- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- মে ২৫, ২০২৫
ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ১০
চিত্রকর্ম : দেব সরকার
সেনোরিটা বলল – মা এই ভয়ানক গরমের পরিমণ্ডলে হঠাৎ তোমার এক বৈপ্লবিক উন্মেষ লক্ষ্য করছি ? হোয়াই ইন মে ?
– কমলা হাসলেন। বললেন, মে মাস সম্ভাবনার মাস রে ! আপাত কঠিন, কালবৈশাখীর ষড়যন্ত্রে ভারী। ভেবে দেখ্, নিরন্তর নিম্নচাপ গত কয়েক বছর জুড়ে কী প্রবল, গম্ভীর ঘূর্ণিঝড়ের আবহ যোগ করেছে। ২০০৯ সালে আইলা, ১৯ সালে ফণী, ২০ সালে আম্ফন, ২১ সালে ইয়াস আর ২৩-এ মোখা। আবার মে মাসে সম্রাট নেপোলিয়নের মৃত্যু হয়েছিল, সঙ্গীত সম্রাট তানসেনও মারা যান। শুধু কি তাই, এই মে মাসেই কমিউনিজমের অবিস্মরণীয় স্থপতি কার্ল মার্ক্স জন্মেছিলেন। পানিপথের যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে মোঘল সম্রাট বাবর আগ্রায় প্রবেশ করেন মে-তেই। নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হন একই মাসে। আর আমাদের গহন ভাব-ভবের জন্ম দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল চিহ্নিত করে রেখেছেন এ মাসকে, যার অন্তিমলগ্ন সূচিত হয় মাইকেল কবির প্রয়াণে।
সেনোরিটা মুগ্ধ, বিস্মিত। মা ইউ আর আ লিভিং এনসাইক্লোপিডিয়া। কী করে মনে রাখলে এত কথা, এত ঘটনা ? কমলা মৃদু হেসে বললেন, দূর এ তো এ আই-এর কামাল রে সিনু ! আজকাল শ্যাম, রাধিকার উদ্দেশ্যে বাঁশিও বাজাচ্ছেন এ আই দিয়ে। কী অব্যর্থ নিশানা রে ! সেনোরিটা বলল, মা আই অ্যাম রিয়েলি ইম্প্রেসড !
আচমকা আকাশ ভেঙে শুরু হল বৃষ্টি। অঝোর বর্ষণ। বৃষ্টিপাত কমলার জলদগম্ভীর গ্রীষ্মে কিঞ্চিৎ পুষ্পবৃষ্টি বটে, আপাতত তিনি সন্তুষ্ট। ইদানীং বঙ্গনারীর বন্দনার রাশভার খানিকটা আয়ত্তে এসে গেছে, শ্যাম তার সুদর্শন চক্রের মাহাত্ম্য তাকে রপ্ত করাতে পেরেছেন। অস্ত্র, যার ধারে বিনাশ নিশ্চিত কিন্তু যার ব্যবহার অনামোদিত নয়। কমলা বুঝেছেন, যো দিখতা হ্যায় ও বিকতা হ্যায় ! এমনকি সেনোরিটা পর্যন্ত ভাবতে শুরু করেছে, আমার মা সব জানে। আশেপাশেও তাঁর জ্ঞানের, বাহাদুরির গল্প ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘর, সে ঘরের গিন্নিরা শুভেচ্ছাবার্তা সহকারে কমলার কাছে মন্ত্রণার যন্ত্রণা নিতে শুরু করেছেন। প্রতি শনি মঙ্গলবার এখন কমলা মহিলা মহলের আসর বসান তাঁর বসার ঘরে। প্রথম প্রথম ওই বিশুর মা, তুলির মা, খুকুর মায়েরাই আসছিলেন, যাঁদের বাড়িতে নিত্যি অশান্তি মশগুল এবং সাত পাড়া এক করে দেওয়ার মতো খণ্ডযুদ্ধ পাড়াজুড়ে রীতিমতো তরজা আর ফিসফাসের রসদ জোগায়। তাঁরাই প্রথম প্রথম আসছিলেন টোটকা নিতে। কমলা শ্যামের মন্ত্রপ্রাপ্ত। তাঁর স্ব-ধর্মের বিশেষ কোনও স্টেটাস নেই। তিনি সুজনের মাতা, দুর্জনের বিমাতা। ন্যায়ের বুক অন্যায়ের পিঠ, প্রয়োজনের ত্রাতা অপ্রয়োজনের বিনাশ। অতএব নির্বিকার পরামর্শ দিয়ে যান অকাতরে।
কমলা মৃদু ভাষণ যোগান দিলেন, সংঘবদ্ধ থাকো। শুধু সুদর্শন চক্র কেন, হাতা, খুন্তি, ডেকচি, কড়াইতেও শান দাও। নিজের অধিকারের কথা বলতে এবং বুঝতে শেখো। মানিয়ে নেওয়ার হরেকরকম ফর্দ ছেড়ে দাবিয়ে রাখার ফর্দ প্রস্তুত করো। এমিলির মা সঙ্গে সঙ্গে একটু ভ্রু কুঁচকে বললেন, এটা একটু বেশি অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছে না ? সেনোরিটা সঙ্গে সঙ্গে বলল, এরকম অ্যাগ্রেসনটাই তো দরকার আন্টি ! ভিজ্যুয়াল এফেক্ট চাই, নাহলে তো পুরো কমিউনিটির জেহাদটাই মাটি
খন্ডযুদ্ধপ্রবণ গ্রহ থেকে আজকাল মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ছড়াচ্ছে। ছড়িয়ে পড়েছে কু-কথার সংক্রামক ভাইরাস। সমস্ত দ্বন্দ্ব দ্বিধা অতিক্রম করে, এমিলি, শেমিলি, রেমিলিদের মায়েরাও এখন আসতে শুরু করেছেন। এমনকি চক্কোত্তিগিন্নিও। এই তো সেদিন, কমলা প্রত্যেককে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করে শরবত, চা ইত্যাদি অফার করলেন। সেনোরিটা সুইগিতে অর্ডার দিয়ে সিঙ্গারা আনিয়ে নেয়। প্রীতিসম্ভাষণে কমলা মৃদু ভাষণ যোগান দিলেন, সংঘবদ্ধ থাকো। শুধু সুদর্শন চক্র কেন, হাতা, খুন্তি, ডেকচি, কড়াইতেও শান দাও। নিজের অধিকারের কথা বলতে এবং বুঝতে শেখো। মানিয়ে নেওয়ার হরেকরকম ফর্দ ছেড়ে দাবিয়ে রাখার ফর্দ প্রস্তুত করো । এমিলির মা সঙ্গে সঙ্গে একটু ভ্রু কুঁচকে বললেন, এটা একটু বেশি অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছে না ? সেনোরিটা সঙ্গে সঙ্গে বলল, এরকম অ্যাগ্রেসনটাই তো দরকার আন্টি ! ভিজ্যুয়াল এফেক্ট চাই, নাহলে তো পুরো কমিউনিটির জেহাদটাই মাটি। ডোন্ট ওরি, ইটস অল অ্যাবাউট ক্রিয়েটিং দ্য টেরর, নট প্র্যাকটিসিং টেরর অ্যাকচুয়ালি। শেমিলির মা বললেন, মে মাস মানেই মায়েদের মাস। একটু নরম করে ভাবলে হতো না। মানে তেনাদের পাশে বসিয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে একটা রফা করেও তো অধিকারের কথা বলা যেত। কমলা এবার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য পেশ করলেন, ‘নারী নন্দনম, নারী জগৎ, নারী জ্ঞানম, নারী শক্তি।’ স্বধর্মে থাকো। হেথায় নহে, হোথায় নহে, এখানেই পরিত্রাণ। তুলির মা বললেন, ‘আসল কথাটা হল কী, মা দুগ্গা যেমন প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে দশহাতে অস্তর ধরি থাকেন, তেমন অস্তর ধরি থাকো। ঠাকুর বলেছেন, ফোঁস করতি হবে। তোমারে কামড় দিতে কে বলিচে।’ শেমিলির মা চুপ। এমন সময় দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ হলো। বিচিত্রবাবু মৃদু স্বরে জানালেন মাদার্স ডে’র কেক চলে এসেছে যে। মহিলা সমিতির অন্দরে-অন্তরে ইষৎ চাঞ্চল্য দেখা দিল। অতঃপর এলাকার সমস্ত পুরুষসিংহ একযোগে মাতৃদিবসের বন্দনায় কেক কাটলেন এবং নারী-পুরুষের যাবতীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত, রঞ্জিত হয়ে উঠল। মহিলামহলে গুঞ্জন শোনা গেল, আপাত শান্তিকল্যাণ তৈরি করতে বিচিত্রবাবু এবং চক্কোত্তিবাবু নাকি এআই এর সাহায্য নিয়েছেন। এমিলির মা ফিসফিসিয়ে বললেন, সেটা আবার কীরকম ? রেমিলির মা বললেন, প্রযুক্তি বাবা প্রযুক্তি। ঠিকঠাক শিখতে পারলে সবই হয়। এরা আজ বৃষ্টি পর্যন্ত তৈরি করে দেখিয়ে দিলেন। কমলার কর্ণে গুঞ্জন পৌঁছল। মনে মনে প্রমাদ গুনলেন তিনি।
♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৯
❤ Support Us








