Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • নভেম্বর ৯, ২০২৫

একা দীপঙ্কর এবং আমরা কয়েকজন

স্বপ্না দে
একা দীপঙ্কর এবং আমরা কয়েকজন

 
‘ আমি তো ছিলাম ঘুমে
তুমি মোর শির চুমে গুঞ্জরিলে কী উদাত্ত মহামন্ত্র মোর কানেকানে ‘

 
সত্যি কোনোদিন ভাবিনি এভাবে একক উপস্থাপনা করতে পারবো । আবৃত্তি করতে ভালোবাসি আবৃত্তি কে আঁকড়েই বেঁচে আছি । কিন্তু কোনো একক উপস্থাপনা করতে গেলে তার নেপথ্যে যে শ্রম থাকা উচিত, সেটা আমার পছন্দের কাজ নয় । একার ও কাজ নয় । তাই চুপচাপ চর্চা করে আনন্দ পেতাম । সুপরিচিত মুখ, দীপঙ্কর দাস এমন একজন মানুষ, যিনি প্রায় এক অসম্ভব কে সম্ভব করে তুললেন । প্রথম যেদিন গ্রুপে বললেন, স্বপ্নার একক আবৃত্তি হবে, ভোরের পাখি কবিতা সম্ভার, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়ের উনি সাকরেদ পেয়ে গেলেন, হবে হবে হবে । আমি রে রে করে উঠলাম, হবেনা, হবে না, হবে না । কে শোনে কার কথা । হল বুকিং হয়ে গেল । জ্ঞান মঞ্চ । হাতে সময় কুল্লে আড়াই মাস । আমাকে প্রায় ধাক্কা মেরে যেন গভীর জলে ফেলে দেওয়া হলো । এবার প্রাণপণ কুলে ওঠার চেষ্টা । শুরু করে দিলাম, বিষয় নির্বাচন । প্রথম পর্বের বাছাইয়ে দাঁড়ালো চার ঘন্টা । কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি । অবশেষে নির্মম ভাবে সম্পাদনা করা হল । প্রথম পর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা এবং দশ মিনিটের বিরতির পর, ‘বেহুলা একটি কথকতা’ । সামান্য আবহ প্রয়োগ ছাড়া আর কোনো অনুষঙ্গ নেই। শুভেন্দু মাইতি, এখন বেশিরভাগ সময় থাকেন কল্যাণী শহরে। চলে গেলাম ওঁর কাছে । স্ক্রিপ্ট নিয়ে কথা হলো । শুভেন্দু দা রাজি হয়ে গেলেন । দীর্ঘদিনের সম্পর্ক । খুবই স্নেহ করেন । জিজ্ঞেস করলাম, আলো-মঞ্চ কাকে দিয়ে করাতে পারি । বললেন সৌমিকের কথা ভাবতে পারিস । ফোন নম্বর দিলেন । কথা বলিয়ে দিলেন । সৌমিক বললেন আলো সৌমেন করতে পারে । আর শব্দ, হাসি, পাঞ্চাল পুত্র নিলয় এবং আবহের বিস্তারে অনুপম । কথা সমণ্বয় করবে দেবাশিস বসু । ব্যাস টিম রেডি । এবার শুরু হলো দীপঙ্কর এর তত্ত্বাবধানে প্রতিটি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ । সংগঠিত রিহার্সাল ক্রমাগত আমাকে বুস্ট আপ করছে । প্রতিদিন সকালে একটা মেসেজ আসে, স্বপ্না বাড়িতে বসছো তো ? আমাদের কবিতা সম্ভবা স্টুডিওতে নিয়মিত মাইক্রোফোনে চর্চা হচ্ছে । রিহার্সাল শুনতে আসছেন বিশিষ্টরা, দীপঙ্করই তা ঠিক করছেন । রিহার্সাল শেষে কি জলযোগ হবে ? কে কীভাবে বাড়ি ফিরবেন, সমস্ত বিষয় নিখুঁত ভাবে পরিচালনা করছিলেন দীপঙ্কর । গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো ২৯ আগস্ট । জ্ঞান মঞ্চ । চারশো আসন । অমিত মিত্র আমার ফেসবুক পেজ মডারেটের । সে আমার ছোটোবেলার বন্ধু । ও লেগে পড়লো ফেসবুক প্রমোশন করতে । দীপঙ্কর কে নানা জগতের মানুষ খুব ভালোবাসেন, কারণ তিনি অনেকেরই বিপদে, আপদে মুশকিল আসান । বন্ধু বৎসল । সৎ, পরিশ্রমী নিষ্ঠাবান কর্মী । পেশা তাঁর স্থাপত্যের নির্মাণ। নেশা লেখালেখি। মানুষের পাশে থাকার অদম্য আগ্রহ নিয়ে স্বপ্ন গড়েন আর সে স্বপ্নের নির্মাণকে সাজিয়ে দেন সবার সামনে । অদম্য জেদ তাঁকে আরোহনের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে, পেশাগত জীবনে।
 
দীপঙ্কর ভোরের পাখি কবিতা সভার সদস্যদের নিয়ে লাগাতার মিটিং করতে লাগলেন । এক একজনকে ধরে ধরে ফোন শুরু করলেন, অনুষ্ঠানের আগাম খবর দিয়ে, একটা আসনও যেন খালি না থাকে । আমাকেও বলেছেন বারবার । বিনয়ের সঙ্গে সক্কলকে জানাতে থাকো, তুমি এক নতুন ঝুঁকি নিয়েছ ।
 
ব্যাস লেগে পড়লাম আমরা সবাই। উনত্রিশ আগস্ট জ্ঞান মঞ্চের চারশো আসন কানায় কানায় পূর্ণ । টিকিট বিক্রি হয়ে গেল সব ।
 
একটা কথা বলতে ভুলে যাচ্ছি । এই আড়াই মাসের অনেকগুলো রাত আমাকে বিনিদ্র থাকতে হয়েছে । ঘুমাতে পারিনি । একদিন সকালে টের পেলাম কণ্ঠ রুদ্ধ । গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না । শিল্প কি এমনই । অবশেষে সে মনোহর মুহূর্ত । উনত্রিশ আগস্ট, সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় জ্ঞান মঞ্চের পর্দা উঠে গেল। মঞ্চে আমি একা । সামনে বসে আছেন দর্শক আর শ্রোতারা । ভাবলাম, আমি আর একা নই । আস্তে আস্তে যেন পাপড়ি খুলতে লাগলো । ধীরে ধীরে সময় এগিয়ে গেল । প্রথম পর্বে রবীন্দ্রনাথ । চা বিরতি পনের মিনিটের । দ্বিতীয় পর্বে, আমার ভাবনায় লেখা, কৌশিক রায়চৌধুরীর জাগরণ পালার নির্বাচিত অংশ, ‘বেহুলা একটি কথকতা’ । দর্শক শ্রোতাদের দীপঙ্কর এবং ভোরের পাখি কবিতা সম্ভবার ছেলেমেয়েরা প্রবেশের সময় চন্দন তিলক পরিয়ে স্বাগত জানালেন । আপ্লুত তাঁরা । অনেকেই বললেন, এই অভিজ্ঞতা বিরল । শেষ হলো, হে একা সখা-র প্রথম শো । দর্শক শ্রোতাদের আশীর্বাদ তাঁদের মুগ্ধ ভালোবাসা আমার ভিতরে আগুন জ্বেলে দিল ।
 
রেশ টুকু কাটতে না কাটতেই অনেকের আক্ষেপ কানে এল । বিভিন্ন পত্রিকায় রিভিউ পড়ে, টেলিভিশনের প্রতিবেদন দেখে মনে হয়েছে একটা ভিন্ন ধরনের কাজ হয়তো হয়েছে । শ্রোতারা আগ্রহী হয়ে উঠলেন । দেখতে চান, শুনতে চান । শুরু হয়ে গেল, দ্বিতীয় শো এর প্রস্তুতি । আইসিসিআর-এর কলকাতা সদনে । ১৮ অক্টোবর আবার আমি দর্শক-শ্রেতার সম্মুখে ।
 
হে একা সখার দ্বিতীয় শো । হঠাৎ একদিন আমি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলাম । তুমুল শ্বাসকষ্ট । ভাবিনি অনুষ্ঠান করতে পারবো । হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে তিনটি রিহার্সালের সুযোগ পেলাম । আর আমাদের দীপঙ্কর, এক সপ্তাহের মধ্যেই একটি অসাধ্য সাধন করলেন । যোগাযোগ করলেন, দুটি বৃদ্ধাবাসের আবাসিক এবং কলকাতা পুলিশের প্রণাম সংগঠনের সঙ্গে । অল্প সময়ে, কাজটি করা খুব সহজ ছিল না । দীপঙ্কর অসম্ভবের অজুহাতকে হটিয়ে দিলেন । সব মিলিয়ে ওঁদের অন্তত একশো অতিথি সদস্য এলেন অনুষ্ঠানে, জ্বেলে দিলেন আলো । কী মায়াময় আহা । অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চে এলেন তাঁরা । গায়ে উত্তরীয়, হাতে হে একা সখার ছবি আঁকা কাপ দিয়ে মাননীয় সদস্যদের বরণ করার সুযোগ পেলাম আমরা । অনুষ্ঠান শেষে সমস্ত দর্শক শ্রোতারা নিয়ে চলল পনের মিনিটের আড্ডা । ওই যে বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকরা যেভাবে আমাকে আশীর্বাদ করলেন, তা অবশ্যই লাইফ টাইম এচিভমেন্ট । মা-বাবার স্পর্শ হয়ে ঝরে পড়লো আমার মাথায় । দীপঙ্কর গোটা মহত যজ্ঞের কারিগর, স্বপ্ন দেখেছেন, সমস্ত ঝুঁকি সামলেছেন । তাঁকে কী বলে কৃতজ্ঞতা জানাব ? ভালো থেকো বন্ধু আমার, হে পরাণ সখা ।
 

এরকম গুণীর আছেন বলেই, হাজরো সঙ্কট, দুর্যোগ পেরিয়ে আমরা টিঁকে আছি, বেঁচে আছে আমাদের যৌথ সাধনা । দীপঙ্কর, দীপঙ্করের স্বচ্ছ পরিবার আমার মতো অনেকানেক বৃন্দের সহচর, ভরসা । গানের মতো, স্বতঃস্ফূর্ত কবিতার মতো, মঞ্চের অঙ্কশেষের গম্ভীর উচ্ছ্বাসের মতো তাঁদের প্রেম-ছোঁওয়া বন্ধুত্ব, তাঁদের নির্মোহ আলো ঝরে পড়ে আমাদের ভেতরে, ভেতর থেকে শূন্য সেকেন্ড দূরে, কাছে আরো কাছে, ছড়িয়ে থাকে বৃষ্টিমুখর রাতে কিংবা সূর্যমুখী প্রভাতে । এত ঋণ কীভাবে শোধ করব জানিনা, এইটুকু বলতে পারি, দায়িত্ব বেড়ে গেল আরো । ‘কোন ভাঙনের পথ এলে…’, ‘ওগো ঘুম ভাঙানিয়া…’
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

লেখক সুপরিচিত বাচিক শিল্পী আর বেতার-দূরদর্শনের নিয়মিত ঘোষিকা


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!