Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৫

প্রফুল্ল কাননে

কানাইলাল জানা
প্রফুল্ল কাননে

♦ পর্ব ২♦

‘ভাষা শহিদের শহরে’ লিখেছিলাম ১২ পর্বে, যা একসঙ্গে প্রকাশ করেন নৃপেন দে উত্তর বঙ্গের ‘ডুয়ার্স সমাচার’ পত্রিকায় এবং প্রয়াত কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়কে নিয়েও লিখেছিলাম ১২ পর্বে, একসঙ্গে প্রকাশ করেন অধীরকৃষ্ণ মণ্ডল তাঁর ‘বনানী’ পত্রিকায়। ভাবি, প্রফুল্ল রায়কে নিয়ে লিখলে নিশ্চয় ছাড়িয়ে যাবে ১২ পর্ব, কিন্তু নানাবিষয়ে ঢুকে পড়ার পর আজ স্থির করি অন্তত দ্বিতীয় পর্বটা লেখা হোক্।

৯১ বছরের সাহিত্যিক কাউকে পীড়া দিতে চাইতেন না। ব্যক্তিজীবনে ছিলেন শৃঙ্খলাপরায়ণ ও সংযমী। শেষবার এক বিকেলে তাঁর আজাদগড়ের বাড়িতে গিয়ে সামান্য কিছু কর্থাবার্তার পর ধোপদুরস্ত পোষাকে তিনি আমাকে নিয়েই নেমে এলেন রাস্তায়। কোথায় যাবেন জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন রুবি হাসপাতালের কাছে চেক আপ-এ। তখন উবেরের আর্বিভাব ঘটেনি, সঙ্গেও কেউ নেই তাই বললাম একটি ট্যাক্সি ডেকে দিই ? তিনি বললেন ‘তুমি চলে যাও আমি ডেকে নেব।’ এমনই একলা চলার মানুষ ছিলেন তিনি। এভাবেই চলল তাঁর শবযাত্রা পর্যন্ত ভীড় থেকে শতহাত দূরে থাকা ।

‘যুগান্তরে’ ছিলেন অনেক বছর। সেখানে বারবার গেলেও তখন তাঁর সঙ্গে না কথা বলেছি, না তাঁর লেখা পড়েছি। কিন্তু নিবিড়ভাবে তাঁকে পড়তে হল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসির আসামি ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের অহরহ তাগাদায়। না, জেলে এসেই যে সে ফাঁসির আসামি হয়েছিল তা নয় কিন্তু তার বিচারাধীন পর্বটা ছিল সংক্ষিপ্ত। জেলে ঢুকেই সে ছিল বন্য প্রকৃতির। সব সময় মাথা গরম করে কী করবে ঠিক করতে পারছে না। উপ-কারাপাল হয়েও যে কোনও বন্দিকে যেহেতু আমি মনে করতাম পাড়ারই ছেলেরা কিছু ভুল করে জেলে এসে পড়েছে, তাই তাদের সঙ্গে দূরত্ব রচনা করিনি কখনোই। ধনঞ্জয়কে বলি তুমি লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়তে থাকো তাহলে তোমার এই অস্থিরতা কমবে।

জেল লাইব্রেরি থেকে দুটি করে বই নেয় এবং দ্রুত পড়া শেষ করে আমাকে দেয় একটি করে পড়তে। দীর্ঘদিন সে-বইগুলো ছিল প্রফুল্ল রায়ের উপন্যাস। এভাবেই ধনঞ্জয় পড়ে আর আমাকে পড়ায় ‘সিন্ধু পারের পাখি’, ‘মহাযুদ্ধের ঘোড়া’, ‘আমাকে দেখুন’, ‘অতল জলের দিকে’, ‘শঙ্খিনী’, ‘নোনাজল মিঠে মাটি’, ‘আকাশের নীচে মানুষ’ ।

এমনই উদ্বুদ্ধ হলাম যে, একদিন পূর্ব মেদিনীপুরে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সময় ময়দানের বইমেলার প্রথম দিনে দে’জ পাবলিশার্স থেকে ন’ টাকায় কিনি দশ টাকা দামের নাতিদীর্ঘ উপন্যাস প্রফুল্ল রায়ের ‘নিজের সঙ্গে দেখা’। বাসে যেতে যেতে যত পড়ছি আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছি ততই: কলকাতা শহরের একজন আমলা বিমল দত্ত কাহিনির নায়ক। বাড়ির লোকজন তাঁকে ভাবেন কুলাঙ্গার। কারণ শনিবার হলে তিনি ময়দানে এলাকা থেকে মেয়ে তুলে নিয়ে দূর পাল্লার ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। চাঁদিপুর থেকে পুরি পর্যন্ত যে কোনো এক জায়গায় হোটেলে থেকে ফূর্তি করে ফিরে আসেন সোমবার সকালে। একবার ইডেন গার্ডেনের দক্ষিণ থেকে যে মেয়েটিকে তুললেন গাড়িতে, বসে আছে জড়সড়। মুখে কথা নেই। চাঁদিপুরের হোটেলে এল রাতের খাবার। খেতে চাইল না মেয়েটি, তাই খেলেন না আমলাও। সদ্য যুবতী হওয়া পুবালি নামের মেয়েটির শারীরিক বর্ণনা দিয়েছেন লেখক সুনিপুণভাবে। স্লিম এবং স্তনবতী হওয়া সত্ত্বেও তার গায়ে হাত উঠল না, ছুঁয়েও দেখলেন না বিমলবাবু। কিন্তু খুব জানার চেষ্টা করলেন কেন এমন করছে মেয়েটি। মাথা নিচু করে খুব ধীরে ধীরে পুবালি জানায়, তার বাড়ি বজবজ, সে দশ ক্লাস পড়তে পড়তে পড়া বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ বাবা ক্যান্সার আক্রান্ত। আর পড়ানোর সার্মথ্য নেই। উল্টে বাবার চিকিৎসার খরচ যোগানের জন্য বাধ্য হয়ে আজ সে এই পথে। টাকা দিতে গেলে নিল না সে, তাকে ব্যবহার করেননি বলে। মেয়েটির এক বেকার প্রেমিকও আছে।

বর-বউ অনুরোধ করছে বারবার, তাদের আশীর্বাদ করতে গিয়ে কিন্তু কেঁপে উঠছেন এই ভেবে যে, বাড়ির লোকজনের কাছে ঘৃণিত মানুষটিরও তাহলে ভালো কিছু করার ক্ষমতা আছে এই সমাজে! বেশ কিছুক্ষণ অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ার পর আলতো হাত ছোঁয়ালেন তাদের মাথায়। এই হচ্ছে ‘নিজের সঙ্গে দেখা’।

ফেরার পথে আমলা বিমল দত্ত পুবালিকে বলেন, মাঝে মাঝে সে যেন ডালহৌসি পাড়ায় তাঁর সঙ্গে দেখা করে অফিসে, কিছু প্রয়োজন পড়লে নির্বিধায় জানাতে পারে । সত্যি সত্যি একদিন পুবালি তার ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে হাজির বিমলবাবুর কাছে। বিমলবাবু বলেন তোমরা বিয়ে করছো না কেন ? তখন স্মার্টলি পুবালি বলে ‘আপনার জন্য স্যর’। বিস্মিত বিমল বাবুর জিজ্ঞাসা ‘দায়ী আমি ?’ পুবালি বলে হ্যাঁ স্যর আপনি ! চেষ্টা করলে আপনি তো আমার ভালবাসার পাত্র অসিতকে অন্তত একটি পিয়নের চাকরি করে দিতে পারেন। ষাটের দশকে সম্ভব ছিল। সত্যি একদিন করে দিলেন অসিতের চাকরি। কথা দিল, সে আর্থিক সহযোগিতা করবে পুবালির বাবাকে। কিছুদিন পর চার হাতও এক হল দু-জনের। অভাবের সংসারে বিয়ে হলো রেজিষ্ট্রেশন করে। রেজিস্ট্রেশনে প্রথম সাক্ষীর সই করলেন একদা ‘কুলাঙ্লার’ বিমল দত্ত-ই।

বহু উপন্যাসেই প্রফুল্ল রায় আলোর সন্ধান দিয়েছেন এভাবেই …


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!