- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- অক্টোবর ২৬, ২০২৫
নেই রাজ্যের দেশ আর চাচা হো
শহর থেকে দূরে । পর্ব ৬
সাংবাদিক ও ইতিহাস সচেতন বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় বলেতেন ‘ব্যবহা’র বা ‘ব্যবসা’র উচ্চারণে য-ফলা দিলে একটা আ-কার এসে যায় অতিরিক্ত তাই সঠিক উচ্চারণ হবে ববহার এবং ববসা। আমাদের ভিয়েতনাম উড়ান ছিল দমদম থেকে ব্যাঙ্কক এবং ব্যাঙ্কক থেকে হ্যানয়। প্রতি ক্ষেপে আড়াই ঘন্টা হলে যাতায়াতে শুধু বিমানে মোট সময় দশ ঘন্টা। এই দশ ঘন্টায় বিমান সেবিকা এবং সেবকদের আপ্যায়ন ছিল শূন্য। সারাক্ষণ তাঁদের ব্যবহার নিয়োজিত ছিল ব্যবসায়। উড়ন্ত বিমানে দিনের আলোয় অথবা আলোআঁধারির মধ্যে রিসার্চ পেপারের মতো কিছু দেখে খাবার সাপ্লাই করছেন বেছে বেছে কিছু যাত্রীর মধ্যে। প্রাইভাটাইজেশান মানে কি মানবিকতার বিসর্জন? আপ্যায়ণকে হিমঘরে পাঠানো ? কি করে ভুলি আপ্যায়ণ বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে এই শহরে: বাড়িতে গেলে অলকরঞ্জন দাশগুপ্ত – টুটবার্তা দাশগুপ্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়- স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় – সোনামন মুখোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় – গীতা মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ- প্রতিমা ঘোষ, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় – বিজয়া- মুখোপাধ্যায়, আলোক সরকার- মিনু সরকার, পবিত্র মুখোপাধ্যায় – মিনু মুখোপাধ্যায়, দিব্যেন্দু পালিত- কল্যাণী পালিত, পবিত্র সরকার -মৈত্রেয়ী সরকার, সমীর রায়চৌধুরী – বেলা রায়চৌধুরী, তপন বন্দ্যোপাধ্যায় – কল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাত চৌধুরী -যূথিকা চৌধুরী, সৈয়দ কওসর জামাল – স্বপ্না সৈয়দ প্রমুখের আপ্যায়ণ। কবি শ্যামলকান্তি দাশ আবার ঘরভর্তি বইপত্র-র মধ্যেও বলেন : ‘খাটে পা তুলে চক্করমেরে বসুন’, তারপর আসতে থাকবে সরবৎ, মিষ্টান্ন এবং নানারকম খাবার। আপ্যায়ণ ছিল অফিসেও। খোলা হাওয়ার যুগে ‘দেশ’ পত্রিকার দপ্তরে সুনীলদা, শীর্ষন্দুদা, আকাশবাণীতে সৈয়দ কওসর জামাল থেকে সিদ্ধার্থ মাইতি, এমনকি এই সেদিন এ জি বেঙ্গলের চারতলায় যশোধরা রায়চৌধুরী। ইন্ডিয়ান অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট সার্ভিসের উঁচু পদে থেকেও অনেকটা সময় বের করে কতোকিছু খাওয়াল, তার উচ্চমানের লেখা দুটি গদ্যগ্রন্থও দিল। না চাওয়া সত্ত্বেও তার গাড়ি ছেড়ে দিয়ে এল মেট্রোতে। বদলি গেল দিল্লি। এ মাসে তার অবসর। সবই থাকবে মনের মণিকোঠায়। ‘রাজধানী এক্সপ্রেস’,’দূরন্ত এক্সপ্রেস’ এবং হাল আমলে ‘বন্দে ভারত’ ট্রেনে তো দারুণ খাবার পরিবেশন হয়। কে বা খাওয়ায়, প্রয়োজনে টিকিটের সঙ্গে খাবারের দাম ধরে নিলেই হয়।
সারা শহর উজ্জ্বল লাল পতাকায় যে ছেয়ে আছে, ২০২৫ সাল দুই ভিয়েতনামের মিলনের সুবর্ণ বর্ষের শুরু। চাচা হোর চরিত্রের প্রধান গুণ তাঁর অসাধারণ সরলতা। কতো আচ্ছা আচ্ছা কূটনীতি যে এই সরলতার কাছে পর্যুদস্ত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। অন্তত দুবার এসেছেন কলকাতায় থাকার ব্যবস্থা রাজভবনের বিলাসবহুল ঘরে। কিন্তু বাইরের মেঝেতেই আসন পেতে সেখানেই যতো আলাপ আলোচনা, সেখানেই ছিল তাঁর রাত্রিবাস

বিমানে শুকনো মুখে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে পড়ে একবার রবীন্দ্রসদনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মুখোমুখি অমিতাভ চৌধুরী ও মুনমুন সেন। মুখেমুখে ছড়া কাটেন অমিতাভ চৌধুরী: ‘এক মুনে রক্ষা নেই তায় ডাবল মুন, মায়ের মতোই যেমন রূপ তেমনি তার গুণ।’ না একই রকম প্রতিভা হয়তো নয় মা ও মেয়ের মধ্যে কিন্তু বন্দিদের চিত্র প্রদর্শনী এবং সংশোধনাগারের সঙ্গে তাঁর অন্য যোগাযোগ সুন্দর মনের পরিচয় হয়েই আছে। আসলে মুন বা চাঁদের কথা বলছি। চাঁদ দেখা যায়নি, তা না হলেও সারা বিশ্বে চাঁদকে নিয়ে কাব্যের শেষ নেই। আমার শুধু মনে পড়ে: ‘চাঁদের এতো আলো তবু সে আমারে ডাকি, উতলা মাধবী রাতে মাগিছে হে মোর আঁখি !’ চাঁদ না থাকলেও দেখা যায় নক্ষত্রখচিত আকাশ। তখন স্মরণে আসে ‘বিভাস’ চলচিত্রের গান: ‘আজ তারায় তারায় জ্বলুক বাতি, আমার আঁধার সরিয়ে নাও। বন্ধ ঘরের দুয়ার ভেঙে আলোয় আমার ভরিয়ে দাও।’ চাঁদের মতোই বা তার থেকে বেশি কাব্য জগৎ ভরে আছে মেঘের রাজ্যে। মন তবু কিছুটা ভাল হয় দিনের আলোয় জানলা দিয়ে মেঘের নানা ম্যাজিক দেখে। এই হয়তো নীল সমুদ্র থেকে ভেসে উঠছে সাদা পদ্ম তো পর মুহূর্তে কালো পাহাড়ের ঢালে শুম্ভনিশুম্ভর মহাযুদ্ধ, তারপরেই সাদা ও নীল রঙের খোকা খুকিদের হামাগুড়ি !
যে হোটেলে উঠেছি, ঘরের টিভি সেটে বেশ কিছু চ্যানেল। তারই একটায়, বলতে চায় পেন্টাগনের তথা আমেরিকার যুদ্ধনীতিকে হারিয়ে দিতে পারে ছোট্ট দেশ ভিয়েতনাম, সে তো বটেই এখন চিন যদি বলে দাবিয়ে রাখবে সে-ও হবে না কখনোই গাইডের মতে। আর একটি চ্যানেল মি: ফিট। রোগ হলে তো চিকিৎসা চলবে কিন্তু রোগ যাতে ধরে তার জন্য আছে শুধু নাচের ক্লাস। গান গাইতে গাইতে নাচ: মহিলা পুরুষ কিংবা একসঙ্গে। সারা শরীর দুলিয়ে ছন্দে ছন্দে নাচ আর নাচ…
ভিয়েতনামকে প্রথম দেখায় মনে হয়, এ আমাদের শহর কলকাতার রাস্তার ছবি। আসলে এটি হো-চি-মিনের দেশ ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় শহরের একটি রাস্তার দৃশ্য। সমাজতান্ত্রিক দেশ ভিয়েতনামের প্রধান রাজনৈতিক দলের পতাকায় কাস্তে হাতুড়ি। সে দেশের জাতীয় পতাকাতেও তারা। সবই লালে লাল। সারা শহর এখন উজ্জ্বল লাল পতাকায় যে ছেয়ে আছে, ২০২৫ সাল দুই ভিয়েতনামের মিলনের সুবর্ণ বর্ষের শুরু। চাচা হো বা হো-চি-মিনের চরিত্রের প্রধান গুণ তাঁর অসাধারণ সরলতা। কতো আচ্ছা আচ্ছা কূটনীতি যে এই সরলতার কাছে পর্যুদস্ত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। অন্তত দুবার এসেছেন কলকাতায়। থাকার ব্যবস্থা রাজভবনের বিলাসবহুল ঘরে। কিন্তু বাইরের মেঝেতেই আসন পেতে সেখানেই যতো আলাপ আলোচনা, সেখানেই ছিল তাঁর রাত্রিবাস। সরলতার সেই ছাপ আছে হ্যানয় শহর সাজানোতেও। হ্যানয় বিমান বন্দর ‘নো-হই’ থেকে শহর পর্যন্ত যে চমৎকার ছয় লেনের রাস্তা তার ডিভাইডার সাজানো খেজুর গাছের সারি দিয়ে। বাংলায় খেজুর গাছকে কে-ই বা সমীহ করে ? অবশ্য করে কোচবিহারের ঘোকসাডাঙার মানুষ। উত্তরবঙ্গে থাকতে কোচবিহারের রাসমেলায় ১৪০০ টাকায় কিনে ছিলাম ঘোকসাডাঙার একটি খেজুর পাতার মাদুর। প্রচন্ড গরমের দিনে দুপুরে এসি নয়, দেয় খেজুর পাতার সেই চাটাই। রাস্তায় পড়ে বিশাল আয়তনের রেড রিভার। এই নদীর উৎপত্তি চিন দেশে। তার ওপর যে লম্বা ব্রিজ, মনে করায় আমাদের গঙ্গা নদীর ওপর বিদ্যাসাগর সেতুর প্রযুক্তির বৃহৎ সংস্করণ।
৪৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলায় যত মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, তার থেকে বহুগুণ বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল ভিয়েতনামে, একই সময়ে । অথচ যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সে দেশ চাচা হো-র নেতৃত্বে তাতে সে দেশ যে কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে লেনিনের পর তাঁকে স্থান দেয় তা যথার্থই মনে হয়
ছবিতে যে অশ্বত্থ গাছ, আমাদের গাইড বললেন সেটির চারা নাকি ১৯৫৯ সালে ইন্দিরা গান্ধি পুঁতেছিলেন শহরের প্রাচীনতম ট্রান কোয়াক প্যাগোডার ধারের লেকের দক্ষিণ পূর্বের এই স্থানে। আমি যতদূর জানি এই চারা স্যার রাজেন্দ্রপ্রসাদ বুদ্ধগয়া থেকে এনে এখানে পুঁতেছিলেন ১৯৫১ সালে। এখানেই আছে একাদশ শতাব্দীতে রাজা কিং লি থাই টং নির্মিত ওয়ান পিলার প্যাগোডা, যার অর্থ সুখের চিহ্ন। আর আছে ল্য কোক সু প্যাগোডা। এই মন্দিরে অর্থ সম্পদ পুড়িয়ে মানুষ লোভ লালসা থেকে মুক্তির উপাসনা করে। প্রতিটি বুদ্ধ মন্দিরে ফিংগার ফ্রুট সহ বিভিন্ন ফলের সমাহার, নিবেদন করা হয় ঈশ্বরকে। বিশাল হ্রদের ওপারে, সুদৃশ্য হ্যানয় ক্লাবের বহুতল হোটেলের ছায়া পড়েছে জলে। ট্রানকুই পার্কে বিদেশীদের ভিড়। ১৯৪৩-৪৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলায় যত মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, তার থেকে বহুগুণ বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল ভিয়েতনামে একই সময়ে । অথচ যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সে দেশ চাচা হো-র নেতৃত্বে তাতে সে দেশ যে কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে লেনিনের পর তাঁকে স্থান দেয় তা যথার্থই মনে হয়। নিজে মনে করি কমিউনিস্ট নীতি রূপায়ণে এবং জীবনযাপনের উদাহরণে চাচা হো-ই সর্বশ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের দখলে ছিল ভিয়েতনাম। হিরোসীমা এবং নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমা পড়ার পর, ৯ আগস্ট ১৯৪৫ জাপান ভিয়েতনাম ছেড়ে চলে গেলে, এবার সে দেশের দখল গেল ফ্রান্সের কাছে। বহু মেহনত বহু সংগ্রামের পর উত্তর ভিয়েতনামকে ফ্রান্সের শাসন থেকে মুক্ত করতে পারলেও চাচা হো দেখে যেতে পারেননি দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে আমেরিকার খবরদারি থেকে মুক্তি। আমেরিকার সহযোগিতায় তখন সেখানে ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের পাপেট সরকার।
তিন লক্ষ বর্গকিমির কিছু বেশি, ‘এস’ (S) আকৃতির এই দেশটিতে ফ্রান্স এবং আমেরিকার প্রভাব প্রকট। সারা শহরে ফরাসি ভাষার উজ্জ্বল উপস্থিতি। হাঁটতে গিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষ হতে যায় আর কি। কারণ এতোদিনের অভ্যেস বাঁ দিক দিয়ে হাঁটা, হ্যানয়বাসীরা আবার আমেরিকান স্টাইলে পথচালায় ডানপন্থী। তাই বাঁয়ে-ডাঁয়ে মুখোমুখি হওয়া।
‘বা দিন স্কয়ারে’ অবস্থিত হো চি মিন-এর সমাধিস্থল। এটির নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন অখণ্ড সোভিয়েতের প্রযুক্তি বিজ্ঞানীরা। একটি কাচের পাত্রে মমি করে রাখা আছে চাচা হো-র দেহ। উদ্ধৃত আছে তাঁর বিখ্যাত উক্তি: ‘স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার থেকে মূল্যবান আর কিছু নেই।’ এর সামনেই রাষ্ট্রপতি ভবন। যদিও সেই ভবনে কখনো থাকা হয়নি হো চি মিন-এর। পাশেই থাকতেন স্টিল্ট হাউসের ছোট্ট বাড়িতে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত। এখানেই আছে ফিদেল কাস্ত্রো-র দেওয়া গোল টেবিল। ওপরে সংরক্ষিত সন্ন্যাসী কবি এনগুইয়ের মূর্তি। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা এই কবির কবিতা পড়তেন চাচা হো। আর শুনতেন রেডিও, তাও সযত্বে রাখা এখানে। আর একটি ঘরে আছে একটি থার্মোমিটার, যেটা ইঙ্গিত দেয় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটি, এক দিনের জন্য। সমাধির বিপরীতে তৈরি হয়েছে পার্লামেন্ট। রোববার বন্ধ। মাঝখানে একটি বেদির ওপর পতপত করে উড়ছে দেশের জাতীয় পতাকা।
সব মিলিয়ে ভিয়েতনাম এখন নেই রাজ্যের দেশ, যেখানে ভিক্ষাবৃত্তি নেই, ধোঁয়া এবং ধুলোয় আচ্ছন্ন পরিবেশ নেই, হর্নের দাপট নেই, মানুষ মারা যানবাহনের গতি নেই, ভিআইপি চলাচলের জন্য সাধারণ মানুষের হয়রানি নেই। একটিও নেই অপরিচ্ছন্ন গলি ও রাস্তা। নেই-এর শহরে আছে অসংখ্য পার্ক আর নীল জলের হৃদ ।
♦–♦♦–♦♦–♦♦–♦
❤ Support Us








