- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- নভেম্বর ২, ২০২৫
ছয় নম্বর প্রশ্নের উত্তর
প্রথম প্রশ্ন, কবিতা কাকে বলে ? অসমিয়া আধুনিক কবিতার বিষয়ে কী জান ?
দ্বিতীয় প্রশ্ন, সাহিত্য বলতে কী বোঝ ?…
তৃতীয় প্রশ্ন…
চতুর্থ প্রশ্ন …
পঞ্চম প্রশ্ন …
ষষ্ঠ প্রশ্ন, নিচের যে কোনো একটি বিষয় নিয়ে একটি রচনা লেখো।ক. অভাবই আবিষ্কারের উৎস
খ. তোমার জীবনের লক্ষ্য
গ. কলেজে তোমার প্রথম দিন
হরিহর প্রশ্নপত্রটি দুবার ভালো করে পড়ে দেখল। এটাই কলেজে তার প্রথম পরীক্ষা, প্রথম টার্মিনাল। তার মতোই সমস্ত পরীক্ষার্থীরই প্রশ্নগুলি পড়ে বুঝতে পারছে না। হরিহরের এরকমটাই মনে হলো। সে পুনরায় ভালোভাবে প্রশ্নগুলোর উপরে চোখ বোলায়। প্রশ্নগুলি ক্রমে তার সহজ মনে হয়। সিলেবাস শেষ হয়নি, তাই সাধারণ প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে।
হরিহরের একটা কথা মনে পড়ল, অধ্যাপক বলেছিলেন, যে প্রশ্নের উত্তর ভালোভাবে জানা আছে, সে প্রশ্নটি প্রথমে লিখে নিতে হয়।
সে ভেবে দেখল, কোন প্রশ্নের উত্তর লেখা তার পক্ষে সবচেয়ে সহজ। অনুভব করল, ষষ্ঠ প্রশ্নটি সবচেয়ে সহজ হবে। রচনা সে লিখতে পারে। তিনটি রচনার মধ্যে তৃতীয় বিকল্পটি লেখাই তার পক্ষে অধিকতর সহজ। ‘কলেজে আমার প্রথম দিন।’ সে দিনটির অনেক কথাই তার মনে আছে। রচনাটা ভালোভাবে লিখতে, এমনটাই মনে হলো তার।
বসে থাকার মতো সময় নেই। তিন ঘন্টার ভেতরে ছ-টি প্রশ্নের উত্তর লিখতে হবে। সবগুলি না পারলেও অন্তত চারটি প্রশ্ন অ্যাটেম্ট করতেই হবে।
কিছুটা ভেবে নিয়ে হরিহর ষষ্ঠ প্রশ্নের উত্তর লিখতে শুরু করল।
‘কলেজে আমার প্রথম দিন।’
আমার কলেজে আসার তিন মাস হয়ে গেল। জুলাই মাসের ২৭ তারিখ কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। সেদিন ছিল কলা বিভাগের ছাত্রদের ভর্তির শেষ দিন। অন্যান্য প্রায় সব ছাত্রই আমার চেয়ে আগে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। আমি শেষে এসে তাদের সঙ্গে যুক্ত হই।
কারণ, তার আগে আমি কলেজে ভর্তি হতে পারিনি।
আমরা তিন ভাই ও দুই বোন। আমাদের বাড়ি গ্রামে। বাবা চাষ করেন অন্যের জমিতে। আমাদের নিজেদের জমি কুল্লে তিন কাঠা। আমাদের বসবাসের ঘরটি আমাদের নিজেদের জমির ওপরেই। চাষের জমি নেই। অন্যের জমিতে চাষ করে যে ধান পাই, তা দিয়ে আমাদের চার মাসের খাবার জোটে। বাকি আট মাস খুব কষ্ট হয়, বড়ো কষ্ট। আশ্বিন কার্তিক মাসে আমরা সারাদিনে কোনো রকম একবেলা খাবার পাই। কখনও কখনও সেটাও জোগাড় হয় না। মা লোকের জমিতে কাজ করে। মায়ের চুলগুলি পেকে গেছে। লোকেরা মাকে দেখলে বুড়ি ভাবে।
আমি দ্বিতীয় বিভাগে মেট্রিক পাশ করলাম। প্রথম বিভাগে পাশ করব, আমিও ভেবেছিলাম, আমার শিক্ষকরাও আশা করেছিল। পারলাম না।
কারণ,
পরীক্ষার জন্য বিশেষ প্রস্তুত হতে পারিনি। হঠাৎ মায়ের কঠিন অসুখ হলো। সুবিধাজনক চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা করা গেল না, সাধারণ টোটকার দ্বারস্থ হতে হলো। চার মাস ভুগলেন, বেঁচে থাকলেন। মারা গেলে আমাদের আরও অসুবিধা হত।
মায়ের চিকিৎসায় লেগে থেকে আমি পড়াশোনা করতে পারলাম না। তাছাড়া, বইপত্রও ছিল না। এর ওর কাছ থেকে, দু-দিনের জন্য চেয়ে এনে কোনোমতে পড়েছি। বেশি রাত পর্যন্ত পড়ার কোনো উপায় নেই। গভীর রাত পর্যন্ত আলো জ্বালিয়ে পড়াশোনা করার মতো তেলের জোগাড় ছিল না। ছিল না ভাতের জোগাড়। মায়ের ওষুধ পত্রের জন্য অন্য কোনো পথ না পেয়ে ধান বিক্রি করতে হয়েছিল। বিক্রি করার মতো আর কিছুই ছিল না। বাড়ির ভেতরে আমরা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আজকাল কেউ মানুষ কেনে না। আমার মনে হয় মানুষ বেচাকেনা করা প্রথাটা আজকের দিনেও চালু থাকলে খুব একটা খারাপ হত না, তাহলে হয়তো আমাদের মুখের ধানের মুঠো বিক্রি না করে আমাকে বা আমার কোনো একটি ভাইকে বাবা বিক্রি করে দিতে পারত। আর সে টাকা দিয়ে মায়ের চিকিৎসা করা যেত।
আমি মেট্রিক পাশ না করলেই ভালো ছিল। পাশ করার পরে প্রত্যেকে বলতে লাগল, আমাকে আরো পড়াশোনা করতে হবে, কলেজে ভর্তি হতে হবে। আমিও বহুদিন থেকে দেখে আসা স্বপ্ন, পুনরায় নতুন করে দেখতে লাগলাম।
বাড়ির অবস্থা দেখে কলেজে পড়তে গেলে গ্রাম থেকে দূরে থাকতে হবে, ভালো না হলেও দুই তিন ধরনের জামা কাপড় লাগবে। দেখতে পাচ্ছি, এ সব কিছুর জোগাড় বাবা কিছুতেই করতে পারবেন না। গ্রামে বসবাসকারী সম্পর্কীয় স্বজনরা আমাদের মতোই দুঃখী, আমার পড়াশোনায় সাহায্য করা তো দূরের কথা, তাদের নিজেদেরই সংসার চলে না। তথাপি তারাও আমাকে পড়াশোনার জন্য উৎসাহ দেয়। আমি আশা নিরাশার মধ্যে দোলায়িত হয়েছি— কী করব, বিশেষ চিন্তা না করে চাষের কাজে ঢুকে পড়লাম। অন্যের জমিতে হলেও লাঙ্গল না বেয়ে একমুঠো অর্জন না করলে আমরা কী খাব ? পড়াশোনা হয় যদি হবে, নাহলে নেই— চাষের সময় যে পেরিয়ে যাবে।
অভাবই আবিষ্কারের মূল কথা প্রবাদটি ধনী মানুষের সৃষ্টি, দুঃখীরা কোনোদিন কিছু আবিষ্কার করেনি, করতে পারেনা। একটি কথা কেবল দুঃখীরা আবিষ্কার করে, করতে পারে যে, সে দুঃখী, দুঃখ তার চিরসঙ্গী, দুঃখই তার জীবনের একমাত্র সত্য। এটা আবিষ্কার করে দুঃখীদের দুঃখ আরও বেশি বেড়ে যায়
মেট্রিক পাশ করে, কাঁধে লাঙ্গল নিয়ে অন্যের ক্ষেতে হাল চাষ করতে যেতে দেখে বাবার মন খারাপ হয়েছে, মুখ খুলে কিছু বলতেও পারছিল না। আমার নিজেরও খারাপ লাগছিল। দরিদ্রের ভালোলাগা খারাপ লাগার অর্থ নেই। জীবন সংগ্রাম করতেই হবে, সুতরাং সহপাঠীরা যখন কলেজে যেতে প্রস্তুত হলো, তখন আমি অন্যের জমিতে চাষ করার জন্য মাঠের উদ্দেশ্যে রওনা দিই।
জুলাই মাসের একুশ তারিখ মাঠ থেকে এসে ঘরে প্রবেশ করেছি। সেদিন বড়ো কড়া রোদ। শ্রাবণ মাস। জলখাবার খেয়ে, মাটির ওপরে দুব্বো ঘাসে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, মা বললেন, টাকার জোগাড় হয়ে গেছে। তোকে আর হাল বাইতে হবে না। পড়াশোনা করার জন্য প্রস্তুত হ।
প্রথমে মায়ের কথা বুঝতে পারলাম না, পড়াশোনার কথা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। ছাত্র জীবন শেষ হয়ে গেল বলেই ভেবেছিলাম। মা যেন অবোধ্য রূপকথার গল্প বলছেন।
আমি মায়ের মুখের দিকে তাকালাম। মা বুঝতে পারলেন, আমি তাঁর কথা বিশ্বাস করতে পারছি না। কারণ, অভাবই আবিষ্কারের মূল কথা প্রবাদটি ধনী মানুষের সৃষ্টি, দুঃখীরা কোনোদিন কিছু আবিষ্কার করেনি, করতে পারেনা। একটি কথা কেবল দুঃখীরা আবিষ্কার করে, করতে পারে যে, সে দুঃখী, দুঃখ তার চিরসঙ্গী, দুঃখই তার জীবনের একমাত্র সত্য। এটা আবিষ্কার করে দুঃখীদের দুঃখ আরও বেশি বেড়ে যায়।
মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘টাকা কোথায় পেয়েছিস মা ?’
‘যেভাবেই হোক জোগাড় করেছি, তবে তা দিয়ে হবে কিনা সেটা বলতে পারছি না।’
মায়ের মুখের দিকে তাকালাম। কান দুটি খালি। দুল জোড়া নেই। বিক্রি করেছে না বন্ধক দিয়েছে ? জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হলো না। বিক্রি করলেও কি কলেজে ভর্তি হওয়ার মতো টাকার জোগাড় হবে ?
বিকেলে দেখতে পেলাম আমাদের ছাগল তিনটিও নেই।
‘ছাগলগুলোও নেই দেখছি, কোথায় গেল ?’ বোনকে জিজ্ঞেস করলাম ।
‘বিক্রি করে দিয়েছে…’
‘কবে করল ?’
‘গতকাল। তিনটে ছাগল বেচে সাতাশ টাকা পেয়েছে।’
‘সবগুলি কেন বিক্রি করে দিল ?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘না হলে টাকা জোগাড় কীভাবে হবে ?’ অর্থাৎ আমার কলেজে ভর্তি হবার জন্য টাকা।
ছাগলের শূন্য খামারটার দিকে একবার তাকিয়ে ভেতরে চলে এলাম।
কলেজে পড়াটা কী ধরনের, জানি না। পড়ার জন্য এতসব আয়োজন দেখে আমি হতাশ হয়ে গেলাম।
অবশ্য মনে কিছু আশা জাগল, হয়তো নাম লেখানোর জন্য টাকার জোগাড় এভাবেই হয়ে যাবে।
কাকুর ছেলে কণপায়ও কিছুটা সাহায্য করল। আমার কিছু পুরোনো বই ছিল— অচল হয়ে যাওয়া পাঠ্য বই, কিছু স্কুলে প্রাইজ পাওয়া বই, ক্লাসে আমি প্রায়ই প্রথম হতাম।
সে বইগুলি সাইকেলের ক্যারিয়ারে বেঁধে নিয়ে টাউনে গেল। তেরো কেজি হলো। সেগুলো বিক্রি করে ন-টাকা পেল।
অবশেষে— আমাকে আশ্চর্য হতে হলো, বাবা ও মায়ের মুখে অফুরন্ত হাসি। আমার কলেজ ভর্তির টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল। এমনকি তিন টাকা বেশি, সেটা আপাতত আমার আসা-যাওয়ার খরচ।
অবশ্য এ পর্যন্ত কেউ ভাবতেই পারেনি যে, কলেজে ভর্তি হবার পর কীভাবে চলব, কোথায় থাকব, কোথায় খাব। প্রসঙ্গটা উত্থাপন করতেও ভয় হলো। মায়ের কানের জোড়া বিক্রি করে, খামারের ছাগল বিক্রি করে, পুরস্কার পাওয়া বই বিক্রি করে মা বাবার মুখে যে হাসি ফুটেছে, সেটাই যথেষ্ট। এ সব প্রশ্ন উত্থাপন করলে হঠাৎ সে হাসি নেই হয়ে যেতে পারে। আশ্চর্য শহরের নতুন জীবন। কোনো উপায় বের হবেই, নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম। নগরে কত মানুষ কত রকম কাজ করে। আমিও কিছু একটা উপায় বের করে নিতে পারব না? ভর্তির টাকা জোগাড় হয়ে গেলে… ভবিষ্যতের উপরে বিশ্বাস রাখতে ইচ্ছা হলো।
বাসে মোটরে গিয়ে টাকা তিনটি খরচ করা থেকে, দুদিন বা তিন দিনের জন্য কাকার সাইকেলটি নিয়ে যাই। সতেরো মাইল পথ, থাকার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক না হলে বাড়ি থেকেই যাওয়া আসা করতে হবে, আসা যাওয়া মিলিয়ে চৌত্রিশ মাইল পথ
আমাদের গ্রামের কোনো ছেলে এর আগে কলেজে পড়তে যায়নি। পাশের গ্রামের মানিক দ্বিতীয় বার্ষিকীতে পড়ছে। একদিন গিয়ে মানিকের সঙ্গে আলোচনা করলাম। মানিক সাহস দিল, ‘প্রথমে নামটা লিখিয়ে আয়, অন্য ব্যবস্থা ধীরে ধীরে হতে থাকবে।’
‘বইপত্র ?’
‘এখন না হলেও চলবে। নোটগুলি লিখে রাখবে।’
‘থাকার ব্যবস্থা ?’
‘কোনো মেসের খোঁজ করতে হবে। আমি খুঁজে দেব।’
মানিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করলাম।
অবশেষে ঠিক হল যে, বাসে মোটরে গিয়ে টাকা তিনটি খরচ করা থেকে, দুদিন বা তিন দিনের জন্য কাকার সাইকেলটি নিয়ে যাই। সতেরো মাইল পথ, থাকার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক না হলে বাড়ি থেকেই যাওয়া আসা করতে হবে, আসা যাওয়ায মিলিয়ে চৌত্রিশ মাইল পথ।
সাতাশ জুলাই। আমার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিন। আমি কাকার সাইকেল নিয়ে নগরের কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দেব।
আগের দিন রাতে কারও ভালো করে ঘুম হলো না।
পিসি এল, পিসির মেয়ে আইধানো এল। মা, আমার বোন হুলস্থুল করে কিছু চিড়া কুটল, পিঠে ভাজল, জানি না আমার শুভযাত্রার জন্য আরও কী কী আয়োজন করা হলো? হয়তো এরই মধ্যে মা বাবার মাধ্যমে কিছু পূজা প্রার্থনারও ব্যবস্থা করেছে।
রাতের বেলা, কণপা কাকার পুরোনো সাইকেলটা মুছে একটা রেন্স দিয়ে, কিছু কিছু জিনিস টাইট-ঢিলা করে সাইকেলটা নির্বিঘ্নে কলেজ পার হয়ে যাবার মতো করে রাখল। একটা টায়ার ফাটা ছিল। সেটা খুলে, ভেতরে ফাটা টায়ারের একটা টুকরো ঢুকিয়ে দিল।আমার কাপড়-চোপড়ের দুটি সেটও নেই। ধুতি অবশ্য দুটি, একটি ফেঁসে গেছে, সেলাই করা সম্ভব নয়। মাঝে মধ্যে গিঁট দিয়ে পরি। অন্যটি এতটা ফাটেনি, খুব ভারী। শার্ট মাত্র একটা। কলার ফেটে গেছে। ওপরের পকেটের কাছেও ফাটা। বোন সেলাই করে দিতে চেয়েছিল, আইধান থাকার জন্য লজ্জা পেল।
সমস্যা হল জুতো নিয়ে। জুতো না পরেই মেট্রিক পাশ করলাম। কলেজে খালি পায়ে যেতে কিছুটা সংকোচ হলো। ভাবলাম কার কাছে চাইতে যাব? যে যা ভাবে ভাবুক, আমি এভাবেই যাব।
রাত দশটায় বাবা ছেঁড়া কাপড় দিয়ে বাঁধা একজোড়া স্যান্ডেল আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।
‘এটা পায়ে হবে কিনা দেখতো—’
আমি একবার বাবার মুখের দিকে আরেকবার স্যান্ডেল জোড়ার দিকে তাকালাম।
‘না হলেও চলে যেত। স্যান্ডেলটা কার ?’
‘শিরীষ ঘোষের।’
শিরীষ ঘোষ আমাদের গ্রামের দোকানদার, বাঙালি। পায়ে ঢুকিয়ে দেখলাম, বড়ো হচ্ছে।
বললাম হবে, ঠিকই আছে।
বাবা বললেন, ‘ছিড়বি না। আবার ফিরিয়ে দিতে হবে। তারও আর নেই।’
গভীর রাত পর্যন্ত জাগতে হলো। কখন ঘুমিয়ে পড়লাম, বলতে পারিনা। স্বপ্ন দেখে থাকলেও মনে নেই।
ভোরের দিকে মা জাগিয়ে দিলেন।
বাবা তখন গোয়ালঘর থেকে গরুর সঙ্গে লাঙ্গলটা নিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
বললেন ‘তুই তাড়াতাড়ি যা, দেরি করিস না, টাকাগুলি সাবধানে রাখবি। ফিরে আসবি তো ?’
‘সম্ভব হলে আসব।’
‘সম্ভব হলে চলে আসবি। না হলে আমাদের নিয়ে চিন্তা হবে। আমি যাই, কণ ঠাকুরের জমিতে কাজ রয়েছে।’ বাবা বললেন।
চিড়া পিঠার পুঁটলিটা সাইকেলে ঝুলিয়ে বেঁধে দিল বোন। জল খাবার দিয়েছিল– খেতে পারলাম না, মুখে দিলাম মাত্র।
একটা তামোল মুখে দিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ালাম। দেখি কাঁধে লাঙ্গল নিয়ে বাবা দাঁড়িয়ে রয়েছেন– মা ছেঁড়া ছাতিটা এনে দিল, কণপা সাইকেলের পাম্পটা এনেছিল, সঙ্গে একটু ছেঁড়া কাপড়– কানেকশন ভালো নেই। ছেঁড়া কাপড়ের টুকরোটা পকেটে ভরে নিলাম। পিসি দুটো তামোল দিল। আইধান আমার দিকে তাকিয়ে আনন্দ ও বিস্ময়ের মিশ্রিত হাসি হাসল।
জামার পকেটে টাকাটা হাত দিয়ে অনুভব করলাম– আছে। এতটা টাকা আমি জীবনে প্রথমবারের জন্য পেয়েছি।
প্রত্যেককে বলে বেরিয়ে এসে বাড়ির গেটের সামনে পৌঁছলাম। সবাই আমার পিছন পিছন এল। মা বললেন, ‘রোদ লাগলে ছাতাটা মেলে নিবি। আজ কড়া রোদ উঠবে।’
বাবা বলল ‘তুই চিন্তা করিস না। ভর্তি হয়ে নে। লেখাপড়া শুরু হলে কোনো একটা ব্যবস্থা করে নেব।’
ছোটো বোনটি কাছে এসে বলল, ‘দাদা, আমার জন্য একটা পেন্সিল আনবি। আমার তো পেন্সিল নেই।’
যাত্রা শুরু হলো।
সাইকেলের প্যাডেল দুটো বড়ো টাইট। তার চেয়েও বড়ো কথা, সাইকেলের সামনের চাকাটা, প্রায় দেড় মাইল দুই মাইল যাওয়ার পরে চাকার হাওয়া উধাও। নেমে পথের পাশের একটা গাছে হেলান দিয়ে পুনরায় হাওয়া ভরে নিই। মাঝেমধ্যে পথের পাশে সাইকেল মেরামতির দোকান দেখতে পাই। টিউবের ফুটো সারাই করতে গেলে অনেক সময় লাগবে। আর পয়সাও খরচ হবে। খরচ করার মতো পয়সা এবং সময় দুটিরই অভাব। প্রায় চার ঘন্টা পরে আমি নগরে প্রবেশ করলাম। কড়া রোদ উঠেছে। ঘামে জামা কাপড় ভিজে গেল। ক্লান্ত লাগছিল। কলেজে পৌঁছানোর আধমাইল আগেই সাইকেল থেকে নেমে পড়লাম। রুমাল দিয়ে হাতমুখ ভালো করে মুছে নিলাম। ক্ষুধা পেয়েছে। কোথাও বসে নিয়ে জলখাবার খাওয়ার মতো জায়গা দেখতে পেলাম না। হাজার হাজার মানুষ শহরের দিকে চলেছে। ঠিক করলাম আগেই কলেজে গিয়ে নামটা লিখিয়ে আসব, তারপর সুবিধা হলে কিছু একটা খেয়ে নেব।
সামনের চাকায় শেষবারের মতো হাওয়া ভরে আবার সাইকেলে উঠলাম। খুব একটা দেরি হয়নি। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা পথে-ঘাটে কিলবিল করছে। আমি সাইকেলটা ধীরে ধীরে চালাতে লাগলাম।
অবশেষে !
কলেজের গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। সাইকেল থেকে নেমে এলাম, হাতের তালু দিয়ে মুখটা একবার মুছে নিলাম। আমার দিকে কেউ তাকাচ্ছে না, কথাটা ভেবে কিছুটা স্বস্তি অনুভব করলাম। একটু ইতস্তত করে, সাইকেলটা রেখে কলেজের অফিসে ঢুকে গেলাম আমি।
মেয়েদের মুখে উজ্জ্বল হাসি। যেন বিয়ে হচ্ছে, কোনো উৎসব চলছে, যুবক-যুবতিরা সেজেগুজে এসেছে। আমার অকারণ সংকোচ বোধ হতে লাগল, ওদের সঙ্গে আমার মিল নেই। অনুভব করলাম, এতগুলি ছেলের মধ্যে আমার মত দরিদ্র আমার মতো দুর্ভাগা কেউ নেই
‘এতদিন কী করছিলে ?’ কিছুটা কঠিন কণ্ঠে কেরানি বললেন। বলেই একটা ফর্ম এগিয়ে দিলেন। আমি এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখলাম— পরিচিত কেউ চোখে পড়ে নাকি ?
অফিসের প্রায় প্রত্যেকেই আমাকে খুব কৌতূহলের সঙ্গে দেখছে বলে মনে হলো। আমি ঘামতে শুরু করলাম। মুখ কান লাল, আমি হঠাৎ নার্ভাস !
অবশেষে তারাই ফর্মটা পূরণ করতে সাহায্য করল। টাকা দিলাম, একটা রশিদ দিলেন কেরানি। তার মানে আজ থেকেই আমি এই কলেজের ছাত্র হলাম।
অফিস থেকে বেরিয়ে খানিকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে রইলাম। সবাই কলরব করতে করতে ক্লাসে যাচ্ছে। ক্লাস থেকে বের হচ্ছে— যেন কোনো উৎসব চলছে।
আমি এক পাশে দাঁড়িয়ে আছি। ক্লান্ত লাগছে, ক্ষুধা পেয়েছে, নার্ভাস অনুভব করছি। কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে না। আমার কাছে জীবনের যা সবচেয়ে বড়ো কথা, অন্যের কাছে সেটা কোনো ব্যাপারই নয়। হতাশা ঘিরে ধরল। বড়ো নিরুৎসাহিত মনে হলো।
মেয়েদের মুখে উজ্জ্বল হাসি। যেন বিয়ে হচ্ছে, কোনো উৎসব চলছে, যুবক-যুবতিরা সেজেগুজে এসেছে। আমার অকারণ সংকোচ বোধ হতে লাগল, ওদের সঙ্গে আমার মিল নেই। অনুভব করলাম, এতগুলি ছেলের মধ্যে আমার মত দরিদ্র আমার মতো দুর্ভাগা কেউ নেই। এ উৎসবে যোগ দিতে আসাটা আমার পক্ষে অশোভন হয়েছে।
ছেলে মেয়েদের পেছন পেছন একটা ক্লাসে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সেটা কোন ইয়ারের, কী ক্লাস, কিছুই জানিনা। কাউকে জিজ্ঞেস করব, সে সাহসও হচ্ছে না। আমি ক্লাস চিনি না বললে, ছেলেরা আমাকে কী ভাববে ?
পেছনের একটি বেঞ্চে চুপ করে বসে রইলাম। আমার পাশে বসা ছেলেটি একবার আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আবার সামনের দিকে তাকাল। আমিও তাকালাম।
হাতে একটা রেজিস্টার নিয়ে একজন মাঝবয়সী ব্যক্তি ক্লাসে প্রবেশ করলেন। ছেলেমেয়েরা উঠে দাঁড়াল। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। বুঝতে পারলাম, ইনি প্রফেসর।
আমি প্রফেসরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চুলগুলি ছোটো করে ছাঁটা, আধপাকা, চুলে তেল নেই। ভালো করে চুলটা আঁচড়ানও নি। তিন চার দিনের না কাটা আধ পাকা দাড়ি। চোখে একজোড়া চশমা।
একটা পুরোনো কুর্তা পরেছেন– কাঁধের কাছটা ছেঁড়া, কলারটা ছেঁড়া, মলিন। আমার মনে হলো– ভদ্রলোক আমার চেয়েও বেশি ক্লান্ত, আমার চেয়েও দরিদ্র। তাকে দেখে আমার সাহস হলো, মানুষটার প্রতি ভক্তি হলো। হঠাৎ চোখে পড়ল তাঁর পায়ের স্যান্ডেল জোড়া শিরীষ ঘোষের স্যান্ডেলের থেকেও পুরোনো।
তিনি হাজিরা নিলেন, কী সব বক্তৃতা দিলেন –আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি কিন্তু অনুভব করলাম যেন ক্লাসটিতে আর কেউ নেই। মুখোমুখি হয়ে বসে আছি আমি এবং সেই আধবয়সী প্রফেসরটি। আমাদের মধ্যে যেন বহুদিনের একটি আত্মীয়তা আছে। আমি না বললেও তিনি যেন আমার সমস্ত কথা জেনে ফেলেছেন, আমার দুরবস্থার কথা, আমার ক্ষুধা পাওয়ার কথা, ক্লান্ত লাগার কথা, আমার সমস্ত কথা।
ক্লাস শেষ হলো। অন্যদের সঙ্গে আমিও বাইরে বেরিয়ে এলাম। মনে হলো, ছেলে মেয়ে প্রত্যেকেই আমার দিকে, আমার ছেঁড়া জামার দিকে, আমার পুরোনো বড়ো ঢিলা স্যান্ডেল জোড়ার দিকে, আমার ক্ষুধার্ত শুকনো মুখের দিকে তাকাচ্ছে। প্রত্যেকেই যেন মুখ টিপে হাসছে, মেয়েরা আমাকে নিয়ে গোপন উপহাস করছে। আমার মাথা গরম হয়ে উঠল। খুব জোরে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা হলো।
ধীরে ধীরে আমি সাইকেলটার দিকে এগিয়ে গেলাম। সামনের চাকাটা পাংচার। বিরক্ত হলাম, ছেলে মেয়েদের সামনে সাইকেলে হাওয়া ভরতে লজ্জাও হলো।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। ছেলেমেয়েরা আবার ক্লাসে গেল। ভিড় একটু হালকা হতেই আমি দ্রুত সাইকেলটা ঠেলে কলেজ কম্পাউন্ড থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
কিছুদূর এসে একটা গাছে সাইকেলটা হেলান দিয়ে রেখে হাওয়া ভরে নিলাম। সামনে তাকিয়ে দেখলাম, একটা লোক কয়েকটি ছাগলের গলায় রশি লাগিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তার হাতে লাঠি।
বুকটা ধরকে উঠল। এগুলি কি আমাদেরই ছাগল ! আমি আর ওদের দিকে তাকাতে পারলাম না, কারণ ছাগল গুলোর অসহায় কাতর দৃষ্টি আমার অসহ্য মনে হতে লাগল।
আমি সাইকেলে উঠে পড়লাম।
‘এটাই কলেজে আমার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা।’
এবার হরিহর প্রথম প্রশ্নটির উত্তর লিখতে শুরু করল, ’’কবিতা কাকে বলে ?’
উত্তর লিখল সে, ‘কবিতা কাকে বলে আমি বলতে পারি না, কারণ কবিতা আমি পড়েছি, কবিতা কী জিনিস এ বিষয়ে জানার কোনো সুযোগ আমার জীবনে আসেনি, কারণ…’
♦–♦♦–♦♦–♦
লেখক পরিচিতি: আধুনিক অসমিয়া কথা সাহিত্যের অন্যতম রূপকার সৈয়দ আব্দুল মালিকের জন্ম ১৯১৯ সালে অসমের শিবসাগর জেলার নাহরণিতে। পড়াশুনো যোরহাট সরকারি হাইস্কুল ও গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অসমিয়া ভাষাসাহিত্য পড়াতেন। আলাপে তাঁর রসবোধ, প্রবাদ হয়ে আছে আজও। ‘অঘরী আত্মার কাহিনী’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, অসংখ্য গল্পের জন্যও তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন। খ্যাতি তাঁর বহুমাত্রিক এবং অশেষ।
তরজমা– বাসুদেব দাস
❤ Support Us








