- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- নভেম্বর ৯, ২০২৫
স্মৃতি শ্রুতি ভবিষ্যৎ
সাহিত্যের বা পৃথিবীর যেকোনো সাহিত্যের আদি সংরক্ষণ পদ্ধতিই আবৃত্তি, এবং তা স্বকীয় সাহিত্যধারা । যে কারণেই বোধ হয় পূর্বের সাহিত্যে আজকের মতো গদ্যের প্রচলন ছিল না
আলোকচিত্র সৌজন্য : সঙ্গীত নাট্যকলা একাদেমি, নয়া দিল্লি
‘সর্ব শাসত্রানাং বোধাদপি গরীয়সী’ অর্থাৎ, সকল শাস্ত্রের বোধ অপেক্ষা আবৃত্তি শ্রেষ্ঠতর। ৩০০০ বছর আগের নিরিখে ‘আবৃত্তি’ শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ ‘বারংবার পাঠ’। বৈদিক যুগের কবিরা তাদের কবিতা বা সাহিত্য সংরক্ষণ করতেন বারংবার পাঠ ঐতিহ্যের মাধ্যমেই। লিখে রাখার ব্যবস্থা ছিল না সেকালের ভারতবর্ষে, ফলে সাহিত্য রচনা আর তার চর্চা হতো সভা করে, আলোচনা বৈঠকে। সেসব সভায় পঠিত কবিতাকে আবৃত্তির মাধ্যমেই মনে ধারণ করে রাখতেন অনেকেই, পৌঁছে দিতেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। বৈদিক সময়কালে বেদ, উপনিষদ-এর চর্চা, চর্যা আর গুরুগৃহে পাঠ, এখানেই ‘শ্রুতি’ শব্দ জুড়ে যায় বহমান শব্দব্রহ্মে। প্রামাণিক, প্রকাশ ধারণ এবং প্রশ্নাতীত সত্য ধারণ করে শ্রুতি সাহিত্য হয়ে ওঠে শাশ্বত, চিরন্তন। উল্লাসে ঝাঁপিয়ে পড়ে ‘স্মৃতি’, যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে হতে নির্মাণ করতে থাকে নতুন ভাষ্যরীতি, নতুন কথন। বেদ-বেদান্ত, উপনিষদ, পুরাণ, বৌদ্ধ দর্শন, ইতিহাস, উপবেদ, তন্ত্র, আগম এবং উপঙ্গ সবই হয়ে ওঠে স্মৃতি সাহিত্যের অংশ।
৫ হাজার বছরেরও বেশি ইতিহাসসমৃদ্ধ প্রাচীন দেশ ভারত, তার সমসাময়িক সভ্যতাগুলির মধ্যে—যেমন মেসোপটেমিয়ান, মিশরীয় এবং মিনোয়ান সভ্যতা। অন্যান্য সভ্যতাগুলি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার উত্তরাধিকারী আজও স্বকীয়ভাবনায় অটুট, অবিভাজ্য। একটি সভ্যতাকে কি এমন জিনিস যা ‘চিরন্তন’ বা ‘সনাতন’ করে তোলে ? সামাজিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাবিদ্যাগত আলোচনায় বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তবে প্রাচীন মিশরীয় ও সিন্ধু সভ্যতার তুলনা আরও গভীর অন্তর্দৃষ্টি দেয়। মিশরীয়রা তাদের বিশাল পিরামিড এবং রাজাদের ভাস্কর্য নির্মাণে দক্ষ ছিল। তবে ২১ শতকে কেউ মিশরীয় প্রাচীন সভ্যতার সরাসরি উত্তরাধিকারী বা অনুসারী হিসাবে নিজেকে পরিচয় দেয় না। মিশরীয় দেবদেবী ও রাজারা এখন জাদুঘরের প্রদর্শনী, এবং পিরামিডগুলোই কেবল পর্যটকদের আকর্ষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, ভারতীয় সভ্যতা বহু আগ্রাসীর সাংস্কৃতিক ধারা মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিজয়ী যোদ্ধা। এর কারণ বোধকরি খরস্রোতেও সংস্কৃতিবোধ আর গ্রহণ করবার ক্ষমতা। ভারতের সাহিত্য ও পারফর্মিং আর্টের ইতিহাস প্রাচীনকাল থেকেই মৌখিক চর্চার উপর নির্ভরশীল ছিল। শব্দ, ছন্দ, সঙ্গীত, নৃত্য ও নাট্যরূপের মাধ্যমে কল্পনা, নৈতিকতা, ধর্মীয় আদর্শ এবং সামাজিক বিধান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়েছে। বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্য ও চর্চাপদের সময় পর্যন্ত মৌখিক ও আবৃত্তিমূলক সাহিত্য সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম এবং সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংপৃক্ত।
পশ্চিমা দর্শনে প্রধানত প্রত্যক্ষ জ্ঞানের উপর নির্ভর করা হয়, কিন্তু ভারতীয় যোগাযোগের ঐতিহ্য প্রধাণত মৌখিক, পশ্চিমা লিখিত ধর্মীয় বা প্রামাণ্য দলিলকে সর্বোচ্চ সত্য হিসেবে গ্রহণ করার তুলনা ভারতভূমের ‘শব্দব্রহ্ম’ ধারণার সঙ্গে করলে তা বড়ো একপেশে হয়ে যায়
হাজার হাজার বছর আগে, সিন্ধু-সরস্বতীর তীরে, বৈদিকরা সভ্যতা স্থাপন করছেন, তার মূল ভিত্তি ছিল ‘জ্ঞান’। ‘ঋগ্বেদ’-এ একাধিকবার ‘জ্ঞান’-কেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গ্রহণ করবার অকৃত্রিম ভাবও সেখানে স্পষ্ট। ‘সকল দিক থেকে শুভ চিন্তা আমাদের কাছে আসুক’— এ ভাবনাই পরিবর্তিত ও রূপান্তরের মেলায় গ্রহণ-বর্জনের সুক্ষ্ম সমীকরণে ভারত আজও আলোকিত সূর্য। জ্ঞানচর্চার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর মৌখিক কাঠামো, যা লেখার চেয়ে মুখস্থকরণ, দৃষ্টি (মন্ত্রদ্রষ্টা), বোঝাপড়া এবং ধারণাকে গুরুত্ব দেয়। বৈদিক পূর্বপুরুষরা তাদের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার সংরক্ষণের জন্য মৌখিক ঐতিহ্য তৈরি করেছিলেন, যা সমহিতি আকারে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের কাছে স্থানান্তরিত হত। এর ফলে মন্ত্রপাঠের শৈলী, শ্রুতি ঐতিহ্য, গুরু-শিষ্য ঐতিহ্য, শব্দব্রহ্ম ধারণা এবং শ্রুতি-স্মৃতি কাঠামো বিকশিত হয়। মৌখিক যোগাযোগের প্রেক্ষাপটে ‘শ্রুতি ও স্মৃতি’ উল্লেখ করা অপরিহার্য। শ্রুতি হলো যা ঋষিরা শুনেছেন, যা ঐশ্বরিক শক্তির মাধ্যমে প্রকাশিত, আর স্মৃতি মানুষের স্মৃতি ও বুদ্ধি দ্বারা তৈরি পাঠ, যা মূলত শ্রুতির মানবীয় ব্যাখ্যা। শ্রুতি আর স্মৃতি—ভারতীয় মৌখিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
খ্রিষ্টপূর্ব ১৫শ শতকে রচিত ‘ঋগ্বেদ’ কীভাবে বছরের পর বছর ধরে লেখার মাধ্যম ছাড়া সংরক্ষিত হয়েছে তা আজও এক বিস্ময়। মুলার বলেন, ‘এটি সম্ভব হয়েছে স্মৃতিশক্তির মাধ্যমে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এ কথা সত্য, যদি সমস্ত ঋগ্বেদের পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়, তবুও তা বৈদিক পণ্ডিতদের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণরূপে উদ্ধার করা সম্ভব।’ এভাবেই নালন্দার গ্রন্থাগার ধ্বংস হওয়া সত্ত্বেও, ভারতীয় জ্ঞান ধারাবাহিকভাবে রক্ষা পেয়েছে। কাগজ-কলম নয়, সমাজের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো গল্প, স্তব, কবিতা, গান, মন্ত্র, প্রবাদ, ও বাণীর মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তর হয়েছে জনপদের কথা
ভারতীয় মৌখিক ঐতিহ্য বিশ্বে অনন্য দূর্লভ। ভারতীয় দর্শনে বৈধ জ্ঞানের ছয়টি মাধ্যম রয়েছে: প্রত্যক্ষ, অনুমান, তুলনা, সাক্ষ্য, অনুমানভিত্তিক, এবং অনধারণা। পশ্চিমা দর্শনে প্রধানত প্রত্যক্ষ জ্ঞানের উপর নির্ভর করা হয়, যা কেবল যা সরাসরি পর্যবেক্ষণযোগ্য ও যৌক্তিকভাবে যাচাইযোগ্য, সেটিকে সত্য হিসাবে গ্রহণ করে। কিন্তু ভারতীয় যোগাযোগের ঐতিহ্য প্রধাণত মৌখিক, তাই এটি শুধু প্রত্যক্ষতার লেন্স দিয়ে যাচাই করা কঠিন। পশ্চিমা লিখিত ধর্মীয় বা প্রামাণ্য দলিলকে সর্বোচ্চ সত্য হিসেবে গ্রহণ করার তুলনা ভারতভূমের ‘শব্দব্রহ্ম’ ধারণার সঙ্গে করলে তা বড়ো একপেশে হয়ে যায়। জার্মান ভাষাবিদ এবং বৈদিক ও প্রাচ্য অধ্যয়নের গবেষক, ম্যাক্স মুলার, পশ্চিমা বিশ্বের কাছে বৈদিক ও উপনিষদ জ্ঞানের গভীরতা উপস্থাপন করেন। ২৭ বছরের নিবেদিত প্রচেষ্টার পর তিনি ‘ঋগ্বেদ’এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃত গ্রন্থ যেমন ‘কথোপনিষদ’, ‘কেনোপনিষদ’, ‘হিতোপদেশ’, ‘মেঘদূত’ জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন। অনুবাদগুলো পরে বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় রূপান্তরিত হয়। ম্যাক্স মুলার ব্যাখ্যা করেন, খ্রিষ্টপূর্ব ১৫শ শতকে রচিত ‘ঋগ্বেদ’ কীভাবে বছরের পর বছর ধরে লেখার মাধ্যম ছাড়া সংরক্ষিত হয়েছে তা আজও এক বিস্ময়। মুলার বলেন, ‘এটি সম্ভব হয়েছে স্মৃতিশক্তির মাধ্যমে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এ কথা সত্য, যদি সমস্ত ঋগ্বেদের পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়, তবুও তা বৈদিক পণ্ডিতদের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণরূপে উদ্ধার করা সম্ভব।’ এভাবেই নালন্দার মহান গ্রন্থাগার ধ্বংস হওয়া সত্ত্বেও, ভারতীয় জ্ঞান ধারাবাহিকভাবে রক্ষা পেয়েছে। কাগজ-কলম নয়, সমাজের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো গল্প, স্তব, কবিতা, গান, মন্ত্র, প্রবাদ, ও বাণীর মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তর হয়েছে জনপদের কথা। ব্রিটিশ শাসনের সময় মিশনারি প্রেসের প্রভাবের কারণে ভারতীয় জনগণ শুধুমাত্র লিখিত শব্দকেই প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করতে শুরু করে। সাধারণ বিতর্কে প্রায়শই প্রশ্ন করা হয়, ‘কোথায় লেখা আছে ? দেখাও বা প্রমাণ কর !’ কিন্তু ভারতীয় যোগাযোগের ঐতিহ্য লেখার চেয়ে মুখস্থকরণ এবং ধারণাকে যে বেশি গুরুত্ব দেয়। শুধুমাত্র লিখিত গ্রন্থকেই প্রমাণ হিসেবে নিলে আমাদের অনেক শাস্ত্রকে মিথ্যা, পৌরাণিক বা লোককাহিনী হিসেবে বাতিল করার ঝুঁকি রয়েছে।
বৈদিক যুগেই ভারতীয় সাহিত্য ও পারফর্মিং আর্টের মূল ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল। সে সময়ের সাহিত্যকীর্তি ‘ঋগ্বেদ’, ‘যজুর্বেদ’, ‘সামবেদ’ ও ‘অথর্ববেদ’-এর ছন্দ এবং আবৃত্তিমূলক পাঠ শুধুমাত্র একটি আধ্যাত্মিক প্রথা নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংহতিরও একটি মাধ্যম ছিল। সামবেদ বৈদিক সঙ্গীতের প্রাথমিক রূপ ধারণ করত, যা পরবর্তী ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়
সংস্কৃত ভাষার অনন্য সৃষ্টি ছিল এই অতুলনীয় মৌখিক। প্রায় একই সময়ে ইন্দো-আর্য ভাষা দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রথম শাখার উত্থান শুরু করে, তখন প্রাচীন গ্রীক (১৪৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), প্রাচীন চিনা (১২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), আরামাইক (১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এবং হিব্রু (১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এর উত্থান ঘটে। মিশরীয় ভাষা থেকে শুরু করে আরও কিছু ভাষা ইতিমধ্যেই তাদের লিপি তৈরি করে ফেলেছিল। এর মধ্যে রয়েছে: সুমেরীয়, হ্যাটিক এবং এলামাইট ভাষা বিচ্ছিন্ন, ছোটো হুরো-উরার্তিয়ান পরিবারের হুরিয়ান, মিশরীয় এবং সেমিটিক ভাষার আকারে আফ্রো-এশিয়াটিক এবং আনাতোলিয়ান ভাষা এবং মাইসেনিয়ান গ্রীকের মতো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। এছাড়াও, প্রোটো-এলামাইট লিপি, সিন্ধু লিপি, ক্রিটান হায়ারোগ্লিফ, লিনিয়ার এ এবং সাইপ্রো-মিনোয়ান সিলেবারির মতো কিছু লিপি রয়েছে, যা পাঠোদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছে। অবশ্যই, লেখাকে প্রাচীন ভাষার অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ হিসাবে বিবেচনা করা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীনতম আবেস্তান গ্রন্থ- গাথা – ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে রচিত বলে মনে করা হয়, তবে প্রাচীনতম আবেস্তান পাণ্ডুলিপিগুলি ত্রয়োদশ শতাব্দীর। অথচ বৈদিক ইন্দো-আর্য ভাষা বেদের আকারে সাহিত্যকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সম্পূর্ণ মৌখিকভাবে প্রেরণ করবার প্রক্রিয়া সে সময়েও অব্যাহত ছিল। অর্থাৎ, মানব ইতিহাসের সমস্ত মৌখিক ঐতিহ্য কেবল আকস্মিক গল্প এবং গানের সমাহার নয়। সমস্ত মৌখিক সমাজকে ‘আদিম গালগল্প’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর্য সভ্যতার বাইরেও আদি অভিবাসী প্রধানদের জিনগত ছাপ বিলীন হওয়ার অনেক পরেও, তারা যে গোষ্ঠী, পৌরাণিক কাহিনী এবং আচার-অনুষ্ঠান প্রবর্তন করেছিলেন তা এখনো ক্ষীণস্রোতে বহমান।
প্রতিটি সংস্কৃতি এবং সভ্যতার নিজস্ব গল্প বলার রীতি রয়েছে, যা প্রধানত পুরাণ, কিংবদন্তি, ধর্ম এবং লোককাহিনীর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় । ভারতের গল্প বলার ঐতিহ্যে আছে বৈচিত্র্য আর বহুমাত্রিক অশেষ উপাদান । এই গল্প বলার প্রথা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জীবন্ত এবং ক্রমবর্ধমান শিল্প, যা শিক্ষাদান করে, ইতিহাস সংরক্ষণ আর সমাজের রূপান্তরকে চিহ্নিত করে
বৈদিক যুগেই ভারতীয় সাহিত্য ও পারফর্মিং আর্টের মূল ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল। সে সময়ের সাহিত্যকীর্তি ‘ঋগ্বেদ’, ‘যজুর্বেদ’, ‘সামবেদ’ ও ‘অথর্ববেদ’-এর ছন্দ এবং আবৃত্তিমূলক পাঠ শুধুমাত্র একটি আধ্যাত্মিক প্রথা নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংহতিরও একটি মাধ্যম ছিল। সামবেদ বৈদিক সঙ্গীতের প্রাথমিক রূপ ধারণ করত, যা পরবর্তী ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। যজুর্বেদ যজ্ঞ ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকলাপের জন্য প্রয়োজনীয় মন্ত্র সংকলিত করে, এবং অথর্ববেদ দৈনন্দিন জীবন, চিকিৎসা ও আচার-অনুষ্ঠানের নির্দেশ প্রদান করত। সে সময়ে মৌখিক চর্চার মাধ্যমে ছন্দ, সুর, আবৃত্তি এবং নৃত্যশৈলীর প্রাথমিক ধারণা গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী সাহিত্য ও পারফর্মিং আর্টকে সমৃদ্ধ করেছিল। সংস্কৃতির উপর বৈদিক সাহিত্যের প্রভাব গভীর সুদৃঢ়। কেবল ধর্মীয় ভাবনা বা আধ্যাত্মিক নৈতিকতা প্রচার নয়, বরং সামাজিক আচার, রাজনৈতিক বিধান এবং সংগীত ও নৃত্যের মৌলিক কাঠামো প্রতিষ্ঠাও করেছে এটি। বিশেষত আবৃত্তি ও সঙ্গীতের সংযোজন পরবর্তী কাব্য, নাট্যশিল্প ও লোকসাহিত্যের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।

১৯৩০, অ্যালেকজান্ডার ম্যাকেঞ্জির লেখা ‘ইনি্ডয়ান মিথ অ্যান্ড লেজেন্ড’ গ্রন্থে কথক পরিবেষ্টিত গ্রামবাসীদের আলোকচিত্র
প্রাচীন ভারতের মহাকাব্যিক বিশালক্ষেত্র ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’, সাংস্কৃতিক ও পারফর্মিং আর্টের ভবিষ্যতের বীজ বুনেছিল তখনই। মহর্ষি বাল্মীকি আর মহর্ষি বেদব্যাসের রচনার সঙ্গে জুড়ে আছে শ্রুতি আর স্মৃতির প্রাচীন দাগ। ঐতিহ্য আর নির্মাণের কাব্যশালা। সে কারণে এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও আধুনিক সাহিত্যের ব্যঞ্জনায় বারবার ঢুকে পড়ে মহাকাব্যিক রূপের ছটা। চরিত্র, কাহিনী আর ভাষ্য অমর, অজেয় হয়ে খেলে বেড়ায় কুরুক্ষেত্রে। মহাভারতে যুদ্ধ এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব, মানব জীবনের জটিলতা, ধর্মবোধ, নীতি, রাজনীতি ও দর্শনের সমন্বিত চিত্র পরিবেশনা শুধু পাঠ্যরূপে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং লোকনাট্য, যাত্রাপালা ও আবৃত্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায় অকাতরে। আঞ্চলিক ভাষায় মহাকাব্যের অনুবাদ আর নাট্যরূপান্তর মাতৃসংস্কৃতির সঙ্গে নাড়ির যোগ হয়ে ওঠে ক্রমশ। কৃত্তিবাসী, কাশীরাম, কম্বোন রামায়াণের সুর ভূ-খণ্ড ছাপিয়ে জুড়ে দেয় অজেয় দেশভাবনাকে।
শতাব্দির প্রথম দশকে প্রাচীন ভারতের পারফর্মিং আর্টের ব্যাকরণ লিখেছেন ভরত, তাঁর ‘নাট্যশাস্ত্র’-এ। নাটকের আনুষঙ্গ নয় কেবল, সামগ্রিক শিল্প মাধ্যম, শব্দ আর তার উচ্চারণ, নৃত্য, সঙ্গীত, ছন্দ, তাল, লয়ের বিদ্যালয়ী শিক্ষা তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছি আমরা। নাট্যকলা যে শুধুমাত্র বিনোদন নয়, বরং নাট্যরসের মাধ্যমে দর্শককে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষায় প্রভাবিত করার মাধ্যম, সেই কবেই তা জেনে গিয়েছি আমরা ! ‘নাট্যশাস্ত্র’-ই আধুনিক ভারতের নৃত্য, গীতি ও আবৃত্তি চর্চার জন্য কাঠামো দিয়েছে, পারফর্মিং আর্টকে বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক ভিত্তি দিয়েছে। ক্লাসিকাল সাহিত্যে কালিদাস অন্যতম শ্রেষ্ঠ। চতুর্থ–পঞ্চম শতাব্দীতে জীবনমান ও সৌন্দর্যের সর্বোচ্চ শ্রষ্টা তিনি। ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’-এর নাট্যরূপের বাহার, সৌন্দর্য, প্রেম, নীতি ও রাজনীতির সংমিশ্রণ দুর্বার গতিতে ছড়িয়েছে লোক থেকে লোকান্তরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ‘রঘুবংশম’ আর ‘কুমারসম্ভব’-এর কবি ছায়ায় মতো এসে দাঁড়িয়েছে সমকালের দরজায়। মধ্যযুগীয় ভারতীয় সাহিত্য, বিশেষত ৬–১৮ শতকের মধ্যে, প্রায়শই আঞ্চলিক ভাষায় বিকশিত হয়। বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রামাণ্য রচনা ‘চর্চাপদ’— ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষামূলক কবিতা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। বৌদ্ধ-ভিক্ষুক চারণ কবিরা লোকমুখেই ধর্মচর্চা, নৈতিকতা ও সামাজিক আদর্শ প্রচার করতেন দেশের বিবিধ বৈচিত্র্যের অঞ্চলে। একটানা দুশো বছর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। পরে ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে ইলিয়াস শাহ. বাংলার সিংহাসনে বসলে নতুন করে সাহিত্য সৃষ্টির আয়োজন দেখা দেয়। ১৩–১৮ শতকের মধ্যে উদ্ভূত, বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার প্রতিফলন ‘মঙ্গলকাব্য’ । লোকদেবী আরাধনা ও নৈতিক আদর্শকে কেন্দ্র করে লেখা ‘মঙ্গলকাব্য’ নিম্নবর্গীয় মানুষের লোকসংস্কৃতি আর যাপনে, পল্লি নদীর মতোই একঘেয়ে সুরে গেয়ে ওঠে ‘আপনার কথা’।
আশ্চর্যের কথা, বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে শুধুমাত্র বাংলাদেশ, কলকাতা ও জাপানে মূলত আবৃত্তির চর্চার চল রয়েছে। অর্থাৎ, বলা যায়, এ দুই ভাষা সাহিত্যেই শুধুমাত্র ‘আবৃত্তি সাহিত্য’-এর চর্চা হয়। খুব ভালভাবে অনুধাবন করলে বিষয়টি লক্ষ্য করা যাবে যে, বাংলা সাহিত্যের বা পৃথিবীর যেকোনো সাহিত্যের আদি সংরক্ষণ পদ্ধতিই আবৃত্তি, এবং তা স্বকীয় সাহিত্যধারা। যে কারণেই বোধ হয় পূর্বের সাহিত্যে আজকের মতো গদ্যের প্রচলন ছিল না। কোনো ঘটনা পঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মনে রাখা সহজ নয়, যদি না তাতে মন-মাতানো কিংবা মনে আঁচড় কাটার মতো কোনো উপাদান থাকে। তাই, হয়তো সে সময় মানুষ তখন গল্প বা কোন কাহিনীর সাথে বিভিন্ন ছন্দ লাগিয়ে তাকে আরো রস-আস্বাদন দিত। ফলে সেসব ছন্দ বেশ কিছু বার আবৃত্তির পর পুরো ঘটনা বা কাহিনিটা মনে রাখা সম্ভব হতো। পণ্ডিতরা মনে করেন, বিশাল বৈদিক শ্লোকগুলি তৈরি করতে এক শতাব্দী বা তারো বেশি সময় লেগেছে। তারপর থেকে, গত তেত্রিশ শতাব্দী ধরে, বেদ-পাঠশালাগুলিতে সম্পূর্ণ সংগ্রহটি আক্ষরিক অর্থে অক্ষরে অক্ষরে স্মরণে রেখে ‘আবৃত্তি’ করা হয়ে চলেছে। ভারতের গল্প বলার প্রথা তাই কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জীবন্ত এবং ক্রমবর্ধমান শিল্প, যা শিক্ষাদান করে, ইতিহাস সংরক্ষণ আর সমাজের রূপান্তরকে চিহ্নিত করে। বৈদিক ঘরানার পাশাপাশি বৌদ্ধ দর্শন, সুফি, ভক্তিঘরাণা ডানা মেলে নির্মল আকাশে। প্রতিটি সংস্কৃতি এবং সভ্যতার নিজস্ব গল্প বলার রীতি রয়েছে, যা প্রধানত পুরাণ, কিংবদন্তি, ধর্ম এবং লোককাহিনীর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। ভারতের গল্প বলার ঐতিহ্যে আছে বৈচিত্র্য আর বহুমাত্রিক অশেষ উপাদান। উত্তরে ‘কথা’ বা ধর্মীয় গল্প বলার প্রথা প্রচলিত ছিল, যখন দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নিজেদের স্বতন্ত্র রূপ ছিল, যেমন সঙ্গম কাব্যধারা। যেমন কেরালার নাট্যনৃত্য ‘কথাকলি’, ব্যঞ্জনা ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে গল্প বলা একটি শিল্প। ভারতীয় কথকদের বহুমুখিতা তাদের গল্পকে শ্রোতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতায় প্রতিফলিত হয়, প্রায়শই স্থানীয় রসিকতা আর কিংবদন্তি সংযোজন করে। বাংলার বাউল গান, নাটক, থিয়েটার, যাত্রাপালা, ভাদুগান, জারি-সারি গান, অজস্র লোকাচার গল্প বলার মাধ্যমেই সামাজিক বাস্তবতা আর অতীতের বাতাস বয়ে এনে দেয় আগামীর দরবারে। সময় এগিয়ে। লেখ্য শিল্পের বিজয়রথ আজ আবার থমকে দাঁড়িয়ে। অত্যাধুনিক জমানায় ফিরে আসছে দৃশ্যশব্দ আর প্রদর্শনের বৈভব।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us








