ ফিরে ফিরে আসে। আর গৌতম, সে তো অন্ধ্রের ঘরের মানুষ।
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
❤ Support Us








